আমার বৃষ্টিভেজা স্মৃতির পাতা

 

 

আমার বৃষ্টিভেজা স্মৃতির পাতা

লেখা- রাজনন্দিনী
ছবি – অভিজিৎ ধর

 

 

ভোররাতে হঠাৎ বাজ পড়ার শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। কান পাততেই শুনতে পেলাম, বাইরে বেশ ভালো জোরেই বৃষ্টি নেমেছে। অথচ সন্ধ্যে রাতেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। বৃষ্টি নামার কোন আগাম পূর্বাভাস ছিল না। মাঘ মাসের প্রায় মাঝামাঝিতেও এবার খুব একটা ঠান্ডা না পড়ায় ভেবেছিলাম ঠান্ডা বুঝি কমে গেল। কিন্তু এই বৃষ্টির জন্য ঠান্ডাটা আবার ঠিক জাঁকিয়ে পড়বে নতুন করে, বুঝতেই পারছি। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালেও একটানা অবিরাম বৃষ্টি পড়েই চলেছে। বিছানা থেকে উঠে, ফ্রেশ হয়ে, এক কাপ গরম কফি হাতে নিয়ে স্বচ্ছ কাচের পাল্লাটানা জানালাটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে তখন গাছপালা, রাস্তাঘাট, গাড়ি-ঘোড়া সব ভিজছে। অনেকদিন পর শুষ্ক প্রকৃতি আবার যেন সিক্ত হচ্ছে। বেশ লাগছে গাছের পাতা থেকে টুপটাপ জলবিন্দু পড়তে দেখতে। বৃষ্টি যেমন খুব পছন্দের আমার কাছে, ঠিক তেমনই খুব অপছন্দের ও বটে।

সারাটা দিন কখনো ঝিরঝির…কখনো ঝমঝম বৃষ্টি হয়েই চলেছে এক নাগাড়ে। নিউজে দেখাল নিম্নচাপের বৃষ্টি, চলবে বেশ ক’দিন। আজ এমনিই ছুটির দিন,তার ওপর এই বৃষ্টি যেন চারপাশটাকে আরো বেশি নিঝুম করে তুলেছে! রুমেলাদি রান্না আর ঘরের কাজ সেরে চলে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হল। একা একা ছুটির দিন গুলো বড্ড বেশী বোরিং হয়ে যায় আমার, ভালো লাগে না একা একা বাড়িতে। টিভি দেখতেও বেশিক্ষণ মন চায় না। লাঞ্চ সেরে, খাবার বাসন সিঙ্কে নামিয়ে রেখে, শোবার ঘরে গিয়ে পছন্দের একটা গল্পের বই নিয়ে বসলাম। কিন্তু কিছুতেই মন বসল না। বারবার জানলার ওপারে বৃষ্টির ধারার দিকে চোখ চলে যেতে লাগল… আর মনে পড়ে যেতে থাকল বৃষ্টি দিনের একের পর এক নানান স্মৃতি…।

সেই ছোট্টবেলায় যখন বৃষ্টি হতো এমন, বাবার হাতে বানিয়ে দেওয়া কাগজের ছোট্ট ছোট্ট নৌকো বৃষ্টির জলে ভাসিয়ে এক অনাবিল আনন্দ পেতাম। সেসব দিনে মায়ের হাতের তৈরি গরম গরম খিচুড়ি, ওমলেট, পাঁপড় ভাজা রান্না হ’ত বাবার আব্দারে। তিনজনে মিলে জমিয়ে দুপুরের খাবার সেরে, কাঁথার নিচে মা-বাবার মাঝে শুয়ে, বাবার কাছে হরেক রকম গল্প শুনতে শুনতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়তাম। মা-বাবাও আজ আর নেই, সেসব দিনও আর নেই। আজ সবই শুধু স্মৃতির পাতায় আবদ্ধ সুন্দর কিছু সোনালী অতীত।

মনে পড়ে যাচ্ছে একটু বড় হওয়ার পর বৃষ্টির দিনে কাকভেজা হয়ে স্কুলে পৌঁছতেই রেইনি ডে হয়ে যাওয়ায় বন্ধুরা মিলে মাঠের জমা জলে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করার কথা…. সে এক দারুন আনন্দ! আর তারপর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরা। সেইসব সুন্দর দিনগুলি মনে পড়লেই যেন আবার ছোট্ট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ফিরে পেতে ইচ্ছে হয় হারিয়ে যাওয়া সেই শৈশব। কিন্তু সেটা যে বড়ই দুষ্কর।

আর আমার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা… সেও যে এই বৃষ্টিকে ঘিরেই। কলেজ লাইফে পিয়াসের সাথে প্রথম বৃষ্টি ভেজা হয়ে বাড়ি ফেরার স্মৃতি আজও মনে পড়লে এক আলাদা শিহরণ খেলে যায় পুরো শরীরে আমার, এক দারুণ ভাললাগা কাজ করে তখন, ঠিক যেমন এখন করছে…! সেই প্রথম ওর উষ্ণ হাতে আমার বৃষ্টিভেজা হাত নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে ওঠা, “আরশি তোকে খুব ভালোবাসি…” মনে পড়তেই আজ এত বছর পরেও লজ্জায় গায়ে কাঁটা দিল যেন!

ভালো লাগার হাসি মুখে লাগিয়ে রেখে ভেবে চলেছি অনেক টুকরো টুকরো মিষ্টি মধুর কথা…। হঠাৎ দমকা হাওয়ার মত চোখের সামনে ভেসে উঠল বছর চারেক আগের এমনই এক শেষ বিকেলের বৃষ্টি ভেজা কিছু স্মৃতি… যা আমার জীবনটাকে পুরোটাই ওলট-পালট করে দিয়েছিল।

সেদিনও এমন বৃষ্টি পড়ছিল… পিয়াস এর ফোন পেয়ে ছুটে গিয়েছিলাম আমাদের চেনা পরিচিত কফি হাউসের সামনে। সেদিন কেমন অন্যরকম দেখাচ্ছিল ওকে! উস্কো-খুস্কো চুল, চোখ দুটোতে ভীষণ কষ্ট। আমার ডান হাতটা ওর দু’হাতের মুঠোয় ধরে বুকের কাছে নিয়ে বলেছিল,“সরি আরশি, পারলাম না রে তোকে স্বীকৃতি দিতে, আমায় ক্ষমা করে দিস পারলে…।” এই কথা ক’টা বলেই, এক নিমেষে পিয়াস নিজের হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল কোনদিন আর মুখোমুখি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সেই মুহূর্তে যেন আকাশের বিদ্যুতের ঝলকানি আমার বুকে এসে বিঁধেছিল। অভিমানে, কষ্টে হারিয়ে ফেলেছিলাম সেদিন নিজেকে!

হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি মুখে এসে পড়ায় ঘোর কাটে আমার। খুব কাছেই কোথাও একটা বাজ পড়ল মনে হয়! বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরে চলেছে অঝোর ধারায়, সাথে আমার দুচোখ বেয়েও…।

You May Also Like

Author: admin_plipi

6 thoughts on “আমার বৃষ্টিভেজা স্মৃতির পাতা

  1. এমন অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় সকলের জীবনের একটা অধ্যায়।

  2. শৈশব সদাই সুখকর স্মৃতির উদ্রেক করে। আমরা নস্টালজিক হয়ে যাই।

  3. ভালো লাগলো পড়ে। প্রথমবার এই সাইট টা দেখলাম। বেশ ভালো। সব লেখা পড়া যাচ্ছে না। কি করে পাবো?

Leave a Reply

Your e-mail address will not be published.