বেনারসের ঘাট গোয়েন্দাগিরির স্টার্ট [দ্বিতীয় পর্ব ]

বেনারসের ঘাট গোয়েন্দাগিরির স্টার্ট [দ্বিতীয় পর্ব ]
লেখা – সন্দীপন গাঙ্গুলী
ডিজিটাল পেইন্টিং – অভিব্রত সরকার

আগে যা ঘটেছে

বেনারসে গিয়ে নীলের সঙ্গে দেখা গিরীশের। বিখ্যাত ভাইরোলজিস্ট প্রয়াত ডঃ উপাধ্যায়ের বাড়িতে দুজনে দেখা করতে গেল ওনার ছেলে ভাস্করের সাথে। ওনার অসমাপ্ত লেখা শেষ এবং অন্য সমস্ত কাজ ডিজিটালাইজেশন এর দায়িত্ব নিয়েছেন শম্ভুনাথ। তারপর…
দ্বিতীয় দিন

ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে সাড়ে চারটের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম আশ্যি ঘাট এর উদ্দেশ্যে। এত ভোরেও রাস্তায় এত লোক এর আগে আমি কোনদিন দেখিনি কোথাও। ২৫ মিনিট লাগল রিকশা করে ঘাটে পৌঁছতে। দুজনে দুকাপ চা নিয়ে ঘাটের মেঝেতে গিয়ে বসলাম। চারিদিকে অনেক ফুল বিক্রি হচ্ছে। সূর্যোদয় হয়নি এখনো। পৌছতেই দেখলাম কালকের দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যের গঙ্গা নদীর মত আশ্যি ঘাটে সকালের গঙ্গা আরতি হচ্ছে। লোকমুখে শুনলাম সকালে নাকি সুবাহ-এ-বানারাস নামের একটি ডেলি কালচারাল প্রোগ্রাম এর অংশ এটি। সেই কালকের মত সাত জন অল্পবয়সী পুরোহিত ও ঘিয়া রঙের ধুতি পড়ে শঙ্খ ধুপ ধুনো প্রদীপ সহযোগে সাড়ে পাঁচটা অবধি গঙ্গা আরতি করল। ঘাটের এক পাশে একটি মঞ্চ করা তাতে লেখা আছে ‘সুবাহ-এ-বানারাস’। তাতে একজন বৃদ্ধ মঞ্চের ওপর থেকে কিছু স্তোত্র পাঠ করছেন। একদল মানুষ তাকে উন্মুগ্ধভাবে শুনছেন। তারপর ওই মঞ্চেই শুরু হ’ল যোগা ক্লাস। যোগা গুরু স্টেজের ওপর থেকে মাইক্রোফোনে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছেন আর স্টেজের নিচে মেঝেতে ৫০-৬০ জন দেশী-বিদেশী পুরুষ মহিলা নিজের নিজের আসনে বসে তা প্র্যাকটিস করছে। তিনজন পালোয়ান গেরুয়া রঙের লেংগোট পড়ে মুগুর ভাজছেন এক কোণে। একজন সেতারবাদক দূরে এক কোণে মেঝেতে আসন পেতে বসে চোখ বন্ধ করে ভৈরবী রাগ ধরেছেন। আরেকজন দেখতে পাচ্ছি সেতার নিয়ে মাঝ গঙ্গায় নৌকায় বসে কিছু গাইছেন। কত কত লোক গঙ্গায় স্নান করছে, কেউ কেউ আবার পুজো করছে, কেউ কেউ মৃত ব্যক্তির অস্থি বিসর্জন করছে। যোগা শেষে মঞ্চে শুরু হ’ল বেনারসের নিজস্ব ঘরানার সংগীত। সেতার, হারমোনিয়াম, তবলা সহযোগে বেনারসের আদি ঘরানার গান শুরু হয়েছে। পাড়ে বাঁধা নৌকাগুলো থেকে বাচ্চা ছেলেগুলো কত রকম ভঙ্গিতে গঙ্গায় ডাইভ দিচ্ছে। সূর্যের আলো একটু স্পষ্ট হতেই দেখতে পেলাম ঘাট বরাবর দাঁড়িয়ে আছে কত শত বছর পুরনো ধূসর হলুদ রঙের কত শত বাড়ি, দূর্গ, মন্দির। দূর থেকে একটা আজানের শব্দ ভেসে আসছে। এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছেন জটাধারী, মুখে খড়িমাটি মাখা এবং গেরুয়া বসন পরা জনাদশেক সাধু-সন্ত। তাদের মধ্যে কারও কারও সঙ্গে বসে আছে চার-পাঁচটা ভক্ত। একটা অল্পবয়সী বিদেশি মেয়ে একজন সাধুর সঙ্গে বসে ধ্যান করছে মা গঙ্গার দিকে ফিরে। এত ভিড় এত শব্দের মধ্যেও একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছি। একবিংশ শতকের এইসময়ে দাঁড়িয়েও, বহুকাল ধরে চলে আসা এই প্রথাগুলোর কোন পরিবর্তন নেই দেখে মনে হচ্ছে, বেনারস যেন ইতিহাসের চেয়েও পুরনো।

সবে সাতটা বাজে।
-“আশ্যি নদী এখানে গঙ্গাতে মিশেছে, তাই এই ঘাটের নাম আশ্যি ঘাট,” বলল নীল।
-“বেনারসে তাও কতগুলো ঘাট হবে?” আমি প্রশ্ন করলাম।
-“এইট্টি প্লাস। এইট্টি এইট মোস্ট প্রবাবলি। জানো বেনারস থেকে ইংলিশে Varanasi নামটা কিভাবে এসেছে?”
-“তুমিই বলো!”
-“Varuna এবং Assi নদীর সঙ্গমস্থলে এই শহর গড়ে ওঠার জন্য একে কাশি, বেনারস এর পাশাপাশি Varanasi ও বলা হয়ে থাকে।”
দুজনেই চা নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ঘাটের একেবারে শেষ সিঁড়ির কাছে গিয়ে বসে দেখলাম কয়েকজন স্নান করছে, কয়েকজন পুজোটুজো করছে।
-“ওম জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।” সূর্য মন্ত্র উচ্চারণ করে মাথার পেছনে হালকা টাকওয়ালা এক ভদ্রলোক সাদা ধুতি পরে হাত দুটো প্রণামের ভঙ্গিতে জড়ো করে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলছেন, -“বাবা বিশ্বনাথ, তোমার কৃপায় ২৯টা ভিডিও আর সেভেন্টি ফাইভ থাউজেন্ড সাবস্ক্রিপশন কমপ্লিট। ৩০ নম্বরটা তোমার রাজধানীতে শ্যুট করে যেন লাখের গণ্ডি ছুঁতে পারি বাবা! আমাকে জ্ঞান দিও বুদ্ধি দিও, কোটি কোটি ভিউয়ার দিও, লাইক দিও।”
প্রার্থনার ওয়ার্ড সিলেকশন শুনে আমি আর নীল পরস্পরের দিকে চাইব এমন সময় দেখলাম ভদ্রলোক খালি গায়ে সাদা ধুতি পরে উঠে আসছেন। আরে ইনি তো কালকের সেই ভদ্রলোক। ভদ্রলোক এত বড় ইউটিউবার বুঝতেই পারিনি, তাই অপেক্ষা না করে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম, “আপনি কি মশাই ভ্লগট্লগ বানান নাকি!”
-“আরে বাঙালি নাকি দাদা!” চোখগুলো বড় বড় করে ভ্রু দুটো কপালে তুলে মুখটা হাঁ করে হাসিমুখে বললেন ভদ্রলোক, “না মানে, ইয়ে ঐ একটু আধটু করি আর কি!”
-“তাহলে ওই ২৯টা ভিডিও আর সেভেন্টি ফাইভ থাউজেন্ড সাবস্ক্রাইবার্স ওগুলো মিথ্যে নাকি!” খোঁচা মেরে বলল নীল।
-“ও! আপনারা সব শুনে নিয়েছেন?” তারপর একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন, “না মশাই, ওসব সত্যি, হান্ডেট পার্সেন্ট! আসলে ভিউয়ারদের যখন এক্সপেক্টেশন আনলিমিটেড হয়ে যায় তখন নাম্বার ডসেন্ট ম্যাটার!”
-“বাই দ্যা ওয়ে, আমি গিরিশ গাঙ্গুলী, আর ইনি আমার বন্ধু নীলাদ্রি আচার্য।”
-“নমস্কার, আমি ভবতোষ মিশ্র। তা আপনারা উঠেছেন কোথায়। এখানে কি ঘুরতে?”
-“নট্ এক্সাক্টলি। আমরা দুজনেই কলেজের প্রফেসর। কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করতে আইআইটি এসেছিলাম। কনফারেন্স থেকেই গাদোয়ালি চকে আমাদের জন্য হোটেল বুক করে দিয়েছে।”
-“আরে, আপনারা প্রফেসর! আমার বাবাও জানেন তো প্রফেসর ছিলেন। I respect all the teachers on the earth. আপনাদের ব্রেকফাস্ট হয়ে গেছে স্যার?”
ভদ্রলোকের কথায় এতটা মাখন ছিল যা আমার পুরো জীবনে কোন স্টুডেন্টও মাখায় নি। বললাম, “না এই করব আর কি।”
-“আমি স্যার ওই হোটেলটায় আছি। হোটেল গ্যাঞ্জেস ভিউ।” আঙ্গুল দিয়ে ১০০ মিটার দূরের একটা হোটেলকে দেখালেন ভবতোষবাবু, “একটা দারুণ জায়গায় বেনারসের ফেমাস ব্রেকফাস্ট, কচোরি জলেবি খাওয়াতে নিয়ে যাব আপনাদের, চলুন স্যার। আমার রুমে ৫ মিনিটের জন্য আসুন, আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি।”
বিদেশ বিভুঁইয়ে কোন বাঙালির এই মাখন মাখা অনুরোধ এড়িয়ে যেতে পারলাম না। ওনার সাথে সাথে গেলাম হোটেল গ্যাঞ্জেস ভিউ।
-“তো আপনারা কি কলকাতা থেকে?” প্রশ্ন করলেন ভবতোষবাবু।
-“আমার বাড়ি সল্টলেকে কিন্তু চাকরিসূত্রে থাকি কানপুরে। গিরিশ থাকে জলপাইগুড়িতে। আপনার আসল বাড়ি কোথায়?” বলল নীল।
-“আমার স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি সব এলাহাবাদে। বাবা ওখানেই প্রফেসর ছিলেন। ঘোরাফেরা ছাড়া বাকি সময়টা এলাহাবাদেই থাকি। এখন অবশ্য বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। বাড়ি ভাড়া দেওয়া আছে। মাসে মাসে ভাড়া পেয়ে যাই গুগ‌্ল পে তে যেখানেই থাকি না কেন। আমার নিজের একমাত্র দিদির শ্বশুরবাড়ি কলকাতার যাদবপুর। ওই সূত্রে মাঝে মধ্যে কলকাতা যাই আর কি!”
ভবতোষ বাবুর রুমটা রিভার ফেসিং।
-“তা আপনি কি ধরনের ভ্লগ বানান, ভবতোষ বাবু?” প্রশ্ন করল নীল।
-“আমি স্যার ঘুরতে খুব ভালোবাসি। এমনিই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। শেষে একদিন আমার ভাগ্নে চিন্টু বলল মামা তুমি ভিডিও ব্লগ বানাচ্ছ না কেন! ভালো হলে আরনিংও হবে! দেখলাম আইডিয়াটা তো ভালোই। তারপর ওই নিজে থেকে ইউটিউবে একটা চ্যানেল খুলে দিল। তারপর ক্যামেরা এল, হ্যান্ড গ্রিপ কাম ট্রাইপড স্ট্যান্ড এল, সেসব হ্যান্ডেল করা শিখতে হ’ল। কিন্তু আমি মশাই ওইসব ভিডিও এডিট ফেডিট করতে পারিনা। তাই ভিডিও কাটছাঁট করা গান-বাজনা অ্যাড করা ওসব আমার ভাগ্নে চিন্টুই করে থাকে। যেখানেই থাকি না কেন গুগ‌্ল ড্রাইভে সোজা শেয়ার করে দি।”
এবার বুঝলাম কাল সন্ধ্যের ভিডিও শুটিংয়ের মর্ম। ভদ্রলোককে এই ব্যাপারে কিছু বললাম না যাই হোক।
-“কই দেখান, আপনার চ্যানেলটা সাবস্ক্রাইব করে দিই।” হাসতে হাসতে বলল নীল।
ভদ্রলোক নিজের চ্যানেলটা খুলে দিলেন আর আমরা দুজনেই তাতে সাবস্ক্রাইব করে দিলাম। ভদ্রলোকের চ্যানেলের নাম ‘ভবঘুরে’। বাপরে, সেভেন্টি ফাইভ থাউজেন্ড সাবস্ক্রাইবার্স!
-“বাহ্! দারুন নাম তো আপনার চ্যানেলের।” বললাম আমি।
ভদ্রলোক আবার সেই গরুর মত এক পাটি দাঁত বার করে হেসে বললেন, “ওটা আবার আমার ছদ্মনামও বটে!” তারপর আবার নাটকীয় ভাবে বললেন, “প্লিজ ডু লাইক শেয়ার অ্যান্ড সাবস্ক্রাইব, মানে ইয়ে আর কি সাবস্ক্রাইব করে দিয়েছেনই।”
-“আপনি কি মশাই আবার লেখেন টেখেনও নাকি?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম আমি।
-“মানে ওই আর কি, রিসেন্টলি শুরু করেছি! ব্লগ দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন আবার একটু অন ডিমান্ড পাবলিশিং এর দিকেও এগোচ্ছি!” তারপর নিজের প্রশংসায় নিজেই গদগদ হয়ে বললেন, “বুঝলেন তো স্যার, সাবস্ক্রাইবাররা আমার সাহিত্য গুন টুন কেমন, তা চেখে দেখতে চাইছে! তাই মাসে দু’একবার কলকাতা যেতেটেতেও হয় আর কি!” কলারওয়ালা সবুজ গেঞ্জি আর অফ হোয়াইট কার্গো প্যান্টের সাথে একেবারে বেমানান নীল চকচকে সানগ্লাসটা চড়িয়ে নিয়ে বললেন ভবতোষবাবু।

আমরা এখন ঠাঠেরি বাজারের দি রাম ভান্ডারে দাঁড়িয়ে আছি। একটা অল্প বয়সী ছেলে দোকানের বাইরে বসে কচুরি জিলিপি ভাজছে। ভবতোষ বাবুর কথা মত একটা বেয়ারা ছেলে এসে আমাদের শালপাতার ঠোঙাতে কচুরি দিয়ে গেল। কচুরির এক টুকরো মুখে পুড়বো, এমন সময় ভবতোষ বাবু লাফিয়ে উঠে বললেন, “স্যার, খাওয়ার আগে দেখুন এর ভিতরে কি আছে। কচুরির ভেতর ডালের স্টাফিং, আলুর সবজির উপর হালকা চানার লেয়ার, তার ওপর পুদিনা ধনেপাতা আর মিষ্টি রসের চাটনি। আর মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি, কচুরি গুলো আটার তৈরি এন্ড সম্পূর্ণ ঘিয়ে ভাজা। ওই এখন জিলিপিটা ঘিয়ে ভাজা হচ্ছে দেখুন স্যার, দেখুন!”
খেতে আমিও ভালোবাসি কিন্তু ইনগ্রিডিয়েন্ট নিয়ে এমন ফ্যাসিনেশন আর এক্সপ্লেনেশন আমার পরিচিত কাউকে দিতে শুনিনি।
-“আপনি তো খুব ভোজনরসিক মশাই!” বলল নীল।
-“লাঞ্চে আজ আপনাদের একটা দারুন জায়গায় নিয়ে যাব স্যার। বহুকালের পুরনো। নানান রকমের ভেজ আইটেম ওখানে দেওয়া হয়। আর মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি সবাই একসাথে মাটিতে বসে পুরনো যুগের মত কাঠের ডেস্কের উপর খাবার রেখে খাওয়া হয় সেখানে। জয়পুরিয়া গেস্ট হাউস।”
-“আপনি এত জানলেন কি করে?” প্রশ্ন করলাম আমি।
-“আমি স্যার এলাহাবাদের ছেলে। ছোট থেকে বেনারস চষে বেড়িয়েছি। বেনারসের প্রতিটা গলির গন্ধ আমার চেনা।”
ভবতোষ বাবুর প্রস্তাবে আমরা এখন গঙ্গার ওপারে রামনগর ফোর্টে ঘুরতে এসেছি। ভবতোষ বাবুকে দেখলাম যথারীতি ওনার ইউটিউব চ্যানেলটির জন্য স্লিং ব্যাগ থেকে গোপ্রো হিরো এইট ক্যামেরা আর হ্যান্ড গ্রিপ বার করে ফোর্টের ভিডিও বানাতে শুরু করে দিয়েছেন।
-“জানো তো গিরিশ, কাশীর সমস্ত রাজারা এই ফোর্টে থাকত। ১৭৫০ এ কাশী নরেশ রাজা বলবন্ত সিং এই স্যান্ড স্টোনের তৈরি দুর্গ বানিয়েছিলেন।”
খুব বিরক্ত লাগছিল এরকম সুন্দর জায়গায় এসেও, একজন ভদ্রলোক হিন্দিতে ফোনে ঝগড়া করছে এক পাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ করে ভাস্কর বাবু ফোন করলেন। ফোন ধরেই বললেন, “গিরিশ বাবু, আজকে আমার হোটেলের ১০ বছর পূর্ণ হল। ইচ্ছে ছিল আজকের দিনে একটু পুজো আচ্চা দেব, আর কয়েকজন বন্ধুবান্ধবকে ডেকে একটু ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করব। কিন্তু বাবা চলে যাওয়াতে তো পুজোটা তো এবারের মতো হচ্ছে না। তবে দুপুরের লাঞ্চের আয়োজন করছি। তাতে আমরা বাড়ির কজন আর হোটেলের টুরিস্ট যারা আছে তাদেরই শুধু আসতে বলেছি। পাড়ার কাউকে ডাকিনি! একজনকে ডাকলেই দশজনকে ডাকতে হবে! তবে আপনি আর নীলাদ্রি বাবু যদি আসতেন তাহলে খুব ভালো লাগত। আসলে কালকে আপনাদের সাথে পরিচয় করে খুবই ভালো লেগেছে!”
-“আচ্ছা বেশ, তাই হবে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে তো আর একজন বন্ধু আছেন। ওনাকে কথা দিয়ে ফেলেছি আসলে ওনার সঙ্গে দুপুরে লাঞ্চ করার।”
-“আচ্ছা বেশ তো, ওনাকে নিয়ে আসুন না তবে, ভালোই লাগবে!”
-“আচ্ছা, তাহলে আমরা দুপুর একটার মধ্যে ঢুকে যাব।”
ফোন রেখে নীলাদ্রি আর ভবতোষ বাবুকে ভাস্কর বাবুর নিমন্ত্রণের কথাটা বললাম। ভবতোষ বাবু গোড়ার দিকে যেতে ইতস্ততঃ করলেও আমাদের পীড়াপীড়িতে ভদ্রলোক এক মিনিটে রাজি হয়ে গেলেন। নাহ্! ভদ্রলোক সত্যিই খুব সহজ সরল হাসমুখ প্রকৃতির।

ফোর্ট থেকে বেরিয়ে ভবতোষবাবুর অনুরোধে আমরা ১০০ মিটার দূরে একটা দোকানে লস্যি খেতে গেলাম। এবারেও ভবতোষ বাবু ফ্রন্ট ফুটে এসে বুঝিয়ে ছাড়লেন, “পুরো কাশীর মধ্যে এর লস্যি মোস্ট ফ্যান্টাবুলাস কেন কি জানেন! পোড়ামাটির ভাড়ে চারটে লেয়ার লক্ষ্য করুন। প্রথমে লস্যি, দেন তার ওপর মালাই, দেন এগেইন লস্যি, আর তার ওপর কাশীর ফেমাস রাবড়ি।”
খাব, না ভদ্রলোকের গোল গোল বড় চোখে লস্যির ছবি দেখব, বুঝতে পারলাম না।

ভাস্করবাবুর বাড়ির গেটে পৌঁছতে দেখলাম ৩৫-৩৬ বছর বয়স্ক একজন ঈষৎ শ্যাম বর্ণ, শর্ট হাইট এর গোলগাল গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক, আমাদের দিকে পিছন করে দাঁড়ানো শম্ভুনাথ বাবুকে কিছু একটা বলছেন। ভদ্রলোকের পরনে আকাশী টি-শার্ট এবং ব্ল্যাক জিন্স। দু একটা কথা কানে এল এই রকম, “মেরে হিস্সে কা প্যায়সা মুঝে ওয়াপাস কারো, মে অউর তুমারে সাথ কাম নেহি করুংগা। অউর নেহি কারোগে তো।”
আমাদের পায়ের শব্দে শম্ভুনাথ বাবু ওই ভদ্রলোককে কাঁধে হাত দিয়ে থামতে বললেন। আরে ইনিই তো রামনগর ফোর্টে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে ঝগড়া করছিলেন। কি সব বলছিলেন যে, “আই উইল নো মোর ডিল উইথ ইউ! মুঝে কুছ এইসা চিস হাত লাগনে ওয়ালা হে কে, মুঝে অউর তুমারে সাথ কাম করনে কি জরুরাত নেহি পাড়েগা।”

শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনি হলেন কাঠমান্ডু থেকে আসা ওষুধের ব্যবসায়ী অভিরাম কুলকার্নি। সবাই একসঙ্গে বৈঠকখানার দিকে এগোলাম। বৈঠকখানার সোফায় ভাস্কর বাবুর সঙ্গে বসে ছিলেন আর একজন ভদ্রলোক। আমাদের দেখে ভাস্কর বাবু উঠে এসে আমাদের এক এক করে সবাইকে সোফায় বসতে বলার পর পরিচয় করিয়ে দিলেন নতুন ব্যাক্তিটির সাথে। ইনি হলেন কলকাতা থেকে আসা প্রফেসর শশাঙ্ক মাইতি। ভদ্রলোক লম্বা ফর্সা মাঝারি ফিগারের, ঠিক রোগাও না আবার মোটাও না, চোখে কালো ফ্রেমের পুরনো ধাঁচের চশমা, আর হাতে একটা স্টিক। ভদ্রলোকের পায়ে বোধ হয় কোন সমস্যা আছে। ভদ্রলোকের পরনে সবুজ ফুল পাঞ্জাবী এবং সাদা পায়জামা। আমরাও সবার সাথে ভবতোষবাবুর পরিচয় করিয়ে দিলাম।

নীল জিজ্ঞাসা করল প্রফেসর মাইতিকে, “আপনি কোন কলেজে আছেন?”
-“কলেজ না, ইউনিভার্সিটি। ক্যালকাটা। ডিপার্টমেন্ট অব বায়োটেকনোলজি। আপনারা?” ভদ্রলোক এমনভাবে উত্তর দিলেন আর আমরা দুজন কলেজে পড়াই শুনে “ওহ আই সি” বলে এমনভাবে রিয়্যাক্ট করলেন, যা দেখে বুঝতেই পারলাম ভদ্রলোক অত্যন্ত রাশভারী।
-“আপনার পিএইচডি post-doc সব কি বিদেশে?” আমি প্রশ্ন করলাম।
-“হ্যাঁ। পিএইচডি মিশিগান ইউনিভার্সিটি। আর পিডিএফ একটা ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন আরেকটা বার্লিন ইউনিভার্সিটি থেকে।”
ভবতোষবাবু আমার হাত ধরে টেনে কানে কানে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই পিডিএফটা কি স্যার?”
-“পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। মানে যেটাকে আমরা post-doc বলছি। হায়েস্ট অ্যাক্যাডেমিক কোয়ালিফিকেশন পিএইচডি আর তারপরের রিসার্চ এক্সপেরিয়েন্স হল পোস্ট ডক্টরেট।” আমি বললাম।
-“ওউক্কে” বড় বড় চোখ করে বিজ্ঞের মত বললেন ভবঘুরে।
-“আপনাদের দুজনের পিএইচডি আর পিডিএফ কোথা থেকে?” আমাকে আর নীলকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করলেন প্রফেসর মাইতি।
আমি আর নীল দুজনেই শুধু পিএইচডি করেছি, কিন্তু post-doc এখনো করি নি। এটা শুনে ভদ্রলোক এবারও একটা একই টোনের “ওহ আই সি” এমনভাবে বললেন যে আমি আর এই সংক্রান্ত কোন প্রশ্ন করতেই ভয় পেয়ে গেলাম।

ভবতোষবাবুর অবশ্য নিজের ইউটিউব চ্যানেলের অ্যাডভার্টাইজমেন্ট করে অলরেডি সবাইকে লাইক শেয়ার অ্যান্ড সাবস্ক্রাইব করতে বলা হয়ে গিয়েছে। মিস্টার কুলকার্নি ভবতোষ বাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা ভবঘুরে জি, আপ কাভি নেপাল আয়ে হে? কাঠমান্ডু?”
-“ঘুরে নেহি তোষ। ভবতোষ। নো স্যার। বাট আই উইল ডেফিনেটলি গো ওয়ানডে।”
-“ইউ শ্যুড কাম দেয়ার ডেফিনেটলি। টেক মাই নাম্বার।”
-“আপ তো আসল মে গোয়ালিয়ারকে রেহনেওয়ালে শুনা মেনে ভাস্করজি সে?” কুলকার্নিকে প্রশ্ন করল নীল।
-“হাঁ জি। মেরা বিবি কাঠমান্ডু সে হে। তো মে ভি ওহি সেটেল হো গেয়া।”
-“কিতনা দিন সে?”
-“হো গেয়া দশ সাল। আই এম এ মেডিসিন ডিলার। উস্কে সাথ উধার মেরা দো মেডিসিন কা শপ ভি হে।”
-“মানি ম্যান!” মজা করে বললেন ভাস্কর বাবু।
সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।
দেড়টা নাগাদ ভজনলাল দোতলার ডাইনিং রুমে টেবিলে খাবার সার্ভ করে আমাদের ডাকতে এল। ভাত, শুক্তো, ডাল, কয়েক রকম ভাজা পরপর সার্ভ করলো ভজনলাল। এমন সময় কলিংবেলটা বেজে ওঠায় ও নিচে গেল দেখতে। পাঁচ মিনিট পরে ডেকে ডেকেও ভজনলালের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না যখন, ভাস্কর বাবু নিজেই গেলেন একতলায় মটর পনিরটা আনতে। নিচ থেকে অকস্মাৎ ভাস্করবাবুর প্রচন্ড চিৎকারে আমরা একসাথে সবাই তড়িঘড়ি একতলায় ছুটলাম। পৌঁছে দেখলাম ভজনলাল মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। সবাই মিলে ধরাধরি করে ভজনলালকে ওর নিজের বিছানায় শুয়ে দিয়ে এলাম। কিছু একটা ভেবে শম্ভুনাথবাবু ছুটল পাশে স্টাডির দিকে। তার পিছন পিছন ছুটল নীল।
-“সর্বনাশ!” বলল নীল।
-“মুঝে ইসি কা হি ডর থা!” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন শম্ভুনাথবাবু।
দেওয়াল আলমারির আটটা খোপের মধ্যে ২০১৭-২০২০ এর খোপের দরজাটা খোলা, তাতে চাবি ঝুলছে, আর খোপের ভেতরটা পুরো খালি।
নীল জিজ্ঞাসা করল শম্ভুনাথবাবুকে, “কেয়া কেয়া থা ইসমে?”
-“All his fully and partially complete research articles and notes between 2017 and 2020.”
-“তো আপকে পাস তো উসকা কপি হোগা।” বললেন অভিরাম কুলকানি।
-“হাঁ আপ তো সব আর্টিকেল কা সফ্ট কপি বানারেহে থে যো ইনকমপ্লিট থা।” আমি বললাম।
-“নেহি মে সির্ফ স্টার্ট কিয়া থা।”
-“আমি পুলিশে খবর দি তাহলে। এ নিয়ে সেকেন্ড টাইম। আর অপেক্ষা করা চলে না। আর এবার চুরিও হয়ে গেছে।” এই বলে পুলিশকে ফোন করতে ছুটলেন ভাস্কর বাবু।

মিনিট দশেক পর ইন্সপেক্টর মহাবীর জোশি এলেন। মোবাইলে দরকারি সব ছবি তুলে তিনি ঢুকলেন ভজন লাল এর ঘরে। আমরাও তার পিছু পিছু গেলাম। মুখে চোখে জল দেওয়ায় ইতিমধ্যে ভজন লালের জ্ঞান ফিরে এসেছে। কি এক্সেক্টলি হয়েছিল জিজ্ঞাসা করতে ভজন লাল যা বলল তাতে আমাদের মাথা ঘুরে গেল।
-“এক জটাধারী সাধু আয়া থা সাহাব, গেরুয়া পেহেনকে। দারওয়াজা খোলতেহি ঝোলি সে হাতোরা জ্যায়সা কুছ নিকালকে মারদিয়া মাথে পে। অর ফির মুঝে কুচ ইয়াদ নেহি।”
-“দিখতা ক্যাইসা সা থা, ইয়াদ হে কুচ?” ইন্সপেক্টর যোশি প্রশ্ন করলেন।
-“পেহেচানেঙ্গে ক্যাইসে সাহাব। পুরা মুমে তো সাফেদ বিভূতি লাগায়া হুয়া থা। উস্কে উপর বড়া বড়া দাড়ি।”
আমরা কেউই তখন ওখানে ছিলাম না বলে আমাদেরকে বেশি কিছু জিজ্ঞাসা না করে শুধু কে কোথা থেকে এসেছি আর এখন কোথায় থাকছি জেনে ইন্সপেক্টর যোশি চলে গেলেন।

ভাস্করবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি, নীল আর ভবতোষবাবু হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফিরছি। সবারই মনের অবস্থা এমনই খারাপ যে অটো বা ‌রিকশা ধরার কথা ভুলেই গেছি। কেউ কারো সাথে কথা বলছি না। হঠাৎ নিস্তব্ধতা কাটিয়ে ভবতোষবাবু বললেন, “চলুন স্যার পান খাই।” তিনজনেই তিনটে মিষ্টি পান মুখে পুরলাম। ভবতোষ বাবু আরো দুটো সঙ্গে নিলেন। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই পান মুখে মিলিয়ে গেল।
-“কি স্যার কেমন লাগলো?” চোখগুলো গোলগোল করে হাসিমুখে আমাকে প্রশ্ন করলেন ভবতোষবাবু।
-“অদ্ভুত!” উত্তর দিলাম আমি।
-“কি জানেন তো স্যার, এই ধবধবে সাদা পানগুলো আলাদা ভাবে চাষ করা হয়। এর টেস্ট আমাদের দেশি সবুজ পানের চেয়ে থাউজেন্ড টাইমস বেশি।”
-“সেকি! আপনি না বলেছিলেন, আপনি বেনারসের গলি গলি চেনেন!” ব্যাঙ্গের সুরে বলল নীল।
-“আলবাত্! চিনি তো।”
-“আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি বলুন তো?”
গলা খাঁকারি দিয়ে বলল ভবতোষ বাবু, “কেন? দারিবা পান মান্ডি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পানের বাজার।”
কিছুটা দূরেই দেখতে পেলাম একগাদা বড় বড় ঝুড়ির মত টোকরি পড়ে রয়েছে পানের। সব ব্যবসাদাররা পান কিনতে এসেছে। এটা বেনারসের দারিবা রোডের ধারে দারিবা পান মান্ডি।
-“তো জেনে রাখুন ভবতোষবাবু, এখান থেকে ব্যবসায়ীরা পান কেনে। তারপর একটা এয়ারটাইট রুমের মধ্যে ভেজা বস্তায় জড়ানো ঝুড়ির মধ্যে রেখে দশ দিন ধরে উনুন জ্বেলে পানগুলোকে গরম করে। তার ফলে পানের পাতা সাদা হয়। দেশি আর সাঁচি পান বাদে বাকি পানের পাতা অতটাও সবুজ হয়না ঠিকই, তাও এত সাদাও হয় না। এদেরকে সাদা করে গরম করে। এই প্রসেস তবে দেশী আর সাঁচি পানের সঙ্গে করে না। বুঝলেন?”
-“স্যার, আপনি আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিলেন। দাঁড়ান স্যার, এটা লিখে রাখি, নইলে পরে ভুলে যাব।”
এই বলে ভদ্রলোক তার স্লিং ব্যাগ থেকে একটা নীল ডায়েরি বার করে তাতে ঝটপট লিখে নিলেন। ভবতোষবাবুকে ওনার হোটেলে ফিরতে না দিয়ে সঙ্গে করে আমাদের হোটেলে নিয়ে এলাম। নীলের একটু মাথা ধরে ছিল। ও বলল একটু রেস্ট নিয়ে সন্ধ্যে বেলায় বিশ্বনাথ মন্দির যাওয়া যাবে। ভবতোষ বাবু অবশ্য আমার সঙ্গে আমার রুমে গেলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমার সঙ্গে ভদ্রলোকের একটা ভালো বন্ডিং তৈরি হয়ে গেছে। ভদ্রলোকের সাথে রুমে গিয়ে গল্প করতে করতে কখন চোখ লেগে গেছে বুঝতে পারিনি। দুজনেরই ঘুম ভাঙলো নীলের দরজায় টোকা মারার শব্দে।
বাবা বিশ্বনাথকে দর্শন করে বেরিয়ে মন্দিরের গলিতে একটা দোকানে আমরা ঠান্ডাই খাচ্ছি। এখানে বলে রাখি ঠান্ডাই মানে হচ্ছে ভবতোষবাবুর ভাষায় ‘দুধের মধ্যে এলাচ পেস্তা কেশর আর সুগার সিরাপ মেশানো শরবত।’
হঠাৎ ভাস্করবাবু ফোন করে বললেন, “গিরিশ বাবু, একবার আসতে পারবেন?”
-“কেন বলুনতো, আবার কিছু হয়েছে?” আমি বললাম।
-“হ্যাঁ, একটা চিঠি! আবার একটা সাধু এসে একটা চিঠি ছুঁড়ে পালিয়েছে। তাতে যা লেখা আছে আমরা কেউ উদ্ধার করতে পারছি না।”
-“এক্ষুনি আসছি।”
ফোনে যা কথা হ’ল তার নীল ও ভবতোষ বাবুকে বলে ঠান্ডাইয়ের গ্লাসটা তাড়াতাড়ি করে রেখেই আমরা অটো ধরলাম উপাধ্যায় বাড়ির উদ্দেশ্যে।

-“ম্যায় চায় দেনে গায়া থা ত্রিপাঠি জি কো। আচানক সে ও সামনে ওয়ালা খিরকি সে কোই এক কাগাজ ফেক কে মারা।”
-“স্টাডি মে?”
-“হাঁ সাহাব।”
-“ফির?”
-“ফির জব দোনো মিলকে দেখনেকে লিয়ে দৌড়া, তাব পিছে সে দেখা এক সাধু ভাগ রাহা থা।”
-“কয়সা দিকতা থা?” চিরকালীন বাঙালির বলা হিন্দিতে প্রশ্ন করলেন ভবতোষ বাবু।
-“পিছে সে দেখা থা। মুখ নেহি দেখা।”
-“তো কিয়া দিখা?”
-“সাধুবাবাকা চামকিলা ট্রাইসেপ।” পান টাকে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে উত্তর দিলেন শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী।
চিঠিটা ব্লু কালি দিয়ে হাতে লেখা। কিছু কথা ইংলিশে লেখা আর কিছু কোন নকশা দিয়ে লেখা। ইংলিশ লেটার গুলো পরপর পড়লে কোন মানেই দাঁড়াচ্ছে না। চিঠির লেখা গুলো হল এরকম।

-“আমি সত্যিই কি করব চিঠিটা নিয়ে বুঝতে পারছিলাম না গিরিশ বাবু, তাই আপনাদের ডাকলাম।” চিন্তিত হয়ে বললেন ভাস্করবাবু। -“এই চিঠিটা কি কোনো হুমকি চিঠি? কে আমায় হুমকি দিচ্ছে? আর তাতে তার লাভটা কি? যা চুরি করার তা তো সে চুরি করে নিয়েছে!”
-“মনে তো হচ্ছে চোরের কার্যসিদ্ধি হয়নি।” খুব গম্ভীরভাবে বলল নীল।
আমার দেখাদেখি ভবতোষবাবুও চিঠিটার ছবি তুলে নিল মোবাইলে।
ভবতোষ বাবুর প্ল্যান মত আমরা বেনারসের অত্যন্ত পুরনো এবং ফেমাস জয়পুরিয়া গেস্ট হাউসে ডিনার করতে এসেছি। ভদ্রলোকের ইচ্ছা মতো আমরা মাটিতে বসে খাওয়াটাই প্রেফার করলাম।
খেতে খেতে দেখলাম দূরের একটা চেয়ার টেবিলে বসে প্রফেসর মাইতি খাচ্ছেন। সম্ভবত উনার পায়ের সমস্যার জন্যই উনি মাটিতে বসতে পারেন না।
খাওয়া দাওয়ার পর আমরা চারজন বেনারসের অন্ধকার গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছি। ঘড়ির কাটায় রাত সাড়ে নটা। চারিদিকে একটা থমথমে শান্তভাব। তারই মধ্যে এদিক ওদিক থেকে ভেসে আসছে সেতার আর তবলার হালকা শব্দ। অনেকক্ষণ চুপচাপ চলেছি। প্রফেসর মাইতি এতটাই রাশভারী আর গম্ভীর যে আমরা কোন টপিক নিয়ে আলোচনা করব বুঝতে না পেরে চুপচাপই তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছি। নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ভবতোষ বাবুই প্রথম মুখ খুললেন, “কি কোইন্সিডেন্স মশাই, আমি বেনারস এসে জীবনে প্রথমবার একসাথে তিনজন প্রফেসর, তাও আবার বাঙালি প্রফেসরের সাথে উঠাবসা করার সুযোগ পাচ্ছি।”
-“আপনি ভুলে যাচ্ছেন ভবতোষ বাবু, বেনারস হলো বাঙালির সেকেন্ড হোম। আমরা তো টুরিস্ট মোটে। আমাদের ছাড়াও অনেক বাঙালি প্রফেসর এখানে পেয়ে যাবেন।” বলল নীল।
-“এটা আপনার কাছে কোইন্সিডেন্স? আর আমার কাছে কোইন্সিডেন্স কি জানেন!” শেষে ভবতোষ বাবুর এইরকম একটা কথায় যে মুখ খুলবেন প্রফেসর মাইতি, তা বুঝতে পারিনি, “আমার সারা জীবনের কাজ, পিএইচডি, পিডিএফ সব ঐ ভাইরোলজির ওপর। আর এসে উঠলাম তো উঠলাম এত বড় ওয়ার্ল্ড ফেমাস ভাইরোলজিস্টের বাড়িতেই।”

মনের মধ্যে অনেক বছরের একটা না বুঝে পাওয়া প্রশ্ন ছিল। সামনে প্রফেসর মাইতির মত একজন দিগগজ লোক পেয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললাম, “আচ্ছা প্রফেসর মাইতি, এই যে দেশ বিদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাইরাসের হঠাৎ আবির্ভাব হয় কোন না কোন কারনে এবং তাদের প্রতিরোধ করতে অনেক মাস এবং বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ভ্যাকসিন তৈরি হয়, ওই ভ্যাকসিনই কি ভাইরাসকে পুরোপুরি নির্মূল করে দেয়?”
-“এ বুঝতে তো তোমার ভাইরোলজির একটা বেসিক নলেজ থাকা দরকার।” গম্ভীরভাবে বললেন প্রফেসর মাইতি।
নীল এবার চুপ থাকতে না পেরে বলেই বসল, “আপনি বুঝিয়ে বললে কেন বুঝব না আমরা!”
ভদ্রলোকের মুখে দেখলাম একটু হাসি ফুটেছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে শুরু করলেন, “যে কোন প্রাণীর ইমিউন সিস্টেম বিভিন্ন রকম ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিভিন্ন উপায়ে। আর ভাইরাসের কাজ হ’ল সেই প্রাণীর শরীরের হোস্ট সেলে নিজের অনেকগুলো কপি তৈরি করা। এই ভাইরাস কোন প্রাণীর শরীরে যদি মিউটেট করতে শুরু করে তাহলে তা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে যায়। এই ভাইরাস যদি অন্য কোন প্রাণীর হোস্ট সেলে প্রবেশ করতে না পারে তাহলে তার এই মিউটেশন এখানেই থেমে যায়। এদিকে হোস্ট সেল বিভিন্ন রকম অ্যান্টিবডি তৈরি করে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। অ্যান্টিবডি ভাইরাসের আউটার সারফেসের প্রোটিনের সঙ্গে লক্ হয়ে গিয়ে ভাইরাসকে হোস্ট সেলে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।”
-“ভাইরাসের মিউটেশন মানে? একটু বুঝিয়ে বলবেন?” নিজেকে যতটা নমনীয় করে বলা যায় সেভাবে বললাম।
-“ভাইরাস দু রকমের হয় ডিএনএ ভাইরাস এবং আরএনএ ভাইরাস। ডিএনএ ভাইরাসগুলোর রিপ্রোডাকশন এর সময় যদি নতুন ভাইরাসের কপি তৈরি হতে কোন ভুল হয় তখন হোস্টের সেল তা শুধরে দেয়। কিন্তু আরএনএ ভাইরাস এর রিপ্রোডাকশনের সময় কপি তৈরি হতে কোন ভুল হলে হোস্ট সেল কিন্তু সেই ভুল শুধরে দেয় না। এভাবেই তৈরি হয় নতুন প্রকৃতির ভাইরাস। এভাবেই হয় ভাইরাসের মিউটেশন। রিপ্রোডাকশন এর সময় আরএনএ ভাইরাস এর এই ভুলটা খুবই বেশি হয় তাই তাদের মিউটেশন রেটও খুব বেশি।… ধরে নেওয়া যাক কোন ভাইরাস কোন প্রাণীকে অ্যাটাক করল। এবার সেই প্রাণীর হোস্ট সেলে তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। এবার যদি মিউটেশনের ফলে সেই ভাইরাসের আউটার সারফেসের প্রোটিনের পরিবর্তন ঘটে, তবে কিন্তু ওই পুরনো তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি এই নতুন ভাইরাসকে প্রতিহত করতে নাও পারে। এই ধরনের ঘটনাকে বলে অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট। এই কারণেই প্রত্যেকটা নতুন ফ্লু সিজনে, সাইন্টিস্টদের নতুন ভাইরাসের প্রকৃতি প্রেডিকশন করে, এক্সিস্টিং ফ্লু ভ্যাকসিনকে আপডেট করতে হয়। কিন্তু যদি কোন একই ভাইরাসের দুই বা ততোধিক টাইপ নিজেদের মধ্যে জেনেটিক রিকম্বিনেশন করে সম্পূর্ণ অন্য প্রকৃতি সম্পন্ন ঐ ভাইরাসেরই আরেকটি টাইপ তৈরি করে, সেই ঘটনাকে বলে অ্যান্টিজেনিক শিফ্ট। ধর যদি দুটো আলাদা প্রাণীর হোস্ট সেল থেকে একই ভাইরাসের দুটো আলাদা sub-category এসে ওই দুটো প্রাণীর কোনো একটার অথবা তিন নম্বর কোন প্রাণীর শরীরের হোস্ট সেলে জেনেটিক রিকম্বিনেশন করে তাহলে সম্পূর্ণ একটা অন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ভাইরাস তৈরি হতে পারে। আর একেই বলে অ্যান্টিজেনিক শিফ্ট। আর এই অ্যান্টিজেনিক শিফ্ট তৈরি করে নতুন এক ভাইরাসের প্রকোপ এবং তার থেকে বিশ্বজুড়ে নতুন করে একটা মহামারী। আর তখন দরকার পড়ে আবার একটা একেবারে নতুন ভ্যাকসিনের।”
ভবতোষ বাবু সব শুনে বলে উঠলেন, “তাহলে তো স্যার, এই অন্টিজেনিক শিফট ইস মোর ডেঞ্জারেস দ্যান অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট।”
প্রফেসর মাইতি হেসে বললেন, “ডেফিনেটলি।”
হোটেলে ফিরে সারারাত মাথায় চিঠির অক্ষরগুলো ঘুরতে থাকল কিন্তু কোনোভাবেই কোনো কিনারা করে উঠতে পারলাম না।


চলবে …

Author: admin_plipi

25 thoughts on “বেনারসের ঘাট গোয়েন্দাগিরির স্টার্ট [দ্বিতীয় পর্ব ]

  1. ভালো লাগল দাদা।পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম ❤❤।

  2. গোয়েন্দা গল্পে বাঙালিয়ানা বজায় রেখে রহস্যের জাল বোনার দারুন প্রচেষ্টা। অভিনন্দন রইলো 👍

  3. অসাধারণ হয়েছে। বেনারসের কথা মনে পড়ে গেল। তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

  4. মহাদেবেরও খুব মুশকিল, আজকাল subscribe আর like বাড়ানোর বন্দোবস্ত রাখতে হচ্ছে 😛

  5. Very informative. A lot of general information in a detective story. Reminds me of Feluda. All his novels used to have a plenty of other info apart from the main story. Very nice. Story is progressing nicely. I think I am able to decode the letter. But won’t discuss as other readers may be disturbed. Let’s see next. Can’t wait for next part.

  6. Seems the story is written recently. May be mere coincidence. But any way nice plot. Getting shots of very deep curiosity. Next part is when? Very very impressive image. Looks like a book. But didn’t get the train scene.

  7. এখানে দারুন দারুন গোয়েন্দা গল্প। ছবিটা ফাটাফাটি। অনেক এপ্ দেখেছি, বাংলায় এমন ধরনের সাইট এক মাত্র পাণ্ডুলিপি। আমি আপনাদের ফ্যান হয়ে গেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.