বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [পঞ্চম পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [পঞ্চম পর্ব]
লেখা : সৌরভ সেন

আগে যা ঘটেছে

দত্তবাড়িতে রক্তে লেখা পরপর দুটো হুমকি চিঠি আর তারপরেই বাড়ির চাকর ছাদ থেকে পড়ে খুন। কোচবিহারের রাজার মহামূল্যবান গনেশ মূর্তি নাকি দত্তবাড়িতে আছে। চাকরের মৃত্যু খুন কিনা পুলিশ নিশ্চিত নয়, টিভি ফুটেজেও কাউকে দেখা যায়নি। পাড়ার লোক বলে বাড়ি বিক্রি নিয়ে দত্ত ভাইদের মতবিরোধ আছে। ল্যাব রিপোর্ট বলছে চিঠিগুলো মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা নয়। দত্ত বাড়ির পারিবারিক ডায়েরিতে এক জটিল ধাঁধা। কেবল একটুই বোঝা যাচ্ছে যে গণেশ মূর্তি নিশ্চিত ভাবে ছিল। কোচবিহার গিয়ে জানা গেল মূর্তি নিয়ে আরো দুজন খোঁজখবর করছে। তারপর…

বুধবার বেশ সকালেই ঘুম থেকে উঠলাম। খুব সকালের ফ্লাইট ধরে টিটোদি চলে গেল কলকাতা। তাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে আমি আর শ্রীকান্তদা ঘরে ফিরে এলাম। ঠিক করলাম আজ একটু আশেপাশে ঘুরিয়ে নিয়ে আসব শ্রীকান্তদাকে। ঘন্টা চারেক ঘুরে আমরা চলে গেলাম বাগডোগরা। এয়ারপোর্ট থেকে টিটোদিকে নিয়ে আমরা যখন ঘরে ঢুকলাম তখন রাত আটটা।
টিটোদি কলকাতায় কোথায় গিয়েছিল সেটা জানতে চাওয়াতে বলল, “সময় মতো সব জানতে পারবি।” আমি বা শ্রীকান্তদা আর এ নিয়ে বেশি জোরাজুরি করলাম না। কারণ আমরা ভালোই জানি এতে বিশেষ লাভ হবে না। ঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ কার কার সাথে ফোনে কথা বলছিল টিটোদি। ডিনারের টেবিলে বসে খেতে খেতে টিটোদি বলল, “তোরা কোথায় গিয়েছিলি আজ ঘুরতে?”
-“ভামরি দেবীর মন্দিরে গিয়েছিলাম আমরা। আর শ্রীকান্তদাকে গাজলডোবার আশেপাশেও ঘুরিয়ে এনেছি। যদিও সেদিনের মত হাতি দেখার সৌভাগ্য হয়নি আজকে।”
-“বুঝলি টিটো, আমার খুব দেবী চৌধুরানীর মন্দিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। নিলু ঠিক চেনে না আর….”
-“কি বললি? আবার বল কথাটা!” টিটোদি উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
-“কি বললাম আবার?” আমতা আমতা করে জবাব দিল শ্রীকান্তদা।
-“ইয়েস। ‘দেবী’ মানে দেবী চৌধুরানীর কথাই বলা হয়েছে। আমার ধারণা দত্ত বাড়িতে যে ডাকাতের দল এসেছিল তারা আসলে দেবী চৌধুরানীর ডাকাত দল।”
-“তার মানে কি টিটোদি মূর্তি ডাকাতের দল নিয়ে গেছে?”
-“না, নিশ্চয়ই নিয়ে যায়নি। যায়নি বলেই ছড়াটা তার কিছুদিন পর লেখা হয়েছে। একবার ডাকাতের দল আসার পর আর ঝুঁকি নিতে চায়নি দত্ত পরিবার। তাই মূর্তিটাকে কোথাও লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু সেটা কোথায় এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।”
-“তাহলে আমাদের এখন কী করনীয়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
-“কাল আবার একবার দত্ত বাড়িতে যেতে হবে। আরেকটু সময় লাগবে ব্যাপারটা বুঝতে।”
-“আমাদের আগে তো আরো দুজন মুতির খোজে গিয়েছিল কোচবিহার রাজবাড়িতে। তারা যদি মূর্তিটা সরিয়ে ফেলে থাকে।”
-“সরাইনি বলেই আমার বিশ্বাস। তাহলে চাকরটাকে খুন হতে হতো না। এখনো অবধি মূর্তিটা সেফ জায়গাতেই আছে।”
-“ধাঁধাটা কি তুমি এখনো সল‌্ভ্ করতে পারোনি?”
-“সিংহ আর বাঘের ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বড়দেবী প্রথমবার যেখানে এসেছিল সেই ব্যাপারটাও ঠিক পরিষ্কার নয়।”
-“মূর্তিটা ঠিক কে সরাতে চায়? হিস্টরি প্রফেসর নাকি প্রোমোটার? নাকি সেই অজানা মহিলা? সে ব্যাপারে কি কিছু বুঝতে পারলে?”
-“মূর্তির উপর লোভ যে দুজনেরই আছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। মহিলাটির খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।”
-“চাকরটা কি মূর্তির ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছিল?”
-“মনে হয় না, সে এসব কি করে জানবে!”
-“তাহলে সে খুন হল কেন?”
-“যথা সময়ে সব জানতে পারবি। এবার ধাঁধার বাকিটা সল‌্ভ্ করার চেষ্টা কর।”
-“বাঘ সিংহ বলতে বড়দেবীর বাহন বাঘ সিংহকেও তো বলা হতে পারে।”
-“কিন্তু বড়দেবীর মূর্তি তো শুধু কোচবিহারে রয়েছে। তাও আবার শুধু পুজোর সময় বানানো হয়। আর সেখান থেকে বাঘ আর সিংহকে আলাদা করা সম্ভব নয়।”
-“তাহলে দত্ত বাড়িতে হয়তো কোন বাঘ আর সিংহের মূর্তি আছে তার কথাই বলা হয়েছে।”
-“সেটা আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কোন সময় সেখানে ওরকম কোন মূর্তি ছিল না। আর তাছাড়া ফ্যামিলি ডাইরিতেও সেরকম কোনো মূর্তির উল্লেখ নেই।”
-“এছাড়া আর কিই বা হতে পারে, সত্তিকারের বাঘ সিংহ হবে না নিশ্চয়ই।”
-“আমাদের ভাবাটা ঠিক হচ্ছে না। বুঝলি তো! এভাবে হবে না, অন্য ভাবে ভাবতে হবে।”
-“বড় দেবী নামে অন্য কোথাও কোন ঠাকুরের পুজো করা হয় কিনা সেটা একটু গুগ‌্ল্ খুঁজে দেখত।”
প্রায় এক ঘন্টা ধরে গুগ‌্লে খুঁজেও আমি কিছুই না পেয়ে হতাশ হয়ে বললাম, “কোন কিছুই তো নেই কোচবিহারের বড় দেবী ছাড়া।”
অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা ভাবনা করার পর টিটোদি বলল, “আমাদের কাছে যদি একটা ওরকম মূর্তি থাকে। তাহলে সেটাকে তোরা কোথায় লুকোবি ডাকাতের থেকে বাঁচার জন্য?”
-“ব্যাংকের লকারে রাখব।”
-“গবেট। তখনকার দিনে এসব কিছু ছিল না।”
-“বাড়ির কোন পিলারের ভেতর রাখা যেতে পারে।” শ্রীকান্তদা বললেন।
-“তা যেতে পারে, কিন্তু বাড়িটা তো তার আগে থেকে তৈরি ছিল। সেরকম হলে কোথাও নিশ্চয়ই রিপেয়ারিং এর দাগ থাকবে। সেরকম কোথাও কিছু দেখা যায়নি। আমি বেশ ভালো করে সব লক্ষ্য করেছি।”
-“ওই বাড়ির চত্বর তো অনেক বড়। মাটির নিচেও তো থাকতে পারে।”
-“তা পারে। কিন্তু সেখানে কোনো চিহ্ন না থাকলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে কি করে।”
-“পুরো ক্যাম্পাসটা খুঁড়ে দেখা যায় না?”
-“সেই পরিকল্পনায় হয়তো করেছিল যারা মূর্তিটাকে বিক্রি করতে চায়। তাই বাড়ি খালি করানোর হুমকি দিচ্ছিল। কিন্তু আমি তো আর সে জিনিস করতে পারি না। কাজটা যখন হাতে নিয়েছি তখন সমাধানটা তো আমাকে করতেই হবে।”
-“আচ্ছা মূর্তিটা যদি পাওয়াও যায়, সেটা তো মনে হয় সরকারি সম্পত্তি হয়ে যাবে।”
-“সেটা সরকার জানলে তবে তো হবে। বিশ্বনাথ বাবুর হাতে মূর্তিটা এলে তিনি সরকারের হাতেই তুলে দিতেন বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু বাড়ির বাকিরা সেটা চায় না।
আর তাতেই যত গণ্ডগোলের সূত্রপাত।”
-“মূর্তিটা তাহলে গলিয়ে বিক্রি করতে হবে, যেই করুক। তা নয় তো ধরা পড়ে যাওয়ার চান্স আছে।”
-“তোর মাথায় কিছু বুদ্ধি আছে। মূর্তিটা মেইন দাম হল অ্যান্টিক পিস হিসাবে। গলিয়ে ফেললে তো খেলাই শেষ। আটটা হীরে আর ওইটুকু সোনা ওর আর কত দাম হবে।”
-“অত দাম দিয়ে তাহলে বিক্রি বা কোথায় করত?”
-“এই পৃথিবীতে সব জিনিস বিক্রি হয়। শুধু সত্যিকারের জায়গাটা জানতে হয়। যারা এ কাজ করে তারা তা ভালো করেই জানে। কিছু বড়লোক লোকের কাজই হল এসব পৌরাণিক জিনিস সংগ্রহ করা।”
-“তারা সংগ্রহ করেই বা কি করবে? তাদেরকেও তো পুলিশ ধরে নেবে তাহলে।”
-“একবার বিদেশে পাচার হয়ে গেলে তারপর আর কে ধরবে! এটা কি জানিস বেশিরভাগ পৌরাণিক জিনিস ফেমাস হয়েছে হয়েছে হয় সেগুলো চুরি হওয়ার জন্য অথবা চুরি হওয়ার চেষ্টা করার জন্য।”
-“তাই নাকি!” আমি বেশ অবাক হয়েই বললাম।
-“তোরা ফেমাস কোন পৌরাণিক জিনিসের নাম বল। কোন মূর্তি, ছবি, কয়েন কিছু একটা।”
-“মোনালিসা…” শ্রীকান্তদা বললেন।
-“ঠিক, মোনালিসা। প্রথমেই হয়তো সবার এই নামটাই মাথায় আসবে। এবার বল তো মোনালিসা কি জন্য বিখ্যাত?”
-“লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা হিসেবে।” আমি বললাম।
-“আর কিছু?”
-“রেনেসাঁস এর যুগের আঁকা চিত্রনাট্য হিসেবে।” শ্রীকান্তদা বললেন।
-“ঠিক বলেছিস। কিন্তু লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা পনেরশো সাত সালের এই চিত্রটিকে অর্থাৎ মোনালিসাকে প্যারিসের বাইরের বাকি পৃথিবীর লোকেরা সেরকম ভাবে চিনতই না। ১৯১১ সালে এটি চুরি হওয়ার পরই বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং সারা পৃথিবী এর সম্পর্কে জানে।”
-“তাই নাকি? এটাতো জানাই ছিল না। ভাগ্যিস মোনালিসা চুরি হয়েছিল! নইলে সারা পৃথিবী কি করে জানতে এর সম্পর্কে!”
-“শুধু মোনালিসা কেন! আরো অনেক কিছুই চুরি হয়েছিল। কোন বিখ্যাত জিনিসের উপর লোভ সবারই থাকে। যেমন তুই কোহিনুর হীরার কথাই ধরে নে। প্রায় ৭০০ বছর আগে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কোল্লুর খনিতে এটি প্রথম পাওয়া গেল। তারপর আজকে কত হাত বদল করে, কত স্থান ভ্রমণ করে আজকে এটি পৌঁছে গেছে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের কাছে। যদিও এটাকে চুরি আখ্যা দেওয়া ঠিক হবে না। টেকনিক্যালি চুরি না বলা গেলেও মনকে চুরি ছাড়া কিবা বা বোঝানো যায় ।”
এভাবে আড্ডা চলতে থাকল আরো কিছুক্ষণ। টিটোদির কথা মতো রতনকে সকাল নয়টায় আসতে বলে দিয়ে সবাই ঘুমাতে গেলাম। ঠিক হল কাল সকালে চা খেয়েই বেরিয়ে যাব। ব্রেকফাস্ট রাস্তায় করা হবে, লাঞ্চ দত্ত বাড়িতেই করব। তারপর কাল রাতে চালশায় থাকব। সেখানে PWD’র একটা কাঠের বাংলো রয়েছে। সেখানেই থাকা হবে রাতে।
চলবে…


বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [চতুর্থ পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]



Author: admin_plipi

1 thought on “বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [পঞ্চম পর্ব]

Leave a Reply

Your email address will not be published.