পুনর্জীবন

 

 

প্রায় আধঘণ্টা হয়ে গেল। পুরু ফ্রেমের বয়স্ক মানুষটা গম্ভীর মুখে চেষ্টা চলাচ্ছেন। অম্লান উসখুস করছে একটা সিগারেট ধরানোর জন্যে। কিন্তু পারছে না। কে জানে হয়ত এই বয়স্ক মানুষটা চিনে ফেলতে পারেন মুখের আদল দেখে । অম্লানের বাবা এই শহরের নামী জেলা স্কুলের অঙ্কের টিচার ছিলেন। অম্লান জানে, এই মানুষটি বাবাকে নিশ্চই চিনতে পারবেন। প্রায় মিনিট চল্লিশ পর মাথাটা তুলে গম্ভীর মুখে উনি জবাব দিয়ে দিলেন। এ রেডিও আর সারাই হবেনা। অগত্যা বাড়ির দিকে পা বাড়ায় অম্লান। বাবার বয়স এখন একাশি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষটা যেন ছেলেমানুষের মত জেদি হয়ে যাচ্ছে। সুগারের কারনে চোখে আর ভাল দেখতে পায় না বাবা। কানেও ভাল শুনতে পায় না আর। তাতে যেন আরেকটু জুবুথুবু হয়ে গেছেন এককালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ অঙ্ক স্যার আশুতোষবাবু। কাল মহালয়া। বাবার দাবি তার রেডিও ঠিক করে দিতে হবে। রেডিওর সাথে সাথে, রিপেয়ারিং এর দোকানও এখন প্রায় অবলুপ্তির পথে। তাও অনেক খুঁজে একটা পুরোন ভাঙাচোড়া, রংচটা দোকান বের করেছিল অম্লান। ওপরে বহুকাল আগের হাতে লেখা সাইনবোর্ড-‘দে ব্রাদার্স- অত্যাধুনিক রেডিওর একমাত্র অভিজাত ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান।’ হয়ত কোন এক সময় রমরমিয়ে চলেছে এই দোকান। আজ সেসব ইতিহাসের পাতায় হলুদ হয়ে মিশে গেছে। বাড়ি ফেরার পথে অম্লান তিনটে বড় ব্যাটারি কিনে নিল।

পরদিন ভোরবেলা বাবাকে ঘুম থেকে ওঠায় অম্লান। ছোটবেলার দিনগুলো অনেক আগে দেখা সিনেমার মত ভেসে ওঠে চোখের সামনে।ঠিক এরকমই অনেক পুরোন সেই ভোরগুলোতে বাবা ডেকে তুলত ছোট্ট অমু কে। নতুন ব্যাটারি ভরা হত রেডিওতে। ঘুম ঘুম চোখে মহাকাশ থেকে নেমে আসতেন মহা শক্তিশালী দেবী।

অম্লানের দেওয়া ব্যাটারিগুলো কাঁপা কাঁপা হাতে রেডিওতে ভরে আরামকেদারায় শরীরটা এলিয়ে দেন আশুতোষবাবু। মহালয়া শুরু হতে আর পাঁচ মিনিট বাকি। মোবাইলটা সাইলেণ্ট মোড করে তৈরি হয়ে নেয় অম্লান। ঠিক চারটার সময় প্লে করে দেয় ফাইলটা। নাগরিক জীবনের অলি গলি ভাসিয়ে বেজে ওঠে “যা দেবী সর্বভূতেষু…………”।

আশি বছরের বলিরেখা ভরা মুখে ফুটে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সময়ের হালকা হাসি।

 

লেখাঃ প্রদীপ্তময়

ছবিঃ সুপ্রতিম

 

Punorjibon  |     Pradiptomoy     |     Supratim    |     www.pandulipi.net     |    Emotional     |    Story     |    Bengali

Author: admin_plipi

6 thoughts on “পুনর্জীবন

Leave a Reply

Your email address will not be published.