হেমন্তিকা

 

 

ঘড়িতে যখন ভোর ৫:৩০, ঠিক তখনই অ‍্যালার্ম ক্লকের তীব্র আর্তনাদে ঘুম ভাঙে মধুছন্দার। এটাই রোজকার রুটিন। ঘুম চোখেই বিছানার পাশে রাখা ছোট্ট পাস টেবিলটা থেকে হাতড়ে নিয়ে ঘড়িটা কে চুপ করায়। আজও এর অন্যথা ঘটলো না। আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলতেই দেখে নিল সে সৌরভকে। বাচ্চা ছেলের মতো হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে….. গায়ের ঢাকা যথারীতি সরানো। নভেম্বরের মাঝামাঝি বেশ শীত শীত করে এই ভোরবেলাটা। মধুছন্দা সৌরভের গায়ের ঢাকাটা ভালো করে টেনে দিল। উষ্ণতার আশ্রয়ে সৌরভ নিজেকে জড়িয়ে নিল।

এবার ঝটপট সকালের কাজ সারতে হবে ছন্দাকে। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে সে পাশের ঘরে উঁকি দিল। তিতির ওর টেডিকে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কাছে গিয়ে মেয়ের মাথায় আলতো করে চুমু খেল ছন্দা। ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। ভারী মিষ্টি মেয়ে।

ছন্দা রান্না ঘরে চলে এল। নিজে চা খেল। তারপর একে একে সবার জন্য ব্রেকফাস্ট, মেয়ের স্কুলের টিফিন, সৌরভের লাঞ্চ তৈরী করে ফেলল। এই করতেই প্রায় পৌনে সাতটা বেজে গেল।
রান্নাঘরের কাজ সেরে তিতিরের ঘরে এল ছন্দা। মেয়েকে আদর করে ঘুম থেকে তুলল। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে তিতির। কষ্ট হয় এই ঠান্ডায় জোর করে ঘুম ভাঙাতে। কিন্তু উপায় নেই। একটা দিন স্কুল বাদ পড়া মানেই অনেকটা পিছিয়ে পড়া যে! একটু ঘ‍্যান ঘ‍্যান করল প্রথমে মেয়েটা, তারপর উঠে পড়ল। সৌরভ ও উঠে পড়েছে। ছন্দা মেয়েকে হাত মুখ ধুইয়ে, স্কুলের ইউনিফর্ম পরিয়ে, তিতিরের দুধ আর সৌরভের জন্য চা তৈরি করল। ব্রেকফাস্ট সারতে সারতে ঠিক সাড়ে আটটা নাগাদ তিতিরের স্কুল ভ‍্যান চলে এল।

মেয়েকে রওনা করে, ঘরে এসে বিছানা গুছিয়ে বরের শার্ট, প‍্যান্ট, রুমাল, পার্স সাজিয়ে রাখল। স্নান সেরে এসে হাতের কাছে এগুলো না পেলেই সৌরভের চিৎকার শুরু হয়ে যাবে, “ছন্দা, রুমালটা কোথায় রেখেছো?… আমার নীল শার্টটা কোথায়!” বরগুলো মনে হয় এমনই হয়! হাতের কাছে জিনিস থাকলেও তারা খুঁজে পাবেনা কোনো দিন ও, যতক্ষণ না বউ গুছিয়ে দেবে।

সৌরভ খুব ভালো ছেলে। শান্ত, ভদ্র, সভ‍্য। কাজ পাগল ছেলে খুব। তবে ছন্দাকে ভালোও বাসে খুব।

ঘড়ির কাঁটায় প্রায় দশটা। সৌরভ রওনা হল অফিসের জন্য। যাওয়ার সময় একটা আলতো চুমু খেল ছন্দার গালে। “ভারী অসভ্য তুমি”……বলেই ছন্দা, সৌরভকে রওনা করে ঘরে এল।

উফফফফফফফফ‍্……এখন অনেকটা সময় ছন্দার শুধু নিজের। সকাল থেকে এই সময়টুকু এক যুদ্ধ চলে যেন! এখন সবার আগে ঘরগুলো একটু গুছিয়ে, স্নানে যাবে ছন্দা। দুপুরের রান্নাটা সে সকালেই সেরে রাখে। স্নান সেরে এসে মৃদু শব্দে গান চালাবে সে। ওর আর একটা ভালো লাগার জিনিস হলো ব‌ই। বই পড়তে ছন্দা খুব ভালোবাসে। বিশেষ করে গল্পের বই। বই ওর অবসরের সঙ্গী। সেই ছোট্টবেলায় ওর এক জন্মদিনে বাবা ‘সুকুমার গল্প সমগ্ৰ’ দিয়ে বলেছিলেন, “মামন, আজ থেকে বই তোর জীবনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। বইকে ভালোবাসবি, দেখবি এর মতো ভালো বন্ধু আর কেউ নেই।” আর সেই তারপর থেকে চাঁদমামা, শুকতারা…. আরও অনেক বই ওর সঙ্গী হয়ে ওঠে। এটা সৌরভও জানে। তাই ভালো কোনো বইয়ের সন্ধান পেলেই সে বউয়ের জন্য নিয়ে আসে।

ইদানিং, এক উঠতি লেখকের গল্প মধুছন্দাকে খুব আকৃষ্ট করছে। সে আবার নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। ‘অচিন পাখি’—এই নামেই সে লেখে। নামটা বেশ ভালো লেগেছিল ছন্দার প্রথম দিনেই।

ফেসবুকে একটা পেজও আছে এই নামে ওই লেখকের। বেশ সুন্দর আর গুছিয়ে লেখেন ভদ্রলোক। যদিও ভদ্রলোকের ব‍্যক্তিগত কোন উল্লেখ নেই ওই পেজে। ছন্দা ধীরে ধীরে ‘অচিন পাখি’-র ভক্ত হয়ে উঠছে। ওনার লেখা কোন বই প্রকাশিত হলে, আগেই সৌরভকে দিয়ে সে আনিয়ে নেয়। বেশ কিছু গল্পের কালেকশন আছে এখন ছন্দার কাছে ‘অচিন পাখি’-র।

আজ স্নান সেরে এসে গান চালিয়ে গল্পের একটা বই নিয়ে বসেছে ও। হঠাৎ কি মনে হলো ফেসবুকটা অন করে ‘অচিন পাখি’ পেজটাতে ক্লিক করল। আরে!! ‘অচিন পাখি’-র জন্মদিন আগামী পরশু, আর তাই এই পেজ এর অ‍্যাডমিনরা সবাই মিলে সেই বার্থডে সেলিব্রেট করবে। ইনভিটেশন এই পেজ এর সব মেম্বারদের। ‘অচিন পাখি’ নিজে উপস্থিত থাকবেন পরশুর অনুষ্ঠানে। নাহ‍্, এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না।

দুপুর একটা বেজে দশ মিনিট তিতির ফিরল স্কুল থেকে। ওকে স্নান করিয়ে, খাইয়ে, ঘুম পাড়াল ছন্দা। দুপুরটা বড্ড শান্ত মনে হয় ওর। চারিদিকে কেমন একটা থমথমে নিস্তব্ধতা। তিতিরকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল ছন্দা নিজেও বোঝেনি। ঘুম ভাঙতেই ঘড়ির কাঁটা জানান দিল, এখন সন্ধ্যে ছ’টা। আর খানিক বাদেই সৌরভ চলে আসবে অফিস থেকে।

মেয়ের হোম টাস্ক, সংসারের টুকিটাকি কাজ সারতে সারতে রাতের খাওয়ার সময় হয়ে গেল। ডিনার টেবিলে বসে সৌরভকে, ছন্দা আগামী পরশুর অনুষ্ঠানের কথা বলল। সে যেতে চায়, এটাও জানাল। সৌরভের আপত্তির কোনো কারণ নেই। ওদের বাড়ির বেশ কাছেই একটা নামী রেস্তোরাঁয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পরশু রবিবার, তাই মেয়েকে সৌরভের কাছেই রেখে যেতে পারবে ছন্দা।

মধুছন্দা আজ নিজেকে নীল রঙের পিওর সিল্ক শাড়িতে সাজিয়েছে। কপালে একটা ছোট্ট টিপ আর আলগা একটা হাত খোঁপায় যুঁই ফুলের মালা জড়িয়েছে। বেশ মানিয়েছে ওকে। কানের ঝুমকোগুলো আরও মোহময়ী করে তুলেছে ওকে।

হাতে একগোছা রজনীগন্ধা নিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ সে রওনা হল। তার মনের ভেতর আজ খুব আনন্দ হচ্ছিল। এতদিন যার লেখা পড়েছে সে, আজ তাকে সামনা সামনি দেখবে। অনেক কিছু আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতেই সেই রেস্তোরাঁর সামনে পৌঁছে গেল সে। ভেতরে বেশ ভিড়। খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে ভেতরটা। ছন্দা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

একরাশ ভিড় ‘অচিন পাখি’-কে ঘিরে রেখেছে। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই একটা  পরিচিত মুখ দেখে ছন্দা দারুন এক ধাক্কা খেল। এ কাকে দেখছে সে!! অতীতের টুকরো টুকরো পুরোনো ছবি তার চোখের সামনে একের পর এক ভেসে আসতে লাগল। ছন্দার মাথা ঘুরছে…! ‘তৃপ্ত’ তার সামনে। কিন্তু ও এখানে কেন? সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর!

একই কলেজের স্টুডেন্ট ছিল ওরা তিনজন। মানে সৌরভ, তৃপ্ত আর মধুছন্দা। সৌরভ আর ছন্দা যখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তৃপ্ত ওদের খুব ভালো বন্ধু। অথচ,সেও যে ছন্দা কে মনে মনে কবে ভালোবেসে ফেলেছে, বুঝে উঠতে পারেনি! যখন বুঝতে পারলো, ততক্ষণে অনেকটাই দেরী হয়ে গিয়েছে।

ছন্দা সৌরভের বিয়ের দশ দিন আগে এক বিকেলে তৃপ্ত হঠাৎ ছন্দাকে ফোন করে জানায় ওর মনের কথা,”হেমন্তের শিরশিরে শীতলতায় তুই যেন উষ্ণ ওমের স্পর্শ, আমার “হেমন্তিকা”। তুই আমার হেমন্তিকা”। তৃপ্তর হঠাৎ এমন কথায় প্রথমে আহত হয় ছন্দা। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে সব শুনে বলেছিল, “এরকম পরিহাস না করলেই পারতিস। তুই তো আমাদের সবটা জানতিস। তুই না খুব ভালো বন্ধু আমাদের”। বলতে বলতে নিজের অজান্তেই ও ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল। আর কিছু বলতে পারেনি। ফোন রেখে দিয়েছিল। নাহ‍্, ওদের বিয়েতে উপস্থিত ছিল না তৃপ্ত।

আজ দীর্ঘ আট বছর পর ওরা একে অপরের মুখোমুখি। ঠিকই তো, আজ তো তৃপ্ত-র জন্মদিন। ‘অচিন পাখি’-র জন্মদিন। খুব ভালো লিখতো তৃপ্ত এক সময়। আজ সে লেখার জগতে বেশ নাম করেছে। তৃপ্ত এগিয়ে এসে ছন্দাকে তার নিজের লেখা একটা গল্পের বই উপহার দিল। বলল,”আমি যেদিন ফেসবুকে আমার পেজে মেম্বার লিস্টে তোর নাম আর ছবি দেখলাম, সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, মানুষ যার কাছ থেকে এক সময় মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঘটনাচক্রে কোন না কোনও সময় জীবনে সেই আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। বিশ্বাস কর খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোকে। তাই আজও অন‍্য কাউকে এই মন দিয়ে উঠতে পারলাম না, পারবোও না। আজ একমাত্র তোকে দেখবার উদ্দেশ্যেই আমার এই অনুষ্ঠানে আসা। আমার বিশ্বাস ছিল তুই আজ আসবি। ভালো থাকিস।” এই বলে তৃপ্ত তার অন্যান্য পাঠক বন্ধুদের ভিড়ে মিলিয়ে গেল।

ছন্দা একা বসে তৃপ্ত-র দেওয়া গল্পের বই-এর পাতাটা উল্টে দেখলো, গল্পের নাম —— ‘হেমন্তিকা’, সাব হেডিংয়ে লেখা, ‘হেমন্তের শীতলতায় তুই যেন উষ্ণ ওম।’

ছন্দা বাড়ি ফিরছে……. হেমন্তের শেষ বিকেলে শীতটা যেন আজ একটু বেশিই অনুভব হচ্ছে ওর!!

 

 

 

কলমে: রাজনন্দিনী

ছবিঃ কুণাল

 

Hemontika    |    Rajnandini    |    Kunal    |    https://pandulipi.net    |    Emotional    |    Bengali    |    Love Story    |    Story

Author: admin_plipi

23 thoughts on “হেমন্তিকা

  1. সত্যি জীবনে কখনো কখনো এমন চক্রবাত আসে। অসাধারণ সুন্দর লেখা। ভালোলাগলো পড়ে। আর ছবি টা কি সুন্দর। খুব গভীর মানে রয়েছে। হালকা মনে পড়তে বেশ লাগলো।

  2. 107263 295395Youre so cool! I dont suppose Ive read anything such as this before. So nice to get somebody with some original thoughts on this subject. realy we appreciate you starting this up. this fabulous internet site are some items that is required on the internet, somebody with just a little originality. beneficial work for bringing a new challenge on the world wide internet! 801232

Leave a Reply

Your email address will not be published.