চারুবালা (প্রথম পর্ব)

চারুবালা (প্রথম পর্ব) || লেখা: শুভাশীষ দে



বেশ লম্বা বলতে গেলে, তালঢ্যাঙা চেহারা। গায়ের রং ঘোর কালো। চেহারা একেবারে শ্রীহীন। একেবারে কাঠ কাঠ গড়ন। গোটা দেহের কাঠামোয় মাংস প্রায় নেইই বললে চলে। হাত পাও কাঠ কাঠ। গায়ের চামড়া খসখসে। মুখের গড়নও অসুন্দর। চোখ দুটো ছোট ছোট, কুতকুতে । নাক থ্যাবড়া। ঠোঁট দুটো এত ছোট আর সরু উপর নিচের দুই পার্টির দাঁতের বেশিরভাগটাই ঢাকতে পারে নি। তাই ঠোঁট বন্ধ থাকা অবস্থাতেও সামনের দিকে দুই পার্টির অনেকগুলো দাঁত বেরিয়ে থাকে। পরনে একটা মলিন, সস্তার মিলের কাপড়ের তৈরি শাড়ি আর তার ওপর একটা ময়লা চাদর। পায়ে একটা সস্তার হাওয়ায় চটি। দুই হাতের কবজিতে কয়টা কাচের চুড়ি। কপালে ছোট দেখে একটা টিপ কালো রঙের। বয়স বড়জোর ১৮-১৯। ইনিই আমাদের এই গল্পের নায়িকা। শ্রীমতি চারু বালা মজুমদার। কাছেই রেল লাইনের ধারে গড়ে ওঠা বিধান কলোনির বস্তির মধ্যে থাকা অসংখ্য ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে একটিতে থাকেন। কিন্তু ইনি এখন শীতকালের এই রাত প্রায় দেড়টার সময় অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে রেললাইনের ধারে কি করছেন? এই প্রসঙ্গে চারিপাশের পরিবেশটা একবার দেখে নেওয়া যাক। হাওড়া-বর্ধমান মেইন লাইনের তালান্ডু আর খন্যান স্টেশনের মাঝে একটি জায়গা। একদিকে আদিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু মাঠ। অপরদিকে সারি সারি আমবাগান। চারিদিকের ঘন অন্ধকারের মধ্যে অসংখ্য জোনাকি পোকার আলো দপ দপ করছে। দূরে গাঢ় কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া রেল সিগন্যালের লাল আলোটাই একমাত্র দেখা যাচ্ছে। ঠিক সামনে অসংখ্য সারি সারি সিমেন্টের স্ল্যাব এর ওপর আর তার উপর ঢেলে রাখা অসংখ্য ছোট ছোট পাথরের কুচি বা স্টোন চিপস এর মধ্যে দিয়ে দুই দিকের দিগন্ত রেখা ভেদ করে একদিকে বর্ধমান আর অপরদিকে হাওড়ার দিকে ছুটে গেছে ঝকঝকে ইস্পাতের তৈরি দুই জোড়া সমান্তরাল রেল লাইন। একদিকের রেললাইনের ঠিক পাশেই একটা আমগাছের নিচে শূন্য দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে আছে চারুবালা। আমবাগানের গাঢ় অন্ধকারে হাতে পায়ে ছেঁকে ধরেছে বড় বড় মশা। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই।

কেন? কেন এই নির্জন, নিশুতি রাতে রেল লাইনের ধারে এই ভয়াল পরিবেশে প্রচন্ড শীতের আর মশার কামড় সহ্য করে চারুবালা এইরকম উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এটা জানতে হলে আমাদের চারুবালার পরিবারের দিকে তাকাতে হবে।


চারুবালার বাবা পঞ্চাশোর্ধ হারু মজুমদার লোকাল এরিয়ায় রিকশা চালান। মা মালতি দেবী মধ্য চল্লিশ এর গৃহবধূ শারীরিকভাবে রুগ্না ও কৃশ। চারুবালার নিচে ভাই বোন আছে আরো তিনটি। প্রত্যেকেই রোগা আর কম বেশি অপুষ্টিজনিত রোগের শিকার। সংসারে উপার্জনশীল ব্যক্তি বলতে কেবলমাত্র চারুবালার বাবা। মাঝে মাঝে চারুবালার মা অবসর সময় ঘরের মধ্যে ঠোঙ্গা বেঁধে কিছু অতিরিক্ত উপার্জন করেন। তাও এমন কিছু নয়। অর্থাৎ একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবার যাকে বলে। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের পরিবারে কন্যা সন্তান খুব একটা কাঙ্ক্ষিত নয়। বিশেষ করে সে কন্যা সন্তান যদি সব রকম সৌন্দর্য্য বর্জিত হয়। এরকম অনেক ক্ষেত্রেই সেই কন্যা সন্তানের নিজের বাবা-মাই তাকে বোঝা বলে মনে করে। সুতরাং সেই হতভাগিনীর অতি শৈশব কাল থেকে নিজের সংসারেই জোটে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, বিদ্রুপ, পক্ষপাতিত্ব আর অবিচার। সেইসঙ্গে সেই পরিবারের অন্যান্য সন্তান বিশেষ করে তার অন্য কোন সুন্দরী বোন অথবা ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা টেনে তাকে অপমান। আমাদের চারুকলার ভাগ্যেও ঠিক এমনটাই ঘটলো। এমনিতেই এই ধরনের পরিবারে ছেলেমেয়েরা খুব একটা পড়াশোনা করে না। কারণ পরিবেশ,পরিস্থিতি ও সর্বোপরি আর্থিক সক্ষমতার অভাব। সাধারণভাবে ক্লাস সেভেন-এইট। টেনেটুনে মাধ্যমিক পর্যন্ত খুব কম ছেলেমেয়েই যেতে পারে। চারুবালা একে মেয়ে তার ওপর কুশ্রী রুপা হওয়ায় ওর এই সুযোগ মিলল আরো কম। ক্লাস ফোর পাশ করার পরেই ওর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল।
-‘ বেশী পড়ে আমার গুষ্টি উদ্ধার করবে না। লেখাপড়া করে জজ-ব্যারিস্টার হবে? মেয়ে সন্তান। সেই পরের বাড়ি খুন্তি নাড়তে হবে। তাহলে এখন থেকে করাই ভালো। আর সেই পরের ঘরই বা কিরকম হবে কে জানে! যা রূপের ছিরি! বিয়ে দিতে পারলে হয়।’ এই হল চারুবালা সম্বন্ধে ওর মায়ের ধারণা।
-‘ আমাদের গুষ্টিতে মেয়ে বেশি পড়াতে নেই গো বাবু! তাতে লক্ষ্মী থাকে না। আর তাছাড়াও আমার মত যদি নেন তো বাবু মেয়ে মানুষকে কখনোই কোথাও বেশি পড়াতে নেই। তাতে কি হয় জানেন? মেয়ে মানুষ অবুঝ হয়, অবাধ্য হয় । বাপের সংসারে বাপ-ভাই কে মানবে না আর সোয়ামীর সংসারে সোয়ামীকে মানবে না। শেষে কি হবে জানেন বাবু? সোয়ামীর সংসারে অশান্তি, মারামারি তারপর শ্যাষে সোয়ামীর ঘর ছেড়ে পাকাপাকিভাবে বাপের ভিটে এসে থাকা। না বাবু, ও বড়লোকদের ঘরে হয়। আমাদের ঘরে ওসব পোষাবে না।’ এই হল চারুবালা সম্বন্ধে ওর বাবার অর্থাৎ হারান রিক্সাওয়ালার মনোভাব।



যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারুবালা পড়তো সেখানকার প্রধান শিক্ষক মহাশয় একবার ওর রিকশায় উঠেছিলেন । সেই সময় চারুবালা ওনার বিদ্যালয়ে পড়তো। হ্যাঁ, অন্যান্যদের দেখাদেখি হারান রিক্সাওয়ালাও চারুবালাকে ওই প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল। অবশ্য সেটা যতটা না চারুবালাকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য তার থেকে অনেক বেশি প্রাইমারি স্কুলের একবেলার ফ্রি মিলের জন্য। গরিবের সংসারে একবেলা একজনের পাত কম পড়লে ক্ষতি কি? তা প্রধান শিক্ষক মহাশয় হারানের রিকশায় উঠে কিছুদূর যাওয়ার পরই চারুবালার লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞেস করলেন। চারুবালার অভিভাবক হিসেবে তিনি হারানকে চিনতেন।
-‘ তোমার মেয়েই তো চারুবালা না। আমাদের স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে?’
-‘আইজ্ঞে হ্যাঁ স্যার! আপনার দয়া!’
-‘না, না! ও দয়াফয়া কিছু নয়! শোন হারান একটা কথা বলি। তোমার মেয়ের লেখাপড়ায় মাথা কিন্তু খুব ভালো। এবারে ফোর থেকে ফাইভে উঠতে ক্লাসে সেকেন্ড হয়েছে। তুমি কিন্তু হাল ছেড়ো না। কষ্ট করে হলেও ওকে যতদূর সম্ভব পড়িয়ে যাও। দেখবে এই মেয়ে কিন্তু একদিন অনেক দূর যাবে।’

প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের এই কথার উত্তর এই হারান রিক্সাওয়ালা চারুবালা সম্বন্ধে ওই কথাগুলি শুনিয়ে ছিল।
-‘ আমাদের গরিব-গুরবোর ঘরে কে আর কত বেশি পড়াশোনা করে বলুন! তার ওপর মেয়ে। এইতো ১০ বছর হল। আর তিন চার বছর পরেই তো ছেলে দেখতে হবে। মেয়েকে তো চিরকাল ঘরে বসে খাওয়াতে পারবো না। ফোর পাশটা হয়ে রইল। এবার মেয়ে ঘরে থেকে ওর মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজগুলো শিখুক। এতেই ওর কাজে লাগবে।’

এর উত্তরে প্রধান শিক্ষক মহাশয় হারানকে অনেক কথাই শুনালেন। এমনকি নাবালিকা বিয়ে দেওয়া যে আমাদের দেশে অপরাধ, দিলে হাজতবাস পর্যন্ত হতে পারে, হারান যেন সে চেষ্টা ভুলেও না করে এরকম কিছু বলে একটু ভয়ও দেখালেন। কিন্তু স্পষ্ট মনে হলো হারান এক কান দিয়ে কথাগুলো শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিল।



আর এই বিয়ে দিতে গিয়েই হলো যত বিপত্তি। মেয়ের যা রূপ তাতে মেয়েকে ভালো কোথাও দিতে পারবে না সেটা তো হারান ভালো করেই জানতো। তাই সে নিজের মতো করেই চেষ্টা করছিল । বাজারের কমবয়সী নতুন পান-বিড়িওয়ালা, স্থানীয় জুট মিলের অস্থায়ী শ্রমিক, রিক্সাওয়ালা, টোটো ওয়ালা, রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে, মুদিখানার কর্মচারী এমনকি চল্লিশ- পঞ্চাশ বছর বয়সের দোজবরে, তেজবরেও বাড়িতে এসে মেয়ে দেখে গেল। মেয়ে সব দিক দিয়ে কাজের, দারুন গৃহকর্ম নিপুনা ( এই একটা ব্যাপারে হারান নিশ্চিন্ত ছিল কারণ স্কুল ছাড়ানোর পর সংসারের যাবতীয় কাজ চারুবালার মা তাকে দিয়ে করিয়েছে। মোটামুটি সূর্যোদয়ের আগে থেকে মাঝরাত্রি পর্যন্ত প্রতিদিন গাধার খাটুনি খাটতে হতো চারুবালাকে, তা সে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যাই হোক) এইটা পাত্রপক্ষের কাছে বারবার জাহির করেও একবার মেয়েকে দেখেই সবাই দূরে সরে যেত। দোজবরে বা তেজবরে একজন পাত্র যাও বা রাজি হতো তাও এমন বরপণ হাঁকতো যে তা দিতে গেলে হারান রিকশাওয়ালার ঘটিবাটি বিক্রি হয়ে যাবে। আর অনিবার্য ভাবেই এর জের এসে পড়তো চারুবালার উপর।
-‘ হে ভগবান! কি পাপ যে করেছিলাম! এই কয়লার বোঝা এনে ফেললে আমার ঘাড়ের উপর! এই পাপ এসে পড়লো আমাদের ঘাড় মটকে পায়ের উপর পা তুলে গান্ডে পিন্ডে আমাদের গিলবে বলে। ওঃ ঠাকুর! আর কতদিন এই পাপ আমাদের ঘাড়ের উপর ফেলে রাখবা ঠাকুর। মরতেও পারে না। না হলে আমাদের তুলে নাও ঠাকুর। কোন ভাগাড় থেকে আমাদের ঘরে এই জঞ্জাল এনে ফেলে আমার সর্বনাশ করলে!দোজবরে- তেজবরেরও পছন্দ হয় না এমন মেয়ে পেটে ধরলাম! শুধু কালো কুচ্ছিৎ হলেও হতো, একেবারে রসকষহীন আখের ছিবড়ে! তার ওপর ঢ্যাঙা তালগাছ! এই কাকতাড়ুয়া আমি কার ঘাড়ে গছাব ঠাকুর! আর কতদিন আমাদের এই শাস্তি দেবে। ‘

একের পর এক পাত্রপক্ষ এসে ডিশ ভর্তি রসগোল্লা সিঙ্গারা আর নিমকি খেয়ে যেত আর তারপর পরে জানাবে এই কথা বলে চলে যেত। মাঝে মাঝে কেউ কেউ লোক মারফত হারান রিকশাওয়ালাকে জানিয়ে দিত পাত্রী তাদের পছন্দ হয়নি। তখন চারুবালার মায়ের এই মর্মভেদী বাক্যবান শুনে চারুবালা নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে চোখের জল ফেলতো আর ভাবতো কোন অভিশাপে সে এমন সমস্ত রূপ-রস-বর্ণ বঞ্চিত কুরূপা হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল।



কিন্তু পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠেছিল আজকের সন্ধ্যেবেলা অর্থাৎ এখন যখন চারুবালা এই গভীর রাতে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে জোনাকির আলো জ্বলা আমবাগানে তালান্ডু আর খন্যান স্টেশনের মাঝের এই রেললাইনের ধারে মশার কামড় খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এই সময় থেকে ৬-৭ ঘন্টা আগে। ভুলটা কিন্তু ছিল চারুবালার বাবা-মায়েরই। এতদিন চারুবালার প্রায় তিনগুন বয়সী দোজবরে-তেজবরে পাত্র, যাদের আগের স্ত্রী গত হয়েছে, তারা এসে চারুবালাকে দেখছিল। চারুবালা এ কথা জানতোও। কিন্তু নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে এর সঙ্গেই আপস করে নিয়েছিল। কিন্তু এখন ওর বাবা এমন এক বয়স্ক পাত্র জোগাড় করলো যার স্ত্রী জীবিত কিন্তু পক্ষাঘাতে পঙ্গু। ঘরে দুই বড় বড় ছেলে। এই অবস্থায় শুধু নিজের কদর্য বাসনা পরিপূর্ণ করার জন্য ভদ্রলোক এসেছেন চারুবালার পানি গ্রহণ করার জন্য। এবার আর হারানকে কোন টাকা দিতে হবে না। বরঞ্চ ওই ভদ্রলোকই বিয়ের সমস্ত খরচ আর সেই সঙ্গে বেশ কিছু অতিরিক্ত টাকাও খরচ করতে রাজি। হারান রিক্সাওয়ালাকে বেশ কিছু টাকা অগ্রিমও দিয়ে রেখেছেন তিনি।এবার আর চারুবালা চুপ থাকতে পারল না।
-‘ এ বিয়ে আমি করব না।’
আচমকা চারুবালার মুখে এই দৃঢ় ঘোষণা শুনে ওদের ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে যেন আচমকা বিস্ফোরণ হল।
-‘ আমার সর্বনাশ করছো করো কিন্তু আমি বিছানায় পড়ে যাওয়া অন্য কোন ঘরের বউয়ের সর্বনাশের কারণ হতে পারব না।’
-‘ কি বললি হা,,, মজাদী, বিয়ে করবি না! তুই বিয়ে করবি না তোর বাপ করবে।’ হারান যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না চারুবালার মুখে কথাগুলো শুনে। রাগে তার চোখ মুখ রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে ফিরেও তাকালো না চারুবালা। শক্ত হয়ে বসে রইল বিছানার উপর।



-‘ না,বিয়ে আমি করবো না বাবা! তুমি যদি আমাকে কেটেও ফেলো আমি অন্যের ক্ষতি করতে পারব না। জানি তুমি আমাকে বিক্রি করছো। কত টাকা নিয়েছো সেটাও জানি। ফেরত দিয়ে দাও ওই টাকা ওনাকে।’
-‘ কি বললি! টাকা ফেরত দেবো! যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। দাঁড়া, তোকে কেটেই ফেলবো আজ। এই পাপ থাকার থেকে না থাকা ভালো।’
এই বলে এক ধাক্কা দিয়ে চারুবালাকে ফেলে দিয়ে মারতে লাগলো হারান। তার সঙ্গে হাত লাগালো ওর মাও। সেইসঙ্গে অশ্রাব্য গালাগালি।
-‘সতী এয়েছেন আমার। সতীপনা দেখানো হচ্ছে। অন্যের ক্ষেতি করব না! নিজের লাভ- ক্ষেতি বোঝার ক্ষমতা নেই উনি অন্যের ক্ষেতি আটকাবেন! আবার আমার সব্বোনাশ করছো! কি সব্বোনাশ তোর করছি শুনি? বলি এই তো শ্যাওড়া গাছের পেত্নীর মত চেহারা! আমার গবভের পাপ! তালগাছের মতো লম্বা, তালঢ্যাঙা। তার ওপর কয়লার মত কুচকুচে কালো। কি এমন রাজপুত্তুর জুটবে তোর? বলি এর থেকে ভালো পাত্তর তোর কোথায় জুটবে শুনি? একটা হিল্লে হয়ে যাবে তোর।’
-‘ এই পাত্তরকেই বিয়ে করতে হবে তোর! তবে আমার নাম হারান সাহা। নাহলে আমি এক বাপের পুত্তুর নয়। ‘

না, আর কোন কথা বলেনি চারু বালা। আর কোন প্রতিবাদ করেনি। দাঁতে দাঁত চেপে সমস্ত লাঞ্ছনা,অপমান, গালাগালি সহ্য করেছে। রাতে একদানা ভাতও মুখে দেয়নি। নিজের বিছানায় বালিশে মুখ বুঝে শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। রাত গভীর হলে কোন এক ফাঁকে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে এই রেললাইনের ধারে। না, এই জীবন আর রাখবে না সে। এই উনিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের সমস্ত লাঞ্ছনা, গ্লানি, অপমান আর অসহায়তার শেষ করবে সে আজকেই চলন্ত রেল গাড়ির চাকার তলায় নিজেকে সঁপে দিয়ে। সেজন্যই এই গভীর রাতে রেল লাইনের ধারে এই নির্জন আম বাগানে আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে।



আচমকা গভীর রাতের নিবিড়, সূচিভেদ্য অন্ধকার ও গাঢ় কুয়াশার যবনিকা ভেদ করে অনেক দূর থেকে দৃশ্যমান রেল সিগন্যালের লাল বাতিটা সবুজ হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেতে খেতে একটু তন্দ্রা মত এসে গিয়েছিল চারুবালার। আচমকা এক ঝটকায় সেই তন্দ্রা ছুটে গেল। চাবুকের মত খাড়া হয়ে উঠল সে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল সবুজ হয়ে যাওয়া সিগন্যালটার দিকে। আর বেশিক্ষণ নয়। যেকোনো মুহূর্তের দিগন্ত কাঁপিয়ে চলে আসবে রাতের মেল ট্রেন তার সমস্ত দুঃখ, অপমান আর যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে। বেশীক্ষন অপেক্ষা করতে হলো না। হঠাৎ দূর দিগন্তে অন্ধকার ভেদ করে দেখা গেল ছুটে আসছে একটা জ্বলন্ত আগুনের শিখা। কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই শিখা রূপ নিল ট্রেনের হেডলাইটে। হু হু করে দশ দিগন্ত কাঁপিয়ে ছুটে আসছে ভাগলপুর – হাওড়া আপ গয়া এক্সপ্রেস। শোনা যাচ্ছে তার চাকার ঘড় ঘড় শব্দ। আচমকা কিছু দূরে দৃশ্যমান হলো ট্রেনের পরিপূর্ণ অবয়ব। তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে সে।আর সময় নেই। লাইনের একটা রেলে মাথা আর আরেকটা রেলে পা রেখে শুয়ে পড়ার জন্য তৈরি হলো চারুবালা। আর কিছুক্ষনের মধ্যেই অবসান হবে এই পর্যন্ত জীবনের যাবতীয় দুঃখ, অপমান, নির্যাতন, অসহায়তা আর লাঞ্ছনার। নিজের মনকে শক্ত করে রেললাইনে শুয়ে পড়তে যাবে, হঠাৎ করে চোখ গেল দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা গয়া এক্সপ্রেস চাকার দিকে। হঠাৎ বুকটা ধক করে ওঠে উঠল ওর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই চাকা দুটো নির্মম নিস্পেষনে ছিন্ন ভিন্ন করে দেবে ওর দেহ। ভাবতেই শিউরে উঠল সে। কতটা কষ্ট হবে ওর? যখন ওর মাথার উপর দিয়ে রেলের চাকাটা যাবে ওর মাথার খুলিটা সঙ্গে সঙ্গে ফেটে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মাথার ভেতর ঘিলু মাথা থেকে বেরিয়ে আসবে। ওর রক্ত, মাংস রেলের চাকার সঙ্গে বহুদুর পর্যন্ত ঘষটাতে ঘষটাতে যাবে। ওঃ মাগো! আর ভাবতে পারে না সে। না, পারবে না। কিছুতেই সে পারবে না এই যন্ত্রনাময় মৃত্যু বরণ করতে। রেল লাইনের কাছ থেকে সভয়ে পেছিয়ে এল চারুবালা। ওর চোখের সামনে দিয়ে তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল ভাগলপুর – হাওড়া আপ গয়া এক্সপ্রেস।



গয়া এক্সপ্রেস চলে যাওয়ার পর চরম হতাশায় হাঁটু মুড়ে যে আমাগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে বসে পড়ল চারুবালা। তবে কি সে পারবে না দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা ট্রেনের তলায় নিজের দেহকে সঁপে দিয়ে মৃত্যুর শীতল ক্রোড়ে আশ্রয় নিতে? আবার কি তাকে ফিরে যেতে হবে সেই লাঞ্ছনাময়, অবমাননাকর জীবনে। না, এ প্রাণ থাকতে কখনোই সে তা পারবে না। আর ফিরে যাবে না সে ওই জীবনে। এখানেই হোক ওর যাবতীয় দুঃখের অবসান। আবার সে বুক বাঁধলো। একটা ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেনি তো কি হয়েছে? আরো তো ট্রেন আছে। আবার শুরু হলো সেই যন্ত্রনাময় প্রতীক্ষা। বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দশ দিক কাঁপিয়ে ছুটে এলো রক্সৌল-হাওড়া আপ মিথিলা এক্সপ্রেস। এবং সেখানেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ট্রেনের চাকাগুলোর দিকে চোখ যেতেই প্রচন্ড আতঙ্কে রেললাইনের ধার থেকে সরে এলো চারুবালা। একই ঘটনা ঘটলো এর পরে আসা বর্ধমান হাওড়া ফার্স্ট আপ লোকাল এর ক্ষেত্রেও। প্রচন্ড হতাশায় চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো চারুবালার। না, মরতে সে পারবে না। এই যন্ত্রণাময় জীবনই তার ভবিতব্য। নিজের ঘরেই তাকে ফিরতে হবে। নিজের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে আপস করে তাকে মেনে নিতে হবে ওই কামনালোলুপ বৃদ্ধ আর তার বিছানায় শয্যাশায়ী অর্ধাঙ্গিনীকে। ওই পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধের বিকৃত কামনার শিকার হয়ে তার শয্যাশায়ী স্ত্রীয়ের অভিশাপ কুড়িয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। মনে পড়ে গেল বহুদিন আগে তার ঠাকুমা কথায় কথায় বলতেন ‘ যাই করো আর তাই করো বিধেতা পুরুষের লেখন খন্ডাবে কে?বলি আগের জন্মের পাপের ফল ভুগবে কোন দাসী?’ কি নির্মমভাবে সত্যি কথাটা! বুক ফেটে একটা তীব্র দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো চারুবালার। চরম হতাশায় ওই আম গাছটার নিচেই শুয়ে পড়ল। দু চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জলের ফোঁটা।
-‘ হে ভগবান! তুমিই যদি বিধাতা পুরুষ হও তবে বলো আগের জন্মে কি পাপ করেছিলাম যে এই জন্মে তুমি আমাকে গরিবের ঘরের মেয়ে করে জন্মগ্রহণ করালে? শুধু মেয়ে না, গরিবের ঘরের কালো মেয়ে!’
আর ভাবতে পারছে না সে। প্রচন্ড তন্দ্রায় আর একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নভাব এসে ওর দুই চোখের পাতা ভারি করে দিচ্ছে। চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে দেখতে পেলে একটি আলোর শিখা। ক্রমশ: সেই আলোর শিখা বড় হয়ে এক জ্যোতির্ময় আগুনের শিখার রূপ নিল। সেই আগুনের শিখার মধ্যে সেই আগুনের মতই শ্বেতশ্মশ্রু সমন্বিত এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। দুই চোখ অর্ধ নিমীলিত। তার দিকে চেয়ে যেন অস্ফুটে হাসছেন। সেই হাসিতে মিশে আছে যেন অবুঝ সন্তানের প্রতি পিতার স্নেহ, প্রশ্রয় আর কৌতুক।



মুখের ওপর রোদ পড়তে ধড়মড় করে উঠে বসলো চারুবালা। কটা বাজে কে জানে? সারা রাত সে বাড়িতে ছিল না। গভীর রাতে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। সবাই নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছে। এতক্ষণে হয়তো ওর বাড়ির সবাই হন্যে হয়ে ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। পুলিশে খবর দেওয়াও বিচিত্র নয়। ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়ালো সে। বাড়িতে কি অভ্যর্থনা হবে সে তো বুঝতেই পারছে। আর এক প্রস্থ গালাগালি, ওর চরিত্র তুলে প্রশ্ন উত্থাপন এসব তো আছেই। আর এক প্রস্থ মারধর হওয়াও বিচিত্র নয়। এটাই এখন তার ভবিতব্য। মাথায় আর কোন বোধ কাজ করছে না। যন্ত্রচালিতের মতো বাড়ির দিকে পা চালালো সে। রেললাইন ছেড়ে আমবাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে। রেল লাইনের পাশে খালের মধ্যে কতগুলো অল্প বয়সী ছোকরা। বোধহয় প্রাতকৃত্য করতে এসেছিল। তাকে দেখে হঠাৎ সন্ত্রস্তভাবে নিজেদের সামলে নিয়ে তার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। চোখের পলক পড়ে না। এদের কি কোন সন্দেহ হয়েছে? এরা কি তবে বুঝে গেছে ও এখানে কি উদ্দেশ্যে এসেছিল? যাক গে। যা বোঝার বুঝুক এরা। ওর এখন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। ও তো জেনে গেছে ওর ভবিতব্য কি? হাঁটতে হাঁটতে আমবাগান পেরিয়ে একটা মোড় ঘুরে বাজারের মধ্যে ঢুকলো। কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার? বাজারের মধ্যে তখনই ছোট বড় দোকানে ক্রেতা বিক্রেতাদের বেশ ভীড়। কিন্তু যেখান দিয়েই যাচ্ছে সেখানেই মানুষের জটলা, তাদের কথোপকথন যেন স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজের কাজ ফেলে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। এটা কি ব্যাপার? এই বাজার তার আজন্ম পরিচিত। এখানকার ক্রেতা-বিক্রেতদের বেশীরভাগই তাকে চেনে স্থানীয় মেয়ে হিসেবে। এই বাজার দিয়েই তো ওর রোজ যাতায়াত। কই?অন্য দিন কেউ তো ফিরেও তাকায়নি! বিশেষ করে ওর এই কুশ্রী রূপের জন্য। অনেকে বিরক্ত হয়েছে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও করেছে। কিন্তু এইভাবে এত জনের মনোযোগ তো ও কখনোই আকর্ষণ করতে পারে নি। তবে কি? তবে কি ও সারারাত বাড়িতে না থাকার কথা এর মধ্যেই রাষ্ট্র হয়ে গেছে? সবাই কি তাকে ভাবছে দুশ্চরিত্রা যে গভীর রাতে বাড়ীর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে কোন গোপন অভিসারে গিয়ে নিজের মুখ কালো করে ফিরছে? ছিঃ ছিঃ! কি লজ্জা! কিন্তু তাহলে তো এদের চোখে থাকতো কৌতুহল ও ঘৃণা। তা তো সে দেখতে পাচ্ছে না। এ বাজারের মধ্যে অসংখ্য যুবক এবং মধ্যবয়সী পুরুষ যারা ওকে দেখেই নিজের হাতের কাজ ফেলে এক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে তাদের চোখে আছে সেটা যেটা যেকোন নারীই পুরুষের চোখে দেখতে চায়। সেই দৃষ্টিতে আছে মুগ্ধতা। যেন সকলেই ওর সঙ্গে কিছুক্ষন কথা বলতে পারলে ধন্য হয়ে যায় ।


১০
-‘এই চারু! সক্কাল সক্কাল কোথায় বেরিয়েছিলিস। শিগগির বাড়ী যা। ওদিকে গিয়ে দেখ হুলুস্থূলু কান্ড। সকাল থেকে তোর বাবা-মা তোকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তুই নাকি খুব ভোরে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিস। কোথায় গিয়েছিলিস?’
এতক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে থাকায় চারুবালা বুঝতেই পারেনি যে সে এতক্ষণে নিজের পাড়ার কাছাকাছি রমজান আলীর মাংসের দোকানের কাছে চলে এসেছে। সেখান থেকে বৃদ্ধ রমজান আলী তাকে দেখতে পেয়েই এই কথাগুলো বলছে। আবার বুকের মধ্যেটা ধক করে উঠলো চারুবালার। তাহলে তো ওর বাবা মায়ের জানতে বাকি নেই ও রাতেই ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে চলে এসেছে। না জানি আবার কোন লাঞ্ছনা আর নির্যাতন অপেক্ষা করছে ওর জন্য। বিশেষ করে ওর বাবার যে চন্ডাল রাগ আজকে একটা আস্ত চ্যালাকাঠ ভাঙবে ওর পিঠে। কিন্তু ও খুব ভোরে ঘর থেকে বেরিয়েছে এ কথাটা রমজান জ্যাঠাকে কে বলল? তবে কি ওর বাবা-মা ভেবেছে ও খুব ভোরে দরজা খুলে বেরিয়েছে?
-‘ একটু রেললাইনের ধারে গিয়েছিলাম জ্যাঠা বেতো শাক তুলতে।’ এই কথা বলতে বলতে এগিয়ে এসে রমজান আলীর সামনে আসতেই রমজান আলী চোখের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল চারুবালা। সত্তরোর্ধ্ব রমজান আলীও তার দিকে সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যে দৃষ্টিতে আছে পঁচিশ বছরের যুবকের মুগ্ধতা। শুধু রমজান আলীই নয় সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিজের পাড়ায় অন্তত: এরকম একশ জোড়া পুরুষ চোখের নীরব কামনা ও মুগ্ধতার শিকার হলো চারুবালা। আশ্চর্য! এরা তো এতদিন ওর দিকে কোনদিন ফিরেই তাকায় নি! একরাতে কি এমন যাদু মন্ত্র খাটল যে এরা সবাই এক নিশ্বাসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে যেন কোন হিন্দি সিনেমার নায়িকাকে চোখের সামনে দেখছে?


১১
-‘ চারু, মা আমার! কোথায় ছিলি সারারাত! আয় ঘরে আয়!’ বাড়ির কাছে আসতে আসতে ওকে দূর থেকে দেখতে পেয়েই হারান রিকশাওলা ছুটে এসে চারুবালাকে জড়িয়ে ধরল। একটা অদ্ভুত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল চারুবালা। ওর সঙ্গে ওর বাবার এইরকম ব্যবহার বোধহয় ওর জীবনে এই প্রথম। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছে ওর জন্ম থেকেই ওর বাবার বিরাগভাজন ও শুধুমাত্র কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন ওর কুশ্রী রূপটা প্রকাশিত হয়ে পড়ল তখন সেই বিরাগ আরো বাড়ে । সেই বাবা হঠাৎ করে তার সঙ্গে এরকম মধুর ব্যবহার করছে, এই সস্নেহ গলার সুরে কথা বলছে এ তার কাছে অভূতপূর্ব। কিন্তু না। তার বিস্ময়ের আরো অনেক বাকি ছিল।
বাবার সঙ্গে বাড়িতে আসতে আসতে তাদের ঝুপড়ির সামনে বিরাট একটা বিদেশী গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাকই হয়ে গেল। ঘরের মধ্যে ঢুকে প্রথমেই দেখল তাদের একমাত্র পরিষ্কার করে কাচা শতরঞ্জিটা যেটা সাধারণত তাদের পুরনো স্টিলের ট্রাঙ্কে ভাঁজ করে রাখা থাকে, সেটা পাতা আছে আর তার ওপর বসে আছেন দামি স্যুট ব্লেজার পরিহিত দুইজন ভদ্রলোক। একজনের একটু ভারিক্কি চেহারা। মাথা জোড়া টাক। কানের পাশে জুলপি পুরোটা সাদা হয়ে গেছে । চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। তার ঠিক পাশেই অত্যন্ত সুপুরুষ একটি যুবক। অতি আকর্ষণীয় চেহারা। দেখলেই মনে হয় অত্যন্ত অভিজাত এবং ধনী পরিবারের সদস্য এনারা। দুজনের সামনে তাদের বাড়ীর একমাত্র কাঁচের প্লেটে বেশ কয়েকটা মিষ্টি, কাঁচের গ্লাসে জল। কাঁচের গ্লাস অবশ্যই ওদের বাড়িতে একটাই। চারুবালা অনুমান করল আর একটা কাঁচের গ্লাস পাশে বাড়ি থেকে ধার করে আনা।
-‘হেঁ হেঁ হেঁ! এই আমার মেয়ে স্যার! ভারী ভক্তিমতি কিনা! সেই কোন ভোরে ওঠে চান করে পাড়ার শিব মন্দিরে গিয়েছিল পুজো করতে। এই কাছেই স্যার! এই হাঁ করে দেখছিস কি! কর কর! পেন্নাম কর! ইনি কলকাতার বড় ডাক্তার সমরেশ হালদার। গরিবের মা-বাপ! আর এই যে পাশে দেখছিস ইনিও খুব বড় ডাক্তার। একেবারে বিলেত ফেরৎ!ডাক্তার পরমব্রত হালদার। প্রণাম কর মা। আজ আমাদের সাত জন্মের ভাগ্যি যে এঁরা এই গরীবের ঘরে পায়ের ধুলো দিয়েছেন।’
এতক্ষণে বুঝতে পারলো। তাহলে এঁদের জন্যই ওর বাবার এত সুন্দর ব্যবহার। কিন্তু এনারা কারা? তাদের এখানে কেন? কি উদ্দেশ্যে? তাদের বাড়ির ঠিকানাই বা এনারা কি করে পেলেন? আর এনাদের প্রণাম করতেই বা হবে কেন? তবুও ওর বাবার কথা অনুযায়ী ঝুঁকে ওনাদের পায়ে হাত দিয়ে করলো চারুবালা।
-‘ থাক থাক মা! বেঁচে থাকো! ভাগ্যবতী হও! তাহলে হারান বাবু ওই কথাই রইল। এই অগ্রহায়নেই দিন ঠিক করে ফেলেন। না না। আপনি এক কাপড়ে শাঁখা সিঁদুর দিয়েই চারু মাকে আমাদের কাছে পাঠান। আমাদের আর কিছু চাই না। তবে হ্যাঁ, আমার এই নতুন চারু মাকেই কিন্তু আমার গোটা সংসার সামলাতে হবে। পরম কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মাতৃহারা।’
এ কি শুনছে সে? তার সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ হবে এই আপাদমস্তক সুন্দর, অভিজাত, সুমার্জিত, জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত এই রাজকুমারের সঙ্গে! সে স্বপ্ন দেখছে না তো?

(ক্রমশ:)

Author: admin_plipi