ভাঙ্গা চাঁদের আলো

ভাঙ্গা চাঁদের আলো

লেখা – শান্তনু দাস

ছবি – নিকোলাস

 

 

( ১ )

আলো দেওয়ালে টাঙানো অর্ধবৃত্তাকার কাঠের ফ্রেমের আয়নাটার সামনে দাঁড়াল। অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ, যেন অন্য কোনো এক অপরিচিতা তরুণীকে দেখছে। পরনে মরচে রঙের তাঁতের শাড়ি, কপালে নীল টিপ, আর তার নীচে একজোড়া তন্দ্রালু চোখ বাইরে চাঁদের আলোয় টিমটিম করছে। এলোমেলো চুলের ফাঁকে অচেনা মুখটাতে একরাশ বিষ্ময় মাখানো। আয়নার জটিল প্রতিবিম্বটার ফাঁকে আলো খুঁজতে থাকে তার সেই হারিয়ে যাওয়া অতীত। নার্সিং হোম থেকে ছাড়া পাবার পর একটা বছর যেন একটা তারার মত মনের আকাশ থেকে খসে গেছে। কিন্তু আলো নিজেকে কখনও অমন করে দেখেনি, দেখার চেষ্টাও করেনি। সে তো ভালই আছে আশ্রমের ঐ ফুলের মত ছোট ছোট শিশুগুলোর সাথে। সকাল হলেই একরাশ মাতাপিতাহীন কচি কচি মুখ তার দিকে “আলো আন্টি, আলো আন্টি” বলে ছুটে আসে। কিন্তু কালকে ঐ ভদ্রমহিলার সাথে দেখা হবার পর তার মনে যে কি হল সেই কথায় বারবার চিন্তা করতে থাকে আলো।

রাত বারোটা, একটা স্বপ্ন দেখে আলোর ঘুমটা ভেঙ্গে গেছে। আয়না থেকে জানলার কাছে সরে এল সে। আকাশে আধফালি চাঁদ থেকে জ্যোৎস্না ঝরে পড়ছে তুষারাবৃত শৃঙ্গগুলোর ওপর। সারাদিন বাচ্চাগুলোর সঙ্গে বড়দিনের মেজাজ কাটানোর পর আজ একটু যেন ক্লান্তিই লাগছিল তার। আলো কাঁচের জানলা দিয়ে রাতের আকাশ দেখছিল, ছোট বড় নক্ষত্র ঝিকমিক করছে… এরোপ্লেনের সাঁ সাঁ শব্দ… তারই মধ্যে থেকে কেউ যেন ওকে বলে ওঠে “আলো আন্টি।” আলো চমকে ওঠে… এ গলা আশ্রমের কোনো শিশুর নয়… কিন্তু খুব চেনা, যেন বহুবছর আগে শোনা এক মিষ্টি গলার স্বর, আজ রাতে স্বপ্নে যাকে সে দেখেছিল। আলোর কিছু ভাল লাগছে না। বহুবছর আগের কোনো ঘটনার যোগবিয়োগ ওর মাথাকে যেন চেপে ধরেছে।

কফিমগ থেকে এক গ্লাস কফি ঢেলে সে নিমেষের মধ্যে শেষ করে ফেলে সেটা। আজ কেন যেন তার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে সে এই আশ্রমে এল কিভাবে? নার্সিং হোমে তার কি হয়েছিল? আলো গায়ে কোটটা চাপিয়ে মাফলারটা জড়িয়ে বাইরে আসে। দার্জিলিঙের ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা আর চাঁদনী রাতের অপরূপ সৌন্দর্য আজ তার দৃষ্টি প্রত্যক্ষতায় এতটুকু প্রভাব ফেলতে পারেনি। আশ্রমের গেটের বাইরে কারুকার্যপূর্ণ সুনীল দেওয়ালটা কুয়াশার মোড়কে মোড়া। আলো শ্লথ পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সবুজ গাছপালার খাঁজে ভাঁজে হিমের থমথমে সাদা ছবি, মস্ত বড় ঝাঁকড়া জলপাই গাছটার মাথায় সাদা তুষার, আর পেছনে কালো মেঘের ছায়া দেখতে থাকে। মন-প্রাণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে আজ আলো রাতকে দেখতে থাকে। খুঁজতে থাকে আবছা স্মৃতি। অনুভূতি দিয়ে গন্ধ উপভোগ করতে থাকে। কান দিয়ে নৈশব্দের গুঞ্জন শুনতে শুনতে আলো আশ্রম ছেড়ে অনেক দূর এগিয়ে চলে। সেই গভীর খাদটার সামনে চলে আসে সে। রাত্রির অন্ধকারে উড়ে যায় প্যাঁচা। মনে হয় আকাশের এক ফালি চাঁদের বিষণ্ণ আলোতে এক পোচ কালি ঢেলে উড়ে যায় । আর ভয়ংকর এক কর্কশধ্বনি সেই খাদটার চারপাশে প্রতিধ্বনিত হয়। অন্ধকার আর কুয়াশার মাঝে খাদটার গভীরতা আন্দাজ করতে পারে না আলো। জায়গাটা কিন্তু খুব চেনা চেনা লাগে। চোখ বন্ধ করলেই আলো যেন দেখতে পায় চারটে মুখোশধারী লোক তাকে ঐ অন্ধকার কূপে ঠেলে দিচ্ছে। আলোর মনে পড়ে যায় কাল সকালের সেই ঘটনার কথা…।

 

 

( ২ )

আলো সবুজ ঘাসের গালিচায় পাতা এক আরামকেদারায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে। বাইরে ডিসেম্বরের নরম কুয়াশার পাউডার, খুনে রঙ মাটির ওপর অফুরান সবুজের বন্যা। দূরে পাহাড়ের কপালে জঙ্গলের ঘোমটায় লাল টিপের মত সূর্য।
-“আলো ভালো আছিস?” এক অপরিচিত গলার স্বর শুনে আলো মুখ তুলে তাকায়।
-“চিনতে পারলি না? আমি চন্দ্রা রে। চন্দ্রানী বসু।”
আলো আগতা নারীটির দিকে তাকিয়ে নিখুঁত জরিপ সেরে নেয়। ছোটখাটো চেহারা, গোল চাপা মুখ, পরনে শীত পোশাক, আর কপালে বেশ বড় করে সিঁদুরের টিপ।
-“জানতাম ভাই চিনতে পারবি না। আমি তোর বান্ধবী রে। চন্দ্রাকেও ভুলে গেলি? তোকে নার্সিংহোমে এসে প্রত্যেকদিন দেখে যেতাম। তুই পাহাড় থেকে পড়ে গিয়েছিলি… মাথার পেছনে আঘাত লেগেছিল… তোর কি কিছুই মনে পড়ছে না?” আলো অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে চন্দ্রার দিকে… চন্দ্রাকে সে সত্যিই চিনতে পারেনি। মনে মনে ভাবে নার্সিংহোমে জ্ঞান ফেরার পর প্রথম সে চন্দ্রাকেই দেখেছিল। তার কি বাবা মা কেউ নেই? খুব জানতে ইচ্ছে করে আলোর, কিন্তু কিছু মনে পড়ে না।
সেদিন আলো চন্দ্রার ফ্ল্যাটে যায়। চন্দ্রা একটা এ্যালবাম বের করে আলোকে দেখায়। আলোর বাবা মায়ের একটা ফটো ছিল… পাশে আলো দাঁড়িয়ে। আলো ছবিতে নিজেকে ছাড়া কাউকে চিনতে পারে না।
-“আমার বাবা মা কোথায়?” নিস্পলক চোখে তাকায় আলো।
-“তোর মা একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। আর বাবার ব্রেন টিউমার হয়েছিল। অপারেশনের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা দরকার ছিল। তুই আমার কাছে চেয়েছিলি। দিতে পারিনি ভাই, ক্ষমা করিস। তার জন্যই…”
আলোর চোখটা ছলছল করে ওঠে। কোনো কথা বলে না সে। একমনে এ্যালবামের পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় এসে থামে। পাঁচ ছয় বছরের একটা ফুটফুটে ছেলের ছবি। আলোর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে । সেই পুরনো চেনা গলার স্বর আবার তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুরণিত হতে থাকে…।
-“আলো আন্টি… ও আলো আন্টি… মিস ইউ, আলো আন্টি।” এক পলকে তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। চন্দ্রা বলে ওঠে, “আমার ছেলে দীপ।”
-“কোথায়?” আলো জিজ্ঞেস করে।
-“সে আজ আমার কাছে নেই রে ভাই। তুই কি সব ভুলে গেছিস আলো? দীপের সাথে তুই না কত খেলা করতিস। তোর সাথে ছাড়া ও নার্সারি স্কুলে যেত না… তোকে আন্টি বলতো… তোর কিছু মনে পড়ছে না? একদিন কয়েকজন গুন্ডা দীপকে তুলে নিয়ে গেল। এক লাখ টাকা চেয়ে ব্ল্যাকমেল করতে থাকল। কিন্তু বিশ্বাস কর তখন দীপের বাবার কাছে একসঙ্গে এতগুলো টাকা ছিল না রে। তোর বাবার তখন ব্রেন টিউমার। তোর কাছেই বা কি করে হাত পাতব। তোকেও তো কিছু হেল্প করতে পারিনি আমি। তখন বুঝেছিলাম জানিস একটা মানুষের কাছে টাকার কত মুল্য। সেদিন মনে হয়েছিল তোর বাবার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইলেও আমরা দীপকে ফেরত পেতাম রে… কিন্তু ওরা কোনো সময় দিল না।” …চন্দ্রা ঝরঝর করে কাঁদতে থাকে।
আলো একদম পাথরের মত বসে আছে। আবছা স্মৃতিগুলো মনের মধ্যে কাটাকুটি খেলছে।
-“ওরা দীপকে পাহাড় থেকে খাদে ফেলে দিয়েছিল। তোর মনে নেই, তুই কত কেঁদেছিলি? তার পরের দিনেই তুইও তো পাহাড় থেকে পা পিছলে পড়ে যাস।”
আলোর মাথাটা দপদপ করে, কান দুটো গরম হয়ে আসে। সেই ডাকটা, “আলো আন্টি… আলো আন্টি,” কানের সামনে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। দুহাত দিয়ে কান চেপে আলো চিৎকার করে ওঠে।

 

 

(৩)

আলো ভাবনার জগত ছেড়ে বাস্তবে ফিরে আসে। রাত ঘনায়মান। কালো খাদটার নিচে মুঠো মুঠো কুয়াশামাখা নরম মেঘ। আকাশের চাঁদ ভেঙে চারদিক ভেসে গেছে আইভরি জ্যোৎস্নায়। মাধবীর গন্ধবিধুর শৈলজগতের সেই রাতে কোনো এক শৈশব স্বর আলোকে হাতছানি দেয়। কুয়াশার ফাঁকে শঙ্খচিলের বিশ্লথ ডানা দেখতে দেখতে আলো যেন বর্তমানের কথা ভুলে যায়… এক ঝটকায় ওর মনে পড়ে যায় সব কথা। গভীর খাদটার বুকে আলো দেখতে পায় তার বাবার মুখ… চন্দ্রার কথা মনে পড়ে… দীপের কথা মনে পড়ে… এক এক করে সব মনে পড়ে যায় তার। বাবার অপারেশনের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা আলো কোথাও না পেয়ে চন্দ্রার কাছে যায়। চন্দ্রাও ওকে ফিরিয়ে দেয়। টাকা যোগাড় করতে আলো পথে পথে ঘোরে… কিন্তু কে দেবে এতগুলো টাকা? হাতে এসে যায় একটা সুযোগ। কাজটা করতে পারলেই ষাট হাজার। আগে পিছে কিছু ভাবার অবকাশ থাকে না তার। বাবাকে যেকোনো উপায়ে বাঁচাতে হবে। তাই চারটে গুণ্ডার কথামত দীপকে কিডন্যাপ করতে সাহায্য করে আলো। ভেবেছিল চন্দ্রা ছেলেকে ফিরে পেতে ওদের প্রাপ্য এক লাখ টাকা দিতে বাধ্য হবে। আর কমিশনের ষাট হাজার টাকায় বাবার অপারেশন হয়ে যাবে… দীপকেও ফিরে পাবে চন্দ্রা। কিন্তু সব কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যায়। একেবারে এতগুলো টাকা চন্দ্রা ওদের দিতে পারেনি। দীপকে ওরা মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আলো তা মনে প্রানে কখনও চায় নি। অনেক চেষ্টা করেছিল দীপকে বাঁচাতে। ওদের বলেছিল দীপের কিছু হলে আলো পুলিশের কাছে সব কথা বলে দেবে। নিজের ভবিষ্যতের পরোয়া ছিল না তার। এধরনের কথা ওরা কানেই নেয়নি। তাই দীপকে পাহাড় থেকে ফেলে দেবার পরের দিনই আলোকেও ওরা পাহাড়ের খাদে ঠেলে দিয়েছিল। তারপর বেঁচে ফিরলেও আলোর স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। নার্সিংহোম থেকে রিলিজ নেবার পর চন্দ্রাই আলোকে ঐ আশ্রমের সন্ধান দেয় ।
আলো ভাবতে ভাবতে খাদটার অনেক কাছে চলে আসে। সারা দার্জিলিং শহর তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন মৃতবৎ নির্জন খাদটার দিকে চেয়ে থাকে আলো একপলকে। শরীরটা পালকের মত হালকা মনে হয়। উত্তুরে শীতল হাওয়া কালো শীতল হাত হয়ে আলোকে মরণ কূপে ঠেলে দেয়। আলো নিভে যায় অন্ধকারের মাঝে। আকাশের ভাঙ্গা চাঁদের আলোটাকে গিলে ফেলে একটা প্রকাণ্ড কালো মেঘ ।

Author: admin_plipi

13 thoughts on “ভাঙ্গা চাঁদের আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published.