[ তুমি ] প্রথম পর্ব – অন্ধকারের ভোর : শিপ্রা তরফদার মজুমদার

ভোর তখনো পুরোপুরি হয়নি। আকাশটা ধূসর যেন আলো আর অন্ধকারের সীমানা। আমি বিবেক, দেখছিলাম বস্তির সরু গলিটা দিয়ে হাঁটছিলে তুমি। কিছুদিন ধরেই তোমার মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে চেপে বসেছে, ভোরে উঠে হাঁটতেই হবে। কোথাও নোংরা জল জমে আছে, কোথাও প্লাস্টিকের ছাউনি থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। ওই যে তোমার বাড়ি। তুমি তো এখন ক্লাস টেনের ছাত্র, এখানেই চলছে তোমার বাঁচার লড়াই। কালকে রাতে তোমার বাবা বাইরে থেকে গিলে এসে তোমার মা কে বেদম মেরেছে। এতো গিলেও শক্তি পায় কোথা থেকে কে জানে, তুমি অবশ্য দা নিয়ে ছুটে গেছিলে বাবাকে কেটেই ফেলবে কিন্তু মায়ের চোখের আকুতি শেষপর্যন্ত তোমাকে থামিয়ে দিয়েছে। তুমি পাশ ফিরে শুয়ে খুব কাঁদছিলে লুকিয়ে আর ওদিকে তোমার মা ও কাঁদছিলো চুপিচুপি। সকালে আবার মা ঠিক সময়মতো তোমাকে ডেকে দিয়েছে, “ও হরি, উঠ বাবা, হাঁটবি বলে তুই।” তুমি চোখ মেলে তাকালে। মাথার উপরে টিনের ছাদ, গত রাতের বৃষ্টিতে এখনো ভেজা। এক কোনে তোমার বইগুলি পলিথিনে মোড়া। তুমি তো জানোই ওগুলো তোমার সম্পদ। মায়ের ডাকে তুমি সাড়া দিলে, “মা থাক, কাল যাবনি। ” “সে কি বাবা, মন যখন করছে, উঠো, একটু হাঁটে আসলে ঘুম ভাঙবেনি। ““ মা, তোমার কেন সকালে ঘুম ভাঙে, সারা রাত তুমি কাঁদলে, আমি জানি।”  “ওসব তো রোজই হয় বাপ, তাই বলে শুয়ে থাকলে আমার চলবে? ” তুমি আর কথা বাড়াও নি। হাঁটতে বের হয়েছো এই গলি দিয়ে। ফিরে এসে তুমি পলিথিন থেকে বই বের করলে। পাতাগুলো একটু ভিজে গেছে, কিন্তু অক্ষর গুলো বোঝা যাচ্ছে ঠিক তোমার স্বপ্নের মতো, ভেজা কিন্তু মুছে যায়নি। বাইরে তখন অল্প আলো ফুটেছে। টুকরো আলো টিনের ফাঁক দিয়ে তোমার বইয়ের উপরে এসে পড়েছে। হয়তো এটাই তোমার ভোর, অন্ধকারের মাঝে টুকরো আলো খুঁজে পাওয়া। মা এক থালা ভাত আর লবন এনে মুখের সামনে ধরে, “খা বাপ, তারপর পড়, শক্তি পাবি। তুমি নিমেষে শেষ করে দিলে এক থালা ভাত, রাতে ঠিকমতো পেটটা যে ভরেনি। মা উদাস হয়ে বলে, তুই পড় মন দিয়ে, তোর আশায় আমি বাঁচি যে। তুই না পড়লে তোর জীবনও যে আমাদের মতো পোড়া হবে। “মা এর শেষ কথা তোমাকে যেন ভেতর থেকে কাঁপায়। তুমি পড়ছো, সমস্ত মনটা দিয়ে, আমি দেখছি। বাইরে এখনো ভাঙা রাস্তায় কাদার উপর দিয়ে বস্তির ছেলেমেয়ের আনাগোনা চলছে, কেউ উঁকি দিচ্ছে তোমার জানালায়, কিন্তু তোমার সারা মন শুধু পড়ায়। অন্ধকার গভীর হলেই আলো ফোটে, তুমি কিন্তু হাল ছেড়োনা।                 ক্রমশঃ

Author: admin_plipi