বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [তৃতীয় পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [তৃতীয় পর্ব]
লেখা : সৌরভ সেন

আগে যা ঘটেছে

মালবাজারের দত্তবাড়িতে রক্তে লেখা দুটো হুমকি চিঠি পরপর এল বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে। বাড়ির চাকর ছাদ থেকে পড়ে খুন হবার পর বিশ্বনাথ দত্ত নিয়োগ করলেন টিটোদিকে। কয়েক দিন আগে কাগজে বেরিয়েছিল কোচবিহারের রাজার মহামূল্যবান গনেশ মূর্তি নাকি দত্তবাড়িতে আছে। এই দুটো রহস্য কি এক সূত্রে বাঁধা?
চাকরের মৃত্যু খুন কিনা পুলিশ নিশ্চিত নয়, টিভি ফুটেজেও কাউকে দেখা যায়নি। পাড়ার লোক বলে বাড়ি বিক্রি নিয়ে দত্ত ভাইদের মতবিরোধ আছে। ল্যাব রিপোর্ট বলছে চিঠিগুলো মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা নয়। টিটোদি ব্যস্ত দত্ত বাড়ির পারিবারিক ডায়েরি নিয়ে। তারপর…

পরদিন সকালে অ্যালার্ম বাজতেই আমি উঠে পড়লাম। খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বের হতে হবে। অফিসে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। তখনো ওরা কেউ ওঠেনি ঘুম থেকে। আমি আধ ঘণ্টার মধ্যেই তৈরি হয়ে নিলাম। কাজের দিদিও এসে গেছে। আমি সবে চায়ের কাপে চুমুকটা লাগিয়েছি তখনই টিটোদি এসে বলল, “তুই কি এখন‌ই চলে যাচ্ছিস নাকি?”
-“প্রায় আটটা বাজে, এখন তো বের হতেই হবে। অফিসে খুব চাপ আছে আজকে। তোমার চোখ মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি রাতে ঘুমাও নি?”
-“না, ঘুমোবো আর কি করে! এতক্ষণে ডাইরিটা পড়া শেষ হল। তুই আয় তাহলে। আমি এখন ঘুমাতে যাব। আর শোন, কাল ছুটি নিয়ে নে। কাল একবার কোচবিহার যেতে হবে।”
-“কোচবিহার! কেন কিছু পেলে নাকি ডাইরিতে?”
-“হ্যাঁ। একটা ধাঁধা পাওয়া গেছে। অনুমান সেটা হবে ১৭৭১-৭২ সনে লেখা। সেটা সমাধান করার জন্যই কোচবিহারে যেতে হবে।”
-“ধাঁধাটা বলবে একবার?”
-“মন দিয়ে শোন,

” সকালে উঠিয়া সূর্য দেবতারে করিও প্রণাম। তাহার পর বাঘ মামারে লইয়া, বড় দেবীরে স্মরণ করিয়া, ঠিক ঠিক ফিট যাইও তুমি সিংহরে ফটকে ছাড়িয়া। যেইখানে বড় দেবী আসিয়াছিল প্রথম বার, সেইখানে কবর তুমি খুঁড়িয়া দেখিও একবার। বিঘ্নেশ্বর ঘুমাইয়া আছে বিছানা তাহার গোলাকার সাথে আছে অস্টেক অষ্টতলাকার। কৈলাসে ভালই ছিল গোষ্ঠীর ঈশ্বর, দেবীর তান্ডব দেখিয়া মুষিকে চড়িয়া চলিয়া গেল বিঘ্নেশ্বর।”

-“এর সাথে কোচবিহারের কি সম্পর্ক? কোচবিহার রাজবাড়িতে খোঁজ করতে যাবে সত্যি মূর্তি ছিল কিনা?”
-“মূর্তি যে ছিল, সে ব্যাপারে এখন আমি এক প্রকার নিশ্চিত। তবে সমস্যাটা হল ঠিক সেই সময়ই দত্ত বাড়িতে ডাকাতি হয়েছিল। ডাকাতরা সেটাকে নিয়ে গেছে কিনা সে ব্যাপারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
-“তুমি কি ধাঁধাটা সমাধান করে ফেললে?”
-“না, এখনো সমাধান করতে পারি নি। তবে নিশ্চয়ই পারব। তোদেরও হেল্প লাগবে। তুই তাড়াতাড়ি অফিসের কাজ সেরে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে চলে আয়।”
সাড়ে আটটার দিকে আমি শিলিগুড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। আজ তাড়াতাড়ি একবার সাইটে যেতে হবে। পথে যেতে যেতে অনেক ভাবলাম ধাঁধাটা নিয়ে, কিন্তু কোনো সমাধান পেলাম না। টিটোদি ছাড়া কারো পক্ষে এ রকম জটিল ধাঁধা সমাধান করা সম্ভব বলে মনেও হয় না। তাড়াতাড়ি অফিসের কাজ শেষ করে, আগামী তিনদিনের অফিস ছুটি নিয়ে আমি শিলিগুড়ি এসে পৌছালাম। ঘরে ঢুকেই দেখি টিটোদি আর শ্রীকান্তদা ধাঁধাটা নিয়ে বসে আছে।
-“ঠিক সময়েই এসেছিস। আমি আর শ্রীকান্ত তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। যা, তাড়াতাড়ি একটু ফ্রেশ হয়ে নে, তারপর এসে বস।”
দ্বিতীয় রাউন্ডের কফির কাপে চুমুক দিয়ে সবাই মনোযোগ সহকারে ধাঁধাটা দেখতে থাকল। যদিও আমার প্রথম রাউন্ডের কফি চলছে।
-“নিলু আর শ্রীকান্ত, মনোযোগ দিয়ে শোন। আমি যেটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি সেটা বলছি। কিছু কিছু শব্দের মানে মনে হয় বুঝতে পেরেছি। যেমন ধরা যাক ‘বড় দেবী’, কোচবিহারের মহারাজার প্রতিষ্ঠিত করা দুর্গা প্রতিমাকে বড় দেবী হিসেবেই সবাই জানে। যেহেতু পুরো ব্যাপারটাতেই কোচবিহারের রাজবাড়ির সাথে যোগসূত্র আছে, তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে এখানে বড় দেবী বলতে কোচবিহারের দুর্গা দেবীর কথাই বলা হয়েছে। তারপর ধর এখানে বলা আছে ‘বিঘ্নেশ্বর’ এর কথা। গণেশ দেবতাকেই অনেক সময় বিঘ্নেশ্বর বলা হয়ে থাকে…”
-“তারমানে গণেশ মূর্তি ছিল।” অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।
-“আগে পুরোটা শোন। মাঝে ডিস্টার্ব করবি না একদম।”
আমাকে খুব জোরে একটা ধমক লাগিয়ে আবার শুরু করল টিটোদি, “অস্টেক অষ্টতলাকার মানে হল আটটা হীরে। ‘অষ্টতলাকার’ বলতে সাধারণত হীরে জাতীয় পদার্থকেই বোঝায়। তারপর ধর বলা আছে ‘গোষ্ঠীর ঈশ্বর’, গোষ্ঠীর ঈশ্বরও গনেশ দেবতারই আরেক নাম। মুষিকের কথা বলা আছে। আসলে ইঁদুর অর্থাৎ গণেশের বাহনের আরেক নাম হল মুষিক। এই অবধি মোটামুটি বোঝা গেল। কতগুলো প্রশ্ন থেকে যায়, সেগুলো হল
এক, যে সিংহ আর বাঘের কথা বলা আছে সেগুলি আসলে কি?
দুই, বড় দেবী প্রথমবার কোথায় এসেছিলেন? কোচবিহারের বড় দেবীর তো এখানে আসার কথা নয়। তাহলে কি মূর্তিটা অন্য কোথাও আছে?
তিন, ‘কৈলাসে ভালই ছিল গোষ্ঠীর ঈশ্বর, দেবীর তান্ডব দেখিয়া মুষিকে চড়িয়া চলিয়া গেল বিঘ্নেশ্বর।’ কৈলাস তো গণেশ দেবতার বাসস্থান। তাহলে কৈলাস মানে কি দত্তবাড়িকেই বোঝানো আছে? ‘দেবীর তান্ডব’ বলতেই বা কি বোঝানো আছে! বাড়িতে যে ডাকাতি হয়েছিল সেটা কে কি বড় দেবীর অভিশাপ হিসেবে মেনেছিল দত্ত বাড়ির লোকজন। আর ডাকাতরাই মূর্তিটা নিয়ে গেছে সেটা কি বলতে চাইছে? আরও একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, বাড়িতে ডাকাত আসার প্রায় একমাস পর কবিতাটি লেখা। তাহলে কি ডাকাত দল মূর্তি নিয়ে চলে গেছে এটাই বলতে চাইছে?”
-“টিটোদি, তাহলে এবারে আমাদের কি করনীয়?” আমি আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাস করলাম।
-“সব বড় দেবীই জানেন!”
-“হেঁয়ালি কোরো না। আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না, এখন একটু খুলে বল।”
-“কাল সকালে এসি বাসে কোচবিহার যাব। আশা করি সেখানে গিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।”
-“বাসে কেন যাব? রতনকে বলে দিলেই তো হয়!”
-“শুধু শুধু এত খরচ করে কি লাভ? এসি বাসে জার্নি খুবই কমফর্টেবল সময়ও প্রায় কাছাকাছি লাগবে কারণ বাসটার খুব বেশি স্টপেজ নেই। হয়তো প্রাইভেট কারের থেকে আধঘন্টা বেশি লাগবে।”
-“ঠিক আছে মূর্তির ব্যাপারটা না হয় হল। খুনের ব্যাপারটা কতদূর এগোলে?”
-“সেটাও ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না। সিসিটিভি ফুটেজে কাউকে দেখা যায়নি বলছে। ক্যামেরাও অফ হয়নি বলছে। তাহলে কি নিজেই সুইসাইড করেছে? কোন সুইসাইড নোটও তো পাওয়া যায়নি, তার ওপর আবার ওই চিঠি। সেটা তো কেউ না কেউ লিখেছে! এখন সিসিটিভি ফুটেজগুলো একবার দেখতে হবে।”
সিসিটিভি ফুটেজগুলো টিভিতে একের পর এক চালানো হল। ঘটনা ঘটার এক ঘন্টা আগে থেকে এক ঘন্টা পর অবধি কোনরকম সন্দেহজনক কিছু দেখা গেল না। যাওয়ার কথাও নয় কারণ দত্ত বাড়ির লোকজন সব চেক করে দেখেছে। ফুটেজগুলো দেখতে দেখতে টিটোদি হঠাৎ বলে উঠল, “আশ্চর্য! ছাদে এত জল কোথা থেকে এল? কোথাও বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে না। অথচ হঠাৎ করে জল এসে গেল। একটু ব্যাক করে দেখ। আগে কিন্তু ছিল না। এটা তো মনে হচ্ছে ঘটনা ঘটার আধঘন্টা পরের ফুটেজ। যেখান থেকে চাকরটা পড়েছে শুধু সেইটুকু জায়গাতেই সিসিটিভি ক্যামেরার কভারেজ নেই। অর্থাৎ খুন যদি করে থাকে তাহলে ঘরের কেউ করেছে।”
-“খুন হয়েছে বলছ?”
-“এখনো সেরকম কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
-“আরেকটা ব্যাপার টিটো, তুই যে বললি দুটো চিঠি রক্ত দিয়ে লেখা, আরেকটা কোন গাছের কিছু দিয়ে লেখা, সেটার ব্যাপারটা কি? কি বোঝাতে চাইছে ওরা?” শ্রীকান্তদা প্রশ্নটা করলেন।
-“হয়তো তাড়াহুড়ো ছিল। রক্ত জোগাড় করতে পারেনি। তাই রক্ত মনে হবে এরকম কিছু দিয়ে লিখেছে।”
-“কি মনে হয় তোর, কি হতে পারে সেটা?”
-“ঠিক বুঝতে পারছিনা।”
কথাবার্তা চলতে চলতেই ডিনারের সময় হয়ে গেল। শ্রীকান্তদা সকালে বাজার করে নিয়ে এসেছিল। রান্নার দিদি বেশ ভালই রেধেছে। খেতে খেতে শ্রীকান্তদা বলল, “সেদিন দত্ত বাড়িতে অত সুন্দর পুঁই গাছ থেকে খুব লোভ হচ্ছিল খেতে। তাই আজ নিয়ে এলাম বাজার থেকে। তবে ছোট ছোট, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। ঐরকম কোয়ালিটির জিনিস আর কোথায় পাব?”
-“টিটোদি…” বেশ উত্তেজিত হয়ে কথাটা বলতে যাচ্ছিলাম।
-“সাবাস নিলু! ঠিক ধরেছিস। পুঁই গাছের ফল দিয়েই লেখা হয়েছে চিঠিটা।”
-“তাহলে তো অনেক রহস্যেরই সমাধান হল। ভাগ্যিস আমি পুঁইশাকটা আজ বাজার থেকে এনেছিলাম।” হাসতে হাসতে শ্রীকান্তদা বললেন।
-“হ্যাঁ সত্যি, শ্রীকান্ত তোকেও অনেক ধন্যবাদ। নিলু, এবারে আমাদের একটু কেয়ারফুল হতে হবে। খুনটা কে করেছে বা আদৌ খুন কিনা সেটা বোঝা যাচ্ছে না ঠিকই। কিন্তু চিঠিটা বাড়ির কেউই লিখেছে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তাই এরপর যেদিন আমরা দত্ত বাড়িতে যাব, সেদিন একটু খেয়াল রাখবি কোথাও কোন গাছের ফল দেখতে পাস কিনা। যদি এতদিন পর সেই সম্ভাবনা খুবই কম থাকলেও হয়তো ঘর পরিষ্কার করা হয়ে গেছে। তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে হবে।”
-“আমরা কবে যাব দত্তবাড়ি?”
-“কাল কোচবিহার যেতেই হবে। পরশু যাওয়া যেতে পারে।”
-“কোচবিহারে আমরা কোথায় কোথায় যাব?”
-“আমাদের প্রধান কাজ বড় দেবীর মন্দিরে যাওয়া। আর রাজবাড়ীতেও যেতে হবে একবার।”
-“আচ্ছা টিটো, বাড়ির কার উপর তোর সন্দেহ হয়?” শ্রীকান্তদা জিজ্ঞেস করলেন।
-“প্রদীপ দত্ত বাড়ি বিক্রি করার পক্ষে, আবার প্রদীপ দত্তর সাথে প্রোমোটারের ও ভালো বন্ধুত্ব রয়েছে। হতে পারে প্রদীপ দত্ত আর প্রোমোটার দুজনে মিলেই খুনটা করেছে। প্রোমোটার লোকটা যে খুব একটা সুবিধার নয় সেটা তো বলল পাড়ার লোকজন। আরেকটা ব্যাপার হল প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমজিৎ চৌধুরী। তিনি তাঁর কাজকর্ম বাদ দিয়ে এতদিন ধরে এখানে কেন পড়ে আছেন?”
-“আচ্ছা টিটোদি, প্রথম চিঠিগুলো যখন পাওয়া গেছিল তখন সৌম্যজিৎ চৌধুরী এ বাড়িতে এসেছিলেন কিনা সেই খোঁজ নিলেই তো হয়।”
-“সে খোঁজ অলরেডি নেওয়া হয়ে গেছে। প্রথম চিঠি পাওয়ার সময় তিনি এখানেই ছিলেন। সেজন্য তো সন্দেহ আরও বেশি হচ্ছে। দত্ত বাড়িতে দ্বিতীয়বার না গেলেই নয়। নিলু কাল বাসে যেতে যেতে একটা কাজ আছে।”
-“কি কাজ?”
-“তুই সৌম্যজিৎ চৌধুরীর সম্পর্কে যত পারিস তথ্য জোগাড় করবি। আশা করি তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল আছে। থাকলে খুব ভালো হয়। না থাকলে এমনি ওয়েবে যা পাওয়া যায় তাই দেখবি।”

চলবে…

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [চতুর্থ পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]

Author: admin_plipi

5 thoughts on “বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [তৃতীয় পর্ব]

Leave a Reply

Your email address will not be published.