সোফার উপর বসে চা খাচ্ছিল বেসরকারি গোয়েন্দা বীরেন্দ্র মল্লিক। হাতে আনন্দবাজার। হঠাৎই একটা খবরে বীরেন্দ্রর চোখ আটকে গেল, আবারও VX। আসলে গত মাসে বিষাক্ত VX তরলে দুজন ভিখিরিকে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন স্টেশনের, অপর একজন দূরে একটা বাসস্ট্যান্ডের। প্রথম জনকে খুন করার পনেরো দিন পর দ্বিতীয় জন খুন হয়। পরের মাস পড়তে না পড়তেই আবারও খুন। তবে এবার খুন হয়েছে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়ানো একটা পাগল। এই নিয়ে দুই মাসে তিন-তিনটে খুন হলো, কিন্তু পুলিশ কিছুই করতে পারলো না। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায় বুকে কিংবা পিঠে সিরিঞ্জ ঢোকানোর একটা ফুটো ও খিঁচুনি। এই তিনটি ঘটনাই পুলিশ সহ সমস্ত এলাকা বাসীর মনে যথেষ্ট বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কারণ যাদের খুন করা হয়েছে, তাদের পৃথিবীর বুক থেকে সরানোর উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ তদন্ত করছে ঠিকই কিন্তু খুব বেশি জোর দিচ্ছে না। হয়তো এই খুনটার পরে তাদের টনক নড়বে।
দুপুরের দিকে শুনতে পেল একটা প্রচারওয়ালা গাড়িতে বলছে— “সকল এলাকা বাসীর উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে, সকলে রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় সজাগ থাকবেন, চোখ-কান খোলা রাখবেন।”
দেখতে দেখতে একটা সপ্তাহ কেটে গেল। অনেকের মন থেকেই আতঙ্ক দূর হয়েছে। আতঙ্ক সম্পূর্ণ দূর হয়েছে তা ঠিক নয়, কিন্তু এলাকা বাসী একটু নিশ্চিত ভাবে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে এসেছে। এমনই একদিন বিকালে ৪টা-সাড়ে ৪টা নাগাদ পুলিশ ইন্সপেক্টর শিবনাথ বাবু বীরেন্দ্রকে ফোন করলেন। এই ফোন কলটা বীরেন্দ্রর কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত নয়। ও ভেবেই রেখেছিল খুনী আবারও তার ভি-এক্স প্রয়োগ করবে। কলটা রিসিভ করে বলল—
— হ্যালো।
— কে বীরেন্দ্র?
— বলুন শিবনাথ বাবু। আবারও কি ভি-এক্স?
— আর বলবেন না, এবার আর ভিখারি, পাগল না, একজন অধ্যাপক খুন হয়েছে।
— বলেন কি? আপনি কোথায়?
— স্বপ্নদৃষ্টি শপিং মলের উল্টো দিকে নেতাজি সরণী। গলির তৃতীয় বাড়িতে আমি আছি। আপনি জলদি চলে আসেন।
তক্ষুনি বীরেন্দ্র তৈরি হয়ে নিল। বাইকে চেপে বেরিয়ে পড়লে। বাড়িতে পুলিশ ভিড় করছে। শিবনাথ বাবু তাকে দেখতে পেয়ে কোনো প্রকার ভনিতা ছাড়াই সরাসরি বলল —
“হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মাত্র ডাক্তারবাবু ওকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু জামা তুলতেই দেখা গেল পিঠে একটা সূঁচ ফোটার দাগ! সন্দেহ হওয়ায় দেহ পাঠানো হলো পোস্টমর্টেমে। ফরেনসিক ডাক্তার পিঠের সূঁচের দাগটি চিহ্নিত করে রক্ত আর ভিসেরার নমুনা পাঠিয়েছিলেন স্টেট ল্যাবে। আজ রিপোর্ট আসতেই আমার চোখ কপালে উঠল— রক্তের সঙ্গে মেশানো ছিল মারাত্মক সেই বিষ ভি-এক্স তরল। যা মৃত্যুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার প্রাণ কেড়ে নেয়।”
বীরেন্দ্র মনে মনে বুঝতে পারল কেসটা অত্যন্ত জটিল তাই পুলিশরা হাল ছেড়ে তার শরণাপন্ন হয়েছে। মুচকি হেসে বলল— “বাড়িওয়ালা নিশ্চয়ই মারা গেছে না?”
শিবনাথ— “হ্যাঁ।”
এরপর শিবনাথ বাবুর সঙ্গে বীরেন্দ্রর,পুলিশ ও ডাক্তার উভয়ের মতামতের বিষয়ে কথা হয়। পাঠকদের সুবিধার্থে সেই সমস্ত বিবরণ জানাচ্ছি— মৃতের নাম সৃজন দাস। পুলিশি রিপোর্ট অনুসারে, তিনি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক । গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পথে কোনো ভাবে তার পিঠে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়। তবে যে স্কুটিতে করে বাড়ি আসছিল সেটি স্ট্যান্ড দেওয়া ছিল। সেখানে রাস্তার উপর তাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। চোখ দুটো উল্টানো, মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে, প্রচণ্ড খিঁচুনিতে শরীরটা মনে হয় বেঁকে গেছে। ঠোঁট নীল, সারা শরীর ভয়ানক ফ্যাকাশে। মুখে অদ্ভুত বেদনার ছাপ, হাত দিয়ে বুক চেপে ধরা।
বীরেন্দ্র এরপর স্বর্গীয় সৃজন দাসের বাড়ির মধ্যে ঢুকল। দোতলা বাড়ি। বেশ পুরোনো বাড়ি, কিন্তু সাজানো গোছানো। ঘরে প্রবেশ করে দেখল সৃজন দাসের স্ত্রী হিয়া দাস ও বারো বছরের ছেলে প্রশান্ত দাস উভয়েরই চোখের কোণে জল।
বীরেন্দ্র ওদের দুজনেরই জেরা-টেরা সেরে নিল। পুলিশের করা জেরা গুলোও শুনল। জানতে পারল, সৃজন বাবুর বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই, এমনকি তাঁর কোনো ভাই-বোন ও বেঁচে নেই থাকলেও তাদের কথা ছেলে-স্ত্রী কেউই জানে না। ফলে কোনো ভাবেই সৃজন দাসের পূর্বপরিচয় সম্পর্কে কিছু জানা গেল না। কেবল মাত্র পরিচয়পত্র থেকে জানা গেল যে সৃজন দাসের পিতার নাম অমৃত দাস। সৃজন দাস ব্যক্তি হিসাবেও ছিলেন খুবই মুখচোরা ও চাপা স্বভাবের, ছেলে স্ত্রীর সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতেন না। মাঝে মধ্যে সন্ধ্যার পর দুই-তিন ঘণ্টা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন— ইথা নাকি ওনার প্রতিদিনের অভ্যাস। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে জানাতো, বাজারে, চায়ের দোকানে, বন্ধুর বাড়ি কিংবা স্রেফ হাওয়া খেতে যাচ্ছি। আদতে সৃজন বাবুর কলেজ ,কি চায়ের দোকানে কোনো বন্ধুর খোঁজ পাওয়া যায় নি। বীরেন্দ্রর নির্দেশে কলেজেও পুলিশের লোক পাঠানো হয়েছিল, উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায়নি সেখানে।
ইতিমধ্যে বীরেন্দ্র মৃতদেহ ভালো করে পরীক্ষা করা শুরু করেছে। শিবনাথ গম্ভীর থমথমে স্বরে জানালেন— “টাকা পয়সা কিছু চুরি হয়নি, আমাদের আগেই সব দেখা হয়ে গেছে, মনে হয় না উল্লেখযোগ্য কিছু পাবেন।”
কয়েক মিনিট পরে বীরেন্দ্র হিয়াকে ডাকতে বলল। হিয়া দাস ফোলা ফোলা চোখে বীরেন্দ্রকে বলল— “আমাকে ডেকেছিলেন?”
বীরেন্দ্র— “হ্যাঁ। আপনার স্বামী কি হাতে আংটি পরতেন?”
হিয়া— “বাঁ হাতের তর্জনীতে পরতেন বোধহয়। তবে আমাকে বা ছেলেকে কাউকেই আংটিটা দিতেন না।”
বীরেন্দ্র— “আচ্ছা! আংটি পরা অবস্থায় নিশ্চয়ই সৃজন বাবুর কোনো ছবি আছে?”
হিয়া দ্রুত ঘরে গিয়ে একটা অ্যালবাম নিয়ে এল। সেখানে সৃজন বাবুর আংটি পরা বেশ কিছু ছবি ছিল। বীরেন্দ্র ছবিগুলো চোখের কাছে নিয়ে গিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগল। গোলাপী রঙের হিরে বসানো সোনার আংটি।
বীরেন্দ্র চমকে উঠে বলল, “এতো দেখছি গোলাপী রঙের হিরের আংটি। যদি এটা আসল হিরে হয় তবে এর দামের দিক থেকে এটি পৃথিবীতে দ্বিতীয়, এত দামি জিনিস নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। সত্যিই আশ্চর্যের!”
রাতের দিকে শিবনাথ বাবু বীরেন্দ্রকে চুপি সারে বলল— “আমার তো মনে হয় মা ও ছেলে গোপনে হত্যা করে আংটিটা হাতিয়েছে।”
বীরেন্দ্র মৃদু হাসি চেপে রেখে বলল— “একটু মাথা খাটান শিবনাথ বাবু, যে জিনিস তারা ঘরে বসে করতে পারতো তার জন্য এত দূর তারা যাবে কেন? খেয়াল করে দেখুন হত্যার পর দিন থেকে হিয়া দাস ও প্রশান্ত ঘর থেকে এক পা-ও নড়েনি। তার উপর আবার আপনারাতো তাদের ঘর তল্লাশি করেছেন।”
শিবনাথ বাবু মাথায় হাত দিয়ে বলল— “সরি, ইয়ে মানে, ভেবে বলা উচিত ছিল।”
কিছুক্ষণ সব চুপ, তারপর বীরেন্দ্রর চোখের দিকে কুরুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গলা ধরা কণ্ঠে শিবনাথ বাবু বলল— “সত্যি কথা বলতে এই রকম ‘হযবরল’ কেসের সম্মুখীন কোনো দিনই হইনি। কোন দিক থেকে এগোবো কিছুই বুঝতে পারছি না, তাই ঠিক করেছি আপনার কথা মতো এবার এগোবো।”
বীরেন্দ্র— “কী যে বলেন, আমি তো একজন সামান্য বেসরকারি গোয়েন্দা।”
শিবনাথ বাবু— “বেসরকারি বা সরকারি যাই হোক, আপনার ক্ষুরধার বুদ্ধি ছাড়া এই মহাবিশ্বের কিছুই এই কেসের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে না।”
বীরেন্দ্র— “ওসব কথা ছাড়ুন তো! চলুন মৃতের ঘর থেকে ঘুরে আসা যাক।”
সৃজন দাসের ঘরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না।
সত্যিই ব্যাপারটা অত্যন্ত আশ্চর্যের। যে মানুষের হাতে সব সময়ে বিশ্বের অন্যতম দামি আংটি থাকতো। ওই রকম নির্মম ভাবে হত্যা করে যার কাছ থেকে সেই আংটি চুরি করা হয়, তার ঘরে কোনো সন্দেহজনক কিছুই নেই।
বীরেন্দ্র তখন মনে মনে ভাবল— “নিশ্চয়ই তদন্তে কোথাও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, আরো গভীর ভাবে কাজে মনোনিবেশ করতে হবে।”
বীরেন্দ্র এরপর বুককেস থেকে সৃজন বাবুর চারটি বই নামাল। বই গুলি নেহাত মামুলি তবুও প্রতিটি পেজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, ঠিক অন্ধ মানুষের হাতে বন্দুক দিয়ে পাখি মারার মতো। এই ভাবে আধঘণ্টা কেটে গেল। চারটি বইয়ের মধ্যে একটা ছিল রবীন্দ্রনাথের “সঞ্চয়িতা”। সেই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠার আগের পৃষ্ঠায় উপরের দিকে পেন্সিল দিয়ে ছোট করে লেখা ‘সপ্তসিন্ধু’। বীরেন্দ্র তখন চেঁচিয়ে উঠল— “পেয়েছি! আচ্ছা শিবনাথ বাবু, সপ্তসিন্ধু হোটেল এখান থেকে কত দূর?”
শিবনাথ বাবু— “পাঁচ-ছ’ কিমির মধ্যে, কেন?”
বীরেন্দ্র— “এক্ষুনি যেতে হবে, কিন্তু তার আগে হিয়া বৌদিকে একবার ডাকতে পার ?”
শিবনাথ বাবু হিয়াকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। বীরেন্দ্র তাকে প্রশ্ন করল— “সৃজন বাবুর নিজস্ব কোনো চাবির গোছা ছিল?”
হিয়া— “হ্যাঁ। ওর কলেজে যাওয়া ব্যাগটার মধ্যে আছে।”
মিনিট কুড়ির মধ্যেই বীরেন্দ্র শিবনাথ বাবুকে নিয়ে হোটেলের সামনে উপস্থিত হলো। পথে যেতে যেতে বীরেন্দ্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই হোটেলের কোনো একটা ঘরেই হয়তো সৃজন বাবু সময় কাটিয়ে দিতেন।
এরপর বীরেন্দ্র ও শিবনাথ বাবু হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে । চাবির গোছা থেকে নির্দিষ্ট চাবিটি পেতে অসুবিধা হলো। হোটেল ম্যানেজারের অনুমতিতে খোলা হলো সেই ঘর। কিন্তু হায়! ঘরে রয়েছে একটা খাট, খাটের পাশে একটা টি-টেবিল। সেই টেবিলের নিচের তাকে চারটি বই। এর মধ্যে দুটি কাব্যগ্রন্থ, একটা বাংলা অভিধান, আর একটা শেক্সপিয়রের রচনা সমগ্র।
শিবনাথ তো রীতিমতো রেগে গেছেন, হঠাৎ বলে উঠলেন— “ভেবেছিলাম এই ঘরে কি বড়ো কোনো প্রমাণ-টমাণ পাওয়া পাওয়া যাবে, কিন্তু ধূর ছাই কিছু নেই।”
বীরেন্দ্র খাটের বিছানার চাদর উলটাতে পালটাতে লাগল অজ্ঞাত প্রমাণের আশায়, কিছুই পাওয়া গেল না। এরপর বই গুলোর পেজ গুলো একটা একটা করে দেখতে লাগল, হঠাৎ একটি পুরোনো রং চটে যাওয়া কালার ছবি দেখতে পেল, ছবির দৈর্ঘ্য প্রায় মানুষের হাতের মধ্যমার সমান। ছবিতে দেখা যাচ্ছে দুটো কিশোর দাঁড়িয়ে আছে, নিচে আবার তাদের নাম লেখা। ডান দিকের টা যে সৃজন দাসের ছোট বেলার ছবি দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু বাম দিকের ছেলেটির নাম লেখা ‘সৌরভ’। এখন প্রশ্ন হলো সৌরভটা কে?
ছবিটা আবিষ্কার করে বীরেন্দ্রর উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আরো ভালো করে বইগুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পুরোনো জীর্ন পাতায় লেখা একটা উইল দেখতে পেল। এতই পুরোনো যে কাগজটায় হলুদ ছোপ পড়ে গেছে। বীরেন্দ্র উইলটা পড়ল না, নিজের ব্যাগের মধ্যে রেখে শিবনাথ বাবুকে বলল— “অনেক রাত হয়ে গেল তো, আমি উইলটা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি । বীরেন্দ্র বাড়ি পৌঁছে একটু খেয়েই উইলটা নিয়ে বসল। বেশ বড়ো উইল। কিন্তু মূল কথাটা সামান্য, বিষয়টি অনেকটা এই রকম— উইলের রচয়িতা অমৃত দাস। তার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বড়ো ছেলে সৃজন পাবে। ত্যাজ্যপুত্র সৌরভ কিছুই পাবে না। আংটিটাও পাবে সৃজন দাস। তবে বড়ো ছেলে যদি মনে করে তাহলে ভাইকে একটা অংশ দিতে পারে। এটা পড়ে কেসটা বীরেন্দ্রর কাছে অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
পরদিন সকালে বীরেন্দ্র একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠল। সোজা থানায় গেল একটু চা খেয়েই। দেখল শিবনাথ বাবু এসে গেছে। তাকে বলল— “সৌরভ দাস, সৃজন দাসের ভাই। তার সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত কিছু করা যাবে না। ওদিকে উইলেও পরিষ্কার বলা আছে সৃজন বাবু সমস্ত সম্পত্তি সহ আংটিটা পাবে। আমার মনে হয় উইলের কথা সৌরভ না জানলেও অনুমান করেছিল।”
শিবনাথ বাবু বললেন— “আচ্ছা আপনি সিওর উইলটা খাঁটি তো?”
বীরেন্দ্র— “মনে তো হয় খাঁটি। বাপ-বেটার হাতের লেখার ফারাক আছে।”
শিবনাথ বাবু— “তা আপনি এখন কি করবেন বলে ঠিক করেছেন?”
বীরেন্দ্র— “সৌরভকে খুঁজতে হবে। আচ্ছা আপনার জানা শোনা কেউ আছে, যে হাতের লেখা নকল করতে পারে?”
শিবনাথ বাবু— “আমাদেরই একটা লোক আছে, দাঁড়ান ডাক দিই।”
কিছুক্ষণ পরেই একটা ছোকরা হাজির হলো। তাকে উইলটা দিয়ে বলল— “এই হাতের লেখা নকল করে নতুন একটা উইল বানাতে হবে, পারবে তো?”
ছোকরাটি বলল— “হ্যাঁ। কিন্তু কি লিখব?”
বীরেন্দ্র পনেরো মিনিটের মধ্যে একটা উইলের খসড়া লিখে দিল। যাওয়া আগে বলে গেল— “আগামীকাল এই সময় আসবো, তার আগে তৈরি রেখো। সুন্দর করে করবে, অনেক সময় দিলাম কিন্তু!”
বীরেন্দ্র বাড়ি ফিরে এসে ওর পারসোনাল খাতায় হিজিবিজি লিখতে লাগল। হিজিবিজি শিল্প অনেকক্ষণ চলল। এরপর দিনের বাকি সময়টা অলস ভাবেই কাটিয়ে দিল। পরদিনই সকাল হতে না হতেই চলে গেল থানায়। সেখানে গিয়ে নকল উইলটা দেখতে লাগল। ছেলেটা যা কপি করেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। নকলটার ঘটনা অনেকটা এমন যে অমৃত বাবুর সমস্ত সম্পত্তির ১/৩ অংশ ও গোলাপি আংটিটা পাবে ছোটো ছেলে সৌরভ। বাকি সম্পত্তি বড়ো ছেলে পাবে।
শিবনাথ বাবু বীরেন্দ্রর কথা অনুযায়ী বিজ্ঞাপনের মতো নকল উইলটার একটা পরিষ্কার ছবি খবরের কাগজে ছাপিয়ে দিল। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও পোস্ট করা হলো, কিন্তু পুলিশি নেতৃত্বে নয়, ছদ্মবেশে। সেখানে লেখা ছিল— “মৃত সৃজন বাবুর ছোটো ভাই সৌরভ যেন অবিলম্বে সৃজন বাবুর বাড়িতে উপযুক্ত প্রমাণসহ উপস্থিত হয়।” লেখার ঠিক উপরেই দেওয়া ছিল নকল উইলের ছবিটা।
এরপর বীরেন্দ্র শিবনাথ বাবু সহ থানার অন্যান্য পুলিশ যেমন – চন্দন, অতুল, রাজিব এদের বুঝিয়ে দিল, যদি সৌরভ আসে তাহলে কী কী করতে হবে।
বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। পরের দিনই দুপুরের দিকে উপস্থিত হলো সৃজন বাবুর বাড়িতে। তার চেহারার সঙ্গে ওর পূর্বের সেই ছোটবেলার ছবির অনেক মিল আছে।
বীরেন্দ্র তাকে বসতে বলল। সৌরভ বসেই বলতে শুরু করে— “আমিই সৌরভ দাস, অমৃত দাসের ছেলে, সৃজনের ভাই। আমি আমার সম্পত্তির ভাগ নিতে এসেছি।”
বীরেন্দ্র দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করেই বলে উঠল— “কিন্তু আপনার কাছে প্রমাণ কী? আপনার বাড়িই বা কোথায়?”
সৌরভ— “আমি তো ‘কাদিমতলা’ মানে পাশের গ্রামটায় থাকি। কাদিমতলা প্রাইমারি স্কুলের অপোজিটে যে গলি, তার দ্বিতীয় টিনের বাড়িটায় আমি থাকি।”
বীরেন্দ্র— “এ তো আপনার ঠিকানা। কিন্তু প্রমাণটার কি হলো?”
সৌরভ এর পরে এদিক ওদিক তাকিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল। সেই গোলাপী রঙের রাজকীয় হিরের আংটিটা বের করল। বীরেন্দ্র কে ওটা দেখিয়ে বলল— “এই দেখুন। এর পর ও আপনি প্রমাণ চাইবেন? উইলে এই আংটির কথাই আছে। দাদা হয়তো উইলের কথাটা জানতো , তাই আমাকে আংটিটা আগেই দিয়ে দিয়েছিল।”
বীরেন্দ্র একদৃষ্টিতে আংটির দিকে চেয়ে ছিল। সৌরভের কথায় তার মোহভঙ্গ হলো। মুচকি হেসে বলল— “না না, আর প্রমাণ চাই না। সব কমপ্লিট।”
আসলে বীরেন্দ্র প্লান অনুযায়ী শিবনাথ বাবু পাশের ঘরে থাকবে। আর রাস্তায় রাজিব ও চন্দন জিপ নিয়ে থাকবে। যখনই সৌরভের ঠিকানা বলা শেষ হবে তখন শিবনাথ বাবু তাদের ফোন করে ঠিকানা জানিয়ে দেবে। তারা সেই ঠিকানায় গিয়ে সৌরভের বাড়ি তল্লাশি করবে ।যতক্ষণ না পর্যন্ত সৌরভের ঘরে ভি এক্স পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ বীরেন্দ্র কথার ছলে সৌরভকে আটকে রাখবে।
মিনিট ১৫ পরে শিবনাথ বাবু ও দুজন কনস্টেবল সৌরভের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। শিবনাথ বাবু বলে উঠল— “ একটু আগেই রাজিব ফোন করে জানালো যে ওর ঘরে VX-এর শিশি পাওয়া গেছে।”
ভয়ে সৌরভ বললো — “মানে”
বীরেন্দ্র, মুখে যুদ্ধ বিজয়ীর মতো হাসি নিয়ে সৌরভকে বলল— “মানে আর কিছুই না সৌরভ মহাশয়। যে উইলটি দেখে আপনাকে এখানে আনা হয়েছে সেটা জাল; নকল— বুঝলেন! এই নিন আসল উইলের জেরক্স কপি। এখানে আপনাকে কিছুই দেওয়ার কথা নেই।”
সৌরভ টেবিলের উপর আংটিটা রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল— “চাই না আংটি, নিয়ে নাও!”
কিছুক্ষণ সব চুপ, তারপর ধীর কণ্ঠে বীরেন্দ্র বলে উঠল— “দ্যাখো সৌরভ, এই খুন-হত্যার পেছনে আসল কারণটা এখনও আমি পুরোপুরি জানি না। তুমি যদি আসল কারণটা জানাতে তাহলে অপরাধটা কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।”
সৌরভ চোখে জল নিয়ে বলল— “শুনুন তবে। আমার বাবা অর্থাৎ অমৃত দাসের পূর্বপুরুষরা রাজা-জমিদার ছিলেন। তাঁদেরই কেউ কোনো এক নবাবের কাছ থেকে এই অমূল্য সম্পদ আদায় করে। বংশপরম্পরায় এটি বাবার হাতে আসে। তারপর আমরা বড়ো হলাম। দুজনেরই আংটিটার উপর লোভ। হঠাৎ বাবা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ল, ডাক্তার দেখালাম কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দিল মেয়াদ বেশি দিন নেই। দুজন তারপর ষড়যন্ত্র করে আংটিটা চুরি করলাম। কিন্তু ওই জানোয়ার সৃজন আমাকে ফাঁসিয়ে দিল। বাবার অবস্থা তখন খুবই খারাপ, জীবনের শেষ সময় ভীমরতি হয়েছিল, তাই হয়তো সব কিছু না শুনেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। এই সময়ই হয়তো বাবা উইলটা লিখেছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই বাবা মারা গেল, আমি বাড়ি ফিরে এলাম কিন্তু দাদা ঢুকতে দিল না। বাবা নাকি আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছে। তার পর একদিন লুকিয়ে আংটিটা চুরি করলাম। তখন দাদা কেনা উকিল দিয়ে যুক্তি দেখাল যে শুধু চুরিই নয়, আমি খুন করার চেষ্টা করেছি। জেলে গেলাম। কয়েক বছর পর জেল থেকে বেরিয়ে সংকল্প করি ওকে পৃথিবী থেকে সরাতে হবে । চোরাকারবার থেকে VX তরল সংগ্রহ করি। প্রথম তিনটে খুন করে জানতে চেয়েছিলাম এটা কেমন কাজ করে, তার পরেই ঘটনাতো আপনার জানা।”
বীরেন্দ্র— “কিন্তু আপনি কীভাবে চলন্ত স্কুটি চালক দাদাকে সিরিঞ্জ ফোটালেন?”
সৌরভ— “আমি আগেই নির্জন রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রেখেছিলাম। পরে যখন দাদা রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে নীচু হয়ে কাঁটা সরাতে গেল, তখন তার পিঠে…”
বীরেন্দ্র রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেল শিবনাথ বাবু সৌরভকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে থানার দিকে। ক্রমে রাস্তা দিয়ে গাড়িটা মিলিয়ে গেল।
