ভয় || ইশান ঘোষ


এই ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে। তবুও কেন জানি না, মনে হয় যেন কালকেরই কথা।
অনেকবার ভেবেছি, পুরো বিষয়টা কাউকে জানিয়ে নিজের মনটা হালকা করব। কিন্তু যতবারই চেষ্টা করেছি, প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে, কেউ যেন আঁকড়ে ধরেছে আমার হৃৎপিণ্ডটাকে, চেপে ধরেছে আমার গলা। তাছাড়া, কাউকে যদি আমি নিজের এই গল্প—না, গল্প নয়, আমার জীবনে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা, বা সেরকমই কিছু—জানাতে যাই, তাহলে সে নিশ্চয়ই আমার কথা বিশ্বাস করবে না। বরং মনে করবে, হয়তো আমি কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছি।
তাই এত বছর ধরে নিজের এই কষ্টটা চেপে রেখে একাই বহন করছি। কিন্তু এই বেদনা আমার হৃদয়কে এতটাই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে যে, আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছি না। অনেক ভেবেছি, অনেক দিন সহ্য করেছি। এই স্মৃতিচিহ্ন ক্রমাগত আমার মনকে আহত করেছে। তাই আজ, নিরুপায় হয়ে, নিজের এই কষ্টটা কমানোর জন্যই হোক, আমার মনের কথাটা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি।
অন্যান্য বছরের মতো, সেই বছরও গরমের ছুটিতে আমাদের চমকে দিয়েছিলেন বাবা। গরমের ছুটি পড়ার আগেই আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম, কোথায় ঘুরতে যাওয়া সবচেয়ে ভালো হবে—দীঘা, দার্জিলিং, পুরী, না গ্যাংটক?
কিন্তু বাবা সেই বিষয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছিলেন না। অথচ যেদিন ছুটি পড়ল, সেদিন তিনি বাড়িতে বেশ রাত করে ফিরলেন। আর বাড়ি ফিরেই আমাকে ডাকলেন।
তারপর আমার সমস্ত আশাকে ছাপিয়ে বাবা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন রাজস্থানের বিখ্যাত শহর জয়সলমিরের ছবি দেওয়া একটি ট্যুর এজেন্সির কার্ড।
তারপর বললেন,
— “কী, কেমন লাগল এইবারের প্ল্যানটা?”
আমি তো খুশিতে আত্মহারা!
কিন্তু তারপরেই ঘটে গেল একunexpected/অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
একদিন সকালবেলা খবরের চ্যানেলে দেখা গেল—রাজস্থানের জয়সলমিরের কাছাকাছি পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। মৃতের সংখ্যা দশ, আহত ত্রিশ।
স্বাভাবিকভাবেই এরপর আমাদের রাজস্থান ট্যুর বাতিল হয়ে গেল। আলাদা করে বলার আর কোনো প্রয়োজন বোধহয় নেই।
অবশ্য আমি তখন সেই ঘটনার গুরুত্ব বুঝিনি। আমি শুধু ভাবছিলাম, যে রাজস্থানের জয়সলমির, চিতোর আর গোলাপি শহর জয়পুরের এত গল্প শুনেছি, সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও তা হাতছাড়া হয়ে গেল।
হতাশ হয়ে আমি নিজেকে নিজের শোয়ার ঘরে বন্ধ করে দিলাম। মা অনেকবার আমাকে ডাকাডাকি করলেন, কিন্তু বোবার মতো কোনো কথার উত্তর না দিয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে বসে রইলাম।
আস্তে আস্তে দিন থেকে রাত হয়ে গেল।
অন্ধকার ঘরে বসে থাকতে থাকতে আমার চোখে ঘুমের হালকা ঝিমুনি নেমে এসেছিল। চোখ দুটো প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। এমন সময় সূর্যের আলোর মতো তীব্র এক আলোকরশ্মি এসে পড়ল আমার চোখে।
প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে খেয়াল হলো, আমার ঘরে আমাকে ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ নেই।
তখনই মনে প্রশ্ন জাগল—কে তাহলে ঘরের আলোটা জ্বালাল?
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সেই ভুল ধারণা ভেঙে গেল।
কারণ আমার মাথার ঠিক ওপরে যে জিনিসটা চকচক করছিল, সেটা আমার ঘরের এলইডি লাইট নয়—সেটা সত্যিই সূর্য।
তারপর চারপাশে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, আমার ঘরটা যেন আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে।
তারপর বেশি সময় লাগল না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেটি রূপান্তরিত হলো এক বিশাল মরুভূমিতে।
অন্ধ মানুষের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিলে তার যে রকম অবস্থা হয়, প্রথম কয়েক মিনিট আমারও ঠিক তেমনই অবস্থা হয়েছিল।
তারপর মনে হলো, হয়তো আমি স্বপ্ন দেখছি। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু তৎক্ষণাৎ সেই ভুল ভেঙে গেল।
মরুভূমির তপ্ত বালি এসে আছড়ে পড়ল আমার শরীরে। জ্বালা করে উঠল আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সেই জ্বালা সামলে ওঠার আগেই আরেক ঝাপটা তপ্ত বালি এসে আঘাত করল আমার শরীরে।
আমি চেষ্টা করলাম সেখান থেকে পালিয়ে যেতে, অন্তত হাঁটু গেড়ে বসতে। কিন্তু পারলাম না। শরীরটা যেন আমার আর নড়তে চাইছিল না।
অথচ সেই জ্বালার চোটে ছটফট করছিল আমার মন।
তখন নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম—কখন যেন সেটা পরিণত হয়েছে একটি বিশাল, হৃষ্টপুষ্ট পামগাছের গুঁড়িতে।
এই কথাটা বুঝতেই মাথা ঘুরে গেল।
এতগুলো সমস্যার সম্মুখীন আমি এর আগে কখনো হইনি। তাই কিছুক্ষণের জন্য আমার বাস্তববুদ্ধি যেন পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিল। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি অজ্ঞান হয়ে যাব।
বেশ কিছুক্ষণ পর আমার হুঁশ ফিরল। ততক্ষণে বালির ঝাপটাও আমার গায়ে সয়ে গেছে।
তখন মনে একটা খুব বড় প্রশ্ন এল—আমার সঙ্গে এই ঘটনাগুলো ঘটছে কী করে?
তাছাড়া, গাছের তো চোখ হয় না। তাহলে আমি নিজের চারপাশে সবকিছু দেখছি কী করে? তাও আবার এত পরিষ্কারভাবে, এত দূর পর্যন্ত?
এখন দেখলাম, আমি দাঁড়িয়ে আছি এক মরুদ্যান-এ। পাশেই কয়েকটি তাঁবু খাটানো।
কিন্তু সেদিকে বেশিক্ষণ আমার মন থাকল না। তার বদলে অন্য কয়েকটি চিন্তা চেপে ধরল আমার মস্তিষ্ককে।
আমি কি আর কোনোদিন নিজের শরীরে ফিরে যেতে পারব?
পাব কি নিজের পুরোনো জীবন ফিরে?
আর কোনোদিন দেখতে পাব কি আমার মায়ের মুখখানা?
পারব কি নিজের মায়ের কাছে ফিরে যেতে?
এই শেষ প্রশ্নটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল।
কথাটা মনে হতেই আমার খুব কান্না পেল।
কিন্তু গাছের তো চোখ নেই—সে কাঁদবে কী করে?
এইভাবেই কাটল পুরো দিনটা।
দুঃখ যেন আমার শেষই হচ্ছিল না। মরুভূমির মাঝখানে সারাদিন সূর্যের তাপ সহ্য করলে যে কেউ কাহিল হয়ে পড়বে। আমিও হলাম।
শরীরটা গাছের হলেও মনটা তো এখনো মানুষেরই।
তাই অনেকবার ইচ্ছে করল একটু শুয়ে পড়ি। কিন্তু সেই চেষ্টা করাটাই বৃথা। কারণ দাঁড়িয়ে থাকা গাছের ধর্ম, গাছের ভাগ্য, গাছের জীবন—শোবে সে কী করে?
সত্যি, কষ্ট সবারই হয়—মানুষেরও, গাছেরও। মরুভূমিতে তো আরও বেশি।
আস্তে আস্তে সূর্য নিজের স্থান ত্যাগ করল। তার সঙ্গে আশপাশের আবহাওয়াও শীতল হয়ে উঠল।
প্রথমে সেটা বেশ মনোরম মনে হলেও পরে সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। কারণ যত বেশি ঠান্ডা পড়ছিল, ততই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। ঠান্ডা যেন আমার পুরো শরীরকে শিরশির করে দিচ্ছিল।
সামনে খাটানো তাঁবুগুলো থেকে কয়েকজন মানুষ বেরিয়ে এল। তারা বেশ আনন্দের সঙ্গে আগুন জ্বালাল। তারপর আগুনের সামনে গিয়ে নাচ, গান আর হইহুল্লোড় শুরু করল।
তাদের দেখে আমার একটু হিংসা হলো, আবার একটু ভালোও লাগল।
ভাবলাম, তাদের কাছে নিজের অসুবিধার কথা বলে সাহায্য চাই।
কিন্তু তখনই আবার মনে হলো—আমি তো একটা পামগাছ!
আমি না বলতে পারি কথা, না আমার কোনো ভাষা আছে। কথা বলাই আমার পক্ষে অসম্ভব। সাহায্য চাওয়া তো দূরের কথা।
ভাবতে পারছি—সেটাই যেন তখন আমার কাছে একমাত্র সান্ত্বনা।
আশপাশের গাছেদের সঙ্গেও আমি যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। কারণ গাছ হয়ে গেলেও গাছেদের ভাষা আমি এখনো শিখিনি।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ আমার কানে ভেসে এল অনেকগুলো মর্মান্তিক আর্তনাদ। তার সঙ্গে মিশে গেল একের পর এক গুলির কানফাটা শব্দ।
চাঁদের জ্যোৎস্নায় দেখতে পেলাম, কোথা থেকে যেন একদল মরুদস্যু এসে তাঁবুগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে।
যারা এতক্ষণ নাচ, গান আর আনন্দ-ফুর্তি করছিল, সেই আর্তনাদগুলো মনে হয় তাদেরই।
তাহলে কি সবাই মারা গেল?
আমার গা শিউরে উঠল।
আমি চিৎকার করে বলতে চাইলাম—“বাঁচাও! বাঁচাও!”
কিন্তু সেই চেষ্টাতেও ব্যর্থ হলাম।
তখন মনে হলো, আমি তো একটা গাছ। দস্যুরা আমার কী-ই বা করবে? তারা তো আমার ব্যাপারে কিছুই জানে না।
এই ভেবে একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম কি না পেয়েছিলাম, তার আগেই মাথায় আরেকটা ঝটকা এল।
দস্যুরা এবার সবাই পালাচ্ছে।
তাদের মধ্যে একজনকে বলতে শুনলাম—
— “এই, তাড়াতাড়ি পালা সবাই! না হলে ডায়নামাইটের সঙ্গে আমরাও উড়ে যাব!”
কথাটা শুনতেই আমার চোখের সামনে আমার পুরো জীবনটা ভয় আর আতঙ্কে অন্ধকার হয়ে গেল।
এই মরুভূমির মাঝখানে কে বাঁচাবে আমাকে?
কী করে বাঁচব আমি?
শেষে কি আগুনে পুড়ে মরতে হবে?
অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম।
দম করে একটা কানফাটা শব্দ হলো।
প্রচণ্ড আলোয় আলোকিত হয়ে গেল চারদিক।
তারপর—
সব অন্ধকার।
কতক্ষণ কেটে গেল, জানি না।
যখন আবার চোখ খুললাম, দেখলাম আমি বসে আছি আমার ঘরের চেয়ারে।
আমি ফিরে এসেছি আবার নিজের জগতে।
আমি বেঁচে আছি।
উঠতে, বসতে, শুতে, কথা বলতে—সবকিছু করতে পারছি।
আমার হাত-পা, চোখ-মুখ, কান-নাক—আমার পুরো শরীর আমি ফিরে পেয়েছি।
কিন্তু আমার হাতে একটু জ্বালা করছিল।
তাকিয়ে দেখি, বেশ খানিকটা জায়গা যেন পুড়ে গেছে।
ঠিক তখনই শুনতে পেলাম মায়ের আওয়াজ।
দরজার বাইরে থেকে তিনি প্রতিনিয়ত আমাকে ডেকে যাচ্ছেন।
আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম।
তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে প্রাণপণে কাঁদতে শুরু করলাম।
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “কীরে? কাঁদছিস কেন? বাজে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছিস কি?”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
শুধু মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।
তখনও আমি নিশ্চিত হতে পারিনি—
আমি কি সত্যিই একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি…
নাকি কোনো অজানা, ভয়ংকর বাস্তবতা থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছি?

Author: admin_plipi