বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [প্রথম পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [প্রথম পর্ব]
লেখা : সৌরভ সেন

সাদা রংয়ের ইনোভা গাড়িটা এসে দাঁড়াল দত্তবাড়ির সিংহ দুয়ারে। গাড়ি থেকে নেমে এলেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমজিৎ চৌধুরী আর ওনার স্ত্রী নীলিমা চৌধুরী। সিংহ দুয়ার! হ্যাঁ সিংহদুয়ারই বটে। যেমনি বিশাল একটা বাড়ি ঠিক তেমনি বড় দুটো লোহার গেট। নেহাত কোনো ছোটখাটো রাজবাড়ী থেকে কম নয়!

আসার খবরটা টেলিফোনে আগাম পৌঁছে গেছিল দত্ত বাড়িতে। তাই তারা পৌঁছাতেই বাড়ির চাকর বিমল ব্যাগ দুটো নিয়ে ওপরে চলে গেল। তাঁরা দুজন সোজা চলে গেলেন বাড়ির ড্রইং রুমে।
-“নাও, মামিকে প্রণাম করো।” বড় মামীর দিকে দেখিয়ে কথাটা তার বউকে বলল সৌমজিৎ চৌধুরী।
-“থাক থাক, তার দরকার নেই। তোমাদের আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?”
-“না, সেরকম কোনো অসুবিধা হয়নি। আর তাছাড়া…”
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শৌণক ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল।
-“মা, টিউশন থেকে ফেরার পথে এগুলো গেটের কাছে পড়ে থাকতে দেখলাম।” বেশ কাঁপা কাঁপা গলায় কথাটা বলল শৌণক। তার হাতে একটা মানুষের মাথার খুলি আরেকটা রক্তে লেখা চিঠি। চিঠিতে লেখা রয়েছে, “এই বাড়ি তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিন। নইলে সবার বিপদ আছে।”
এসব দেখে বাড়ির বড় বউ অর্থাৎ সীমা দেবীর প্রায় মূর্ছা যাওয়ার মত অবস্থা। বিশ্বনাথ বাবুকে ফোন করে জলদি বাড়িতে ডেকে পাঠানো হল। বাড়ির সবাই বেশ ভয় পেয়ে গেল এই ঘটনার পর।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটল দিন তিনেক পর। একই জিনিস আবার ঘটল। এবারের চিঠিটা উদ্ধার করল বাড়ির কর্তা বিশ্বনাথ দত্ত। এক‌ই চিঠি, লেখা ও এক। আগের মতোই রক্ত দিয়ে লেখা। তবে এবারে অবশ্য মাথার খুলি নেই।
পরপর এরকম দুটো ঘটনায় বাড়ির সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। মোটামুটি বাড়ির সকলের মতামত এই বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে শিলিগুড়িতে নতুন কেনা ফ্ল্যাটে শিফ্ট হয়ে যাওয়ার।
বাড়ির সবাই ভয় পেয়ে গেছে দেখে তড়িঘড়ি বিশ্বনাথ বাবু পাড়ার প্রোমোটার মিতুল পালকে ডেকে পাঠালেন। মিতুল পাল আর তাঁর ভাই প্রদীপ দত্ত বন্ধু। স্বভাবতই অন্য কোন প্রোমোটার না ডেকে তাকেই ডাকলেন বিশ্বনাথ বাবু। তাকে ডেকে বললেন, “বুঝলে মিতুল, আমি ভাবছি বাড়িটা বিক্রি করব। তবে এখনো মনস্থির করে উঠতে পারিনি। তুমি যদি এটা কিনতে চাও তাহলে বাড়িটার বিক্রি করলে কি রকম দাম পাওয়া যাবে সেটা তুমি আমাকে ভেবে বলো।”
মিতুল পাল বলল, “সেসব নিয়ে দাদা আপনাকে একদম চিন্তা করতে হবে না। বাড়িটা আমিই নেব। সবার থেকে বেশি দাম দিয়েই নেব। পরে আমি হিসাবপত্র করে আপনাকে অরিজিনাল ভ্যালুটা বলে দিচ্ছি। আপনি অন্য কাউকে দেখিয়ে বাজার দর শুনে নেবেন।”
এবার ঘটল তৃতীয় ঘটনাটি। বাড়ির চাকর বিমল ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল। আর মৃতদেহের পাশেও পাওয়া গেল আগের মতই একই রকম চিঠি। তাতে রক্ত দিয়ে লেখা রয়েছে, “তাড়াতাড়ি বাড়ি ছেড়ে দিন নইলে সবার এরকমই অবস্থা হবে।

                    ***

শনিবারের সকালের আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছিল। আমি গতকালই শিলিগুড়ি চলে এসেছিলাম। দুদিন একটু চুটিয়ে আড্ডা মেরে যাব বলে। এখানে আসলে কলেজের দিনগুলো যেন আবার ফিরে পাই। কথায় ব্যাঘাত ঘটল কলিং বেলের শব্দে। “ক্রিং ক্রিং ক্রিং” ঘন্টাটা বেজে উঠল।
-“নিলু, দেখ তো কে এসেছে।” টিটোদি বলে উঠল।
আমি নিজে গিয়েই দরজাটা খুলতেই দেখি একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
-“সুস্মিতা সেনের সাথে দেখা করতে চাই!”
-“আচ্ছা ভেতরে আসুন।”
ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজ ৫০ হবে। বেশ ফরসা গায়ের রং। পরনে হালকা সবুজ কালারের দামি শার্ট আর নীল রঙের জিন্স। হাতে খুব দামি ঘড়ি। ক্লিন শেভ করা মুখ। বেশ মোটা গোঁফ। ভেতরে ভদ্রলোককে বসিয়ে আমি টিটোদিকে ডাকতে গেলাম।
টিটোদি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। ভদ্রলোককে একটু অপেক্ষা করতে বলে একটা সিগারেট ধরিয়ে প্রায় অর্ধেকটা শেষ করে তারপর ভেতরে এল। ততক্ষণে আমিও তিন কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসেছি।
ভদ্রলোক টিটোদিকে দেখে বললেন, “নমস্কার, আমার নাম বিশ্বনাথ দত্ত।”
-“বুঝেছি, আপনি মাল বাজার থেকে এসেছেন আর আপনি দত্ত ফার্নিচার এর মালিক তাইতো?” বেশ স্মার্ট ভাবে প্রশ্নটা করল টিটোদি। এরকম দূরদর্শিতা আশা করিনি আমি। বেশ অবাক হয়ে গেলাম এরকম কথা শুনে।
-“আপনি কি করে জানলেন?” ভদ্রলোকও বেশ চমকে গিয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করলেন।
-“আরে, এতো খুবই সিম্পল ব্যাপার। আপনার হাতে রোলেক্স ঘড়ি, আপনি অডি গাড়িতে চড়ে এসেছেন। এ থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে পয়সা কড়ি ভালোই আছে আপনার। আর আপনার গাড়িতে বৃষ্টির জলের দাগগুলো এখনো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। শিলিগুড়িতে আজ এখন অবধি বৃষ্টি হয়নি। এই রোদেলা ওয়েদার এ বৃষ্টি একমাত্র ডুয়ার্স এই সম্ভব। আর খুব বেশি দূর থেকে আপনি যে আসেননি সেটা গাড়িতে জলের দাগ থেকে বোঝা যাচ্ছে। বেশি দেরি হলে দাগ শুকিয়ে যেত। এত দামি গাড়ি সবার ব্যবহার করার কথা নয়। আপনার হাতব্যাগে জলপাইগুড়ি জেলার টিম্বার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এর নাম লেখা আছে। এ থেকে অনুমান করা যায় আপনি অনেক বড় কাঠ ব্যবসায়ী হলেও হতে পারেন। আর এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঠের দোকান দত্ত ফার্নিচার সেটা সবাই জানে।”
-“হ্যাঁ, তাইতো! এত সহজ ব্যাপারটা আমি বুঝতেই পারিনি!”
-“বুঝলি নিলু, এতো সহজ করে লোকজনকে বোঝানো যাবে না। তাহলে আমার ব্যবসা থাকবে না।”
লোকটি মুচকি হেসে বলে উঠলেন, “তা যা বলেছেন। এবারে আমি নিশ্চিত যে আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি।”
-“তা বলুন, কি সমস্যা নিয়ে এসেছেন? দেখে তো মনে হচ্ছে কদিন রাতে ঘুম হয়নি।”
-“হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। বড় অদ্ভুত সমস্যা বুঝলেন ম্যাডাম। বাড়িতে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে আমরা কিছু অদ্ভুত ধরনের চিঠি পাচ্ছিলাম। রক্তে লেখা চিঠি। তাতে আমাদের বাড়ি ছাড়তে বলা হচ্ছে বারবার। আর প্রথম দিন চিঠির সাথে একটা মাথার খুলিও রেখে গেছে কেউ। প্রথমে ব্যাপারটা কে খুব বেশি গুরুত্ব দেইনি আমরা। কিন্তু কাল রাতে হঠাৎ আমাদের বাড়ির কাজের লোক বিমল ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। তার সাথে আবার একই হুমকি দেওয়া চিঠি। আর ইদানিং কিছু অদ্ভুত ভৌতিক ব্যাপার ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে বাড়িতে। যেমন ধরুন রাতে অদ্ভুত ধরনের আওয়াজ, অথবা হঠাৎ করে আমার বেডরুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া, এইসব আর কি। বাড়ির সবাই এখন খুব ভয় পাচ্ছে। সবাই চাইছে শিলিগুড়িতে উত্তরায়ণে নতুন কেনা আমাদের ফ্ল্যাটে শিফট হয়ে যেতে। এবারে আমার আর ভাই দুজনেরই ব্যবসা মালবাজারেই। শিলিগুড়ি চলে এলে ব্যবসাটা যে করা যাবে না তা নয় কিন্তু ভালই অসুবিধা হবে সামলাতে।”
-“চিঠিগুলো সাথে এনেছেন?”
-“হ্যাঁ। এই নিন।”
কতগুলো রক্তে লেখা চিঠি এগিয়ে দিলেন বিশ্বনাথ বাবু। প্রথম দুটো চিঠি একই রকম দেখতে। রক্ত দিয়ে লেখা বলেই মনে হচ্ছে। একই কথা লেখা রয়েছে দুটি চিঠিতে… “এই বাড়ি তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিন। নইলে সবার বিপদ আছে।”
আর তৃতীয় চিঠিটা একটু অন্যরকম। তাতে লেখা “তাড়াতাড়ি বাড়ি ছেড়ে দিন নইলে সবার এরকমই অবস্থা হবে।”
এই চিঠিটার দিকে দেখিয়ে বিশ্বনাথ বাবু জানালেন যে এই চিঠিটাই বাড়ির কাজের লোকের মৃতদেহের পাশে পড়েছিল। খুব মনোযোগ দিয়ে টিটোদি চিঠিগুলো দেখল। তারপর বিশ্বনাথ বাবুকে বলল, “চিঠিগুলো কি আমি কিছুদিন আমার কাছে রাখতে পারি?”
-“হ্যাঁ নিশ্চয়ই, রাখুন।”
-“আরেকটা ব্যাপার, আপনাদের ছাদের রেলিং নেই?”
-“আছে কিন্তু ছাদে কিছু কাজ হয়েছিল। তাই সেদিনই রেলিংয়ের কিছুটা ভেঙে আবার নতুন করে করতে হয়েছে। রেলিং ভেঙে পুরো বডিটা উপর থেকে পড়ে গেছে।”
-“আচ্ছা যিনি মারা গেছেন তার কোন ছবি আছে?”
-“হ্যাঁ, দেখাচ্ছি।” বিশ্বনাথবাবু পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখালেন। বেশ মোটাসোটা চেহারা বাড়ির চাকরের। ওরকম একটা চেহারা সদ্য করা দেওয়ালের উপর পড়লে, দেওয়াল ভেঙে যাওয়া এমন কিছু আশ্চর্যজনক ব্যাপার নয়।
-“ঠিক আছে তাহলে আপনার কেসটা আমি নিলাম।”
-“ম্যাডাম, আমি আপনাকে দশ হাজার টাকার একটা চেক দিয়ে যাচ্ছি।” বলে ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক বের করে নামের জায়গাটা ফাঁকা রেখে ১০,০০০ টাকা লিখে সই করে টিটোদির হাতে দিলেন। আর একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে টিটোদিকে দিলেন।
-“আপনি কি ভূতে বিশ্বাস করেন বিশ্বনাথ বাবু?”
-“করিনা বলেই তো আপনার কাছে আসা ম্যাডাম।” একটু গম্ভীর মুখ করেই কথাটা বললেন ভদ্রলোক। কাপের চা শেষ করার পর টিটোদির ফোন নম্বর নিয়ে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন।
ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর আমি টিটোদিকে জিজ্ঞেস করলাম, “মাথার খুলি কে ফেলে গেল বলতো? এটা পাওয়া তো এত সহজ নয়। যতদূর জানি মেডিকেল কলেজ ছাড়া ওই জিনিস তো কেউ কিনতে ও পারে না।”
-“কেন? শুনলি না ভূতের উপদ্রব হয়েছে। কোন অতৃপ্ত আত্মা ফেলে গেছে নিশ্চয়ই।” বেশ চিন্তিত মুখে কথাটা বলল টিটোদি।
আমি বেশ ভালই বুঝলাম টিটোদি হেঁয়ালি করছে। এখন আর এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলেও কোনো জবাব দেবে না। টিটোদির এই টেকনিক আমার বেশ ভালোই জানা। খুব গম্ভীরভাবে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করছে সে।
কিছুক্ষণ ওইভাবে থাকার পর টিটোদি আমাকে হঠাৎ প্রশ্নটা করল, “কি কি অবজার্ভ করলি বল তো?”
-“তৃতীয় চিঠিটা অন্য লোকের লেখা।”
-“সাবাস। তোর অনেক উন্নতি হয়েছে দেখছি। লেগে থাক তোর হবে।” বলে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো হাতে আমার পিঠ চাপড়ে দিল টিটোদি। শরীরে একটা হালকা শিহরণ খেলে গেল আমার। যে কথাটা অনেক চেষ্টা করেও বলা হয়নি সেটা টিটোদিকে বলে দিতে ইচ্ছে হল এখন।
-“একটা কথা বলব টিটোদি?”
-“দাঁড়া, একটা দরকারি ফোন সেরে নিই আগে।”
অনেকক্ষণ পর কথা বলা শেষ করে টিটোদি ফোনটা বিছানায় রাখতে রাখতে বলল, “কি বলছিলিস, বল এবার।”
-“না মানে, ভুলে গেলাম কি বলছিলাম।”
-“তুই কি নতুন প্রেমে পড়েছিস?”
-“কি সব ভুলভাল বলছ!” একটু লজ্জা পেয়েই আমি কথাটা বললাম।
-“নতুন প্রেমে পড়লে লোকজন এরকম সব ভুলে যায়।”
-“ও না না, ভুলিনি তো। ওই তোমার নতুন কেসের ব্যাপারে বলছিলাম। আরো কিছু অবজারভেশন আছে আমার।”
-“বাপরে তুই তো ফাটিয়ে দিচ্ছিস পুরো। বল দেখি তোর কি কি অবজারভেশন!”
-“থার্ড চিঠির শুধু হাতের লেখাই আলাদা নয়! ওটা দেখে রক্ত দিয়ে লেখা বলে মনে হচ্ছে না।”
-“সাবাস। কাল রাতে এতগুলো বিয়ার খেয়েছিস বলে বেশ মাথা খুলেছে তোর। সত্যি মন থেকে বলছি, দারুন নোটিশ করেছিস তুই।”
-“আর একটা অবজারভেশন আছে!” হাসতে হাসতে নিলু কথাটা বলল।
-“কি? বলে ফেল তাড়াতাড়ি।”
-“তুমি কি নিজের দাম বাড়ানোর জন্য ভদ্রলোককে ওয়েট করালে কিছুক্ষণ? নাকি ভদ্রলোকের গাড়িটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার জন্যই বারান্দায় দাঁড়ালে?”
-“বাঃ ভালই লক্ষ্য করেছিস। দুটোর জন্যই। সবার কাছে খুব তাড়াতাড়ি সহজলভ্য হয়ে গেলে ডিটেকটিভদের দাম কমে যায় বুঝলি। আর তাছাড়া ভদ্রলোকের গাড়িটাও খুঁটিয়ে দেখার দরকার ছিল।”
-“ঠিক আছে, খুব খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে হবে। তোমার রান্নার দিদি তো আসেনি।”
-“আজকে দুপুরের লাঞ্চ আমরা ভজহরি মান্না তে করব। তাই দিদিকে আসতে না করে দিয়েছি। এবার বল এই কেসের সাথে রিলেটেড আর কিছু তোর মনে পড়ছে?”
-“আর কিছু? না তো!”
-“দু-তিন সপ্তাহ আগে, খবরের কাগজে একটা খবর বেরিয়েছিল। তোকে যত্ন করে রাখতে বলেছিলাম কাগজটা। এবার কিছু মনে করতে পারলি?”
-“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তুমি কাগজটা যত্ন করে রাখতে বলেছিলে। বলেছিলে একটা অঘটন খুব তাড়াতাড়ি ঘটবে।”
-“কাগজটা খুঁজে বের কর তাড়াতাড়ি।”
-“তুমি কোন চিন্তা করো না। সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমি ড্রাইভে সেভ করে রাখি। তোমাকে লিংকটা দিয়ে দিচ্ছি।”
হোয়াটসঅ্যাপ থেকে লিংকটা খুলে আমার হাতে ফোনটা দিয়ে, টিটো দি বলল, “পড়ে শোনা এটা।”
আমাকে যাতে পড়ে শোনাতে না হয় সেজন্যই ফোনটা আমি টিটোদির হাতে দিয়েছিলাম। কি আর করা যাবে অগত্যা আমাকেই পড়ে শুনাতে হল, “কোচবিহারের রাজার উপহার দেওয়া মূল্যবান মূর্তি থাকার সম্ভাবনা মালবাজারের দত্ত বাড়িতে।” হেডিং টা পড়ে শোনালাম আমি।
-“পুরোটা পর।”
-“কোচবিহারের ১৩ তম রাজা ধীরেন্দ্র নারায়ণ এর উপহার দেওয়া মহামূল্যবান একটি মূর্তি মালবাজারে দত্ত বাড়িতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি কোচবিহার রাজবাড়ি থেকে পাওয়া একটি রেজিস্টারে এর উল্লেখ রয়েছে। এটা কি মূর্তি তার ঠিক উল্লেখ নেই তবে এটা অনুমান করা যায় যে গণেশ মূর্তি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সোনার তৈরি এই মূর্তিটির গায়ে মহামূল্যবান আটটি হীরে বসানো রয়েছে। এছাড়াও মূর্তিটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও প্রচুর। খুব সহজেই অনুমান করা যায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূর্তিটি কয়েক কোটি থেকে কয়েক শত কোটি টাকাতেও বিক্রি হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে মালবাজারের দত্তবাড়ির বর্তমান বাসিন্দাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান যে এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না। কোনদিন তারা এরকম কোন মূর্তি চোখেও দেখেননি।”
-“কি বুঝলি এবার বল?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল টিটোদি।
-“তুমি কি সন্দেহ করছ এই খুনের সাথে ঐ মূর্তির কোন যোগাযোগ আছে?”
-“এখনই ঠিক বলা যাচ্ছে না। তার জন্য দত্ত বাড়িতে একবার যেতে হবে।”
-“কবে যাবে তাহলে?”
-“কাল তো রোববার, তোর ছুটি। কালই চল। রতনকে টেলিফোন করে বলে দে, সকাল ৭টার মধ্যে চলে আসতে। আমরা ঠিক ৭টায় বেরোব।”
-“এত সকালে যাবে?”
-“হ্যাঁ যাব। কারণ না হলে হাওয়া মহলে বসে টাটকা বোরোলি মাছ ভাজা খাওয়া হবে না। ভোর ৬টার দিক থেকে গজলডোবায় বোরোলি মাছ বিক্রি হওয়া শুরু হয়। শুধু মাছ খাওয়ার জন্য তো আর যাওয়া হবে না। আর তাছাড়া কাল শ্রীকান্ত সান্যাল সকাল সাড়ে ছটায় এনজেপি স্টেশনে নামবে। তুই ঘরের যা অবস্থা করে রেখেছিস কাউকে নিয়ে আসা খুবই চাপ। তারমধ্যে আজকে কাজের দিদি আসবে না। তাই ওকে নিয়ে ডাইরেক্ট বাংলোতে উঠব। ওখানেই ও ফ্রেশ হয়ে নেবে। তারপর কাল সকালে দিদি এসে ঘর পরিষ্কার করে দেবে।”
-“তুমি কি তখন দরকারি ফোনটা শ্রীকান্তদাকে করলে?”
-“তাছাড়া আর কি।”
এখানে বলে রাখা ভাল হাওয়া মহল ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের একটি ইনস্পেকশন বাংলো। টিটোদির ব্যাচ এর অনেকেই ইরিগেশন ডিপার্টমেন্ট এ কর্মরত। তাই ভালোই চেনা জানা রয়েছে টিটোদির। আমি বেশ ভালই বুঝলাম মাছ খাওয়া আসল উদ্দেশ্য নয় টিটোদির। নিজে ঘর নোংরা করে রেখেছে এখন আমার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে।
-“বাহ ফাটাফাটি। শুধু খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে এই যা!”
-“কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে, বুঝলি?”
-“বুঝলাম। কিন্তু কষ্টটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?”
-“আজ রাত দশটার মধ্যে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। তাহলেই হল। এবার চল লাঞ্চ করে আসা যাক।”
লাঞ্চ সেরে আমরা ঘরে ফিরে দেখলাম, তখন ঘড়িতে বিকেল তিনটে। টিটোদি আমকে বলল, “আমি স্নানে যাচ্ছি। তুই ইন্টারনেট ঘেঁটে কোচবিহারের ১৩তম রাজা ধীরেন্দ্র নারায়ণ সম্পর্কে যা তথ্য পাস খুঁজে রাখ। আমি এসে দেখছি।”
একটা টিউবরগ এর বোতল খুলে দুটো ঢোক বিয়ার খেয়ে নিয়ে আমি ইন্টারনেট সার্ফ করতে শুরু করলাম।
প্রায় আধঘন্টা পর টিটোদির প্রশ্ন শুনে মুখ তুলে তাকালাম আমি।
-“কি কি তথ্য জোগাড় করতে পারলি বল।”
কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে টিটোদির দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। লাল রঙের খুব সুন্দর একটা হাউস কোট পড়ে রয়েছে টিটোদি। খুব সুন্দর মিষ্টি মুখ। তার দিক থেকে চোখ ফেরানোই খুব কঠিন ব্যাপার।
-“কিরে এতক্ষণ কি শুধু বিয়ার খেলি, না কিছু পেলি?”
-“না না পেলাম। বলছি তোমাকে। বস চেয়ারটাতে।”
-“ঠিক আছে বসলাম এবার বল।” চেয়ারে বসতে বসতে কথাগুলো বলল টিটোদি।
-“শুধু রাজা সম্পর্কে সেরকম বিশেষ কিছু পেলাম না। তবে কিছু ইন্টারেস্টিং জিনিস পেলাম।”
একটুখানি থেমে আমি আবার বলতে শুরু করলাম, “কোচবিহারের ১৩ তম রাজা ছিলেন ধীরেন্দ্র নারায়ণ। ভুটানের দেবরাজ তার সাফল্য সহ্য করতে পারতেন না। বক্সার কাছের জমি নিয়ে তিনি কোচবিহারের রাজার সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। তিনি দাবি করেছেন যে জমিটি তাঁরই। তিনি তাঁর সেনাবাহিনী এবং তাঁর সেনাপতি পঞ্চু তোমা কে প্রেরণ করেছিলেন, যিনি কোচবিহারের রাজাকে বন্দী করে নিয়েছিলেন। প্রথমে রাজা কে বক্সার জঙ্গলেই রাখা হয়েছিল। পরে তাকে ভুটানের তদানীন্তন রাজধানী পুনাখায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভুটান রাজা রাজাকে বন্দী করার পাশাপাশি কিছুটা জমিও দখল করে নেন।
কোচবিহার রয়্যাল পরিবারের সদস্যরা তখন ব্রিটিশ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে তাদের কোচবিহারের বাদশাহকে তাঁর সিংহাসনে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করার জন্য আবেদন করেছিলেন। এটা সম্ভবত ১৭৬৫ সালের ঘটনা। ব্রিটিশরা শুরুতে অনিচ্ছুক ছিল, তবে পরে তারা বুঝতে পেরেছিল এই অঞ্চলের বিশাল বনজ সম্পদ রয়েছে (বিশেষত বক্সা এবং আলিপুরদুয়ার অঞ্চলে) যেটা তাদের রেলপথ তৈরিতে প্রয়োজনীয় কাঠ সংগ্রহ করতে সহায়তা করতে পারে। সুতরাং তাদের নিজস্ব প্রয়োজনেই তারা কোচবিহারের রাজার পক্ষ নিয়েছিল এবং রাজ পরিবারকে সহায়তা করেছিল। ভুটান রাজা ১৭৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং বাদশাহকে ছেড়ে দেন। কোচবিহারের রাজা যখন তাঁর রাজ্যে ফিরে যেতে শুরু করলেন, রাজ পরিবার এবং তার প্রজারা তাকে একটি দুর্দান্ত স্বাগত জানিয়েছিল। আজকের রাজাভাতখাওয়া সেই জায়গা যেখানে রাজা মুক্ত হওয়ার পর প্রথম ভাত খেয়ে ছিলেন বা মধ্যাহ্নভোজ করেছিলেন। সেই থেকে এই জায়গাটি রাজা-ভাত-খাওয়া নামে পরিচিত। এটি বাংলার বৃহত্তম বন, বক্সা টাইগার রিজার্ভের প্রবেশদ্বার।”
-“বাঃ অনেক কিছু জোগাড় করেছিস তাহলে। ঠিক আছে আজকে আর কোনো পরিশ্রম নয় একটু রেস্ট নিয়ে নিই আমরা। তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে দশটার মধ্যে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে।”
-“ডিনারে কি বাইরে গিয়ে করতে হবে?”
-“তার দরকার হবে না। রুটি তড়কা অর্ডার করে দেব। তুই চাইলে অন্য কিছু করতে পারিস।”

চলবে…


বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [চতুর্থ পর্ব]

বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [ষষ্ঠ পর্ব]



Author: admin_plipi

6 thoughts on “বড় দেবীর গোলকধাঁধায় টিটো দি [প্রথম পর্ব]

Leave a Reply

Your email address will not be published.