বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [দ্বিতীয় পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [দ্বিতীয় পর্ব]
লেখা : সৌরভ সেন

আগে যা ঘটেছে

মালবাজারের দত্তবাড়িতে রক্তে লেখা দুটো হুমকি চিঠি পরপর এল বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে। বাড়ির চাকর ছাদ থেকে পড়ে খুন হবার পর বিশ্বনাথ দত্ত নিয়োগ করলেন টিটোদিকে। কয়েক দিন আগে কাগজে বেরিয়েছিল কোচবিহারের রাজার মহামূল্যবান গনেশ মূর্তি নাকি দত্তবাড়িতে আছে। এই দুটো রহস্য কি এক সূত্রে বাঁধা?
তারপর…

সকাল ছয়টায় দার্জিলিং চায়ের কাপ হাতে নিয়ে টিটোদি দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করল। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বেশ অনীহা সহকারে ঘুম থেকে উঠলাম। উঠেই এত সুন্দর চা খেয়ে মনটা সত্যিই ভরে গেল।
-“তুমি কখন উঠেছ, টিটোদি?”
-“পাঁচটায়।”
-“এত সকালে!”
-“হ্যাঁ, শ্রীকান্তকে আনার জন্য কার সার্ভিসে কল করে বলে দিলাম। এশিয়ান হাইওয়ে হয়ে যাওয়ার পর এন্ট্রি এবং এক্সিট নিয়ে এত সমস্যা হয় লোকজনকে বোঝাতে! তাই চেনা ড্রাইভার পাঠিয়ে দিতে বললাম।”
-“চা টা কিন্তু দারুন হয়েছে।”
-“এতে আমার কোন গুণ নেই। এটা মকাইবাড়ি ফার্স্ট ফ্লাশ।”
-“ও তাই বলি! একেবারেই আলাদা খেতে!”
-“কথায় আছে, যত গুড় তত মিষ্টি। দামটাও আলাদাই লেভেল এর। আমার ব্যাচমেট প্রীতম নিয়ে এসেছিল দিন কয়েক আগে।”
-“ঠিক আছে, আমার রেডি হতে কুড়ি মিনিট লাগবে।”
-“হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। ঠিক সাতটায় বের হব।”
সব কাজকর্ম সেরে আমরা যখন গাড়িতে উঠলাম তখন ঠিক সাতটা দশ। শ্রীকান্ত সান্যাল ও ততক্ষণে চলে এসেছেন, তাঁর পরনে বেগুনী রংয়ের শার্ট আর নীল কটনের প্যান্ট। তিনি অবশ্য আর আমাদের ঘরে ঢোকেন নি। তাই আমরা গাড়ি স্টার্ট করে দিলাম। সামনের সিটে আমি আর পিছনের সিটে ওরা দুজন।
-“শ্রীকান্ত, আর মিনিট ৫০ পর ফ্রেশ হলে সমস্যা হবে না তো তোর?” টিটোদি জিজ্ঞাসা করল।
-“না না, ঠিক আছে।” শ্রীকান্ত সান্যাল ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। খুব সকাল তাই রাস্তা একেবারেই ফাঁকা। ক্যানালের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। শ্রীকান্ত সান্যাল তো কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রাস্তা থেকে এত সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যেতে পারে এটা তাঁর ধারণার বাইরে।
-“টিটো, তোর কেসটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগল, তাই চলেই এলাম।” শ্রীকান্ত সান্যাল বলে উঠলেন।
-“বেশ করেছিস। এবারের পুজোয় তাহলে এটা নিয়ে উপন্যাস লিখে ফেল। যদিও কেসটা ঠিক কোন দিকে যাবে এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।”
-“আমাকে এরকম নিরাশ করিস না। অনেক আশা নিয়ে এসেছি।” হাসতে হাসতে শ্রীকান্ত সান্যাল বললেন কথাটা।
কথা বার্তার মাঝেই খুব তাড়াতাড়ি গাড়ি পৌঁছে গেল গাজোল ডোবায়। রতনকে আগেই বলা ছিল, সে প্রথমেই গিয়ে দাঁড়াল জেলেদের কাছে। সেখান থেকে হাফ কিলো মত বোরোলি মাছ নিয়ে নেওয়া হল। বাংলোর কুক হরিকে আগেই বলে রেখেছিল টিটোদি। আমরা পৌঁছলেই সে ব্রেকফাস্ট করে দেবে। লুচি, আলুর তরকারি আর বোরোলি মাছ ভাজা। বাংলোয় ঢুকে শ্রীকান্ত সান্যালকে ফ্রেশ হয়ে নিতে বলল টিটোদি। তারপর আমি আর টিটোদি হরিকে ব্রেকফাস্ট রেডি করতে বলে বেরিয়ে পড়লাম।
-“জানিস এই হাওয়া মহল থেকে সোজা যে রাস্তাটা বেরিয়ে গেল, সেটা দিয়ে কিছু দূর গেলে সরস্বতীপুর ফরেস্ট। সেখানে ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা আছে। সেই রাস্তা দিয়ে সরাসরি শিলিগুড়ি চলে যাওয়া যায়।”
-“বেশতো চলনা, একটু ঘুরে আসি।”
-“না, এখন আর সময় হবে না। বরং পাশেই সুন্দর চা বাগান আছে চল সেখান থেকে ঘুরে আসি।”
আমরা হাঁটতে হাঁটতেই চা বাগানে পৌঁছে গেলাম। সবেমাত্র পৌঁছেছি এমন সময় এক পাল হাতি আমাদের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি ভয় টিটোদির কাছে এসে কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়ালাম। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
-“চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।” আমার হাত টেনে টিটোদি বলল।
-“এবার চোখ খুলতে পারিস।”
চোখ খুলে নিজেকে অনেকটা অপ্রস্তুত লাগল। হাতির পাল দেখে এত ভয় পেয়ে গেছিলাম যে টিটোদির এত কাছে চলে গেছি সেটা খেয়ালই ছিল না।
এত সুন্দর বনের মধ্যে যে একটা এরকম সাজানো-গোছানো চা বাগান থাকতে পারে সেটা এখানে না আসলে জানতেই পারতাম না। স্থানীয় বাগানে কর্মরত লোকজনের থেকে এটা জানতে পারলাম যে এখানে হাতির পাল মাঝে মাঝেই আসে। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর আমি আর টিটোদি আবার রাস্তা ধরে হাওয়া মহল এর দিকে পা চালালাম।
বাংলোতে পৌঁছে দেখি ব্রেকফাস্ট রেডি। শ্রীকান্তদাও নিচে নেমে এসেছেন। আমাদের দেখে বললেন, “তোরা এসে গেছিস। খুব ভালো। পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। চল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়া যাক।”
বেশ জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা মালবাজারের উদ্দেশ্যে যখন রওনা হলাম তখন ঘড়িতে সকাল দশটা।
-“শ্রীকান্ত, আশপাশটা ঘুরে দেখা হল না তোর। কদিন তো আছিস পরে ঘুরিয়ে দেখাব কেমন?” টিটোদি বলল।
-“হ্যাঁ, আপাতত সপ্তাহখানেকের প্ল্যান নিয়ে এসেছি। তারপর আরো কিছুদিন থাকা যেতে পারে। যদি তোরা থাকতে দিস তো!”
-“বাজে বকার অভ্যাসটা তোর এখনো যায়নি না?”
-“টিটোদি দেখো, দুটো ময়ূর রাস্তার উপর।” ওদের কথার মাঝেই আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলাম।
-“বাহ, ভাবা যায়! ট্রেন থেকে নামতে না নামতেই এরকম সুন্দর দৃশ্য তার ওপর আবার রাস্তার মাঝে ময়ূর!”
-“তুই তো কিছুই দেখিস নি। কি বলিস নিলু?”
-“হ্যাঁ শ্রীকান্তদা। আমাদের রাস্তায় এক পাল হাতি আটকে রেখেছিল একটু আগে।”
-“বলিস কিরে নিলু! তোরা একবার আমাকে ডাকলি না? এটা কিন্তু ঠিক করিস নি।”
-“নিলু তখন ভয়ে কি করবে তাই বুঝতে পারছিল না। তোকে কি করে ডাকবে? আর তাছাড়া হাতির পাল কি বেশি সময় থাকে এক জায়গায়?”
-“যাই বলিস না কেন তোরা, তোদের এই ব্যাপারটা আমার কিছুতেই হজম হচ্ছে না। এক যাত্রায় পৃথক ফল হতে নেই কিন্তু।”

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মালবাজারে পৌঁছে গেলাম আমরা। বিশ্বনাথ বাবু বাড়ির লোকেশন আগেই হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে রেখেছিলেন। জিপিএস অন করে আমরা ঠিক জায়গায় পৌছে গেলাম।
বিশাল বড় বনেদি বাড়ি বিশ্বনাথ বাবুর। ঠিক আগেকার দিনের জমিদার বাড়ির মত। বাড়িতে কম করে আন্দাজ কুড়িটা রুম তো হবেই। বাড়ির পাশে খুব সুন্দর বাগান। তাতে ফোয়ারাও লাগানো আছে। আর ফুটে আছে সুন্দর রংবেরঙের ফুল। সেই বাগানেই একটা চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন বিশ্বনাথ বাবু। আমাদের দেখেই ব্যাপারটা রেখে উঠে দাঁড়ালেন।
-“আসুন আসুন। আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?”
-“নানা, কিছু অসুবিধা হয়নি। আপনার সাথে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি আমার বন্ধু এবং গোয়েন্দা গল্পের লেখক, শ্রীকান্ত সান্যাল। আর নিলুর সাথে তো আপনার আলাপ হয়েছে গতকালকেই।”
-“হ্যাঁ, নমস্কার শ্রীকান্ত বাবু। আর নিলু, তুমি কিন্তু আমার ছেলের বয়সী। তোমাকে নিলু বলেই ডাকব কেমন? আপত্তি নেই তো কোন?”
-“না না, কোনো আপত্তি নেই।” মুচকি হেসে আমি জবাব দিলাম।
-“আচ্ছা বেশ। আপনারা সবাই ঘরের ভেতরে চলুন। সবার সাথে আপনাদের আলাপ করিয়ে দিই।”
বিশ্বনাথ বাবু একে একে বাড়ির সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। সবার সম্পর্কে আমি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিচ্ছি।
প্রথমেই আসি বিশ্বনাথ বাবুর ভাইয়ের কথায়। ভাইয়ের নাম প্রদীপ দত্ত। তিনি এলাকাতেই একটা বড় দোকান চালান। স্টেশনারি দোকান, প্রায় সমস্ত রকম মালপত্র পাওয়া যায় তাতে। তার বয়স আনুমানিক ৪৮। এক ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে ওনার সংসার। ছেলে রাকেশ এবছর উচ্চ মাধ্যমিক দিচ্ছে। আর ওনার স্ত্রী চন্দ্রিমা সংসার চালানোর পাশাপাশি গান-বাজনা করতেও ভালোবাসেন। এনারা যৌথ পরিবার। এখনো এক সাথে খান দু’ভাই।
বিশ্বনাথ বাবুর দুই ছেলে। ছোট ছেলে বিশ্বজিৎ ক্লাস সিক্সে পড়ে, বড় ছেলে শৌণক বিএসসি থার্ড ইয়ার, ম্যাথমেটিক্স অনার্স। স্ত্রী সীমা সারাদিন ঘর সামলাতে ব্যস্ত থাকেন। বেশ দক্ষ মহিলা।
এছাড়া বাড়িতে আছেন বিশ্বনাথ বাবুর বয়স্কা মা। বয়স আনুমানিক ৭৮। কথাবার্তা বিশেষ বলেন না। বেশিরভাগ সময় শরীর খারাপ থাকে ওনার।
প্রায় একমাস হল এনাদের বাড়িতে এসেছেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমজিৎ চৌধুরী আর ওনার স্ত্রী নীলিমা চৌধুরী। সৌমজিৎ চৌধুরী, বিশ্বনাথ বাবুর একমাত্র বোনের ছেলে। তারা মূলত এসেছিলেন ডুয়ার্স ঘুরবেন বলে। কিন্তু বিশ্বনাথ বাবুর মায়ের শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়ায় ওনারা আরো কিছুদিন থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একে একে আলাপ-পরিচয় সব সেরে আমরা বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখার জন্য বেরোলাম। বাড়িতে নানারকম শাক সবজির গাছ রয়েছে। কুমড়ো ফুল ফুটে রয়েছে গাছে। পুই গাছের সুন্দর কালচে লাল রংয়ের থোকা থোকা ফল হয়ে রয়েছে। বিশ্বনাথ বাবু জানালেন যে মালি গোবর সার দিয়ে নিজের হাতে এগুলো সব দেখাশোনা করে।
বাড়ির আশেপাশে ঘুরে দেখে এসে আমরা এসে পৌছালাম বাড়ির ছাদে। বাড়ির ছাদে এসে টিটোদি প্রশ্ন করল,“বিশ্বনাথ বাবু, আপনাদের ছাদে তো সিসিটিভি রয়েছে দেখছি?”
-“হ্যাঁ। ছাদে, বাগানে আর এন্ট্রান্সে সিসিটিভি বসানো রয়েছে। বুঝতেই পারছেন এত দামি দামি কাঠ রয়েছে বাড়িতে।”
-“বাঃ, খুব ভালো। আপনাদের চাকর যেদিন মারা যায় সেদিনের ফুটেজটা একবার দেখব আমি।”
-“হ্যাঁ নিশ্চয়ই দেখবেন। তবে আমরা দেখেছি পুরোটাই। আশ্চর্য ব্যাপার কি জানেন, ছাদে বিমলকে ছাড়া আর কাউকে আসতে বা যেতে দেখা যায়নি।”
-“ফুটেজ কেউ ডিলিট করে নিত? বা ক্যামেরা কিছু সময়ের জন্য অফ করে নিত?”
-“অসম্ভব! ক্যামেরা অফ হলে ডাইরেক্ট আমার ফোনে মেসেজ চলে আসবার কথা। কোম্পানিকে বলে স্পেশালভাবে এটা ডিজাইন করা আছে। আর তাছাড়া কোম্পানির লোককে দিয়েও চেক করেছি। ক্যামেরা অফ হয়নি কোন সময়।”
-“ঠিক আছে, আমি তবু একবার ফুটেজটা দেখতে চাই। আপনি ড্রাইভে করে আমাকে লিংকটা শেয়ার করে দিন। আমি ফাঁকা সময় বাড়িতে বসে দেখে নেব।”
-“ঠিক আছে ম্যাডাম। আমি কোম্পানির লোককে বলে দিচ্ছি।”
-“আরেকটা ব্যাপার বলুন তো, আপনাদের বাড়িতে কি কোন বড় মই জাতীয় কিছু আছে যেটা দিয়ে ছাদে ওঠা যাবে এমন।”
-“না, এত বড় মই তো নেই।”
-“ঠিক আছে, আপনি এক কাজ করুন। আপনি বরং সবগুলো সিসিটিভির ফুটেজই আমাকে পাঠিয়ে দিন সেই দিন কার।”
-“ঠিক আছে। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
-“আরেকটা ব্যাপার,আপনাদের বাড়িটা বিক্রি করার জন্য কোন প্রোমোটার এর সাথে কথা বলেছিলেন বললেন যেন?”
-“হ্যাঁ, আমাদের পাড়ারই ছেলে মিতুল পাল। আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ডও বলতে পারেন।”
সমস্ত পরিদর্শন শেষ করে আমরা ড্রইং রুমে এসে বসলাম। টিটোদি সেদিনকার খবরের কাগজের স্ক্রিনশটটা বিশ্বনাথ বাবুকে দেখাল। তারপর প্রশ্ন করল, “এই ব্যাপারে আপনার কি মতামত। এইরকম কোন মূর্তি কি আপনাদের বাড়িতে থাকতে পারে।”
-“না, কোনদিন তো দেখিনি। কেন বলুন তো আপনার কি সন্দেহ মূর্তির সাথে এসব ঘটনার কোন যোগ থাকতে পারে?”
-“তাই তো মনে হচ্ছে।”
-“কিন্তু ওরকম কোন মূর্তি তো আমাদের বাড়িতে আছে বলে মনে হয়না। কোচবিহারের রাজবাড়ীতে পাওয়া রেজিস্টারে নাকি লেখা আছে আমার প্রপিতামহ নির্মল দত্ত মহাশয় কে সেই সময়কার মহারাজা এটা উপহার দিয়েছিলেন।”
-“ঠিক আছে, দেখা যাক কি করা যায়। এখনই আমি শিওর হয়ে কিছু বলতে পারছিনা।”
-“আপনাদের চাকর এর মৃতদেহ কি ময়না তদন্তে পাঠানো হয়েছিল?”
-“হ্যাঁ, পাঠিয়েছিল পুলিশ। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে হার্ট ফেল হয়ে মৃত্যুর কথা বলা আছে।”
-“আপনার প্রপিতামহ নির্মল দত্ত সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে পারেন আমাদেরকে?”
-“হ্যাঁ, ফ্যামিলি ডায়েরি থেকে যা জেনেছি, ওনার সাথে তৎকালীন কোচবিহারের মহারাজা ধীরেন্দ্র নারায়ণ এর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ভুটানের রাজা যখন মহারাজা ধীরেন্দ্র নারায়নকে বন্দী করেন সেই সময় তিনি রাজবাড়ীতে চাকরি করতেন। তিনিও মহারাজের সাথে বন্দী ছিলেন এবং মহারাজকে বিভিন্ন রকম সদুপদেশ দিয়েছিলেন। তার পরামর্শে মহারাজ খুব খুশি হয়েছিল এবং সে সময় তাঁর পদোন্নতিও হয়েছিল।”
-“আচ্ছা আপনাদের সেই ফ্যামিলি ডাইরিটা দেখা যায়?”
-“ওটা ডিজিটালাইজড করা আছে। আসল কপিটা আমার আলমারিতে রয়েছে। আপনাকে ডিজিটাল কপিটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।”
-“ঠিক আছে। ওতেই আপাতত চলবে। তবে অত পুরনো একটা ডায়েরী দেখার লোভ কিন্তু রয়ে গেল।”
-“ওহো নিশ্চয়ই! এরপরে যেদিন আসবেন সেদিন না হয় দেখিয়ে দেব।”
কথাবার্তার মাঝেই এসে পৌঁছালেন বিশ্বনাথ বাবুর স্ত্রী সীমা দেবী। লাঞ্চ রেডি, সবাইকে বসতে অনুরোধ করে গেলেন তিনি।
খাবার টেবিলটা বেশ বড়। মেহগনি এবং সেগুন কাঠ দিয়ে বানানো । সত্যি মিউজিয়ামে রাখার মত জিনিস। সবার জন্য খাবার সাজিয়ে দেওয়া রয়েছে কাঁসার বাসনে। পোস্ত বাটা, ডাল, আলু ভাজা, নিজেদের পুকুরের চিতল মাছ, কচি পাঁঠার ঝোল, চাটনি, পাপড়, দই, মিষ্টি। এত সুন্দর খাওয়ার সত্যি আশা করিনি আমরা। সবাই পেট ভরে খেলাম। রান্নার স্বাদই আলাদা। সীমা দেবী জানালেন কয়েক পুরুষ আগের রেসিপি ডাইরিতে লেখা রয়েছে। সেই রেসিপি মেনেই এখনো রান্না হয়। তবে আগে মসলাও বাড়িতে বানানো হতো রেসিপি মেনে। এখন অবশ্য সেটা আর হয়ে ওঠে না। তাই খাবারের স্বাদ একটু কমে গেছে। আমি ভাবলাম এর থেকে বেশী আর কি হতে পারে খাবারের স্বাদ! এতো সুস্বাদু খাবার জীবনে কোনদিন খাইনি!
খাওয়া-দাওয়া শেষে আমরা সব ঘরগুলো ঘুরে দেখলাম।
প্রথমেই আমরা গেলাম প্রদীপ বাবুর ঘরে। সেখানে গিয়ে দেখি বিশ্বনাথ বাবুর ছোট ছেলে কাকুর কাছে বসে রয়েছে। প্রদীপ বাবুর একটু রোগা চেহারা, বিশ্বনাথ বাবুর থেকে হাইট ‌ও একটু কম। গায়ের রঙ শ্যাম বর্ণ।
-“আরে, আসুন আসুন। আর বলবেন না, ও আমার খুব ভক্ত। কাকু প্রাণ ওর।” আমাদের দরজার কাছে দেখে বলে উঠলেন ভদ্রলোক।
-“বাঃ, বেশ তো। আপনার সাথে কয়েকটা কথা বলার ছিল।”
-“বলুন না।” আমাদের বসতে বলতে ইঙ্গিত করে কথাটা বললেন ভদ্রলোক।
-“আপনার কি ধারণা? আপনাদের বাড়িতে কি গণেশ মূর্তিটা আছে?”
-“সে তো চোখে দেখেনি কেউ কখনো। কি করে বলি বলুন।”
খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর আমরা সেখান থেকে বিদায় নিয়ে সৌমজিৎ চৌধুরীর ঘরে বসে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললাম। ভদ্রলোকের বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। ফর্সা গায়ের রং। নিয়মিত জিম করা চেহারা। স্বাস্থ্য সম্পর্কে খুব সচেতন দেখেই অনুমান করা যায়।
বাড়ির লোকেদের সাথে কথাবার্তা শেষ করে শ্রীকান্তদাকে বসিয়ে রেখে আমি আর টিটোদি একটু বাইরে বের হলাম। যাওয়ার সময় ও বিশ্বনাথ বাবুকে টিটোদি বলে গেল
-“আমরা একটু থানা থেকে ঘুরে আসছি। শ্রীকান্ত রইল আপনাদের বাড়ীর সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য নিয়ে নিক। সেগুলোর ওর লেখায় কাজে লাগবে। এরকম পুরনো বনেদি বাড়ি ওর কপালে হয়তো আর জুটবে না।”
-“নিশ্চয়ই। কোন অসুবিধা নেই আপনারা ঘুরে আসুন। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি, ও আপনাদের নিয়ে যাবে।”
-“না না, তার দরকার হবে না। আমরা একটু হেঁটেই যাব।”
আমি আর টিটোদি হাঁটতে হাঁটতে থানায় চলে এলাম। থানার ইনচার্জ রাখালবাবু কে টিটোদি নিজের পরিচয় দিতেই তিনি বলে উঠলেন, “আপনার সাথে আলাপ করার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল। এভাবে আপনার সাথে দেখা হয়ে যাবে ভাবি নি।”
-“আপনার সাথে দেখা করতে পেরে আমাদের‌ও বেশ ভালো লাগছে। এখানে এসেছিলাম একটা কাজে, তাতে আপনার একটু সাহায্য দরকার।”
-“হ্যাঁ বেশ তো, বলুন না। কি সাহায্য করতে পারি আপনাকে।”
-“দত্ত বাড়িতে যিনি ছাদ থেকে থেকে পড়ে মারা গেলেন, সেই বাড়ির চাকরটা, ওটা কি আপনাদের স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হয়?”
-“সেরকমই তো মনে হচ্ছে। তবে তবে নিজে পড়েছিল, না কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।”
-“আর ওই রক্তে লেখা চিঠি, মাথার খুলি ওসব নিয়ে আপনার কি মনে হয়?”
-“আসলে কি জানেন, অনেকের ধারণা ওই বাড়িতে রাজার দেওয়া গণেশ মূর্তি রাখা হয়েছে। তাই ওই বাড়ির দিকে অনেকেরই চোখ রয়েছে। কেউ হয়তো চাইছে ওনারা বাড়ি থেকে চলে যান। আর তাছাড়া ওই প্রোমোটার উনিও কিন্তু খুব একটা ভালো লোক নন।”
আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে, চা খেয়ে আমরা থানা থেকে বিদায় নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার দত্তবাড়ির কাছাকাছি এসে পৌছালাম। কাছেই একটা চায়ের দোকানে কয়জন বয়স্ক ভদ্রলোক আড্ডা দিচ্ছিল। টিটোদি বলল
-“চল, চা খেয়ে নেই। ডুয়ার্স এসে চা না খেলে তোর ডুয়ার্স ঘোরাই বৃথা।”
এইমাত্র আমরা থানা থেকে চা খেয়ে এলাম তাই চা খাওয়াটা যে টিটোদির আসল উদ্দেশ্য নয় সেটা বেশ ভালই বুঝতে পারলাম।
চা খেতে খেতে টিটোদি একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, এই বাড়িটা বিক্রি হবে নাকি শুনলাম?”
-“হ্যাঁ, বিক্রি তো হওয়ার কথা। এক ভাই বিক্রি করতে চায় কিন্তু আরেক ভাই চায় না।”
-“আমরা আসলে হোটেলের ব্যবসা করি। এত বড় একটা জায়গা এখানে একটা হোটেল করার ইচ্ছে আমাদের। কোন ভাই বিক্রি করতে চায় একটু বলতে পারবেন?”
-“ওই তো প্রদীপ বিক্রি করতে চায়। কিন্তু বিশ্বনাথ চায় না। এখন অবশ্য নাকি ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে, তাই হয়তো করলেও করতে পারে। কিন্তু আগে মত ছিলনা বিশ্বনাথের। একজন প্রোমোটার বাড়িটা কিনতে চেয়েছিল সে আমাদের পাড়ার ছেলে। সে আবার প্রদীপের ভালো বন্ধু। প্রদীপটা আসলে বরাবরই একটু লোভী। তাই অমন সুন্দর বাড়ি বিক্রি করতে চাইত। বিশ্বনাথ খুব ভালো ছেলে।”
-“আচ্ছা ওই প্রোমোটার লোকটি কেমন? আমরা কিনতে চাইলে কি ঝামেলা করতে পারে?”
-“তা করবে না আবার! ও একটা হাড় বজ্জাত। সাথে পিস্তল রাখে।”
-“শুনলাম একজন চাকর খুন হয়েছে এ বাড়িতে?”
-“খুন! কি জানি বাপু, তাকে আবার কে খুন করবে? ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে জানি। তবে ভূত নাকি চিঠি রেখে গেছে। ভূত খুন করলেও করতে পারে।”
-“আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা একবার ওই বাড়িতে গিয়েই কথা বলি।”
মিনিট দশেক কথাবার্তার পর আমরা দত্ত বাড়িতে এসে পৌঁছলাম।
বিশ্বনাথ বাবুকে দেখে টিটোদি প্রশ্ন করল, “মাথার খুলি আর আগের দুটো চিঠি ঠিক কোথায় পাওয়া গেছিল?”
-“ঐতো সিংহদুয়ার এর বাইরে।”
-“তারমানে কেউ ওটা রেখে গেলে সিসিটিভিতে দেখা সম্ভব নয়?”
-“না, ওই দিকটা তো দেখা যায় না সেরকম।”
-“ঠিক আছে বুঝলাম। আপাতত এতেই কাজ চলে যাবে। আপনি তাহলে ডাইরির সফট কপিটা, আর সিসিটিভির ফুটেজ গুলো আমাকে মেইল করে দিন। আমি আপনাকে মেইল আইডি হোয়াটসঅ্যাপ করে দিয়েছি।”
-“ঠিক আছে ম্যাডাম।”
বাড়ির সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। এবার টিটোদির নির্দেশে গাড়ি চলল করোনেশন ব্রিজ হয়ে। শ্রীকান্তদাকে করোনেশন ব্রিজটা একবার ভাল করে ঘুরিয়ে দেখাবে সে। সন্ধ্যে নামতে এখনো অনেক দেরি, তাই সিনিক বিউটি ও বেশ ভালোই পাওয়া যাবে।
ফেরার পথে টিটোদি আমাদের গাড়িতে বসিয়ে রেখে বিধান মার্কেট এর কাছে একটা প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে ঢুকল। কাল যখন দুপুরে খেতে এসেছিলাম তখনোও আমাকে একবার দাঁড় করিয়ে এখানে এসেছিল টিটোদি। হাতে কয়েকটা রিপোর্ট নিয়ে টিটোদি ফিরে এল গাড়িতে।
-“কিসের রিপোর্ট এগুলো?”
-“কাল সেই চিঠি তিনটে টেস্ট করাতে দিয়েছিলাম তার রিপোর্ট।”
-“কি পেলে রিপোর্টে?”
-“প্রথম দুটো চিঠি কোন প্রাণীর রক্ত দিয়ে লেখা। মানুষের রক্ত নয়। আর তৃতীয় চিঠিটা কোন প্রাণীর রক্ত দিয়ে লেখা নয় কিন্তু তাতে জৈবিক পদার্থ পাওয়া গেছে অর্থাৎ ওটা কালি জাতীয় কিছু দিয়ে লেখা নয়। সম্ভবত কোন গাছ থেকে পাওয়া ফল বা রস এই জাতীয় কিছু জিনিস দিয়ে লেখা।”

শিলিগুড়িতে ঘরে পৌঁছে দেখি তখন ঘড়িতে সন্ধ্যে সাতটা। ঘরে পৌঁছে আমরা কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে নিলাম সবাই। আমি আর শ্রীকান্তদা দুজনেই খুব ক্লান্ত। তাই আমরা তাড়াতাড়ি ঘুমোতে চলে যাব ঠিক করলাম। ততক্ষণে বিশ্বনাথ বাবু ও প্রয়োজনীয় জিনিস হোয়াটসঅ্যাপ করে দিয়েছেন। টিটোদি ঘুমোতে গেল না, আজকের মধ্যে ডায়েরীটা পড়ে শেষ করবে, তারপর ঘুমোতে যাবে।

চলবে…

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [চতুর্থ পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]

Author: admin_plipi

6 thoughts on “বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [দ্বিতীয় পর্ব]

Leave a Reply

Your email address will not be published.