মরচে ধরা রহস্য (পর্ব ৬ )


মরচে ধরা রহস্য (পর্ব ৬ )
লেখা : শান্তনু দাস
প্রচ্ছদ : অনিন্দিতা রায় কর্মকার

আগে যা ঘটেছে

সোমনীল বাবু এক নারীকে দেখে অজানা আতঙ্কে মারা গেলেন। ইন্দ্রদার ঘরে সেই নারী মার্টিনা ক্যাম্পবেল এসে গুপ্তধনের ধাঁধা সমাধানের জন্য শাঁসিয়ে যায়। খোঁজখবর করে জানা গেল, সোমনীল জীবনের বেশ কিছু সময় আমেরিকায় কাটিয়েছেন। তাহলে কি ওনার সঙ্গে মার্টিনার কোন যোগসূত্র রয়েছে? শেষ পর্যন্ত ইন্দ্রদা গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে গেল, কিন্তু সোমনীলের হারমোনিয়ামের ভিতরে মার্টিনার ছবি লুকিয়ে রাখা কেন?

তারপর…

পর্ব ৬ – পরদিন বিকেলে

-“মানেটা পরিষ্কার, ইন্দ্রজিৎ সান্যাল। আই ওয়ান্ট দা ট্রেজার বাট ইউ হ্যাভ চিটেড মি। আপনিই গিয়েছিলেন সে রাত্রে সোমনীলবাবুর ঘরে। আই এম টকিং এবাউট দ্যাট নাইট ইউ নো। আই অ্যাম নট ফুল মিস্টার সান্যাল। নাউ লিস‌্ন কেয়ারফুলি, বিপিন ইজ মাই আন্ডার। আপনি কিন্তু ঠিক করলেন না।”
-“হোয়াট আই হ্যাভ টু ডু?” ইন্দ্রদা বলল ।
-“জাস্ট কাম অ্যাট ফোর থার্টি পিএম, সোমনীল বাবুর ঘরে। ডোন্ট ট্রাই টু বি ক্লেভার।”
মার্টিনার ফোনটা কেটে যাবার কয়েক সেকেন্ড পর পর্যন্তও ইন্দ্রদা কান থেকে রিসিভারটা নামায়নি। ওর চোখে মুখে উত্তেজনার ভাব স্পষ্ট। চটজলদি পোশাক চেঞ্জ করে আমরা বিফোর টাইম সোমনীল বাবুর বাড়ি পৌঁছলাম। আমি জানি ইন্দ্রদা রিভলবার সঙ্গে নেয় নি। কি যে হতে চলেছে তা একমাত্র ভগবানই জানেন। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলল মার্টিনা। হাতে তার উদ্যত রিভলবার। চোখের কোনে রাগ অঙ্গারের মত জ্বলছে।
-“কাম কাম মিস্টার সান্যাল। আপনার স্যাটেলাইটটাকেও সঙ্গে এনেছেন দেখছি। আপনারা তো দেখছি অ্যাকশন থ্রিলার মুভি এনজয় করতে এসেছেন। হ্যান্ডস আপ…”
-“বিপিন বাবু কোথায়?” ইন্দ্রদা ঠান্ডা গলায় গর্জে উঠল।
-“ইউ মাস্ট নট বি সো কুইক ডিটেকটিভ।”
-“হোয়ের ইজ হি?”
-“কুল ডাউন মিস্টার সান্যাল। আগে আমার হিডেন ট্রেজার।”
আমরা পাশের রুমে এলাম, যে রুমে হারমোনিয়ামটা আছে। আমার আর ইন্দ্রদার হাত তখনো ওপরে তোলা। সেখানে একটা চেয়ারের সঙ্গে মুখ হাত পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছেন বিপিনবাবু, চোখদুটোর কোনে জমা জল শুকিয়ে শুকিয়ে লালচে হয়ে গেছে। ইন্দ্রদা কোনোরকম কথা না বাড়িয়ে হারমোনিয়াম এর রিড গুলো টিপে দিতেই একপাশের কাঠটা আওয়াজ করে খুলে গেল। মিস মার্টিনা একদৃষ্টে চেয়ে আছে হারমোনিয়ামটার দিকে। বিপিনবাবু সহ আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছি ইন্দ্রদার কার্যকলাপ দেখে। এর পরের ঘটনাটা সেই মুহূর্তে কল্পনাই করতে পারিনি।
মিস মার্টিনা রিভলবার উঁচিয়ে রেখে দরজার দিকে এক পা এক পা করে পেছাতে পেছাতে কথাগুলো বলে চলল, “থ্যাংক ইউ, ইন্দ্রজিৎ সান্যাল। আমি শুধু এটুকুই জানতে চেয়েছিলাম। আই হ্যাভ নো উইস টু টেক দিস হেল। এটা তো বিপিন চ্যাটার্জির। অবাক হচ্ছেন তাই না? ইউ আর নট মাই এনিমি। অ্যাকচুয়ালি বিপিন ইজ নট মাই এনিমি অলসো। ইউ কান্ট অ্যারেস্ট মি মিস্টার সান্যাল… ইউ কান্ট অ্যারেস্ট মি।”
কথাগুলো বলতে বলতে মিস মার্টিনা দরজার বাইরে চলে গিয়েছিল। ও দরজা বাইরে থেকে লক করে দিল। শেষপর্যন্ত তিনজনে মিলে দরজা ভেঙে বাইরে এলাম। ততক্ষনে মিস মার্টিনা উধাও। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার মাথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে বিপিনবাবুকে ওনার বন্ধুর বাড়িতে হল্ট করিয়ে আমাদের বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কেন জানি না ইন্দ্রদা পুলিশে একবারও ইনফর্ম করল না।
ঘরে পৌঁছে ইন্দ্রদা সোজা ওর অতি পরিচিত টেবিলটার পাশে চলে গেল। ওর মস্তিষ্কে কি চলছে তা আন্দাজ করা বেশ মুশকিল। আমি হাত পা ধুয়ে দুটো চিকেন প্যাটিস গরম করে ইন্দ্রদার সামনে এলাম। ও তখনও পোশাক চেঞ্জ করেনি। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কখনও আবার বসছে, হাতে সেই মিস মার্টিনার ফটোটা। ঘড়িতে সাতটা বাজতে দশ মিনিট। এই মুহূর্তে ঘরের মধ্যে ঘড়ির টিকটিক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। ইন্দ্রদা আমার হাত থেকে একটা প্যাটিস নিয়ে ছবিটা আমার হাতে দিয়ে বলল, “বলতো ছবিটা কার?” মনে মনে ভাবলাম, অবভিয়াসলি ঝিলিকদির তো নয়। কিন্তু মুখে কিছু বললাম না কারন ইন্দ্রদাকে এর আগেও দেখেছি কোনো একটা অবভিয়াস কোশ্চেন এর আনসার জানতে চেয়ে নিজে অন্য কিছু ভাবতে বসে যায়। আমি চুপ করে আছি দেখে ইন্দ্রদাই আবার শুরু করল, “আমার যতদূর মনে হয় সৌম্য, এই ছবিটা মার্টিনা ক্যাম্পবেল এর নয়। কারন ছবিতে এই তরুণী নাকে একটা দুল পড়ে আছে। মিস মার্টিনার নাকে এরকম দুল দেখা তো দূরে থাক, ভালভাবে লক্ষ্য করেছি ওর নাকে কোনো ফুটোই নেই।”
-“কিন্তু ছবিটা কার? মার্টিনা ছাড়া তো অন্য কেউ মনেও হচ্ছে না। আর ছবিটা বেশ পুরনো।”
-“ছবিটা কার এইমুহূর্তে আমার কাছে অস্পষ্ট। তবে দুটো প্রশ্নের উত্তর যদি আমি পেয়ে যাই তাহলে আমার অনুমানই ঠিক বলে আমি মনে করব। এখন চল।”
-“কোথায়?”
-“গরম গরম চিকেন প্যাটিসের পর একটু কফি না হলে জমে?”
-“কিন্তু যাবে কোথায়?”
-“দমদম।”
-“মানে?”
-“মানে দমদম এয়ারপোর্ট। মাথার ঘিলুগুলো তোর শুকিয়ে গেলে নাকি, একটু বুদ্ধিটা লাগা।”

এয়ারপোর্টে গিয়ে খবর পেলাম আজ সাড়ে সাতটার ফ্লাইট যেটাতে করে মার্টিনার আমেরিকা যাওয়া যেতে পারে তা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বাতিল করা হয়েছে। যাত্রীরা সব হোটেলে আশ্রয় নিয়েছে। ইন্দ্রদা এয়ার অফিসে প্যাসেঞ্জার লিস্টটা চেয়ে নিল একবার। যা সন্দেহ করা হয়েছিল ঠিক তাই। মিস মার্টিনা আজই আমেরিকা যাবার প্ল্যান করেছে। কিন্তু কোন হোটেলে আছে তা জানতে তো অনেক সময় লাগবে। কিন্তু সমস্যা সমাধান হতে বেশি সময় লাগল না। এয়ারপোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডগুলোতে প্রত্যেকের কাছে খোঁজ নিতে নিতে জানা গেল এক ড্রাইভার এক বিদেশিনীকে শুকতারা হোটেলে নামিয়ে এসেছে। ইন্দ্রদা পকেট থেকে ফটোটা বের করে দেখাতেই ব্যাপারটা আরো ক্লিয়ার হল। পনেরো মিনিটের মধ্যে শুকতারা হোটেল কমপ্লেক্সে পৌঁছে গেলাম। হোটেল সুপারের কাছে নেম লিস্টটা চেয়ে দেখা গেল মার্টিনা ক্যাম্পবেল, রুম নম্বর ৫৩৭, ফিফথ ফ্লোর। আমরা পৌঁছে গিয়েই কলিং বেল বাজালাম। ভেতর থেকে মার্টিনার আওয়াজ এল, “হু ইজ দিস?”
-“ইন্দ্রজিৎ সান্যাল। প্লিজ ওপেন দা ডোর।”
কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই। ইন্দ্রদা দ্বিতীয়বার কলিংবেল টিপতেই রুমের ভেতর থেকে একটা গুলির আওয়াজ শোনা গেল, সেই সঙ্গে মিস মার্টিনার আর্তনাদ। ততক্ষনে পাশের রুমের কয়েকজন এবং রিসেপসনের বেশ কিছু লোক দরজার সামনে চলে এসেছে। ইন্দ্রদা অবশ্য আমাদের পরিচয় রিসেপশনে দিয়েই পাঁচতলায় এসেছিল। ইন্দ্রদা সবার উদ্দেশ্যে বলল, “প্লিজ হেল্প মি, দরজাটা ভাঙতে হবে। ভেতরে মনে হয় একটা সুইসাইড হয়েছে।”

ইন্দ্রদা ছিল বলেই প্রথমে কেউ পুলিশে খবর দেয় নি। দরজাটা ভাঙা হল। দেখি মেঝের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে মার্টিনা, লোরিয়েল করা চুলগুলো মেঝেতে ছড়ানো। ডান হাতে ধরা রিভলবারটা। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ঘটল আবার এক অভাবনীয় ঘটনা। ইন্দ্রদা আধবসা অবস্থায় মার্টিনাকে পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছিল। তখনই মার্টিনা হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ইন্দ্রদার কপালে রিভলবার ঠেকিয়ে দিল। উপস্থিত সবাই তখন হতচকিত।
মার্টিনা ক্যাম্পবেল গর্জে উঠল অন্যদের দিকে তাকিয়ে, “আপনারা যে যার কাজে যান… গো ব্যাক… আই সে গো ব্যাক। পুলিশে ইনফর্ম করলে খুব বড় বিপদে পড়বেন।”
ইন্দ্রদার চোখের ইশারাতে সবাই পিছিয়ে গেল। আমাদের দুজনকে রুমে রেখে মার্টিনা রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। ইন্দ্রদার কপালে রিভলবার ঠেকানো, আর আমার হাত ওপরে।
-“এখন বলুন ইন্দ্রজিৎ সান্যাল, হোয়াই আর ইউ ডিস্টার্বিং মি টিল নাউ? আই রিপিট ইউ, ইউ কান্ট অ্যারেস্ট মি… ইউ কান্ট।”
-“আমি আপনাকে অ্যারেস্ট করতে আসিনি। আমাদের দুজনের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। ইউ মে চেক আপ। এখন কপাল থেকে রিভলবারটা সরিয়ে আমার তিনটে প্রশ্নের উত্তর দিন তো। আই প্রমিস ইউ, আফটার দ্যাট আই উইল নট ডিসটার্ব ইউ এনি মোর। ইউ মে গো ব্যাক টু আমেরিকা।”
মার্টিনা রিভলবারটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “আমি আপনাকে সারেন্ডার করব না মিস্টার সান্যাল। আই লাইক ইওর জব, অ্যান্ড আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইওর ইন্টেলিজেন্স। দ্যাটস হোয়াই আই এম অ্যানসারিং ইউ। বাট মাইন্ড দ্যাট অনলি থ্রি কোশ্চেন।”
-“আই অলসো অ্যাপ্রিসিয়েট ইওর অ্যাক্টিং। তিনটে প্রশ্নই করবো, ইউ হ্যাভ টু আনসার ইন ইয়েস অর নো। মাই ফার্স্ট কোশ্চেন, আপনিই সেদিন পাঞ্জাবি ড্রাইভার সেজে আমাদের টাটা সুমোতে করে সোমনীল বাবুর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন, তারপর ফলো করছিলেন গাছের আড়াল থেকে, তাই তো?”
-“ইয়েস।”
-“মাই সেকেন্ড কোশ্চেন, জুল কি আপনার মা? আই মিন আর ইউ হার ডটার?”
-“ইয়েস, বাট…”
মার্টিনা অবাক। আমিও শুনে কম অবাক হই নি। ইন্দ্রদার শেষ প্রশ্নটা শুনে আমার কৌতূহল দ্বিগুন বেড়ে গেল এবং গোটা রহস্যটাই পুনরায় আবার ঘোলাটে হয়ে গেল।
-“মাই লাস্ট কোশ্চেন মিস মার্টিনা, ইউ আর অ্যান এমিনেন্ট ডিটেকটিভ অফ আমেরিকান ক্রাইম ব্রাঞ্চ, অ্যাম আই রাইট?”
-“ইয়েস… বাট বাট… আমি…”
-“থ্যাংকস। আমরা তাহলে এখন চলি। শুধুমাত্র এইটুকু জানবার জন্যই এখানে এসেছিলাম। আন্দাজের সঙ্গে বাস্তবতাকে মেলাতে পেরে ভাল লাগছে। আই নো ইউ আর নট গিল্টি। আর একটা কথা, আপনি অবাক হচ্ছেন এটা ভেবে যে এতসব ইনফরমেশন আমি কোথা থেকে পেলাম, তাই তো? আমি আপনাকে বলেছিলাম না, দৃষ্টিশক্তি আর বুদ্ধির প্রখরতা এ দুটো আমার সেরা অস্ত্র। ইউ দেন টোলড আস আমাদের নাকি শুট করে ইন্ডিয়ার নোংরা গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন। ফর ওয়ান ক্যারেক্টারলেস পারসন ইউ আর হেটিং দা হোল ইন্ডিয়ান, এটা আপনার মত শুট বুট পরা আমেরিকান ডিটেকটিভদের শোভা পায় না। আর আপনাকে ডিস্টার্ব করব না, চল সৌম্য।”
-“দাঁড়ান, ইন্দ্রজিৎ বাবু। ইউ আর রিয়েলি অ্যামেজিং ডিটেকটিভ অফ বেঙ্গল। আপনিই বুঝতে পারবেন আমার পাস্ট হিস্ট্রিগুলো। আমি জানি না আপনি আমার সম্পর্কে কতটুকু জেনেছেন, তবে এটুকু জানি ইউ হ্যাভ এন এক্সট্রা অর্ডিনারী আই সাইট। এই নিন আমার পারসোন্যাল ডায়রি, এতে সবকিছু লেখা আছে, আপনার পুরোটা জানার অধিকার আছে। মাই লস্ট পাস্ট। তবে বিপিনকে এ ব্যাপারে কিছু বলবেন না প্লিজ।”
-“ সে ব্যাপারে আমার ওপর পুরো আস্থা রাখতে পারেন।”
-“বিলিভ মি, সেদিন আমি চাইনি সোমনীলবাবু মারা যান।”
-“আই নো দ্যাট। অতটা নিষ্ঠুর আপনি নন।”
মার্টিনার চোখটা সামান্য ছলছলিয়ে উঠল। দু ফোঁটা চোখের জল টপটপ করে চকচকে মেঝেতে পড়ে গেল। সেদিকে তাকালও না মিস মার্টিনা। আমরা তখন দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছি। ইন্দ্রদার হাতে চওড়া নীল মলাটের ডায়রি।

চলবে …

Author: admin_plipi

4 thoughts on “মরচে ধরা রহস্য (পর্ব ৬ )

  1. বেশ পেঁচাল। কি ভাবে কি হলো বোঝা যাচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.