পৌষপার্বণে ডবল বোনাস

 

 

অরুন আর পিয়ার বিবাহিত জীবনের এতগুলো বছর ওরা পার করে এলেও ওদের মধ্যে ভালবাসাটা যেন সেই প্রথম দিনের মতই আছে৷ আজও কেউ কাউকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না৷ ওদের একটা ছেলে একটা মেয়ে৷ অরুনাভ আর প্রিয়দর্শিনী৷ ওরা অবশ্য ওদেরকে অরি আর প্রিয়া বলেই ডাকে৷ ওরাও নিজেদের কর্ম জীবনে যথেষ্ঠ সফল৷ নিজেদের পছন্দের মানুষকে বিয়েও করেছে৷ প্রতি মাসে ওরা ওদের বাবা-মাকে দেখেও যায়৷ কিন্তু কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক মাস ধরে ওরা কেউই আসতে পারেনি। পিয়া ভেবেছিল পৌষপার্বণে এসে বাবা-মাকে হয়তো চমকে দেবে! ফোন করে পিয়া যখনই জানতে চাইত যে ওরা পৌষপার্বণে আসবে কিনা, ওরা যেন কথাটা এড়িয়ে যেত৷ এইরকমভাবেই চলছিল৷

 

এরমধ্যে একদিন বাজারে গিয়ে অরুন দেখল অনেকগুলো বাচ্চা একসাথে লাইন দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে৷ একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করায় ও জানতে পারে ওই বাচ্চাগুলো “রবিছায়া” অনাথ আশ্রমের বাচ্চা৷ বাচ্চাগুলোকে দেখে অরুনের খুব মায়া হল৷ এত ছোট-ছোট বাচ্চাদের কেনো যে বাবা-মা ছেড়ে চলে যায়৷ দায়িত্বই যখন নেবে না, পৃথিবীতে আনার কী দরকার৷ এসব ভাবতে ভাবতে অরুণ বাড়ি চলে আসে৷ মনে মনে ঠিক করে একদিন ওই আশ্রমে যাবে৷ সেইমত একদিন বিকেলবেলায় চলে যায় ওই আশ্রমে৷ ওখানে গিয়ে দেখে ওদের পাড়ার অনেকেই এখানে আসে৷ কেউ  বাচ্চাদের গল্প শোনাচ্ছে, কেউ আবার বাচ্চাদের সাথে খেলছে৷ কেউ আবার বাচ্চাদের সাথে ছবি আঁকছে৷

-কাউকে খুঁজছেন? কিছু বলবেন?
-হঠাৎ কারোর গলার আওয়াজে ও পিছন ঘুরে দেখে একটা অল্পবয়সি মেয়ে ওর সামনে দাড়িয়ে আছে৷ ও মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে- তুমি কে?
-আমি নন্দিতা৷ এখানকার বাচ্চাদের পড়াই৷
-ও: আসলে একদিন বাজারে এই বাচ্চাগুলোকে দেখেছিলাম, তাই আজকে এখানে এলাম৷
-ওই দিন তো সেনকাকু ওদের জিলিপি খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন৷ উনি এখানে প্রায়ই আসেন৷ বাচ্চাদের সাথে সময় কাটিয়ে আবার চলে যান৷ আপনিও আসবেন কাকু, আপনারও ভাল লাগবে৷
-ঠিক আছে৷ আজ আমি আসি৷ আর একদিন আমার মিসেস-কে নিয়ে আসব৷

 

এরপর থেকে অরুন পিয়াকে নিয়ে সপ্তাহে একদিন করে এখানে আসে৷ কখনও বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে যায়, কখনও আবার পড়ার জন্য বই, কখনও আঁকার জন্য রং পেনসিল নিয়ে যায়৷ বাচ্চারাও ওদের পেয়ে খুব খুশি৷ অরুনকে ওরা বন্ধু বলে ডাকে আর পিয়া ওদের বন্ধুআন্টি৷ বেশ ভালই কাটছিলো ওদের৷

 

দেখতে দেখতে পৌষপার্বণের দিনও এসে গেল। অরি প্রিয়ার ওদের বাবা-মায়ের কাছে আসার দিনও চলে এল৷ আজ সকাল থেকেই পিয়া খুব ব্যস্ত নানরকম পিঠে-পুলি বানাতে৷ অরুন গিয়েছে বাজারে নলেন গুড় আর গোবিন্দভোগ চাল আনতে৷ পিয়া পায়েস করবে বলেছে৷ অরি খুব ভালবাসে নলেন গুড়ের পায়েস খেতে৷ বাজার থেকে বাড়ি এসে দেখে সারা বাড়ি পিঠের গন্ধে ভরে গেছে৷
– তুমি এতক্ষণ লাগিয়ে দিলে এই দুটো জিনিস আনতে৷ ভাগ্যিস আমি চালের গুড়ো, পাটালি গুড় আর নারকেল এনে রেখেছিলাম৷ তোমাকে আনতে দিলে সারাদিন লাগিয়ে দিতে৷ আমার এমনি সব হয়ে গেছে শুধু পায়েসটা করলেই হয়ে যাবে৷
-হুম, সে তো গন্ধেই টের পাচ্ছি যে সব হয়ে গেছে৷ কী কী করেছ বলো৷
-দুধপুলি, সিদ্ধপিঠে, ভাপাপিঠে, পাটিসাপটা, গোকুলপিঠে, আর নলেন গুড়ের পায়েস৷
-বাবা রে! কত কি বানিয়েছ৷ এত খাবে কে?
-আমার মন বলছে আজ অরি আর প্রিয়া ঠিক আসবে৷ তাই তো এত কিছু করলাম৷

 

এমন সময় ফোন বেজে ওঠায় অরুন গিয়ে ফোনটা ধরল৷ কিছুক্ষণ পর অরুন এসে বলল যে অরি আজ আসতে পারবে না৷ ওর অফিসের কাজের চাপ আছে তাই৷ কথাটা শুনে পিয়ার মুখটা শুকিয়ে গেল৷ পিয়া চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেল৷ অরুনের এখন কী করা উচিৎ ও বুঝতে পারছে না৷ হঠাৎ ওর মাথায় একটা বুদ্ধি আসে৷ ও সঙ্গে সঙ্গে নন্দিতাকে ফোন করে বলে আজ ও আর পিয়া আশ্রমে যাবে৷ পিয়াকে চা করতে বলে অরুন মোড়ের মাথায় গিয়ে রিক্সা ডেকে আনতে যায়৷ তারপর বাড়ি এসে চুপচাপ চা খেয়ে নিয়ে পিয়াকে বলে সমস্ত পিঠে টিফিনবক্সে ভরতে৷ তারপর পিয়া যেন শাড়ী পড়ে তৈরী হয়ে নেয়৷ পিয়া কিছুই বুঝতে পারছে না৷ এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজে পিয়া গিয়ে দরজা খুলে দেখে একজন রিক্সাওয়ালা রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ অরুন সব টিফিনবক্স রিক্সায় তুলে নিয়ে পিয়াকে বলল বসতে৷ তারপর ওরা আশ্রমে গেল৷ বাচ্চারা সবাই ওদেরকে দেখে একসাথে চিৎকার করে বলে ওঠে- শুভ মকরসংক্রান্তি বন্ধুআন্টী৷ আচমকা এরকম একটা উপহার পেয়ে আনন্দে পিয়ার চোখে জল আসে৷
-কী গো দরজাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি ভেতরেও যাবে? চোখের জলটা মুছে নিয়ে পিয়া বলে- তোরা সবাই বস আমি তোদের জন্য পিঠে নিয়ে এসেছি৷ বাচ্চারা খুব খুশি অনেক রকম পিঠে খেয়ে৷ অরুনও বাচ্চাদের সাথে পিঠে খেতে ব্যস্ত৷ পিয়াও আজ ভীষণ খুশি৷ প্রতিবছর তো অরি আর প্রিয়া ওর বানানো পিঠে খেয়ে খুশি হয়৷ এই বছর নাহয় রাহুল, রহিম, টিনা, আজাদ, আমিনা, বিল্টুরাই ওর বানানো পিঠে খেয়ে খুশি হোক৷ এইসব ভাবনার মাঝে নন্দিতা এসে বলল একটা ছেলে আর একটি মেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে৷ বাইরে এসে দেখল অরি আর প্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে৷ এই সারপ্রাইজটা তো ও আশাই করেনি! এইরকম পৌষপার্বণ যেন প্রতিবছর আসে ওর জীবনে৷ আজকের দিনটা সারাজীবন পিয়ার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে৷ এরপর আবার একবছরের অপেক্ষায় থাকবে সবাই এই দিনটার৷

 

অরুন, অরি তখন বাচ্ছাদের সাথে ঘুড়ি ওড়াতে বাস্ত। হঠাৎ করে অরুন পিয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল- কী গো, পৌষপার্বণে ডবল বোনাসটা কেমন দিলাম?

 

 

 

লেখাঃ সুদেষ্ণা

ছবিঃ কুণাল

 

Poush parbone double bonus |     Sudeshna     |     Kunal    |     www.pandulipi.net     |    Emotional     |    Story     |    Bengali

Author: admin_plipi

6 thoughts on “পৌষপার্বণে ডবল বোনাস

Leave a Reply

Your email address will not be published.