ফিমেল ওয়ার্ড -চারদিন : শিপ্রা তরফদার মজুমদার

নার্সিংহোমের ফিমেল ওয়ার্ড, সবুজ চাদর, ওষুধের গন্ধ, আর মানুষের নীরব কষ্টে ভরা একটি জগৎ। এই ওয়ার্ডে কাটলো নিবেদিতার জীবনের চারটে দিন। কিন্তু এই চারটি দিন যেন জীবনের পরম এক পাওয়া। হয়তো পাঠক পাঠিকার মনে হতে পারে পরম পাওয়ার অর্থ জীবন ফিরে পাওয়া, কিন্তু সেটাও ঠিক নয়।

প্রথম দিন -অনুষ্কার অপেক্ষা

নিবেদিতার পাশের বেডে ছিল ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে অনুষ্কা, বয়স তার দশ। বাচ্চা মেয়ে, তার টিউমার অপারেশন হয়েছে। মা মেয়েকে নিয়ে বেডে শুয়ে আছেন আর অনুষ্কা মা কে বলেই চলেছে, “মা বাড়ি কখন যাবো, পাপা কখন আসবে? ” মা জানেন তাঁদের থাকতে হবে আরও কিছুদিন কারণ অপারেশন হলেও বাচ্চা মেয়েটির শারীরিক কিছু জটিলতা আছেই। নিবেদিতা আজই ভর্তি হয়েছে, ওরও মনটা খুব খারাপ। ছেলে মেয়ে দূরে রয়েছে, দূর থেকে তারা মায়ের জন্য খুব টেনশন করছে। স্বামী বাড়িতে একা, তাঁর ও বয়েস হয়েছে। নিবেদিতাকে সালাইন দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে কিন্তু মনটা যে তার বাড়িতেই। রাতে চোখটা বুজে এসেছিল, মাথায় হাতের স্পর্শ, হাসিমুখে একজন নার্স, “ঘুমিয়ে পড়ুন। ” তারপর অনুষ্কার মাথায় হাত দিয়ে স্নেহের সাথে বলে, “কেন বাড়ি যেতে চাচ্ছো? আমরা সবাই আছি তো। আমাদের সাথে দুদিন থাকবে না? আমরা কি খুব খারাপ? ” অনুষ্কা হাসিমুখে মাথা নাড়ায়, “তোমরাও ভালো, আমি পাপার কাছে যাবো। ”

দ্বিতীয় দিন -বৃদ্ধার প্রলাপ

“ও বউমা, আমাক বাঁধিছো ক্যান? মুই চুর না ডাকাত, খুইল্লা দাও হাত খান।” নীল পোশাকের নার্স রা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসে। একজন বলে, „“ও দিদা, আমাদের চারজনের মধ্যে তোমার বউমা কে? ছেলেকে তো দেখলামই না। ” “উই যে মোর বউমা, খুলোতো মা হাত খান। উদিকে বুড়ার জ্বর, পরি রইছে ঘরে, চান করি খাওয়ামু বুড়াক, ছাড়ো মোক। ” “না দিদা, তোমার হাত খোলা যাবেনা, তুমি সব টেনে খুলে দাও। খাও তুমি, খুলে দেবো। ” “উঁহু তুরা মিথ্যা কইছিস, ও রাজু, বাপ মোর, আয় তো বাপ। ” নিবেদিতা অনুভব করে বৃদ্ধার কষ্ট। নিউরো প্রবলেম বেচারির। শরীর মোটামুটি সুস্থ। তাই জোড় করেই বেড থেকে নেমে যেতে চায়। অগত্যা বৃদ্ধার হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছে। “নাও দিদা খাও তো এখন, ” একজন নার্স এগিয়ে যায়। “মুই খামু না তুদের পচা ভাত, মুই ইলিশ মাছ খামু। ” ওরা সেবিকা, তাই হাসিমুখে শেষপর্যন্ত ভুলিয়ে ভালিয়ে ঠিক খাইয়ে দেয় বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা ফ্যালফাল করে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে, তারপর রেগে ওঠে হঠাৎ, “আমাক খাওয়াস ক্যান তুরা, উদিক বুড়া না খায়ে পরি রইছে জ্বরে। ছাড় তুরা মোক। ”

তৃতীয় দিন -সাহসী নীলিমা

নীলিমা একজন ওয়ার্কিং ওম্যান। জন্ডিসের পর পেটে জল জমে গিয়েছে। দুপুরে উঁনার পেট থেকে চার লিটার জল বের করা হয়েছে। মহিলার শরীর দূর্বল কিন্তু হাসিখুশি। মহিলার স্বামীও অমায়িক। এতো টেনশন এর মধ্যেও ভিজিটিং আওয়ার্স এ এসে স্ত্রীর সাথে মজা করতে ছাড়েনা।নিবেদিতা পরে নীলিমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি এতো শক্ত কীভাবে? ” নীলিমা হেসে উত্তর দেয়, “ভয় পেলে রোগ জিতবে আর আমি হাসলে রোগ হারবে। ” অল্পবয়েসি নার্সরা ডেডিকেশন এর সাথে ডে ডিউটি নাইট ডিউটি করছে কিন্তু কোনো ক্লান্তি নেই। নিবেদিতা শুয়ে শুয়ে ওদের কাজ দেখে আর মন থেকে ওদের ত্যাগকে শ্রদ্ধা করে। রাতে ওদের একজন নীলিমার মনের জোড় আর হাসিমুখ দেখে প্রশংসা করে, সাহস দেয় ওকে।

চতুর্থ দিন -বিদায় বেলা

আজ সকালে ডাক্তার এসে ডিসচার্জ করে দিয়ে গেছেন নিবেদিতাকে। মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে ঘরে ফিরবার জন্য। গতকাল নববর্ষ ছিল, স্টাফরা যখন একে অপরকে নববর্ষ বলছিল, নিবেদিতার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসেছিল, এরকম একটা দিনে বন্দী হয়ে থাকার জন্য। পরে নিজের মনকে বুঝিয়েছে সে, “আরও অনেক রোগী আছে এখানে, তাঁদের শারীরিক, মানসিক যন্ত্রনা ওর চেয়ে অনেক বেশি, তবুও ওরা নীরবে সব সহ্য করছে। মাঝে মাঝে তীব্র ওষুধের গন্ধ মনটাকে ভারাক্রান্ত করছে, চারদিন ধরে স্নান নেই, একইভাবে সে পরে রয়েছে। কিন্তু যখন দেখছে মাসিরা নিজে হাতে সবার নোংরা পরিষ্কার করছে, তার মাঝেও হাসছে, তখন নিবেদিতার কষ্ট যেন কোথাও উধাও হয়ে যাচ্ছে। সারাটা দিন একই ঘরে কতো কিছুই না হচ্ছে, কাউকে ওটি তে নিচ্ছে, তো কেউ নতুন ঢুকছে, আবার কেউ হাসিমুখে ছুটি পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ যেন অন্য পৃথিবী, এরই মাঝে বিএসসি নার্সিং স্টুডেন্টস সেবাও করছে আবার পড়াশোনাও করছে দাঁড়িয়ে, এসাইনমেন্ট লিখছে। অবশেষে এলো বিদায়ের মুহূর্ত। একজন নার্স এগিয়ে এসে বললো, “সময়মতো ওষুধ খাবেন, নিজের খেয়াল রাখবেন। ” কতো মমতা ওর গলায়, অথচ এখান থেকে বেরিয়ে যাবার পর জীবনে হয়তো ওর সাথে নিবেদিতার আর দেখাই হবেনা। হুইল চেয়ারে করে যখন নিবেদিতাকে হসপিটালের গেটের কাছে আনা হোলো, সামনের রাস্তায় কতো গাড়ি, লোকজন, আলো। এ যেন আরেক পৃথিবী। একবার পেছন ফিরে দেখলো নিবেদিতা, অদ্ভুত এক বিষন্নতায় মনটা ভারাক্রান্ত হোলো, মনে হোলো চারদিনের কিছু কাছের মানুষের সঙ্গ ছেড়ে চিরদিনের মতো বেরিয়ে এলো সে, আর হয়তো কোনোদিন দেখা হবেনা ওই পরিবারটির সাথে তার।

(সমাপ্ত )

Author: admin_plipi