বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]
লেখা : সৌরভ সেন

আগে যা ঘটেছে

দত্তবাড়িতে রক্তে লেখা পরপর দুটো হুমকি চিঠি আর তারপরেই বাড়ির চাকর ছাদ থেকে পড়ে খুন। কোচবিহারের রাজার মহামূল্যবান গনেশ মূর্তি নাকি দত্তবাড়িতে আছে। বাড়ি বিক্রি নিয়ে দত্ত ভাইদের মতবিরোধ আছে। দত্ত বাড়ির পারিবারিক ডায়েরিতে এক জটিল ধাঁধা। বোঝা যাচ্ছে যে গণেশ মূর্তি নিশ্চিত ভাবে ছিল, ডাকাতির পর সেটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। মূর্তি নিয়ে আরো দুজন খোঁজখবর করছে। তারপর…

আমরা দত্ত বাড়িতে এসে যখন পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে এগারোটা বাজে। আসবার সময় সারা রাস্তাটা টিটোদি গাড়ির পেছনে বসে ঘুমিয়েছে। কাল রাতে নাকি সেরকম ঘুম হয়নি তার।
বিশ্বনাথ বাবু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমরা পৌঁছে ব্রেকফাস্ট করার পর টিটোদি বলল, “আমি আপনাদের বাড়িটা আর একটু ভালো করে ঘুরে দেখতে চাই। যদিও সেদিন দেখেছি তবুও আরেকবার সব ঘর গুলো দেখতে চাই।”
-“বেশ তো, দেখুন না।”
আমি আর টিটোদি সব ঘরগুলো ঘুরে দেখতে থাকলাম। শ্রীকান্তদা আর বিশ্বনাথ বাবু তখন বসে গল্প করছিলেন। বাড়ির বাকিরা তখন গেছে হনুমান মন্দিরে পুজো দিতে।
প্রথমেই গেলাম ইতিহাসের অধ্যাপকের ঘরে। ঘরে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না, তবে স্টাডি টেবিলের ওপর একটা খাতা রাখা, আর তাতে সেই ছড়াটা লেখা আর অনেক রকম আঁকিবুকি কাটা। ছড়ার মানে উদ্ধার করতে পেরেছে বলে মনে হল না।
তারপর আমরা গেলাম প্রদীপ দত্তর ঘরে। তার ঘরে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর আমি টিটোদিকে বললাম, “এদিকটা একবার দেখে যাও।” স্টাডি টেবিলের ওপর শুকনো পুঁই গাছের ফল পড়ে রয়েছে। সেটা টিটোদিকে দেখালাম।
-“যাক নিরাশ হয়ে ফিরতে হল না। আমি আশা করিনি এতদিনও এটা থাকবে।”
তারপর আমরা এসে পৌঁছলাম বিশ্বনাথ বাবুর বড় ছেলের ঘরে। টেবিলে একটা ডাইরি আর তাতে অনেক কিছু লেখা রয়েছে। ধাঁধাটার অনেক শব্দের মানে বের করার চেষ্টা করেছে ছেলেটা। আমি তো প্রথমে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। প্রায় বাড়ির সবাইতো দেখছি মূর্তিটা উদ্ধার করার চেষ্টা করছিল। তবে এই ছেলেটা অনেক দূর এগিয়েছে সেটা ওর খাতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। টিটোদি সব পেজগুলোর ছবি তুলে নিল ফটাফট। আমাদের আর কিছু সেরকম দেখার ছিল না। আমরা ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখি বাড়ির সকলে পুজো সেরে চলে এসেছেন।
টিটোদি বিশ্বজিৎকে অর্থাৎ বিশ্বনাথ বাবুর ছোট ছেলেকে নিয়ে বাগানের দিকে গেল। ইশারায় আমাকেও উঠে আসতে বলল।
-“আচ্ছা বিশ্বজিৎ, তোমার ঘরে তো দেখলাম অনেক ফেলুদার বই। তোমার তো ফেলুদা হওয়ার ইচ্ছে, তাই না?”
-“হ্যাঁ, বড় হয়ে আমি ফেলুদা হব।”
-“জানো তো, ফেলুদা সবার ভেতরে কি আছে, কে কী ভাবছে সেটা খুব ভালো করে জেনে যায়।”
-“হ্যাঁ, সেটা তো আমিও বুঝতে পারি।”
-“বেশ তো, তোমার তাহলে একটা পরীক্ষা নেওয়া যাক। পরীক্ষায় পাস করলে ডেয়ারি মিল্ক চকলেট।”
-“ঠিক আছে।”
-“বল তো, তোমার পিসতুতো দাদা, সে সারাদিন ঘরে বসে বসে কি করে?”
-“সে তো মস্ত বড় প্রফেসার। তাই সারাদিন ঘরে বসে বসে পড়াশোনা করে আর লেখালেখি করে।”
-“তোমার দাদার সাথে কি কারো ঝগড়া হয়েছে?”
-“হ্যাঁ, আমার কাকুর সাথে।”
-“তুমি কি করে জানলে?”
-“ওই তো একদিন রাতে কাকু বলছিল, ‘তুমি বেরিয়ে যাও আমাদের বাড়ি থেকে’।”
-“কিন্তু ও তো এখনো এখানেই আছে, বেরিয়ে তো যায়নি?”
-“না তারপর দিন ওই লোকটা এসেছিল, সেই দুষ্টু লোকটা যে আমাদের বাড়ি কিনতে চায়। তারপর দুষ্টু লোকটা কাকুকে আর দাদাকে সিগারেট খাওয়াল। তারপরও যে ভাব হয়ে গেছে ওদের।”
-“বাঃ! তুমি তো ফেলুদার মতো হয়ে গেছ। তুমি নিশ্চয়ই বড় হয়ে ফেলুদা হবে। একটা শেষ প্রশ্নের উত্তর দাও দেখি?”
-“বেশ বল, ফেলুদা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে।”
-“যেদিন ওই কাকুটা মারা যায় ছাদ থেকে পড়ে, সেদিন কি তোমার ওই দাদার সাথে তোমার কাকুর কোন কথা হয়েছে?”
-“হ্যাঁ হয়েছে তো। রাতের বেলায় আমি কাকুর সাথে লুডো খেলছিলাম। তখন দাদা এসে কাকুকে ডেকে নিয়ে গেল। তারপর অনেক জোরে জোরে রেগে গিয়ে কাকুকে কি সব বলল। তারপর ঘরে এসে কাকুর ডায়েরি থেকে কি বের করে কাকুকে দেখাল আর বলল লেখাটা দেখো ভালো করে। একদম সেম জিনিস আছে।”
-“এই নাও তোমার চকলেট।” আমি পকেটে রাখা ডেয়ারি মিল্কটা বের করে দিলাম।
আরো কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমরা সেখান থেকে বিদায় নিলাম। আমরা তিনজন এসে পৌঁছলাম মালবাজার থানায়। টিটোদি ও সি কে বলল, “আপনার ইনফর্মার লাগিয়ে একটা খোঁজ দিতে পারেন?”
-“কি বলুন?”
-“দত্ত বাড়িতে যে মাথার খুলিটা ফেলা হয়েছিল সেটা কে সাপ্লাই দিয়েছিল। আমার ধারণা কোন তান্ত্রিক গোছের লোকের থেকে কেনা হয়েছিল।”
-“ঠিক আছে, আমি খোঁজ নিচ্ছি।”
আরো কিছুক্ষন কথা বার্তা বলার পর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম সোজা চালশা বাংলোর দিকে। কুককে বলে রাখা ছিল আমরা রাতে বন ফায়ার করব। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে সে জানিয়েছে। শুধু আমাদেরকে চিকেনটা রাস্তা থেকে নিয়ে যেতে বলেছে। আমরা সেই মত একটা গোটা মুরগি নিয়ে নিলাম ‌।
বাংলোর সামনে খুব সুন্দর ফাঁকা মাঠ। কাটিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে বাংলা কুক শ্যামা। আমরা এসে বসতেই আগুন জ্বালিয়ে দিল। তার পাশেই ম্যারিনেট করে রাখা চিকেনগুলো আগুনের ওপর রাখা তার জালিতে দিয়ে দিল।
-“এত সুন্দর বন্দোবস্ত আমি তো ভাবতেই পারছি না। নর্থ বেঙ্গল ছেড়ে তো আর যেতে ইচ্ছে করছে না। ভাবা যায় এরকম পাহাড়ের মধ্যে কুয়াশার চাদরে মোড়া জঙ্গল, পাশে এত সুন্দর কাঠের বাংলো আর বারান্দায় বসে আমরা ক্যাম্প ফায়ার করছি আর রোস্ট খাচ্ছি।” শ্রীকান্তদা বললেন।
-“আপনার জন্য এখনো আরো অনেক কিছু অপেক্ষা করছে। আপনি এই কাঠের বাংলোর দোতালায় তো এখনো যান নি। আমি আর টিটোদি একবার থেকে ছিলাম। ওপরটা এত সুন্দর করে সাজানো না দেখলে পাগল হয়ে যাবেন।”
-“বলিস কি! তাহলে উপরের রুমে কিন্তু আমি থাকব। আমি তো জাস্ট ভাবতেই পারছিনা এত আনন্দ করছি এখানে।”
-“এসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আপাতত দুটো খটকা রয়েছে।” টিটোদি বলে উঠল।
-“দুটো খটকা… মানে বাকি সব রহস্যের সমাধান করে ফেলেছ?”
-“মোটামুটি” খুব গম্ভীরভাবে বলল টিটোদি।
-“মূর্তিটা তাহলে আছে?”
-“আশা করছি আছে। কিন্তু দুটো ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
-“কি ব্যাপার বলতো? আর মূর্তিটা কোথায় আছে?”
-“মূর্তির খবর জানতে হলে কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে।”
-“ঠিক আছে, খটকাগুলোই বল।”
-“মহিলাটি যিনি মূর্তির খোঁজ করতে রাজবাড়ী গেলেন, তিনি আসলে কে? ওরকম কম বয়সী কোন মহিলা নেই দত্ত বাড়িতে।”
-“এমনি খবরের কাগজে পড়ে যেতে পারে, জাস্ট কিউরিসিটির জন্য।”
-“তাহলে ইতিহাসের প্রফেসর এর খোঁজ কেন করল গিয়ে!”
-“ইতিহাসের প্রফেসর এসব নিয়ে লেখালেখি করেছে অনেক, তাই কোন ইতিহাসের ছাত্রী কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করতে পারে!”
-“সে সম্ভাবনা খুবই কম।”
-“আচ্ছা বেশ, দ্বিতীয় খটকাটা?”
-“মাথার খুলিটা কে ফেলে গেছে?”
কথাবার্তার মাঝেই মালবাজার থানার ওসির ফোন এল। টিটোদি অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর জানাল যে খুনিটা যে ফেলে গেছে তার সন্ধান পাওয়া গেছে। সে ঐ প্রোমোটারের কথাতেই ওটা ফেলে গেছে। ওখানকার কোন এক বাবাজি।
-“নিলু তোর ফোনে সেদিন চাবির রিং এর লকেট এর ছবিটা তুলেছিলাম। ওটা দে তো।”
ছবিটা নিয়ে গুগ‌্ল্ লেন্স এনালাইসিস করতে শুরু করল টিটোদি। আধ ঘন্টার মতো ঘাটাঘাটি করতেই বেরিয়ে এলো একটা ব্লগস্পট, এটা মূলত রান্নাবান্নার ব্লগ। দেখা গেল তাতে লেখা রয়েছে মেয়েটির নাম দিয়া পাল।
-“এবার তুই দিয়া পাল নাম দিয়ে ফেসবুকে সার্চ কর তো নিলু।”
টিটোদির কথা মত ফেসবুকে সার্চ করতে গিয়ে কয়েকশো প্রোফাইলের সন্ধান পেলাম। সেকথা টিটোদিকে জানাতে সে বলল, “সিটি মালবাজার ফিল্টার করে সার্চ কর।” ফিল্টার করে সার্চ করার পর পাঁচ ছটা প্রোফাইল পাওয়া গেল। সেগুলো টিটোদিকে দেখাতে একটা প্রোফাইল খুলে সে বলল, “দেখ তো এই মেয়েটার ছবি না লকেটের গায়ে?”
-“তাই তো মনে হচ্ছে।”
-“এ তো দেখছি মিতুল পালের মেয়ে। ম্যাথমেটিক্স থার্ড ইয়ার মালবাজার কলেজ।” টিটোদি বলল।
-“কিন্তু মিতুল বাবু নিজে না গিয়ে মেয়েকে কেন পাঠাবেন। যাতে অন ডিউটি ভদ্রলোকের মন গলে যায় সেজন্য?”
-“সব অন ডিউটি অফিসাররা যে তোর মত হয় না। তোর বুঝি যে কাউকে দেখলেই মন গলে যায়।”
-“আমি তো মজা করে বললাম।”
-“মজার মধ্যে নিজের ভাবনা চিন্তায় প্রকাশ হয় বুঝলি তো। ঠিক আছে চল তাড়াতাড়ি ডিনার করে শুয়ে পড়া যাক। এখানে সবাই খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। আমরা না খাওয়া অবধি বাংলোর কুক ঘুমোতে যেতে পারবে না।”
চলবে…

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [চতুর্থ পর্ব]

Author: admin_plipi

6 thoughts on “বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]

Leave a Reply

Your email address will not be published.