সিঁদুর

সিঁদুর ।। লেখা : রুমি বন্দ্যোপাধ্যায়

সিঁদুর

রুমি বন্দ্যোপাধ্যায়

দু’বছর হল ললিতার স্বামী হঠাৎই গত হলেন। সময়টাও তাই আর আগের মত তেমন অনুরাগ প্রিয় রইল না। লাল রং বড় পছন্দের ছিল তাঁর। এই‌ বয়েস‌ও এক মাথা সিঁদুর পড়তেন তিনি, সাথে একটা বড় টিপ। স্বামী মারা যাওয়ার পর তার সেগুন কাঠের আলমারিটা খুঁজে মাত্র তিন খানা শাড়ি পেয়েছিলেন যাতে লালের ছোঁয়া নেই। অমিত চলে যাওয়াতে তাঁর ভারী কষ্ট হয়েছিল কিন্তু তার থেকেও বেশি কষ্ট হয়েছিল ঐ সিঁদুরটুকু উঠিয়ে ফেলতে। বহুদিন আয়নাতে নিজেকে দেখতেন না তিনি। এখনো আলতা, সিঁদুর বড় প্রিয় তাঁর। বাড়িতে কেউ না থাকলে একখানা লাল টিপ মাঝে মাঝে পরেন উনি। একদিন তাঁর নাতনি দেখে ফেলেছিল, বলেছিল “ঠাপ্পি, টিপ পরলে তোমাকে কি সুন্দর লাগে!” ললিতা হেসে বলেছিলেন, “জানি।” তবে জেনেও কেন যে আর লাল পরতে পারেন না… সেটা তাঁর পুত্রবধূ মধুশ্রী আড়ালে হাসবে বলে, ছেলে অতনুর ভ্রূতে একটা নতুন ভাঁজ পড়বে বলে, নাকি নিজের আজন্ম লালিত সংস্কারের দোষে তা কখনও খতিয়ে দেখেননি তিনি। শুধু সবকিছু অভ্যাস করে নিয়েছেন। তাই বোধহয় আজকাল একটু খিটখিটে হয়ে গেছেন, একথা মধুশ্রী বলে আড়ালে।
মধুশ্রী একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। যদিও ললিতার মনে হয় ওই অল্প মাইনের চাকরিটা অনেকটাই ড্রেসিং টেবিলে সাজিয়ে রাখা অতিরিক্ত গয়নার মতো,পরলে চলে তবে না পরলেও বিশেষ কিছু যায় আসে না। কিন্তু সে খানিক জেদের বশেই চাকরি ছাড়ে না। এই নিয়ে ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও মাঝে মাঝে অশান্তি হয়। জোনাকির মতো ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ দিয়ে শুরু হয়ে কখনো কখনো সেটা ভিসুভিয়াস হয়ে যায়। ওই ভিসুভিয়াসের ছাইভস্ম দেখে ললিতার খারাপ লাগার কথা, কিন্তু তিনি দেখেছেন এখন ছেলে বউয়ের ঝগড়া হলে তাঁর মন্দ লাগে না। যদিও অত্যন্ত বুদ্ধিমতীর মত তিনি ওদের ঝগড়ার মধ্যে কখনো থাকেন না। তিনি থাকেন তাঁর আদরের নাতনি, মধুশ্রী এবং অতনুর একমাত্র কন্যা চার বছরের তিন্নিকে নিয়ে। তিন্নির মুখখানা অবিকল তার ঠাকুমার মতো ঢলঢলে, মায়া মাখা। ওই নাতনীই তার দুঃখ জাগানিয়া রাতের একমাত্র বাঁশী। তবে ইদানিং সেই বাঁশী অন্য কারো সুরে বাজছে। সে হলো পরী। তিন্নি ও তাঁর খেয়াল রাখবে বলে অতনু তাকে রেখেছে মাসখানেক হল। ললিতার বয়স হচ্ছে তাই একজন সবসময়কার লোক থাকলে মন্দ হয় না। সেই কথা ভেবে তিনিও খুশিই হয়েছিলেন, কিন্তু পরী যে এভাবে অল্প দিনের মধ্যেই তিন্নির এত প্রিয় হয়ে উঠবে তা তিনি বুঝতে পারেন নি।
পরীর চেহারা অত্যন্ত সাধারণ, মোটেই পরীসুলভ নয়। তবে সে ভীষণ হাসিখুশি, যেন তার জীবনের ইতিহাসে কোন দুঃখের অধ্যায় নেই। এই পরীর কাছে আছে অফুরন্ত গল্পের ভান্ডার। সে যেন হেঁটে চলে বেড়ানো যেন এক আরব্য রজনী! ও গ্রামের মেয়ে, বাড়ি শিরাকোল। তিন্নিকে যখন ওর ছোটবেলার গল্প শোনায় মনে হয় একটা ছোট্ট নৌকা ঢেউয়ের উপর সাজিয়েছে। সেই নৌকাতে খালি সে আর তিন্নি এবং দাঁড়খানা তারই হাতে। যে ঘাট পছন্দ হয় সেখানে নেমে যায়। কখনো গ্রামের বট গাছের ঝুরিতে থাকা ব্রহ্মদৈত্য, কখনো বহুরূপী শিব ঠাকুর, কখনো ধানের ক্ষেতে ভূতুড়ে কাকতাড়ুয়া… কি না থাকে তার গল্পে! এই কথাগুলো শোনার সময় তিন্নির মুখ চকচক করে ওঠে। সেও যেন তার পরীপিসির সাথে দৌড়ে দৌড়ে গ্রামের মেঠোপথে বাতাবি লেবু নিয়ে ফুটবল খেলে বেড়ায়, শাপলা-শালুক তুলে আনে, বৃষ্টিতে গামছা দিয়ে চকচকে পুটি মাছ ধরে, খপখপ করে কোলা ব্যাঙ ধরে পুষে রাখে, যত্ন করে পোকামাকড় ধরে খাওয়ায়। একদিন পরী শুনিয়েছিল কিভাবে কালবৈশাখী ঝড়ে ডাল ভেঙ্গে পড়ে যাওয়া একটা টিয়া পাখির বাচ্চা ও বাঁচিয়েছিল। ন্যাকড়ায় মুড়ে হ্যারিকেনের তাপে একটু একটু করে বড় করছিল। তারপর একদিন দুপুরে দেখল ওর দাদার পোষা হুলো বিড়ালটা ওর ঘাড় মুটকে দিয়ে গেছে। পাড়ার ছেলেদের সর্দারনী ছিল পরী। বিড়ালটাকে বস্তায় ভরে গ্রামের শেষে শ্মশানে রেখে এসেছিল সে। এইসব গল্প শুনে ডাকাবুকো পরীর এক্কেবারে চেলা হয়ে গিয়েছিল তিন্নি। ললিতা প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছিলেন পুরনো বইয়ের আলমারি ঘেঁটে দু তিন খানা রূপকথায় তার ছোট্ট নাতনি থেকে জয় করার কিন্তু সুয়োরানী, দুয়োরানী, ক্ষীরের পুতুল, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী সবকিছুই ওই গ্রাম্য মেয়ের সরল জীবনের অভিজ্ঞতার গল্পের কাছে হার মানল। ললিতা বেশ বুঝতে পারছিলেন ‌একদা‌ তাঁর নাতনির হৃদয় জুড়ে থাকা তাঁর আধিপত্য এখন বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠছে।
সাদা কাপড়ে বিউলির ডালের বড়ি দিতে দিতে, আদরে লাগানো বেলী, টগর, জবাগুলোতে যত্নের জল দেওয়ার সময় অথবা ঠাকুরঘরে গোপালকে আবদার ও নালিশ জানানোর ফাঁকে একটাই চিন্তা তাঁকে ত্রস্ত করে তুলেছিল যে তিন্নি আর তাঁর পেছন পেছন ঘুরছে না, তার নরম নরম যে হাত গুলো আগে তাঁর গলা জড়িয়ে থাকতো সেগুলো এখন পরীর আঁচল খোঁজে।
দুপুরগুলো আজকাল তাঁর পাথরের মতো ভারী মনে হয়, তাই একদিন তাকে হালকা করতে পুরনো শাড়ি বের তার ভাঁজে আটকে থাকা স্মৃতির ধুলো ঝাড়ছিলেন। তাঁর চোখ পড়ে একটি লালপাড় গরদের দিকে, ওটি পরে তিনি কতবার সিঁদুর খেলেছেন। সেই সাথে হঠাৎ তাঁর মনে হয় পরী কে কখনো সিঁদুর পরতে দেখেননি তিনি। তার স্বামী আছে, একবার দেখেছেন তাকে দূর থেকে। একটি গ্রাম্য মেয়ে, সধবা তাহলে সিঁথি ফাঁকা রাখে কেন? বিদ্যুতের মতো একটা চিন্তা তার মাথায় খেলে গেল… তবে কি পরী মুসলিম, পরী আসলে পারভীন! তাঁর বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা গোপাল আছে, মুসলমান হলে তো পরীকে কিছুতেই তিনি এ বাড়িতে রাখতে পারবেন না। মনে মনে হঠাৎ খুশি হয়ে উঠলেন তিনি। পরী তখন ছাদে শুকনো কাপড় জামা তুলতে গিয়েছিল। ললিতা হন্তদন্ত হয়ে ছাদেই গেলেন… চোখ দুটো‌ একবার পরীর সিঁথিতে ছুঁইয়েই কোন ভুমিকা ছাড়াই প্রশ্ন করলেন, “তুমি সিঁদুর পরো না কেন?” পরী একটু অপ্রতিভ হ’ল না, বরং হেসে জিজ্ঞেস করল, “এইটা জানতে তুমি ছাদে উঠলে মাসিমা? এই যে দেখো সিঁথিতে একটা কাটা দাগ। পাঁচটা সেলাই পড়েছিল এখানে। দুদিন হসপিটালে ছিলাম এমন মেরেছিল আমার বর মদ খেয়ে। তারপর থেকে সিঁদুর পরা ছেড়ে দিয়েছি। নিজের পেটের ভাত নিজেই জোগাড় করি। আমার বর মদ এখনও ছাড়েনি, তবে আমার সাদা সিঁথি দেখে ভয় পায়… আর আমার গায়ে হাত তোলে না। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম তাই সংসারটা এখনো করি, তবে আমার নিজের শর্তে।”
পরীর মতো একটা কাটা দাগ ললিতার বাঁ হাতের কুনুই এর কাছেও আছে। অমিত মদ খেতেন না ঠিকই, কিন্তু প্রথম জীবনে প্রচন্ড বদমেজাজি ছিলেন। টুকটাক কালশিটে কতবার লুকিয়েছেন তিনি! কখনো মিথ্যে দিয়ে ঢেকেছেন, কখনও শাড়ির আঁচল দিয়ে। কিন্তু সেবার বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। পুজোর ছুটিতে অমিত তার বন্ধু সুমন্ত ও তার স্ত্রী মহুয়ার সাথে সপরিবারে চেন্নাই যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। আনন্দে দু রাত ঘুমোতেই পারেননি ললিতা। তারপর চেন্নাই গিয়ে যা দেখছিলেন তাই মনে হচ্ছিল চমক! সুমন্ত লোকটিও ভারী আমুদে ছিলেন, কথায় কথায় হাসাতেন। মহুয়াও খুব মিশুকে মেয়ে ছিল তবে ওদের কোনো ছেলেপুলে ছিল না। অতনু তখন আড়াই বছরের, সারাক্ষণ সুমন্ত‌ই তাকে কোলে করে নিয়ে বেড়াতেন। যেদিন তারা কলকাতায় ফিরবেন তার আগেরদিন সিল্কের শাড়ি কিনবেন বলে টি নগরে এক বিখ্যাত দোকানে যান সবাই মিলে। একটা লালচে কমলা ঘেষা কাঞ্জিভারাম গায়ে ফেলে দেখছিলেন ললিতা। পাশে সুমন্ত দাঁড়িয়েছিলেন অতনুকে কোলে নিয়ে। মাদ্রাসি দোকানদার ভেবেছিলেন ওরা স্বামী-স্ত্রী। ইংরেজিতে বলেছিলেন, “নিয়ে নিন স্যার, আপনার মিসেস কে দারুন লাগবে!” সুমন্ত হো হো করে হেসে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, শাড়িটা মানাবে বটে আমার স্ত্রীকে।” ব্যাস, ওইটুকুই। তাতেই চূড়ান্ত অশান্তি করেন অমিত হোটেলে ফিরে এসে। তুমুল ঝগড়ার পর একটা কাচের গ্লাস ছুড়েছিলেন তিনি যেটা তার বাঁ হাতের কুনুই এ গেঁথে গিয়েছিল। রক্তের আঁশটে গন্ধ, আড়াই বছরের বাচ্চার কান্না, লোকলজ্জার ভয়, সব মিলিয়ে বিষিয়ে গিয়েছিল সেবারের পুজোর বেড়ানোটা। পরে অবশ্য ছেলে বড় হতে একটু একটু করে সংযত হয়েছিলেন অমিত এবং শেষের দিকে তিনি একদম অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। বাঁ হাতের কাটা দাগটার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন ললিতা।
পরীর কথায় পুরনো দিনগুলো যেন হুড়মুড় করে ঝড়ের মত ঢুকে পড়লো তাঁর মনে আর হঠাৎ নাতনির বুক থেকে আসনটি ছিনিয়ে নেওয়া গ্রাম্য, মাঝবয়সী, সিঁদুর না পরা সধবা বউটার জন্য তাঁর যা রাগ ছিল সব উড়িয়ে নিয়ে গেল। পরীর চিবুক ছুঁয়ে বললেন, “বেশ করেছ মা! যাও এবার আমার বউমার ড্রেসিং টেবিলে একটা লাল রঙের নেলপালিশ আছে। ওটা নিয়ে এসে আমাকে পরিয়ে দাও।”
দু হাতে ‌আর দু পায়ের আঙুলে নিয়ম ভাঙ্গার সাহস ও কিছু সংস্কার না মানার স্বাধীনতাটুকু রেখে দেওয়াটা, ভালভাবে বাঁচার জন্য বড্ড দরকারী, তাই আজ থেকে সেইভাবেই বাঁচবেন ললিতা।

Author: admin_plipi

Leave a Reply

Your email address will not be published.