বেনারসের ঘাট গোয়েন্দাগিরির স্টার্ট [তৃতীয় এবং শেষ পর্ব ]

বেনারসের ঘাট গোয়েন্দাগিরির স্টার্ট [তৃতীয় এবং শেষ পর্ব ]
লেখা – সন্দীপন গাঙ্গুলী
ডিজিটাল পেইন্টিং – অভিব্রত সরকার

আগে যা ঘটেছে


বেনারসে গিয়ে নীলের সঙ্গে দেখা গিরীশের। প্রয়াত ভাইরোলজিস্ট ডঃ উপাধ্যায়ের অসমাপ্ত লেখা এবং অন্য কাগজ ডিজিটালাইজেশন এর দায়িত্ব নিয়েছেন শম্ভুনাথ। ইউটিউবার ভবতোষের বন্ধুত্ব হয়ে গেল সহজেই। ডঃ উপাধ্যায়ের ঘর থেকে কিছু মূল্যবান কাগজপত্র চুরি, সেই সঙ্গে সাংকেতিক চিঠি। কার কাজ? তারপর…

তৃতীয় দিন

সকালে ঘুম ভাঙল ভবতোষ বাবুর ফোনে। ভদ্রলোক নাকি একটা বহু পুরনো আখাড়ার খোঁজ পেয়েছেন। ন’টার মধ্যে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। তাই তাড়াতাড়ি আসতে বললেন। আর তাই ঠিক হ’ল ব্রেকফাস্ট বাইরে হবে।

এদিকে নীলের আজ পেপার প্রেজেন্টেশন। ওর রুমে গিয়ে দেখি ও স্নান করে রেডি। ও বলল ব্রেকফাস্ট করে নটায় বেরোবে। তাই আমি আমার রুমে এসে কোনরকমে তাড়াতাড়ি করে ব্রাশ করে বেরিয়ে পড়লাম। ভবতোষবাবু ওনার হোটেলেই আমাকে আসতে বলেছিলেন। ওনার হোটেল থেকে আখাড়াটা নাকি ২০০ মিটার দূরে।
-“বুঝলেন স্যার, আখাড়াটা ফোর হান্ড্রেড এন্ড ফিফটি ইয়ার্স ওল্ড। অ্যান্ড এনাদার মোস্ট ইম্পরট্যান্ট অ্যাট্রাকশন হল গিয়ে, আখাড়ার সাথে অ্যাটাচ্ড বাড়িটা কার জানেন স্যার?” অ্যাজ ইউজুয়াল চোখগুলো গোল গোল করে ভ্রুটা কপালে তুলে বললেন ভবতোষবাবু আখাড়ার পথে যেতে যেতে। কাল থেকে শুনে শুনে শেষে বিরক্ত হয়েই বললাম, “আপনি আমায় বারবার স্যার স্যার করে ডাকছেন কেন বলুন তো? আমি তো আপনার থেকে বয়সে ছোট। নাম ধরেই তো ডাকতে পারেন।” এটা শুনে গুরুতর অন্যায় কথা বলে দিয়েছি এরকম ভাব করে দাঁত দিয়ে জিব কেটে ভবতোষ বাবু বললেন, “কি বলছেন স্যার! আমার বাবা বলতেন, শিক্ষকের আবার কি কোন বয়স হয়।” তারপর ন্যাকা সুরে বললেন, “আপনাকে দেখেই কেমন যেন একটা স্যার স্যার বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। আমি ছোটখাটো মানুষ বলে আমাকে এরকম ভাবে বলছেন স্যার!” পরিস্থিতি সামাল দিতে অবশেষে বললাম, “উফ্, আমি কি তাই বললাম নাকি! আপনার যা ইচ্ছে তাই বলেই ডাকবেন কেমন! আচ্ছা এবার বলুন আখড়ার সাথে অ্যাটাচ্ড বাড়িটা কার?” ভদ্রলোক হাত দুখানাকে জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “রামচরিত মানসের স্রষ্টা, গোস্বামী তুলসীদাস।”

আখাড়ায় ঢুকে দেখলাম চারিদিকে কালো কালো ষন্ডামার্কা পালোয়ানরা নানান রকমের কর্তব্য করছে। কেউ মুগুর ভাঁজছে, কেউ কুস্তি লড়ছে, আর কেউ কেউ ডন বৈঠক করছে। ওয়েট লিফ্টিং এর নানান রকমের সরঞ্জাম রাখা আছে একপাশে। সবকটার রং গেরুয়া। ডাম্বেল‌ আর মুগুর বাদে বাকিগুলোর নাম জানি না। একটা লম্বা সরু কাঠের স্টিকের মাথায় গোল ফুটবলের মত লোহার ওয়েট আটকানো একটা ওয়েট লিফ্টিং সরঞ্জাম রাখা রয়েছে। ভবতোষবাবু তার দিকে এগিয়ে গিয়ে কিভাবে তুলতে হয় না জেনেশুনে তুলতে গিয়ে যেভাবে উল্টোদিকে উল্টে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলেন, তা দেখে আমাদের পেছন থেকে একজন খালি গায়ে গেরুয়া ল্যাঙ্গোট পড়া পালোয়ান বলে উঠলেন, “কা হো গুরু! কা হালবা?”
-“হালুয়া?” চোখ কুঁচকে আবার গরুর মত এক পাটি দাঁত বার করে প্রশ্ন করলেন ভবতোষ বাবু। আরে ইনি তো আমাদের শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী। ভদ্রলোককে চশমা ছাড়া একেবারেই চিনতে পারিনি। আজ ভালো করে লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোকের চোখের মণি অনেকটাই ঘোলাটে সবুজ। ভদ্রলোকের কাঁধ চওড়া, হাতও বেশ পেশীবহুল সাধারণ মানুষের চেয়ে। ভদ্রলোক সারা গায়ে, মাথায়, মুখে ধুলো মেখে ডন দিতে দিতে প্রশ্নটা করলেন ভবতোষ বাবুকে।
-“হালুয়া নেহি বাবু, আপকা হাল পুছ রাহে হে শম্ভুজী।” পাশ থেকে ভবতোষ বাবুকে বলল একজন খুদে পালোয়ান।
ভবতোষ বাবু এর উত্তর কি দিল তা একটুও বোধগম্য হলো না, তবে আমি প্রশ্ন করলাম শম্ভুনাথকে, “আপকো কেয়া কুস্তি আতা হে?”
-“নেহি আতা হে। তভিতো শিখনে আয়া হু। কেয়া হে কে, আপ কভি কাহি গেয়ে, অউর কুছ শিখনে কা মওকা মিলে, তাব উসকো জরুর শিখ লেনা চাহিয়ে। হে না?”
-“অফ কোর্স!” হেসে বললাম আমি।
-“তো হো যায়ে ইসি বাতপে দো দো হাত?”
-“মুঝে ইয়ে সব নেহি আতা।”
-“তো কেয়া হুয়া? আতা মুঝে ভি কুচ খাস নেহি। ডারিয়ে মাত, আ যাইয়ে!”
এবার অন্তত না গেলে শম্ভুনাথ আমাকে ভীতু ভাবত। একটু শরীর গরম হবে ভেবেই চলে গেলাম কুস্তি লড়তে আখাড়ার মাঝখানে যেখানে ঝুড়ো মাটি দিয়ে কোর্ট বানানো আছে।
এই খেলায় অপোনেন্টকে মাটিতে ঝোঁকানোর জন্য ঠেলতে হয়। আমার দুই হাত দিয়ে ওর দুই হাত ধরেই বুঝতে পারলাম ওর হাতটা কত শক্তিশালী। এ হাত দশদিনে কুস্তি প্র্যাকটিস করা হাত নয়। আমি অনেক চেষ্টা করলাম ওকে মাটিতে ঝোঁকাতে, কিন্তু ওর পাদুটো মাটিকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যে তা আমার দ্বারা হ’ল না। যেটা হ’ল সেটা আমার ধাতে সইল না। নিজেকে তো ডিফেন্স করলই, উপরন্তু আমাকে পেছন থেকে এসে কোমর জাপটে ধরে দুবার উল্টে দিল মাটিতে। আর তৃতীয় বার যখন আমাকে ডিগবাজি খাইয়ে আমার পা দুটো ওর ওর দুই কাঁধে তুলে, আমার দেহটা শূন্যে ভাসিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলবে এমন সময় ভবতোষ বাবু আমার অভিভাবকের মতো চিৎকার করে বলে উঠলেন, “সার কো নরম-সরম দেখে ইতনা মারনা কেয়া বাহাদুরি হায়। ম্যাচ খত…..ম! ফিনি……শ্!” ওখানে দাঁড়ানো সবকটা পালোয়ান, ভবতোষ বাবুর আর্তনাদ শুনে, আমি একেবারে সিওর, ভয় পেয়ে গেছিল। ভদ্রলোকের জন্য এ যাত্রায় আমার কোমরটা আস্ত রইল। আমাকে খুব ভদ্রভাবে মাটিতে ল্যান্ড করিয়ে কাঁধে “ওয়েল প্লেড” বলে ঠুকে শম্ভুনাথ বাবু জামা কাপড় বদলাতে চলে গেলেন। কলতলায় হাত পা ধুয়ে, জামাপ্যান্ট যথাসম্ভব ঝেড়ে, আমি আর ভবতোষ বাবু তারপর আখাড়ার সাথে লাগানো গোস্বামী তুলসীদাসের বাড়িটি ঘুরে দেখতে গেলাম।
-“আমার ওই ব্যাটাকে ফিল্ডের বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে আছাড় মারতে ইচ্ছা করছিল। একটিবার যদি আছাড় মারতে পারতেন স্যার!” দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বিকৃত করে বললেন ভবতোষ বাবু।
-“আরে ইট ওয়াস এ গেম ভবতোষ বাবু। ছাড়ুন তো সেসব! দেখুন রামচরিত মানস ছাড়াও গোস্বামী তুলসীদাস আর কি উপহার দিয়ে গেছেন আমাদের!”
দেওয়ালে হিন্দী ফলকে সুন্দর করে লেখা আছে গোস্বামী তুলসীদাস রচিত আমাদের সবার অতি পরিচিত ‘হনুমান চালিশা’।
-“রামায়ণের পরে লিখেও রামচরিত মানস এত কেন পপুলার হয়েছিল জানেন তো?” ভবতোষ বাবুকে প্রশ্ন করলাম আমি।
-“কেন বলুন তো?”
-“কারণ রামায়ণ সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়নি ততদিনেও। এমতাবস্থায় তুলসীদাস রামচরিত মানস লিখলেন অবধি ভাষায়, যাতে পংক্তি আছে ১০৯০২টি। বলা হয় রামচরিত মানস কিন্তু রামায়ণের হুবহু কপি নয়। এর মধ্যে এমন অনেক গল্পই আছে যা থেকে তৎকালীন ইন্ডিয়ান কালচারের সামগ্রিক সমৃদ্ধি প্রকাশ পায়। বুঝতেই পারছেন আমাদের ইন্ডিয়ান লিটারেচারে তার ভ্যালু কতটা। আর রামায়ণ কে লিখেছিলেন, সেটাতো জানেন নিশ্চয়ই?”
শেষের কথাটা ভদ্রলোককে একটু রিলাক্সড ফিল করাতে বললাম।
-“সে আবার বলতে! মহর্ষি বাল্মীকি।”
-“আর তার পূর্ব নাম?”
-“রত্নাকর! দস্যু রত্নাকর!” পিছন থেকে বলতে বলতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন শম্ভুনাথ বাবু।
-“অউর আপ কেয়া ইয়ে জানতে হে গিরিশ বাবু, গোস্বামী তুলসিদাস কা উস্ জামানে কা কনটেম্পোরারি রাইটার কন থা?” আমার দিকে তাকিয়ে বলতে বলতে এগিয়ে আসছেন শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী।
-“নেহি, আপ বাতাইয়ে!” বললাম আমি।
-“The Bard of Avon, my dear!”
-“William Shakespeare!” জ্বলজ্বল চোখে হাসিমুখে বললেন ভবতোষ বাবু।
-“ইয়েস, সন্তোষ বাবু!” এই বলে ভবতোষবাবুর পিঠে চাপড় মারতেই মারের ভাইব্রেশন আর নিজের নামের বিকৃত ও ভুল উচ্চারণ শুনে ভদ্রলোক আবার ভ্রু কুঁচকে মুখ বেঁকিয়ে পূর্বরাগে ফিরে গেলেন।
শম্ভুনাথবাবু চলে যাওয়ার পর আমি আর ভবতোষবাবু Hotel Ganges Grand এ ফিরে এলাম। ভবতোষবাবু স্নান করে বেরিয়েছিলেন সকাল সকাল। আর আমার গায়ে এতটাই ধুলোবালি যে, স্নান না করে বেশিক্ষণ থাকতে পারছিলাম না। স্নান করতে ঢুকব এমন মুহূর্তে রুমবয় হাতে একটা চিঠি নিয়ে এসে বলল ম্যানেজার পাঠিয়েছে। সাদা খামটা খুলে চিঠিটা বের করে যা দেখলাম তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। কালকের সেই চিঠিটার মতই একইভাবে লেখা একটা চিঠি। কিছু ইংলিশ লেটার্স, যা পরপরই লিখলে বা উচ্চারণ করলে কোন মানে দাঁড়ায় না। আর কিছু একেবারেই না বোঝার মত নকশা। আর এটাও হাতে লেখা ব্লু কালিতে। চিঠির লেখাগুলো হল এরকম।

ম্যানেজারকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতে উনি বললেন কোন এক সাধু এসে এই চিঠিটা দিয়ে গেছেন যখন আমরা ছিলাম না। আমাকেই শুধু দিয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করতে ম্যানেজার বললেন আরেকটি চিঠি নীলকে দিতে বলেছেন। আমি ম্যানেজারকে বললাম নীলের চিঠিটাও আমার রুমে পৌঁছে দিতে। রুম বয় নীলের চিঠিটাও নিয়ে এল। খাম খুলে দেখলাম একই চিঠি। এবার কি তাহলে আমাদেরকেও হুমকি দিতে শুরু করল? কিন্তু আমরা কারো কি করেছি? নাকি সে আমাদের উপাধ্যায়দের বাড়িতে যাওয়াটা ভালোভাবে নেয় নি? হাজারটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। আমরা তো গোয়েন্দা গল্প পড়ি, আমরা কি আর নিজে ডিটেকটিভ! কি করব একেবারেই মাথা কাজ করছে না।
ভবতোষবাবু মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “স্যার! আমাকেও কি পাঠিয়েছে কোন চিঠি? আমারও খুব ভয় করছে।”
-“আপনি আপনার হোটেলের রিসেপশনে একটা ফোন করে জিজ্ঞাসা করুন না।” আমি ভদ্রলোককে সাজেস্ট করলাম।
হোটেলে ফোন করে রাখার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রলোক বললেন, “নো স্যার, আই এম কমপ্লিটলি আউট অফ কম্পিটিশন।”
ইতিমধ্যে ভবতোষ বাবু মোবাইলে তোলা কালকের চিঠিটার ফটোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করেছেন। মিনিট খানেক দেখার পর চাপা গলায় কেউ শুনে নেবে এরকম ভাব করে বললেন, “ও স্যার! একবার এদিকে এসে দেখে যান।”
ভদ্রলোক ফটোটা ফুল জুম করে আমাকে দেখালেন সাদা A4 পেজ এর চিঠিটাকে ঈষৎ নোংরা করে দিয়েছে ঝুরো মাটির গুঁড়ো গুঁড়ো ছোপ। তারপর ভদ্রলোক চোখগুলো গোলগোল করে আমার জামার দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করলেন। কি আশ্চর্য ব্যাপার! একই রকম মাটির গুঁড়ো এখন আমার গায়েও লেগে আছে। এতো আখাড়ার গুঁড়ো মাটি! কি যে হচ্ছে তা মা গঙ্গাই জানে!

স্নান সেরে আজকের মত হোটেলের ডাইনিংয়েই লাঞ্চ করে নিলাম। নীলের সম্ভবত একটা থেকে প্রেজেন্টেশন ছিল। আমি একেবারেই ভুলে মেরে দিয়েছি। আসলে মনের যা অবস্থা মনে পড়লেও যেতে পারতাম কিনা সন্দেহ আছে। দুটো চিঠি খুলেই মানে উদ্ধার করার চেষ্টা করলাম খেতে খেতে, খাওয়ার পরে রুমে এসে। কিছুতেই কিছু হল না। আমার পাগল পাগল অবস্থা দেখে ভবতোষ বাবু অবশেষে বললেন, “চলুন স্যার! বুদ্ধির গোড়ায় ঘাটের ফুরফুরে হাওয়া দিয়ে আসি।”
ভবতোষ বাবু মুখে একটা পান পুরেছেন আর আমি পুরেছি একটা সিগারেট। দশাশ্বমেধ ঘাটে পৌঁছতেই ভদ্রলোক বললেন, “স্যার, আপনি প্রথমবার কাশী এলেন! আর একবার গঙ্গায় নৌকা রাইড করবেন না! ওসব চিঠি চাপাটিকে গুলি মেরে চলুন নৌকায় চড়া যাক।”
মাঝির সঙ্গে ফিক্স করলেন ভবতোষ বাবু যে, আমাদের লেফ্ট সাইডে মণিকর্ণিকা ঘাট অবধি নিয়ে গিয়ে ফের গঙ্গার মাঝখানে ইউ টার্ন মেরে দশাশ্বমেধ ঘাট ক্রস করে রাইট সাইডে আশ্যি ঘাটে নামিয়ে দেবে। ভবতোষ বাবুর মতে, “একবারই নৌকায় চড়লেন যখন, সব ঘাট ঘুরে নিন স্যার। নো আক্ষেপ অ্যাট অল!” ভদ্রলোক পারেনও বটে।

মণিকর্ণিকা ঘাটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভবতোষ বাবু বলতে শুরু করলেন, “কাশীতে দুটো টুয়েন্টি ফোর সেভেন মড়া পোড়ানোর জন্য ডেডিকেটেড ঘাটের মধ্যে এটি একটি। আরেকটি হল হরিশচন্দ্র ঘাট। জানেন স্যার, এই মড়া পোড়ানোটাকে এখানকার ডোমেরা নট অনলি এ প্রফেশন বাট অলসো এ হোলি ওয়ার্ক মনে করে। এদের কমিউনিটিতে এখনও ডোমরাজা সিলেক্ট করা হয়। ডোম রাজার বাড়িতে রান্নার জ্বালানিতে অবধি ব্যবহার করতে হয় মড়া পোড়ানোর জন্য ঘাটে জমিয়ে রাখা কাঠের একাংশ। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এসব ভাবা যায়!”

আমাদের কথা মতো নৌকা এবার মণিকর্ণিকা ঘাট থেকে ইউ টার্ন নেওয়া শুরু করেছে। গোল করে ঘুরতে গিয়ে নৌকা একেবারে গঙ্গার ওপারে কিনারে চলে গেছে। ভবতোষ বাবু আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “স্যার! দেখুন চোখ মেলে এক বার। কবে কার ইতিহাস বুকে বয়ে নিয়ে চলেছে এই সমস্ত ইমারত! দেখুন স্যার দেখুন!”
গঙ্গার ওপার থেকে এবার বেনারস নগরী আর তার সাথে পাড়ে অবস্থিত বেলেপাথরের তৈরি ঘরবাড়ি, দুর্গ, মন্দির, ঘাট, ফটকগুলোকে একসাথে সারি সারি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হ’ল আমি যেন কতশত বছর পুরনো যুগে ফেরত চলে গেছি।
-“পড়ন্ত সূর্যের আলোয় গঙ্গার জলে কাশী শহরের রিফ্লেকশনটা একবার দেখুন স্যার!”
জলের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। সত্যিই এ এক অপরূপ থমথমে জ্বলন্ত সৌন্দর্য, একটা অদ্ভুত শান্তি। ঘাটের এপারে না এলে আমি বুঝতেই পারতাম না আমি কার মধ্যে রয়েছি। শান্তিতে চোখ দুটো বুজে এলো। চোখ বন্ধ করতেই আশ্চর্যভাবে এমনই সময় বিদ্যুতের বেগে মাথায় কি একটা যেন খেলে গেল! রিফ্লেকশন! হ্যাঁ, রিফ্লেকশনই তো! ভবতোষবাবুকে তাড়াতাড়ি তার স্লিং ব্যাগ থেকে নীল ডায়েরিটা বের করতে বলে আমার মোবাইলে কালকের তোলা চিঠির ছবিটা খুললাম। তারপর মাথায় যা এল, খাতায় লিখে ফেললাম।
ইংলিশ আলফাবেট এর ২৬টা লেটারকে যদি দুটো লাইনে সমান ভাগে ভেঙে উপর নীচ করে লেখা হয়, যেমন A to M এই তেরোটি লেটারকে উপরের লাইনে ও N to Z এই তেরোটি লেটারকে উপরের তেরোটি লেটারের ঠিক তলায় তলায় নিচের লাইনে লেখা হয়; আর দুটো লাইনের মাঝের ডিভাইডারটিকে যদি আয়না হিসেবে কল্পনা করা যায়; তাহলে উপরের লেটারগুলোর রিফ্লেকশন হল গিয়ে নিচের লেটারগুলো; এন্ড নিচের লেটারগুলোর রিফ্লেকশন হল ওপরের লেটারগুলো। যেমন A হয়ে যাবে N, একই ভাবে O হয়ে যাবে B।
এই নিয়ম অনুযায়ী প্রথম চিঠিটা ডায়েরিতে লিখে ফেলে যা বেরোল তা হ’ল।

এবার আমাদের পাওয়া চিঠিটা খুলে লিখলাম, আর তার থেকে মানে দাঁড়ালো,

-“স্যার! প্রথম চিঠি থেকে মানে দাঁড়াল কারো কাছে কিছু একটা আছে যেটা অন্য কেউ জানে। আর সে যদি ওটা না দেয় তাহলে তার মৃত্যু হবে। আর দিলে ১০ কোটি টাকা পাবে।” খাতার উপর ঝুঁকে পড়ে বললেন ভবতোষ বাবু।
-“তার সাথে সেটা কোনো সময় কোনো জায়গার গেটে আনতেও বলেছে। কোন গেট? কোন সময়? আবার আমাদের লেখা চিঠিতে বলছে যে, সে সেটা সেই জায়গায় সেই সময় আনার জন্য রাজি। প্রথম চিঠির উত্তর যদি দ্বিতীয় চিঠিটা হয় তাহলে সেটা আমাদের লেখা কেন? আমরা কি তাকে চিঠি লিখে জিজ্ঞাসা করেছি নাকি!” একশোটা চিন্তা মাথায় ঘুরতে লেগেছে আমার।
-“ব্যাপারটা এবার একটু ডেঞ্জারাস হয়ে যাচ্ছে। চলুন স্যার, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাই কালই।”
নিজে প্রথম এই ফ্যাসাদে পড়েছি। তবুও এর সমাধানের ফিফটি পারসেন্টও করতে পেরেছি দেখে মনে একটা অদ্ভুত বল পেলাম। সঙ্গে চাপা একটা টেনশনও হচ্ছে। সামনে দ্বারভাঙ্গা ঘাটটা দেখে ভবতোষ বাবুকে প্রশ্ন করলাম, “ওই ঘাটে প্রয়াগ থেকে সাঁতরে এসে কে বসেছিল মনে আছে তো?”
ভদ্রলোক গোলগোল চোখে হাসি মুখে বললেন, “মনে থাকবে না আবার! মগনলালের মছলি বাবা!”
মন ছটফট করছিল নীলকে তাড়াতাড়ি করে ব্যাপারটা জানানোর জন্য। এমন সময় নীল নিজে থেকে ফোন করল। ও কনফারেন্স থেকে হোটেল ফিরে এসেছে। আমাদের আর আশ্যি ঘাটে যাওয়া হ’ল না। নৌকা ঘুরিয়ে মাঝিকে ফের দশাশ্বমেধ ঘাটে আমাদের নামিয়ে দিতে বললাম।

হোটেলে ফিরে নীলকে সব কিছু বলতেই ও বলল, “আরে গিরিশ, তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছ!”
-“ক্রেডিটটা সম্পূর্ণ ভবতোষ বাবুর। উনি আজকে গঙ্গার জলে বেনারস শহরের রিফ্লেকশনটার দিকে আমার নজর না কাড়লে, আমি এটা কোনদিনই উদ্ধার করতে পারতাম না।”
এই সুযোগে ভবতোষ বাবু বুকের ছাতিটা একটু ফুলিয়ে, মুখটাকে যতটা পারা যায় সিরিয়াস করে, বললেন, “আর একটা জিনিস পেয়েছি উপাধ্যায় বাড়ির চিঠিটা থেকে স্যার।”
-“কি শুনি?” বলল নীল।
নিজের মোবাইল থেকে কালকের চিঠির ছবিটা খুলে জুম করে নীলকে দেখিয়ে সেই সকালের মত চাপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, “চিঠির মধ্যে লেগে থাকা গুঁড়ো গুঁড়ো আখাড়ার মাটি।”
চিঠির দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর ভবতোষবাবুর দিকে তাকিয়ে চশমাটা নাকের কাছে নামিয়ে নীল বলল, “আজ্ঞে না মশাই! এ মাটি গঙ্গার শুকনো মাটি! বেনারসের আকাশে বাতাসে এ মাটির গুঁড়ো ছড়িয়ে আছে। আর তার ওপর এই চিঠি দিয়েছে একজন সাধুবাবা। তাহলে এই চিঠিতে মাটি লাগা কি স্বাভাবিক নয় ভবতোষ বাবু?”
ভদ্রলোকের বুক আবার চুপসে গেল; কিন্তু আমি এবার নীলকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কি সত্যিই মনে করো এই কোডেড চিঠি লেখা কোন পাতি সাধুবাবার কর্ম?”
হঠাৎ এমন সময় ভাস্কর বাবু ফোন করে বললেন, “গিরিশ বাবু, আজ আবার একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে!”
-“কি ব্যাপার বলুন তো!”
-“আজ একটু কেনাকাটা করতে বাইরে গেছিলাম। দুপুরবেলা ফিরে এসে ভজনলালের মুখে শুনলাম ও একটা সাদা খামে মোড়া চিঠি বসার ঘরের দরজার সামনে পেয়েছে। ও বলছে কেউ মনে হয় দরজার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে।”
-“কি লেখা আছে তাতে?”
-“লেখা যা আছে তা তো আগের দিনের মতোই অবোধ্য। ভাববার বিষয় এই যে একই রকম কথা লেখা চিঠি প্রফেসর মাইতি আর মিস্টার কুলকার্নিও পেয়েছেন!”
-“ওদেরও কি দরজার নিচ দিয়ে ঢোকানো?”
-“তাইতো বলছেন। ওনারাও কেউ সকাল থেকে বাড়িতে ছিলেন না। দুপুরে ফিরে এসে চিঠিগুলো পেয়ে আমায় দেখালেন দুজন মিলে এসে। ওনারা তো রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছেন। বলছেন আজ‌ই হোটেল ছেড়ে চলে যাবেন।”
আমি আর আমাদের চিঠির প্রসঙ্গটা না তুলে ভাস্কর বাবুকে বললাম, “আপনি আমাকে ওই তিনটে চিঠির ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপ করুন! আর আপাতত ইন্সপেক্টর যোশীকে কিছু বলার দরকার নেই।”
ফোনটা রেখে নীল আর ভবতোষ বাবুকে ফোনে যা কথা হ’ল সব গুছিয়ে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে ভাস্কর বাবুর মেসেজটা ঢুকল। আমাদের মতই একই রকম লেখা চিঠি।
-“কি ব্যাপার স্যার! একই রকম পাঁচটা চিঠি পাঁচজনকে দেওয়ার মানেটা কি?” বললেন ভবতোষ বাবু।
-“এমনটা তখনই হয় যখন প্রথম চিঠির উত্তরে দ্বিতীয় চিঠিটা মানুষ কাকে দেবে বুঝতে পারে না।” বললাম আমি।
-“তুমি কি বলতে চাইছ, তাহলে কালকের চিঠিটা আজকের চিঠিগুলো একই লোকের লেখা নয়?” প্রশ্ন করল নীল।
-“তাইতো দেখতে পাচ্ছি। নকশাগুলো বাদ দিয়ে ইংলিশ লেটার গুলো শুধু দেখো, তুমিও বুঝতে পারবে।” বললাম আমি।
মোবাইলে কালকের চিঠিটা আর বিছানায় রাখা আজকের চিঠিগুলো দেখে ভবতোষ বাবু বললেন, “আরিব্বাস, কি চোখ আপনার স্যার!”
-“এখন কথা হ’ল, প্রথম চিঠিটা যে লিখেছে সে জানে কাকে লিখতে হ’ত। কিন্তু দ্বিতীয় চিঠিটা যে লিখেছে সে জানেনা উত্তরটা দিতে হবে কাকে?”
-“তাহলে প্রথম চিঠিটা কে লিখেছে? কি জন্যই বা লিখেছে?” বলল নীল।
-“কে লিখেছে তা তো অগুনতি সেট। তবে কিজন্য লিখেছে তার একটু আঁচ পাচ্ছি। আর লিখেছে ওই দুজনেরই একজনকে।” বললাম আমি।
-“কোন দুজন?” প্রশ্ন করল নীল।
-“তুমি ভুলে যাচ্ছ নীল! ও বাড়িতে এখন ভাস্কর বাবুর সাথে শম্ভুনাথ বাবুও থাকেন। আর চিঠিটা এসেছে ওনার আসার পরেই। চিঠিটা ছোঁড়াও হয়েছে ওনার ঘরেতেই।” বললাম আমি।
-“এটাও তো হতে পারে চিঠিটা আর্বিট্রারিলি ছোঁড়া হয়েছিল। সেম টাইমে সেম প্লেসে শম্ভুনাথ বাবু বসে ছিলেন তাই ওনার গায়ে লেগে গেছে!” বলল নীল।
-“সেটা ভাবতে পারতাম! কিন্তু এই চিঠির মানে উদ্ধার করার ক্ষমতা ভাস্কর বাবুর আছে কিনা, প্রথম চিঠির লেখক লেখার আগে নিশ্চয়ই একবার ভাববে!”
-“ভাস্কর বাবুর ক্ষমতা নেই তাহলে কি ওই শম্ভুনাথের ক্ষমতা আছে ওই চিঠির লেখা উদ্ধার করার?”
-“তা বলতে পারব না! তবে দীর্ঘদিন ধরে রিসার্চ ল্যাবে এতগুলো সাইন্টিস্টের সাথে ওঠাবসা করে কিছু তো একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে ওনার!”
-“এমনও তো হতে পারে উনি নিজেই চিঠিটা দিতে চেয়েছিলেন ভাস্কর বাবুকে। তাই একটা নাটক করে বাইরে থেকে সাধুবাবা ভাড়া করে এনে চিঠিটা নিজের গায়েই ছুঁড়ে মারালেন!”
-“হতেই পারে!” বলে উঠলেন ভবতোষ বাবু, “ব্যাটাকে আমার মোটেই সুবিধার লাগে না!”
-“আর প্রথম চিঠিটার উত্তরে দ্বিতীয় চিঠিটা শম্ভুনাথ অথবা ভাস্কর বাবু সবাইকেই বা দিতে যাবেন কেন?” বলল নীল।
-“আরে সেটাই তো বলছি, দ্বিতীয় চিঠিটা আসলে কাকে দিতে হবে সেটা দ্বিতীয় চিঠির লেখক এখনো জানে না।”
-“ওই দুজনের একজন তাহলে নিজেদের বাড়িতেই বা দ্বিতীয় চিঠিটা ফেলতে যাবেন কেন?”
-“সেই তো! নীলাদ্রি স্যার একদম ঠিক বলেছেন।” বললেন ভবতোষ বাবু।
-“আর কিজন্য এই চুরি সেটা তুমি আঁচ করতে পেরেছ বলছিলে?”
-“নট সিওর। তবে ডক্টর উপাধ্যায়ের রিসার্চের কাগজ পত্রের মধ্যে সিওর এমন কিছু আছে যা এখনো অত্যন্ত মূল্যবান।” বললাম আমি।
-“কিন্তু তার কাজের ভ্যালু বোঝার লোক কোথায় এখানে?” প্রশ্ন করল নীল।
-“কেন শম্ভুনাথ?” বললাম আমি।
-“আরে, রিসার্চ ল্যাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়া আর সাইন্টিস্ট হওয়া কি এক জিনিস ভাই? ও হাজার বইপত্র পড়লেও এ নিয়ে কিছু করতে পারবে না!” বলল নীল।
-“কিন্তু বেচতে তো পারবে!” , বললাম আমি।
-“তাহলে মিস্টার কুলকার্নিকেই বা বাদ দিচ্ছ কেন? ও লিখতে পারে না এমন চিঠি পেশায় ব্যবসাদার বলে?” এই বলে পুরো ঘাঁটিয়ে দিল নীল।
-“আর একজনকে বাদ দিচ্ছেন স্যার!” বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন ভবতোষবাবু, “প্রফেসর শশাঙ্ক মাইতি!”
-“হ্যাঁ, তা হতে পারে! ডক্টর উপাধ্যায়ের কাজের ভ্যালু উনি ছাড়া আর কেউ এখানে বোঝার লোক নেই!” বলল নীল।
-“আর ভদ্রলোকের পায়ে সমস্যা বলেই বাইরে থেকে কাউকে হায়ার করে সাধুবাবা সাজিয়ে এসব করাচ্ছে। ভেরি ডেঞ্জারাস ম্যান! নইলে কি কেউ পায়ের এত সমস্যা নিয়েও কলকাতা থেকে একা একা এখানে ঘুরতে আসে!”
-“আর যদি এসব কিছু না হয়, আমি বলছি শোনো, ভাস্কর বাবু আমাদের কাছে কিছু চেপে যাচ্ছেন। ওনার নিশ্চয়ই বাইরে কারো সাথে কোন লাফড়া আছে। উই শুড নট গেট ইনটু দিস। আমাদের বেনারসে আজ শেষ দিন। চলো গিরিশ, সারনাথটা এখনো আমাদের ঘোরা বাকি। এখান থেকে আধঘন্টা দূরে, একটু ঘুরে আসি।”
-“সেই ভালো স্যার, চলুন। ও যা করার পুলিশ করবে!” আমার হাত ধরে বললেন ভবতোষ বাবু।
গোয়েন্দা কাহিনী পড়ে পড়ে নিজেকে গোয়েন্দা ভাবাটা একেবারেই অনর্থক। অগত্যা বেরোলাম সারনাথ ঘুরতে।
অটো করে সারনাথ পৌঁছতে লাগলো ৪০ মিনিট। নীলের একটা ফোন এসেছে। এই বৌদ্ধ মন্দির চত্বরে কমপ্লিটলি পিন ড্রপ সাইলেন্স দেখে নীল ফোনটা ধরতে একটু বাইরে গেল। Wat Thai সারনাথ টেম্পেলের ৮০ ফুট লম্বা জায়েন্ট বুদ্ধা স্ট্যাচুটা দেখে ভবতোষ বাবু হাতটা মাথায় তুলে বলতে শুরু করলেন, “এনলাইটেন মি এবাউট মাই কজ অফ লিভিং, ও লর্ড বুদ্ধা! জানেন স্যার এনলাইটেনমেন্ট এর পর প্রথম ধর্মজ্ঞান লর্ড বুদ্ধা এই সারনাথে দিয়েছিলেন।”
-“আপনি আবার কেন এনলাইটেনড হতে চান! ২৯ টা ভিডিও আর ৭৫০০০ খানা সাবস্ক্রাইবার তো অলরেডি ঝুলিতে আছেই!” হাসতে হাসতে বললাম আমি।
-“আরে স্যার, ওগুলো তো এক নম্বর হ’ল গিয়ে শখে; আর দু’নম্বর পেট চালানোর জন্য! কিন্তু আমার রিয়েল প্যাশন কি জানেন স্যার! পুরো পৃথিবীটা ঘুরে বেড়ানোর!”
-“সে তো আপনি এখনই পারেন। আপনার ইউটিউবের যা আর্নিং!”
-“না স্যার! ওই ভিডিও বেচে আমার লন্ডনের স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, আমেরিকার টাওয়ার ক্লক বিগবেন, ওসব আর দেখা হ’ল না এ জন্মে! বড়জোর নেপাল, ভুটান বাংলাদেশ!” আফসোসের সুরে বললেন ভবতোষ বাবু।
আমি ওনাকে শুধরে দিয়ে বললাম, “প্যাশন তো বুঝলাম! কিন্তু একটু জিওগ্রাফিক নলেজটাও তো দরকার!”
-“আবার আপনি আমাকে এরকমভাবে বললেন স্যার!” মুখ ফুলিয়ে অভিমানের সাথে বললেন ভবতোষ বাবু।
-“আরে না না মশাই, ওসব কিছু না। বিগবেন হ’ল গিয়ে লন্ডনে। আর স্ট্যাচু অফ লিবার্টি আমেরিকার নিউইয়র্কে। আপনি উল্টো বললেন কিনা!”
ভদ্রলোক আবার চোখ দুটো বড় করে মুখটা হাঁ এক পাটি দাঁত বের করে বললেন, “এইজন্যই বলেছিলাম আই নিড টু বি এনলাইটেনড স্যার! দাঁড়ান আমি এক্ষুনি এনলাইটেনড হয়ে নি!”
এই বলে ভদ্রলোক দুম করে গুগ‌্ল ভয়েস সার্চে গিয়ে এই অতিরিক্ত চুপচাপ বৌদ্ধ মন্দিরের চত্বরে চাপা গলায় মোবাইলটা মুখের কাছে নিয়ে এসে বললেন “বিগ বেন!”
সার্চ করার পর জোরে হাসতে যাবেন, তখনই আমার দিকে চোখ পড়ে যাওয়াতে, আমি ওনাকে পরিস্থিতির নিরবতার কথা মনে করিয়ে চুপ করালাম। ভদ্রলোক নিজের হাসি কোনরকমে কন্ট্রোল করে আমার কাছে মোবাইলটা এনে ফিসফিস করে বললেন, “গুগ‌্ল ব্যাটার অবস্থাটা দেখুন স্যার! বললাম বিগবেন, আর এ নিল পিগ পেন। দেখুন দেখুন!”
লর্ড বুদ্ধা ভবতোষ বাবুকে কতটা এনলাইটেনড করলেন জানিনা; তবে আমার ওপর যে তাঁর কৃপা দৃষ্টি পড়েছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। পিগ পেন এর ডিটেলস পড়ে যা বুঝলাম তা হলো গিয়ে এটা এক ধরনের কোডেড চিঠি লেখার রুল।

ইংলিশ অ্যালফাবেটের ২৬টি লেটারকে এরকমভাবে গ্রিডের মধ্যে লিখে, প্রত্যেকটি লেটারকে তার চারিদিকে ঘিরে থাকা গ্রিডের ইউনিক ফ্রাগমেন্টস দিয়ে এক্সপ্রেস করা হয়। তারমানে ২৬ রকম ইউনিক ফ্রাগমেন্টস দিয়ে ২৬টি লেটারকে প্রকাশ করা যায়।
দুটো চিঠির নকশাগুলো হল গিয়ে পিগ পেন কোডে লেখা একেকটা ইংলিশ লেটার। ভবতোষ বাবুর ব্যাগ থেকে নীল ডায়েরিটা বের করে দুপুরে লেখা ইনকমপ্লিট sentence টাকে কমপ্লিট করলাম। তারফলে দুটো চিঠির মানে দাঁড়ালো এই রকম:

First letter:

I KNOW U HAVE THE NOTES.
LEAVE IT AT THE GATE OF BABAS TEMPLE AT VI XXX PM TOMORROW.
WILL GIVE U TEN CR IF IT IS GENUINE. ELSE U DIE.
BABA DECIDES WHO WILL STAY IN KASHI.

Second letter:

I ACCEPT UR DEAL. WILL BRING THE NOTES SAME TIME SAME PLACE.

-“Tomorrow! মানে আজকে। সাড়ে ছ’টার সময়! বাবার মন্দিরের গেটে! কোন নোটসের কথা বলেছে? আর তাতে রাজিই বা হয়েছে কে সেটা দিতে আসতে? কার কাছে কোন নোটস আছে?” ভদ্রলোক খাতার তার ওপর ঝুঁকে পড়ে একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করে ফেললেন।
-“কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা ভবতোষ বাবু! তবে চিঠির মানে যখন উদ্ধার হয়েছে, আর স্থান কালও যখন ধরা পড়েছে, তখন পাত্রটিকেও স্বচক্ষে না দেখলেই নয়! কিন্তু সমস্যাটা হ’ল এই লাইনটা নিয়ে। BABA DECIDES WHO WILL STAY IN KASHI. কে সেই বাবা, যে কাশীতে কে থাকবে, তা ডিসাইড করেন?”
-“স্যার এত কিছু বুঝতে পারলেন এটা বুঝতে পারছেন না! অনলি ওয়ান বাবা ইজ দেয়ার স্যার! আমাদের সকলের বাবা! ভোলেবাবা! বাবা বিশ্বনাথ!”
-“চলুন আর দেরি নয়! এখন বাজে ৫:১৫! আমাদের সাড়ে ছটার আগে ওখানে পৌঁছাতেই হবে, বাই হুক অর ক্রুক!”
দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম নীল বাইরে সিগারেট টানছে। ওকে রাস্তা থেকে তাড়াতাড়ি করে অটোতে তুলে অটোওয়ালাকে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য বুক করলাম। রাস্তায় যেতে যেতে সব শুনে নীল বলল, “তুমি এত দূর অবধি যখন এগিয়ে দিয়েছ, এবার দেখো ব্যাটাকে আমি কিভাবে ধরি! আজ এসপার নয়তো ওসপার করেই ছাড়ব!”
-“মে ভি হু স্যার ফর এসপার অর ওসপার!” আঙ্গুল তুলে চোখ পাকিয়ে বললেন ভবতোষ বাবু।
৪০ মিনিট পর অটো থেকে নেমে, বিশ্বনাথ মন্দিরের গেটকে দূর থেকে দেখে আমি বললাম, “এখানে তো পুলিশ আর সিকিউরিটিতে ছড়াছড়ি! এর গেটে চিঠিওয়ালা আসবে কি করে!”
-“তাহলে স্যার?” বললেন ভবতোষ বাবু।
-“আচ্ছা ওয়েট করে দেখি না কি হয়!” ভরসা দিল নীল।
১৫ মিনিট হয়ে গেছে। ঘড়িতে ছ’টা কুড়ি। আমরা দূরে একটা লাইটপোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে আছি মন্দিরের গেটের দিকে চোখ রেখে। একটা বছর কুড়ি বয়সের ছেলে অনেকক্ষণ ধরে তার ইউটিউবের ভ্লগ বানানোর জন্য একটা ট্রাইপড স্ট্যান্ডে ক্যামেরা লাগিয়ে একজন সাধুবাবাকে কোথা থেকে পাকড়াও করে বকে যাচ্ছে ক্যামেরার সামনে। তার কথাগুলো এই মুহূর্তে আমি শুনতে চাইছি না! কিন্তু তাও যেন কথাগুলো এড়াতে পারছিনা! তার যে দু’চারটে কথা আমার কানে এল, তা থেকে বুঝতে পারলাম লর্ড বুদ্ধর পরে এবার বাবা বিশ্বনাথের পালা ছিল আমাকে এনলাইটেনড করার।
তার সেই দু’চারটে কথা ছিল এইরকম, “বলা হয় বাবা বিশ্বনাথ যদি হয় কাশীর রাজা, তাহলে তার কোতোয়াল হলেন বাবা কালভৈরব। কালভৈরব হলেন বাবা ভোলেনাথের রুদ্ররূপ। এখানকার লোকেরা মনে করে, বাবা কালভৈরবের অনুমতি ছাড়া কেউ কাশীতে থাকতে পারে না। এখানে এসে প্রথমেই এবং এখান থেকে যাওয়ার আগে অবশ্যই বাবা কালভৈরবের মন্দির দর্শন করে তার অনুমতি চাওয়া অতি আবশ্যক।”
এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে গুগ‌্ল ম্যাপ খুলে সার্চ করে দেখতে পেলাম আমাদের কারেন্ট লোকেশন থেকে বাবা কালভৈরবের মন্দির এক কিলোমিটার দূরে। হাতে সময় খুব অল্প আছে ভেবে দৌড়াতে শুরু করেছি তিনজনে। দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তায় একটা ফাঁকা অটো পেয়ে তাতে উঠে পড়লাম। ৬:৩০ বাজতে আর দু’মিনিট বাকি। বাবা কালভৈরবের মন্দিরের তেমাথা মোড়ের চারটে দোকান আগে একটা রিকশার পেছনে লুকিয়ে অপেক্ষা করছি। মন্দিরের সামনে দর্শনার্থীদের অজস্র ভিড়। মন্দিরের ভেতরে সন্ধ্যারতি চলছে।
হঠাৎ করে দেখলাম একটা বড় বাজারের ব্যাগ হাতে শম্ভুনাথ বাবু মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের দিকে পিছন করে। মন্দিরের সামনে পৌঁছে চারপাশটা ভালো করে দেখে সেই ব্যাগ থেকে একটা দড়ি বাঁধা হলুদ কাগজের ফাইল মন্দিরের গেটের একটু পাশে ফেলে দিয়ে সোজা অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন তিনি। ঘড়ির কাঁটায় দেখলাম সাড়ে ছ’টা। পলকের মধ্যেই দেখলাম গেরুয়া বসনে জটাধারী একজন সাধুবাবা আরেকজন একই রকম সাধুবাবার বাইকের পেছনে বসে, ফাইলটা মাটি থেকে ঝুঁকে তুলে সোজা ঐ একই পথে মিলিয়ে গেলেন। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগেই নীল দৌড় দিয়েছে বাইকের পেছনে। ওকে ফলো করে আমি আর ভবতোষ বাবু একই দিকে ছুটতে লাগলাম। হঠাৎ করে একটা বাইক আর একটা রিক্সায় বাধা পেয়ে আমাকে থামতে হ’ল। তারপর আবার দৌড়ে একটা অন্ধকার চৌমাথা মোড়ে এসে পড়লাম। আমার পিছন পিছন দৌড়ে এসে থামতে আমি ভবতোষ বাবুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, “কোন রাস্তা দিয়ে কোথায় যায় জানেন?”
বেচারা হাঁপাতে হাঁপাতে কোনরকমে যা বললেন তার টুকরো টুকরো অংশগুলো থেকে গোটা বাক্যটা আন্দাজ করলে দাঁড়ায় এরকম যে, ফেমাস কোন জিনিস ছাড়া কাশীর নর্মাল কোনো গলি উনি চেনেন না। সমাধানের এত কাছে এসে এভাবে যে হার মানতে হবে তা ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। নীলকে ফোন করলাম, ও ফোন ধরছে না। হয়তো এখনো দৌড়চ্ছে। অগত্যা নিরুপায় হয়ে আমি আর ভবতোষ বাবু হোটেল গ্যাঞ্জেস গ্ৰ্যান্ড এ ফিরলাম। ভবতোষ বাবু হাজার হাজার প্রশ্ন করছেন কিন্তু আমার কানে কিছু ঢুকছে না। বাথরুমে গিয়ে স্নান করে ১৫ মিনিট পর যখন বাইরে এলাম, তখন নীল ফোন করে বলল, “ফিরেছ?”
-“হ্যাঁ, তুমি কোথায়? ধরতে পারলে কে ছিল?”
-“নাহ, অনেক চেষ্টা করলাম! কিন্তু ওর বাইকের সাথে কি আর দৌড়ানো যায়!”
-“তাহলে এখন উপায়?”
-“আর ভেবে লাভ নেই। যা হবার হয়ে গেছে। ৫ মিনিট পর ডাইনিং রুমে মিট কর। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। খুব খিদে পেয়েছে।”

৫ মিনিট পর ডাইনিং রুমের টেবিলে এসে বসেছি। নীলের মুখ রেগে লাল হয়ে আছে। এতক্ষণে আমি প্রথম মুখ খুললাম, “কি হল তুমি দৌড়ানোর পর..?”
আমার কথা কমপ্লিট করার আগেই “মে বাতাতা হু” বলে সদলবলে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করলেন ইন্সপেক্টর যোশি। তার রিভলভারটা বের করে নীলের মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, “আপকা হাত দিখাইয়ে।”
নীল কিছু বোঝার আগেই ইন্সপেক্টর যোশি নিজেই ওর দুটো হাতের চেটো চেক করে, পেছনদিকে ফিরে কাউকে ছোট্ট করে ঘাড় নেড়ে বললেন, “ইয়েস!”
একি এ তো আমাদের শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী!
-“কি ব্যাপার! আপনারা এ কি করছেন!” এই বলে আমি আরো কিছু বলতে যাব তার আগেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী বললেন, “লেট হিম ডু হিজ ডিউটি প্রফেসর গাঙ্গুলী। আমি জানি আপনাদের মনে অনেক প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে। আপনাদের অন্ধকার কিছুটা কাটা দরকার। চলুন কোন ফাঁকা জায়গায় যাওয়া যাক।”
নীল লজ্জিতভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পুরো আকাশ থেকে পড়লাম! শম্ভুনাথ ত্রিপাঠী ঝরঝরে বাংলা বলছে! এসব হচ্ছে টা কি!
শম্ভুনাথ বাবু আমার সাথে হ্যান্ডশেক করতে গিয়েও পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “ওহ্ সরি! আমার হাতে এখনো অভ্র লেগে আছে, যেমনটা লেগে আছে ওই নীলাদ্রি বাবুর হাতে। ফাইলটার কভারের দড়িতে অভ্র লাগিয়ে দিয়েছিলাম যে! বাই দ্যা ওয়ে আমি রত্নাকর, ডিটেকটিভ রত্নাকর সিকদার। কি গিরিশ! কাল জলপাইগুড়ি ফেরার ট্রেনটা ক্যানসেল কর নি তো?”
গুড হেভেন! চুলে সাদা রং, চোখে চশমা, ঘোলাটে সবুজ চোখের মনি, এক সপ্তাহ ধরে শেভ না করা দাড়ি, মুখে ২৪ঘন্টা ধরে চেবানো পান, আর ফ্লুয়েন্টলি বলা ইউপির টানওয়ালা হিন্দির সংমিশ্রণে আমি চিনতেই পারিনি যে, এ তো আমাদের জলপাইগুড়ি শহরের বিখ্যাত গোয়েন্দা রত্নাকর সিকদার! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে অবাক মুখে বললাম, “না করি নি!”
-“ব্যাস ব্যাস! তাহলে একসাথেই ফেরা যাবে। ইন্সপেক্টর যোশি, আপনি ওনাকে নিয়ে যান।” বললেন রত্নাকর সিকদার। সঙ্গে সঙ্গে ইন্সপেক্টর যোশি এবং তার একজন কনস্টেবল নীলকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে চলে গেল। আমি কোন অংকই মেলাতে পারছি না! নীল তো ২৪টা ঘন্টা আমার সঙ্গেই ছিল।

একটা অন্ধকার ফাঁকা ফাঁকা ঘাটের সিঁড়িতে বসে আমার আর ভবতোষ বাবুর দিকে তাকিয়ে রত্নাকর শুরু করল, “ডক্টর প্রভাকর উপাধ্যায় যখন ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করেন তখন তার টিমের কেউ এই ভাইরাসের কোনো রকমের অ্যান্টিজেনিক শিফ্ট অবজার্ভ করেননি। ও আপনাদের বলে রাখি অ্যান্টিজেনিক শিফ্ট হল গিয়ে….”
রত্নাকর বাবুকে হাত তুলে চোখ বন্ধ করে থামিয়ে ভবতোষ বাবু বিজ্ঞের মত বললেন, “কোন একই ভাইরাসের দুই বা ততোধিক টাইপ নিজেদের মধ্যে জেনেটিক রিকম্বিনেশন করে যদি সম্পূর্ণ অন্য প্রকৃতি সম্পন্ন ঐ ভাইরাসেরই আরেকটি টাইপ তৈরি করে, সেই ঘটনাকে বলে অ্যান্টিজেনিক শিফ্ট। নিন এবার বলুন!”
-“বাহ্ ভবতোষ বাবু! এক্সিলেন্ট! তো যা বলছিলাম, তারপরেই এই পালমো ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি হয় এবং তা মানুষকে সুস্থও করে তোলে। আজকের দিন অবধি এই ভাইরাসের অন্টিজেনিক শিফ্ট হওয়ার কোন টেন্ডেন্সি দেখা যায়নি। এই ভাইরাসের হিউম্যান ভ্যাকসিন তৈরির সময় ডক্টর উপাধ্যায় সিভেট নামে এক ধরনের বিড়াল প্রজাতির প্রাণী এবং বাদুড়ের শরীরে এই ভাইরাসের অ্যান্টিজেনিক শিফ্টের সম্ভাবনা খুঁজে পান। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে ডক্টর উপাধ্যায় কৃত্রিম উপায়ে এই ভাইরাসের জেনেটিক রিকম্বিনেশন করে যত বিভিন্ন প্রকার more deadly and more rapidly spreading ভাইরাস তৈরী হতে পারে, তাদের জন্য ভ্যাকসিন তৈরি করার কাজ শুরু করেন। কিন্তু ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মহামারী থেমে গেছিল বলে ইউরোপিয়ান হেলথ ইন্সটিটিউট ভ্যাকসিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফান্ডিং বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ততদিনে ডক্টর উপাধ্যায় নিজের কাজের ৯৫ পার্সেন্ট কমপ্লিট করে ফেলেছিলেন। ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনি এই নতুন অন্টিজেনিক শিফট সম্পন্ন ভাইরাসের ভ্যাকসিনের কথা প্রকাশ্যে আনেন নি। কারণ সেটা ন্যাচারালি তখনও বিশ্বের কোথাও প্রকাশ পায়নি। কিন্তু তারই টিমের একজন সাইন্টিস্ট ডক্টর মিচেল উইলসন পুরোটাই জানতে পেরে গেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ডক্টর উপাধ্যায়ের এই অসম্পূর্ণ রিসার্চটা উনি নিজে কমপ্লিট করে সেই ভাইরাসটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়াতে এবং তারপরে মার্কেটে এর প্রতিরোধক ভ্যাক্সিন নিয়ে এসে অনেক নাম যশ কামাতে। আমার অনুমান, হঠাৎ করে ডঃ উপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবরটা পেয়ে তার সেই গোপন ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দেয়। তখন তিনি তার পুরনো ইন্ডিয়ান post-doc স্টুডেন্টকে এই বলে লোভ দেখান যে, সে যদি কোন ভাবে ডক্টর উপাধ্যায়ের এই সিক্রেট নোটগুলো তাকে এনে দিতে পারে, তাহলে তাকে আমেরিকায় তার নিজের ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর হওয়ার সুযোগ করে দেবেন। নীলাদ্রি বাবুর অনুপস্থিতে ইন্সপেক্টর যোশিকে দিয়ে ওনার হোটেল রুম সার্চ করে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পোস্টে নীলাদ্রি বাবুর অ্যাপ্লিকেশনের প্রিন্ট আউটও পাওয়া গেছে। কারণ নীলাদ্রিবাবুর মত এত ambitious লোক কানপুরের সামান্য স্টেট গভর্মেন্টের চাকরিতে খুব একটা খুশি ছিলেন না। আমার অনুমান, উনি কিন্তু নিজেও জানতেন না যে, যে নোটস‌্টা উনি চুরি করতে এসেছেন, তাতে কি আছে! মানবজাতির এত বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে জানলে হয়তো উনি কোনদিনই এটা করতে রাজি হতেন না! নিজের দ্বারা এসব হবে না জেনে বেনারসের সবচেয়ে পুরনো আখাড়া থেকে একজন পালোয়ানকে হায়ার করলেন মোটা অংকের টাকা দিয়ে। আমাদের আখাড়ার চুনিলাল আপাতত পুলিশের হেফাজতে। তাকে সাধু বানিয়ে প্রথমবার চুরি করাতে পাঠালেন। চোর জানত না কোন ঘরে নোটসগুলো আছে। ভজনলাল এসে যাওয়ায় তা সে যাত্রায় ব্যর্থ হয়। এমতাবস্থায় আমাকে এই কেসের তদন্ত করার জন্য নিযুক্ত করেন কলকাতা নিবাসী ডক্টর শ্রীধর বোস। ডঃ উপাধ্যায়ের সঙ্গে ইন্ডিয়া থেকে তিনিও ছিলেন Pulvus T1এর টিমে। ডক্টর বোসের কথা মত আমি এসেই প্রথমে ডক্টর উপাধ্যায়ের সেই অসম্পূর্ণ প্রজেক্টের নোটস সেগ্রিগেট করতে শুরু করি। ওনার অলরেডি অনলাইনে পাবলিশ‌্ড্ আর্টিকেলগুলোর পার্সোনাল কোনো নোটস্ই এ বাড়িতে ছিলনা, শুধু ইনকমপ্লিট নোটস‌্গুলোই ছিল। তাই আমার কাজটা খুব একটা কঠিন হয়নি। ভাইরোলজির আমিই বা কতদূর বুঝি বল ভায়া!”
-“তাহলে ওই দেওয়াল আলমারির আটটা খোপে কি ছিল?” প্রশ্ন করলাম আমি।
-“ফাইলে বাঁধা খবরের কাগজ শুধু। আর প্রত্যেকটা খোপের বাইরে সালগুলো লাগিয়েছিলাম চোরকে অ্যাট্রাক্ট করতে। নীলাদ্রি বাবু বেনারসে বিগত ১০ দিন ধরে আছেন আরো দুটো হোটেল মিলিয়ে। পুলিশ তারও প্রমাণ পেয়েছে। কিন্তু তোমার ইন্টারেস্ট তৈরি করে ও সুযোগ পেয়ে গেল নিজে এ বাড়িতে আসার। আর এসে দেখতে পেল ওর প্রয়োজনীয় জিনিসটা থাকে কোথায়। সেদিনকে লাঞ্চের টেবিলে সবাই ব্যস্ত আছে দেখে ওই সময় ইচ্ছে করে ওর সাধুবেশী পালোয়ানকে মেসেজ করে তখনই আসার জন্য। ও জানত ভজনলাল বাদে নিচে গিয়ে দরজা খুলতে এই সময় বাড়ির আর কেউ যাবে না। ওনার পাঠানো সাধুবেশী পালোয়ান ভজনলালের মাথায় ডাম্বেল মেরে অজ্ঞান করে যেটা চুরি করল, তা উনি হাতে পাওয়ার পরেই বুঝতে পেরে গেছেন যে, যে ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখাচ্ছে সে কোন সাধারণ লোক নয়। তাই তার পরেই লেখেন এই কোডেড চিঠি। চিঠির কথাগুলো অবশ্য ওই পালোয়ানের পক্ষে লেখা সম্ভব নয় যদি না তাকে কেউ ছবি তুলে মোবাইলে পাঠিয়ে থাকে। আমার অনুমান পালোয়ান ওই আখাড়ার কোথাও বসেই ওটা লিখেছিল মোবাইলে ছবি দেখে।”
-“আমি বলেছিলাম। চিঠির মধ্যে গুঁড়ো মাটির রং দেখেই আমি বলেছিলাম।” লাফিয়ে উঠে বললেন ভবতোষ বাবু।
-“বাহ ভবতোষ বাবু! আপনার দৃষ্টিশক্তি তো অসাধারণ।” বললেন মিস্টার শিকদার।
আর তাতে ভবতোষবাবু নিজের গেঞ্জির কলারটা একটুখানি টেনে উপরে তুললেন।
-“কিন্তু আমাদের হোটেল ম্যানেজার যে বলল কোন সাধুবাবা এসে আমাদেরকে চিঠি দিয়ে গেছে। সেটা তাহলে আবার কোন সাধুবাবা?”
-“সেটা আমার পাঠানো সাধুবাবা!” মুচকি হেসে বললেন রত্নাকর সিকদার, “ইন্সপেক্টর যোশীর কনস্টেবল ভীমনাথ!”
-“কিন্তু তাহলে ওই নোটসগুলো আছে কোথায়?” প্রশ্ন করলাম আমি।
-“ডক্টর উপাধ্যায়ের স্টাডিতে।” এই বলে রত্নাকর নিজের পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে তাতে একটা এক্সেল শিট খুলল, যাতে ডক্টর উপাধ্যায়ের স্টাডির কাচের দরজাওয়ালা চারটে আলমারির কোন বইয়ের কোন পেজে নোটস এর কত নম্বর পেজটা ও লুকিয়ে রেখেছে তা সব লেখা আছে। সব মিলিয়ে দেখলাম ১২৭ পেজ।
-“এবার বলো ভায়া, ১২৭ খানা বইয়ের ভেতর থেকে ১২৭টা লুজ পেজ বের করে চুরি করার সময় ও দক্ষতা দুনিয়ার কোন চোরের আছে!”

-“আচ্ছা আপনি কি করে…?”
-“আপনি না তুমি।” আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল রত্নাকর।
-“আচ্ছা বেশ, তুমি কি করে জানলে ওর পোস্ট ডক কোথায়? কার কাছে করেছে?”
-“নীলাদ্রিবাবু যে কলেজে পড়ান তার ওয়েবসাইটে ওনার পার্সোনাল ডিটেলসে কোথাও এই পোস্ট ডকের কোন উল্লেখ নেই। কিন্তু ওনার রিসার্চ আর্টিকেলগুলো ইন্টারনেটে পড়তে গিয়ে দেখলাম এমন দুটো পেপার আছে যাতে নীলাদ্রি বাবুর সাথে কো-অথার হলেন ডক্টর মিচেল উইলসন, প্রফেসর অফ ভাইরোলজি ডিপার্টমেন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি। ডক্টর শ্রীধর বোস নিজে ভেরিফাই করলেন যে ইনিও ছিলেন Pulvus T1 এর টিমে। আর তারপর দুয়ে দুয়ে চার করতে আর বেশি সময় লাগল না। শুধু ওনাকে হাতেনাতে ধরাটা দরকার ছিল।” বলল রত্নাকর।
-“আর তার জন্যই আজকের ফাইলের কভারের দড়িতে তুমি ইচ্ছে করে অভ্র লাগিয়ে দিয়েছিলে?” প্রশ্ন করলাম আমি।
-“ঠিক ধরেছ গিরিশ! ও হাতে যতই সাবান দিয়ে ঘষুক না কেন সব অভ্র হাত থেকে তুলে ফেলতে পারত না!”
-“কিন্তু ওই সাধুবেশী পালোয়ান ওকে ফাইলটা দিল কখন? আর এই ফাইলটাতে ছিলই বা কি?”
-“এবারও খবরের কাগজ, আবার কি! ইন্সপেক্টর যোশিকে আমি আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম নীলাদ্রি বাবুর হাতে ফাইলটা না যাওয়া অবধি চোরকে যেন কিছু না করে। পুলিশের লোক বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পোশাকে ছিল কালভৈরবের মন্দিরের রাস্তাতে। নীলাদ্রি বাবুকে ফাইলটা হ্যান্ডওভার করার পরেই সাধুবেশী পালোয়ানের বাইকটা ফলো করে তাদের দু’জনকে ধরেছে পুলিশ। পালোয়ানের কাছ থেকে পুলিশ এতক্ষণে নীলাদ্রি বাবুর সাথে তার ডিলের ব্যাপারে সব ইনফরমেশন বের করে নিয়েছে।”
-“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রফেসর নিলাদ্রি বাবু পিডিএফ না কি ছাই করতে গেল তো গেল ভাইরোলজির প্রফেসরের কাছে? এ আবার কেমন ধারা কথা মশাই!” মাথা চুলকে বললেন ভবতোষ বাবু।
-“ঠিক ধরেছেন ভবতোষ বাবু। প্রথমদিকে এটাই আমাকে চমকে দিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে যা আনফোল্ড হল, তা হল এই প্রফেসর নীলাদ্রি আচার্য মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিয়ের একটা বিশেষ সাবজেক্ট মাইক্রোফ্লুইডিক্সের ওপর দীর্ঘদিন রিসার্চ করছিলেন। উনি এক ধরনের এমন মাইক্রোফ্লুইডিক চিপ ডিজাইন করেছিলেন, যা দিয়ে ভাইরাস ডিটেকশন করা যায়। আর নিজের কাজে পারফেকশন আনার জন্যই তিনি পিডিএফ করতে গিয়েছিলেন প্রফেসর মিচেল উইলসনের কাছে। তখন অবশ্য উইলসন নীলাদ্রি বাবুকে এসব চুরি সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে মনে হয় না। তাহলে এই ঘটনাটা অনেক আগেই ঘটতে পারত, ডক্টর উপাধ্যায় বেঁচে থাকতেই।” বলল রত্নাকর।
-“কিন্তু এতগুলো পেড জার্নালের রিসার্চ আর্টিকেল উইদাউট সাবস্ক্রিপশন তুমি পড়লে কিভাবে?” প্রশ্ন করলাম আমি।
-“এই প্রশ্নটা তোমার থেকে আশা করিনি, গিরিশ! উইদাউট সাবস্ক্রিপশন তোমরা প্রফেসররা পড় কিভাবে ভায়া!”
-“Scihub?”
-“Yes dear! With no doubt!” হাসতে হাসতে বলল রত্নাকর, “নিজে সায়েন্টিস্ট না হলেও, কারো রিসার্চ নিয়ে ঘাটতে গেলে এতটুকু তো শিখতে হ’তই!”
তারপর ভবতোষ বাবুর দিকে ফিরে রত্নাকর বলল, “কি ভবতোষ বাবু, মাথা ঝিমঝিম করছে? চলুন একটু চাট খাইয়ে নিয়ে আসি আপনাকে।”
-“অ্যাঁ! চাট? আরো কিছু চাট খেতে বাকি আছে নাকি মশাই?” ভদ্রলোক এখনো ঘটনার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেন নি বলে মনে হয়।
-“একি মশাই! আপনি এত বড় ফুডি! আর এটা জানেন না কাশীতে বিখ্যাত হল নানান রকমের চাট।”

কাশী চাট ভান্ডারের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনজনে তিনটে ভাঁড়ে করে এখানকার স্পেশাল টমেটো চাট খাচ্ছি।
-“সবই যখন জানতে পেরে গেছিলে, তখন নীলাদ্রিকে সরাসরি ধরলে না কেন? এসব চিঠি চাপাটির কি দরকার ছিল?”
-“প্রমাণ গিরিশ, প্রমাণ! চোরকে চুরি করার সময় ছাড়া প্রমাণ করতাম কি করে! মিচেল উইলসনের কাছে পোস্ট-ডক করা তো আর দোষের নয়!”
-“তাহলে প্রথম চিঠিটা নীলাদ্রি লিখেছিল আর দ্বিতীয়টা তুমি তাইতো?”
-“একদম!”
-“আর তুমি প্রথম চিঠির লেখক কে তা সিওর ছিলে না বলে সবাইকেই চিঠির উত্তর দিয়েছিলে। তাই তো?”
হো হো করে হেসে রত্নাকর বলল, -“মোক্ষম ধরেছ গিরিশ! তবে তুমি যে, চিঠি দুটোর মানে এত তাড়াতাড়ি বের করতে পারবে, এ আমি ভাবতেই পারিনি!”
-“তবে নীল কাউকে এরকম কঠিন কোডেড চিঠি লিখলই বা কি ভেবে? ও কি জানত তুমি চিঠির মানে একদিনের মধ্যে উদ্ধার করে ওকে নোটসগুলো দিয়ে যেতে পারবে? আর তুমিই বা এত তাড়াতাড়ি কোডের মানে বের করলে কিভাবে?”
আরেকবার হো হো করে লম্বা হেসে রত্নাকর বলল, “ভুলে যাচ্ছ গিরিশ! আমি একজন পেশাদার গোয়েন্দা! আর এইসব বাচ্চাদের কোড দিয়ে আমি স্কুল লাইফে গার্লফ্রেন্ডকে চিঠি লিখতাম। হ্যাঁ, তবে আমার অনুমান, নীলাদ্রিবাবু কোনভাবে আমার আসল পরিচয়টা জানতে পেরে গেছিলেন। আর তাই হয়তো তিনি এত তাড়াতাড়ি চিঠির মানে উদ্ধার হবে, এ ভরসাও পেয়েছিলেন।”
-“সব তো বুঝলাম, কিন্তু সেদিন মিস্টার কুলকার্নি, তোমার সঙ্গে আর কাজ করবে না, এসব কি একটা বলছিল; যখন আমরা উপাধ্যায় বাড়িতে ঢুকছিলাম, সেগুলো? পয়সা কড়িও তো ফেরত চাইছিল তোমার থেকে!” রত্নাকরকে প্রশ্ন করলাম আমি।
-“ওগুলো আমার সঙ্গে নয়, ওর বউয়ের সঙ্গে কি কথা হয়েছে ওর, সেটা আমাকে বলছিল, আর সেটাই হয়তো তোমরা শুনেছ।” বলল রত্নাকর।
-“হ্যাঁ ওই রামনগর ফোর্টেও তো ফোনে কাকে বলছিল যে আমি একটা জিনিসের খোঁজ পেয়েছি। আমি আর তোমার সঙ্গে কাজ করব না!” বললেন ভবতোষ বাবু।
-“আরে না না, ওসব কিছুই না। ওর এই ওষুধের বিজনেসটা ওর শ্বশুরের একচুয়ালি। তাই বেচারাকে বাধ্য হয়ে শ্বশুর বাড়িতেই পড়ে থাকতে হয়। বিজনেসটা আসলে ওর বউয়ের নামে। আর তাই কথায় কথায় হাতও পাততে হয় বউয়ের কাছে। কিন্তু এবার ও ঠিক করেছে ইন্ডিয়ায় ফিরে নিজের একটা ভালো বিজনেস করবে অন্য কিছুর। নিজের এতদিনের হকের টাকা ফেরত চাইছিল বউকে। আর তার থেকে শুরু হয় ঝগড়া। আর তাই এসব থেকে দূরে থাকতে, শান্তি পেতে, বেচারা একা বেনারসে এসে লুকিয়ে বসে আছে। ও বেচারা সারাদিন নিজের সুখ-দুঃখের সব গল্প আমার সঙ্গে করত। তুমি তো আর বুঝবে না গিরিশ, বিয়ে তো কর নি!”
-“তা তুমি বুঝলে কি করে? তুমি করেছ নাকি?”
দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম।

কাল সকাল ১১টায় আমাদের ট্রেন। এখন বাজে সন্ধ্যে সাড়ে আটটা। এই দুদিনের পরিচয়ে ভবতোষ বাবুর মত এরকম সহজ সরল এবং সাহসী বন্ধুর ওপর বড্ড মায়া পড়ে গেছে। ভদ্রলোক আমার মনের কথা কিভাবে না জানি বুঝতে পেরে নিজে থেকেই বললেন, “স্যার! আপনি যদি কিছু মাইন্ড না করেন, তাহলে আমি আপনার সাথে কয়েকদিনের জন্য জলপাইগুড়ি ঘুরতে আসতে পারি?”
-“ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম স্যার ভবঘুরে!” ভদ্রলোকের কাঁধে হাত দিয়ে অত্যন্ত খুশি হয়ে বললাম।

চতুর্থ দিন

বেলা ১১টার সময় ট্রেন ধরার জন্য বেনারস স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর ভবতোষ বাবু। রত্নাকর এখনো এসে পৌঁছায়নি, ট্রেন ছাড়তে আর ১৫ মিনিট বাকি। ফোনও ধরছে না। চায়ের ভাঁড়টা ফেলে দিয়ে বাধ্য হয়ে এবার দুজনে ট্রেনে উঠে বসব, হঠাৎ এমন সময় দেখতে পেলাম রত্নাকরকে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তার অরিজিনাল গেট আপে। একটা মাটি রঙের ফুল পাঞ্জাবি তার সঙ্গে সাদা পাজামা, কাঁধ থেকে ডায়াগোনালি জড়ানো একটা পেস্তা রঙের শাল। ছ ফুট লম্বা, ফর্সা, চওড়া কাঁধ, স্ট্রংলি বিল্ট ফিগার, দাড়ি গোঁফ কামানো, তীক্ষ্ণ নাসিকা, চোখে তেজোদীপ্ত ভাব। না আছে ঘোলাটে সবুজ কন্টাক্ট লেন্স আর না চশমা। চোখের মনিও কালো, আর চুলের রং ও।
-“হাঁ করে কি দেখছ! চুলটা আবার ন্যাচারাল কালার করিয়ে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আসতে সময় লেগে গেল।” বলল রত্নাকর।
-“তলে তলে যে এতটা বাঙালিয়ানা ছিল ভেতরে, লাস্ট তিনদিনে এক্কেবারেই বুঝতে দাওনি।” বললাম আমি।

পন্চম দিন

জলপাইগুড়ি পৌঁছানোর পরদিন সকালে রত্নাকরের বাড়িতে ও, আমি আর ভবতোষবাবু বসে চা খাচ্ছি। চায়ে চুমুক দিয়ে রত্নাকর বলল, “দেখ গিরিশ! আমার তিনটে ঘর! আর আমি মানুষও একলা! আর আমার বাড়িটাও তোমার কলেজ থেকে হাঁটা দূরত্বে!”
-“হ্যাঁ, তো?” সব বুঝেও না বোঝার ভান করে বললাম আমি। মানুষের স্বভাবই এরকম। প্রিয় লোকের মুখ থেকে কোন জিনিস সরাসরি একবার শুনতে না পাওয়া অবধি আশ মেটে না।
-“অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম একটা ঘর কাউকে ভাড়া দেব। কিন্তু এখন আর সে ইচ্ছে নেই। তুমি যদি আমার বাড়িতে পার্মানেন্টলি শিফ্ট করে যাও, তাহলে আমিও একজন বুদ্ধিমান, সাহসী, বলবান বন্ধু পেয়ে যাই। কি বলেন ভবতোষ বাবু?”
শেষের কথাটা ভবতোষ বাবুকে বলার উদ্দেশ্য হল বেনারসের সেই কুস্তির আখাড়ায় আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভদ্রলোকের সেই আকুল চিৎকার। আর তার ফলে রত্নাকরের উপর তৈরি হওয়া ভদ্রলোকের অদম্য রাগ। রত্নাকরের কথা শুনে ভদ্রলোক মাটির দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছেন।
-“আমি কিন্তু সেদিন আখাড়ায় ওকে, আপনি চিৎকার না করলেও, আছাড়টা মারতাম না!”
একসঙ্গে তিনজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম।
-“এই রিগার্ডিং একটা ইনফরমেশন ও দুটো কন্ডিশন তোমাকে বলার আছে।” রত্নাকরকে বললাম আমি।
-“বলে ফেলুন স্যার!”
-“ইনফরমেশন হ’ল ভবতোষবাবু এখন আমার গেস্ট! উনি আমার কাছে ক’দিনের জন্য বেড়াতে এসেছেন।”
-“বেশ তো! তিনটে রুম আছে বললামই তো! আর তোমার কন্ডিশনগুলো কি কি শুনি!”
-“প্রথম কন্ডিশন হল আমাকে আজ থেকে তোমার সব গোয়েন্দাগিরির গল্প লিখতে দিতে হবে!”
-“সেকি গিরিশ! তুমি লেখক হলে কবে থেকে?”
-“ছিলাম না! কিন্তু এখন হবার মতো কারণ পেয়ে গেছি!” হাসতে হাসতে বললাম আমি।
-“ওকে রাজি! আর দ্বিতীয় শর্ত?”
-“দ্বিতীয় শর্ত হ’ল আমি ফ্রিতে কিন্তু থাকতে পারব না ভায়া; আই উইল পে ইউ ফেয়ার রেন্ট! বল? রাজি?”
বুঝলাম না কেন রত্নাকর আর ভবতোষ বাবু পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

Author: admin_plipi

18 thoughts on “বেনারসের ঘাট গোয়েন্দাগিরির স্টার্ট [তৃতীয় এবং শেষ পর্ব ]

  1. দারুন। ক্লু গুলো সত্যি ধরা যায়নি। গল্প তো পুরো ঘুরে গেল। অসাধারন।

  2. Nice detective series after long. You published many serieses. All are good. Especially this one. The picture is now understood in details. The station scene kept me and probably many others in confusion why this picture for these days. Very nice

  3. অসাধারণ দাদা, খুব ভালো লাগল পড়ে।আরো ভালো ভালো গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।

  4. রহস্য টা শেষ পর্যন্ত ধরা ছিল। ভালো রহস্যময় হয়েছে।

  5. এক কথায় অসাধারন। 3 টি পর্ব এক নাগড়ে পরে ফেললাম। লেখকের উদ্দেশ্যে বলি, বই বের করুন। খুব সমাদৃত হবে। আমি কিন্ডল অনুরাগী। আমি সংগ্রহ করে রাখতে চাই।

  6. এত ফেলুদা। দারুন লিখেছেন। ফেলুদা ফিরে পেলাম। লেখকের আরো লেখা এখানে প্রকাশিত হবে কি? আমি পাণ্ডুলিপির (সময়ের অভাবে অনিয়মিত) পাঠক। আশায় রইলাম লেখকের আরো এমন গোয়েন্দা গল্পের। মরচে রহস্য টাও ভালো লাগলো।

    ধন্যবাদ প্রাপ্য পাণ্ডুলিপির ও। ছবিটা তো পুরো মুভি পোস্টার। দারুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.