এরেবাসের সোনালি নিশ্বাস || তন্ময় চ্যাটার্জী

অ্যান্টার্কটিকার বুকে বিজ্ঞান, রহস্য ও রোমাঞ্চের এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান

অধ্যায়-১ — অভিযানের ডাক

[ অজানার প্রতি আকর্ষণ ]

বারাসাতের এক শান্ত রবিবারের সকাল।

বারান্দার টবে জল দিচ্ছেন অরিন্দম চ্যাটার্জী। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে পুরোনো বাংলা গানের সুর। ডাইনিং টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে একটি কম্পাস, ভারতের মানচিত্র, কয়েকটি পাথরের নমুনা আর একটি পুরোনো চামড়ায় বাঁধানো খাতা।

তেরো বছরের নীলার্য্য চ্যাটার্জী খাতার পাতায় মন দিয়ে কিছু লিখছে।

অরিন্দমবাবু মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, — “আজকের প্রশ্নটা কী?”

নীলার্য্য মাথা না তুলেই বলল, — “বাবা, পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা আছে, যেখানে মানুষের পায়ের ছাপের চেয়ে পেঙ্গুইনের পায়ের ছাপ বেশি?”

অরিন্দমবাবু সরাসরি উত্তর দিলেন না। বরং কম্পাসটা ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, — “উত্তরটা আমি বলে দিলে তুই একদিন ভুলে যাবি। কিন্তু যদি নিজে খুঁজে বের করিস, তাহলে সারাজীবন মনে থাকবে।”

এটাই ছিল নীলার্য্যের বড় হয়ে ওঠার পরিবেশ। অরিন্দম চ্যাটার্জী পেশায় একজন শিক্ষক। ইংরেজি পড়ালেও ইতিহাস, ভূগোল আর বিজ্ঞানে ছিল তাঁর সমান আগ্রহ। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয় ; বরং পৃথিবীকে গভীরভাবে বুঝতে শেখা।

ছুটির দিনগুলোতে তিনি নীলার্য্যকে নিয়ে কখনও কোনো ঐতিহাসিক স্থানে, কখনও জাদুঘরে, কখনও তারামণ্ডলে, আবার কখনও প্রকৃতির মাঝে বেড়াতে যেতেন। পথ চলতে চলতেই শেখাতেন—একটি পাহাড়ে র জন্মের গল্প, একটি নদীর পথ বদলের ইতিহাস, একটি নক্ষত্রমণ্ডলের পরিচয় কিংবা কোনো দুঃসাহসী অভিযাত্রীর জীবনকাহিনি।

তিনি প্রায়ই বলতেন, — “ইংরেজি ভাষা তোমাকে পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে পরিচয় করাবে। কিন্তু ইতিহাস, ভূগোল আর বিজ্ঞান তোমাকে পুরো পৃথিবীটাকেই চিনতে শেখাবে।”

সেই কথাগুলোই ধীরে ধীরে নীলার্য্যের কৌতূহলকে রূপ দিয়েছিল গভীর অনুসন্ধিৎসায়। বই পড়া, মানচিত্র দেখা, প্রশ্ন করা আর ভ্রমণ—এসবই তার কাছে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।

অরিন্দমবাবুর ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি যেমন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন, নীলার্য্যের কাছে তেমনই ছিলেন একজন গল্পকার, একজন পথপ্রদর্শক এবং এক অদম্য ভ্রমণপাগল মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন— — “ভূগোল শুধু মানচিত্রে নয়; মাটিতে হেঁটেও শেখা যায়।”

তাই স্কু লের ছুটি মানেই শপিং মল বা রিসর্ট নয়। কখনও সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, কখনও পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় , কখনও বিষ্ণুপুরের মন্দির, কখনও শান্তিনিকেতন, আবার কখনও অজানা কোনো গ্রাম। প্রতিটি সফরই ছিল একেকটি চলমান শ্রেণিকক্ষ। কোনো জায়গায় গিয়ে অরিন্দমবাবু কখনও শুধু ছবি তুলতেন না, প্রশ্ন করতেন—

— “এই নদীটা এদিকে বাঁক নিল কেন?” — “এই মন্দিরে এই ধরনের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে কেন?” — “এখানে এত পাখি আসে কেন?”

প্রথম প্রথম নীলার্য্য উত্তর দিতে পারত না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে শিখল—ভালো অভিযাত্রী হওয়ার আগে ভালো পর্যবেক্ষক হতে হয়। আর ভালো পর্যবেক্ষক হতে গেলে প্রথমে ভালো প্রশ্ন করতে শিখতে হয়।

প্রতিটি ভ্রমণ শেষে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল—একটি খাতা। নীলার্য্য নিজের হাতে সেটার নাম দিয়েছিল “ফিল্ড জার্নাল”। সেখানে লিখতে হতো—আজ কী দেখলাম? কী শিখলাম? আর শেষ প্রশ্নটি সবসময় একই থাকত—“আজ এমন কী দেখলাম, যার উত্তর এখনও জানি না?”

অরিন্দমবাবু বলতেন, — “যে প্রশ্ন করতে শেখে, সে-ই একদিন নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করে।”

এই অভ্যাসই নীলার্য্যকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। সে স্কু লে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী। কিন্তু সে নম্বরের জন্য নয়, শেখার আনন্দের জন্য পড়ে । বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, ভূতত্ত্ব, মহাকাশবিজ্ঞান—সবই তার কাছে একই গল্পের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।

স্কু লের লাইব্রেরিতে নতুন কোনো বিজ্ঞানবিষয়ক বই এলেই সেটি প্রথমে তার হাতেই দেখা যেত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, মডেল মেকিং, বিজ্ঞান প্রদর্শনী—সব জায়গায় সে নিয়মিত অংশ নিত। কিন্তু কোনো পদক জিতলে অরিন্দমবাবু শুধু একটি কথাই বলতেন— — “পদকটা আলমারিতে থাকবে। কিন্তু আজ তুই নতুন কী শিখলি?”

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন নীলার্য্যের জীবন এগিয়ে চলেছে।

ঘরের এক দেওয়ালজুড়ে ঝুলছে বিশাল পৃথিবীর মানচিত্র। লাল পিন দিয়ে চিহ্নিত করা আছে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, নীল পিনে গভীর সমুদ্রখাত, সবুজ পিনে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল। আর একেবারে নিচে সাদা রঙের একটি ছোট পিন; তার পাশে লেখা—ANTARCTICA।

নীলার্য্য অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই সাদা বিন্দুটির দিকে। সে তখনও জানত না—খুব শিগগিরই এই বিন্দুটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযানের দরজা খুলে দিতে চলেছে।

নীলার্য্যের এই কৌতূহলের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল তার মাসতুতো দিদি—রূষা ভদ্র। পনেরো বছরের রূষা কলকাতার কারমেল হাই স্কু লের দশম শ্রেণির ছাত্রী। জীববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক্স—সবকিছু র প্রতিই তার সমান আগ্রহ।

তবে এই আগ্রহও হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। রূষার বাবা সৌরদীপ ভদ্র একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অফিস থেকে ফিরেই তিনি কখনও পুরোনো টর্চ, কখনও টিভি, আবার কখনও ছোট্ট মোটর বা সার্কি ট বোর্ড নিয়ে বসতেন। রূষাও ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে থাকত।

একদিন একটি টর্চ কাজ করছিল না। রূষা বলেছিল, — “নতুন একটা কিনে নিলেই তো হয়।”

সৌরদীপবাবু মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন, — “কোনো জিনিস নষ্ট হলেই বদলে ফেলতে নেই। আগে বুঝতে শেখো, কেন নষ্ট হলো।”

তিনি টর্চটা খুলে ব্যাটারির সংযোগে একটু মরচে ধরা অংশ পরিষ্কার করে দিতেই আলো জ্বলে উঠল। সেদিন রূষা প্রথম শিখেছিল—প্রতিটি সমস্যার পেছনে একটা কারণ থাকে, আর কারণ খুঁজে বের করাই বিজ্ঞানের প্রথম কাজ। এরপর থেকে সার্কি ট, ব্যাটারি, সেন্সর, ছোট ছোট মোটর—এসবই তার খেলনার অংশ হয়ে উঠেছিল।

তবে শুধু যন্ত্র নয়, প্রকৃতিও ছিল তার সমান প্রিয়। স্কু ল ছুটির দিনে কখনও সে পাখি পর্যবেক্ষণ শিবিরে যেত, কখনও জলাভূ মিতে পাখির সংখ্যা গুনত, আবার কখনও গাছের পাতার পরিবর্তন লিখে রাখত নিজের নোটবইয়ে। তার কাছে প্রকৃতি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গবেষণাগার।

দুজনের স্বভাব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। নীলার্য্য প্রশ্ন করতে ভালোবাসত, আর রূষা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভালোবাসত। একজন রহস্যের সন্ধান করত, অন্যজন বিজ্ঞানের আলোয় সেই রহস্যের ব্যাখ্যা খুঁজে বের করত।

একদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনী থেকে ফেরার পথে নীলার্য্য হেসে বলেছিল, — “আমি যদি কোনো রহস্যের দরজা খুঁজে পাই, তুই সেই দরজার চাবিটা খুঁজে বের করবি।”

রূষাও হেসে বলেছিল, — “আর তুই না থাকলে আমি হয়তো সেই দরজাটাই খুঁজে পেতাম না।”

দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক ছিল শুধু আত্মীয়তার নয়, ছিল একই মূল্যবোধের। মাসে অন্তত একবার সবাই মিলে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাওয়া হতো—কখনও কোনো দুর্গ, কখনও জাদুঘর, কখনও জঙ্গল, আবার কখনও নদীর মোহনা। ভ্রমণ মানে শুধু ছবি তোলা নয়—স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ইতিহাস জানা, পাখির ডাক শোনা, পাথর হাতে নিয়ে দেখা, মানচিত্র খুলে পথ বোঝা এবং রাতে ফিরে আলোচনা করা যে আজ নতুন কী শেখা গেল।

তাদের বাড়ি তে রাতের খাবারের সময় একটি অলিখিত নিয়ম ছিল—ডাইনিং টেবিলে মোবাইল ফোন আনা যাবে না। বন্ধু রা যখন নতুন মোবাইল গেম, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড বা ভাইরাল ভিডিও নিয়ে ব্যস্ত থাকত, তখন নীলার্য্য আর রূষাদের আলোচনার বিষয়

হতো—নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, মঙ্গল গ্রহের নতুন ছবি, অথবা পৃথিবীর এমন কোনো রহস্য যার উত্তর বিজ্ঞান এখনও পুরোপুরি খুঁজে পায়নি।

একদিন এক বন্ধু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, — “তোরা এত পড়াশোনা করিস কেন?”

নীলার্য্য হেসে বলেছিল, — “আমরা তো মুখস্থ করি না, আমরা পৃথিবীটাকে বুঝতে চাই।”

রূষা যোগ করেছিল, — “সব উত্তর গুগলে পাওয়া যায়, কিন্তু গুগল ভালো প্রশ্ন করতে শেখায় না।”

কথাটা শুনে অরিন্দমবাবু মৃদু হেসে বলেছিলেন, — “মনে রেখো, বিজ্ঞান শুরু হয় উত্তর দিয়ে নয়… প্রশ্ন দিয়ে।”

দুই স্কু লের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছেও তারা ছিল খুব পরিচিত মুখ। বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, কুইজ, গবেষণাভিত্তিক প্রকল্প কিংবা বিজ্ঞান প্রদর্শনী—যেখানেই অংশ নিত, তাদের কৌতূহল, দলগত কাজ এবং যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা সবার নজর কাড় ত। তারা কখনও নিজেদের ‘জিনিয়াস’ ভাবেনি, বরং বিশ্বাস করত—শেখার কোনো শেষ নেই, আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষক হলো প্রকৃতি।

তখনও তারা জানত না, খুব শিগগিরই সেই প্রকৃতিই তাদের এমন এক পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাবে, যেখানে বইয়ের জ্ঞান, পারিবারিক শিক্ষা, সাহস, সততা আর মানবিকতা— সবকিছু রই পরীক্ষা হবে।

সেই পরীক্ষার নাম—অ্যান্টার্কটিকা। বরফে ঢাকা পৃথিবীর শেষ অজানা মহাদেশ।

একদিন দুপুরে হঠাৎ করেই নীলার্য্যের জীবনে এল সেই অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত। তার কম্পিউটারে একটি ই-মেল এল। প্রেরক: ভারতীয় অ্যান্টার্কটিকা গবেষণা কর্মসূচি। নীলার্য্য অবাক হয়ে মেইলটি খুলল। চিঠিতে লেখা:

“তরুণ বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ গবেষণা-শিক্ষা অভিযানের আয়োজন করা হয়েছে। নির্বাচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী ভারতীয় মেরু গবেষণা দলের সঙ্গে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।”

নীলার্য্যের চোখ বড় হয়ে গেল। গন্তব্য—অ্যান্টার্কটিকা! পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা, সবচেয়ে রহস্যময় মহাদেশ।

সে সঙ্গে সঙ্গে রূষাকে ফোন করল, — “রূষা! জানিস কী হয়েছে?”

রূষা শান্ত গলায় বলল, — “তোর গলায় যে উত্তেজনা শুনছি, মনে হচ্ছে আবার নতুন কোনো রহস্য পেয়েছিস।”

নীলার্য্য হেসে বলল, — “রহস্য নয়… অ্যান্টার্কটিকা!”

কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর রূষা বলল, — “তাহলে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। অ্যান্টার্কটিকা তো আর শুধু স্বপ্ন দিয়ে জয় করা যায় না, প্রস্তুতি দিয়ে জয় করতে হয়।”

এরপর বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. অনিরুদ্ধ সেনের নেতৃ ত্বে শুরু হলো তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ।

ড. অনিরুদ্ধ সেন হলেন ৪৮ বছরের এক বিশিষ্ট ভারতীয় ভূতত্ত্ববিদ, আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ এবং মেরু গবেষক। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অ্যান্টার্কটিকার ভূতত্ত্ব, আগ্নেয়গিরি ও ভূ-তাপীয় ব্যবস্থার ওপর গবেষণা করছেন। শান্ত, ধৈর্যশীল ও যুক্তিবাদী এই বিজ্ঞানীই নীলার্য্যদের অভিযানের বৈজ্ঞানিক নেতৃ ত্ব দেবেন। প্রথম দিনেই তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন— — “মনে রেখো, অ্যান্টার্কটিকা কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়। সেখানে প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় শক্তি।”

আর মাত্র দশ দিন… তারপরই শুরু হতে চলেছে এই ঐতিহাসিক অ্যান্টার্কটিকা অভিযান!

 অধ্যায়-২ — দক্ষিণ মেরুর পথে
[ অজানার অভিমুখে ]

কলকাতা বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। কাঁচের বিশাল জানালার ওপারে সারি সারি উড়োজাহাজ রানওয়েতে যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে নতুন অভিযানের জন্য।

নীলার্য্য কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জানালার পাশে। তার হাতে সেই পরিচিত বাদামি রঙের ফিল্ড জার্নাল—যার প্রথম পাতায় প্রতিটি নতুন অভিযানের আগে সে একটি প্রশ্ন লিখে রাখে। আজও লিখল—

“অ্যান্টার্কটিকা কি সত্যিই পৃথিবীর শেষ অজানা মহাদেশ?”

পাশে দাঁড়িয়ে রূষা হেসে বলল, — “দেখছি, অভিযান শুরু হওয়ার আগেই প্রশ্নের সংখ্যা দশ ছাড়ি য়ে গেছে।”

নীলার্য্য মুচকি হেসে উত্তর দিল, — “বাবা বলে, ভালো প্রশ্নই অর্ধেক পথ দেখিয়ে দেয়।”

— “আর বাবা বলেন, উত্তর খুঁজতে গেলে আগে পর্যবেক্ষণ করতে শিখতে হয়,” রূষার সংযোজন।

ঠিক তখনই অরিন্দম চ্যাটার্জী ও সৌরদীপ ভদ্র এগিয়ে এলেন। ছেলের কাঁধে হাত রেখে অরিন্দমবাবু বললেন, — “মনে রাখিস, পৃথিবী জয় করতে যাচ্ছিস না, পৃথিবীকে বুঝতে যাচ্ছিস। প্রশ্ন করতে কখনও ভয় পাবি না।”

সৌরদীপবাবু ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট মাল্টিটু ল বের করে রূষার হাতে দিলেন। — “যন্ত্রের ওপর ভরসা করবি, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। আগে সমস্যা বুঝবি, তারপর চাবি ব্যবহার করবি।”

বোর্ডিং ঘোষণার সাথে সাথে প্রিয়জনদের বিদায় জানিয়ে দুই কিশোর-কিশোরী বিমানে উঠল।

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক যাত্রার পর তারা পৌঁছাল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে—যেখানে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অ্যান্টার্কটিকা কেন্দ্র। এখানেই অভিযাত্রী দলের প্রশিক্ষণ শুরু হলো। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হাইপোথার্মিয়া মোকাবিলার কৌশল, ক্র্যাম্পন পরে বরফে হাঁটা, রশি বেঁধে চলা, বরফের ফাটল (crevasse) শনাক্ত করা এবং স্যাটেলাইট ট্রান্সিভার পরিচালনার কঠোর অনুশীলন চলল কয়েক দিন ধরে।

সেখানেই তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় হলো দলের নিরাপত্তা প্রধান ক্যাপ্টেন মীরা রাওর সঙ্গে। তিনি উচ্চ-অভিযান ও মেরু নিরাপত্তায় অভিজ্ঞ। প্রথম দিনেই ক্যাপ্টেন মীরা মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট সতর্ক বার্তা দিলেন—

— “হিমালয়, সিয়াচেন কিংবা অ্যান্টার্কটিকা—প্রকৃতি কখনও মানুষের অহংকার সহ্য করে না। এখানে শত্রু কোনো প্রাণী নয়; শত্রু হলো তীব্র ঠান্ডা, হঠাৎ বদলে যাওয়া আবহাওয়া, বিপজ্জনক ফাটল আর নিজের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।”

নীলার্য্য ফিল্ড জার্নালে লিখে রাখল: “অহংকার জ্ঞানকে থামিয়ে দেয়। কৌতূহল তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।”

ক্রাইস্টচার্চ থেকে বিশেষ বিমানে চেপে দক্ষিণ মেরুর উদ্দেশে যাত্রা করার পর আকাশ থেকেই ধরা দিল অ্যান্টার্কটিকার রূপ। বরফের বিশাল সমতল, নীল জলের বুকে ভেসে থাকা বিশালাকার হিমশৈল (iceberg) আর কালো আগ্নেয় শিলার উপস্থিতি। বিমান থেকে নেমেই কানে এলো সেই নিস্তব্ধতা—কোনো কোলাহল নেই, শুধুই বরফ আর বাতাস।

ভারতীয় মেরু গবেষণা কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর ড. অনিরুদ্ধ সেন, ক্যাপ্টেন মীরা এবং পরে বসলেন। ড. সেন বরফের ‘কোর- অন্যান্য বিজ্ঞানীরা তাদের নিয়ে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নমুনা’ (ice core) দেখিয়ে বললেন—

— “বরফের এই স্তরগুলো হাজার হাজার বছরের আবহাওয়ার ইতিহাস ধরে রাখে। আর আমাদের মূল ঘাঁটি ‘মৈত্রী’ হলেও, তার আগে আমরা মাউন্ট এরেবাসের কাছাকাছি একটি বিশেষ ভূ তাত্ত্বিক সমীক্ষা করব।”

ক্যাপ্টেন মীরা ডিজিটাল মানচিত্রে একটি জ্বলজ্বলে লাল বিন্দু দেখালেন। — “এটি মাউন্ট এরেবাস—পৃথিবীর দক্ষিণতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। গ্রিক পুরাণে ‘এরেবাস’ ছিল আদিম অন্ধকারের প্রতীক। বরফে ঢাকা এই আগ্নেয়গিরিও ঠিক ততটাই রহস্যময়।”

ড. সেন যোগ করলেন— — “ভূ তাত্ত্বিক দিক ছাড়াও, এরেবাসের আগ্নেয়গ্যাসে অতি সূক্ষ্ম সোনার কণা পাওয়া যায়। প্রকৃতি তার রহস্য আর সম্পদ নিজের নিয়মেই পাহারা দেয়।”

সন্ধ্যা নামতেই এক অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী হলো সবাই। অন্ধকার আকাশে সবুজ, নীল আর বেগুনি আলোর ঢেউ খেলে গেল—অরোরা অস্ট্রালিস বা দক্ষিণ মেরুপ্রভা।

নীলার্য্য ফিসফিস করে বলল, — “এ যেন মহাবিশ্বের নিজের হাতে লেখা চিঠি।”

কিন্তু সেই আলোর খেলা শেষ হওয়ার আগেই ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দূরবীন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রূষা হঠাৎ বরফের একটি ঢিবির দিকে আঙুল তুলল— — “নীল… ওইদিকে দেখ!”

অনেক দূরে, কনকনে বরফঝড়ে র ঝাপসার মধ্যে কালো পোশাক পরা এক অবয়ব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটি অদ্ভুত ধাতব যন্ত্র, যা থেকে নীল রঙের আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল।

পরের মুহূর্তেই এক তীব্র তুষারঝড় বা ‘ব্লিজার্ড’ চারপাশ ঢেকে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর ঝড়ে র তোড় কমলে দেখা গেল—জায়গাটি পুরো ফাঁকা।

ক্যাপ্টেন মীরা দ্রুত লেন্স ঘোরালেন। সেখানে মানুষের কোনো চিহ্ন নেই, কেবল নতুন বরফের ওপর রয়ে গেছে গভীর বুটের ছাপ… যা সোজা চলে গেছে মাউন্ট এরেবাসের দিকে।

নীলার্য্য ফিল্ড জার্নালটা শক্ত করে চেপে ধরে বিড় বিড় করল, — “ও কি আমাদের দেখছিল… নাকি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল?”

অ্যান্টার্কটিকার কনকনে নীরবতা আবার ফিরে এলো, তবে তার পেছনে লুকিয়ে রইল এক গভীর ও বিপজ্জনক রহস্যের সিগন্যাল।

অধ্যায়-৩ — বরফের বুকে সোনার খোঁজ

তিন দিনের সমুদ্রযাত্রার পর অবশেষে গবেষণা জাহাজটি রস সাগরের বরফময় জলরাশিতে প্রবেশ করল। চারদিকে শুধু অনন্ত সাদা বরফ আর গভীর নীল সমুদ্র। দূরে কালো আগ্নেয়শিলার গা বেয়ে নেমে এসেছে বরফের চাদর। আকাশে চক্কর কাটছে ডানামেলা স্কু য়া পাখি, আর বরফের ভাঙা চাঁইয়ের ওপর সার বেঁধে হেঁটে চলেছে শত শত অ্যাডেলি পেঙ্গুইন।

রূষার চোখ আনন্দে জ্বলে উঠল। — “নীল, দেখ! সত্যি পেঙ্গুইন!”

নীলার্য্য মৃদু হেসে বলল, — “তোর কৌতূহলের জন্যই তো ওদের এত কাছ থেকে দেখা হলো।”

ড. সেন মৃদু হেসে যোগ করলেন, — “মনে রেখো, আমরা এখানে অতিথি। অ্যান্টার্কটিকার প্রতিটি প্রাণী ও পরিবেশ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। গবেষণা করা যাবে, কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না।”

দুজনেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

কয়েক ঘণ্টা পর জাহাজটি ভারতীয় গবেষণা কেন্দ্র ‘ভারতী’ স্টেশনে পৌঁছাল। সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা আন্তরিকভাবে তাদের স্বাগত জানালেন।

ক্যাপ্টেন মীরা বললেন, — “আগামীকাল থেকে আসল কাজ শুরু হবে। কিন্তু তার আগে তোমাদের একটা ছোট পরীক্ষা দিতে হবে।”

নীলার্য্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “পরীক্ষা?”

ক্যাপ্টেন মীরা হেসে বললেন, — “অ্যান্টার্কটিকায় শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। এখানে টিকে থাকতে হলে প্রকৃতিকে পড় তে জানতে হয়।”

পরদিন সূর্য ওঠার আগেই সবাই প্রস্তু ত হয়ে বেরোল। প্রথম কাজ ছিল কম্পাস, জিপিএস আর কাগুজে মানচিত্র ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট স্থান খুঁজে বের করা। নীলার্য্য দ্রুত

মানচিত্র বিশ্লেষণ করল। অন্যদিকে রূষা বাতাসের গতি, বরফের ঢাল আর সূর্যের অবস্থান মিলিয়ে পথ নিশ্চিত করল।

ড. সেন সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, — “চমৎকার! বিজ্ঞান কখনও একটিমাত্র সূত্রে চলে না। পর্যবেক্ষণ আর যুক্তি—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।”

এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় পরীক্ষা—বরফের নিচে লুকিয়ে রাখা একটা বৈজ্ঞানিক সেন্সর খুঁজে বের করা। নীলার্য্য বরফের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করল। ঠিক তখনই রূষা লক্ষ করল, সম্রাট পেঙ্গুইনের একটা দল বারবার একটা নির্দিষ্ট এলাকা এড়ি য়ে কিছু টা দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

সে বলল, — “নীল, ওদিকে দেখো। মানুষ বোঝার আগেই প্রাণীরা বিপদের বা কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সংকেত পেয়ে যায়।”

নীলার্য্য সঙ্গে সঙ্গে বরফ-স্ক্যানার চালু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্ক্রিনে স্পষ্ট সংকেত ভেসে উঠল। ঠিক সেই জায়গার নিচেই পুতে রাখা ছিল সেন্সরটা!

ক্যাপ্টেন মীরা প্রশংসা করে বললেন, — “দারুণ! একজন বিজ্ঞান দিয়ে ভাবল, অন্যজন প্রকৃতিকে পড়ল। এই সমন্বয়ই তোমাদের সেরা দল তৈরি করে।”

ঠিক তখনই আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে শুরু করল। উত্তর দিক থেকে প্রবল হিমেল বাতাস বইতে শুরু করল।

ড. সেন আকাশের মেঘ দেখে বললেন, — “সবাই স্টেশনের দিকে চলো। তুষারঝড় তৈরি হচ্ছে।”

ফিরে আসার পথে রূষা হঠাৎ থেমে গেল। নিচু হয়ে বরফের দিকে তাকাল সে। — “নীল… এখানে দেখো।”

বরফের ওপর স্পষ্ট কিছু মানুষের বুটের ছাপ। কিন্তু সেগুলো তাদের দলের কারও নয়।

ক্যাপ্টেন মীরা নিচু হয়ে দাগগুলো পরীক্ষা করলেন। — “এই সীমায় অন্য কোনো দেশের গবেষণা দলের থাকার কথা নয়।”

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—কিছু দূর গিয়েই পায়ের ছাপগুলো হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। মনে হয় কেউ ইচ্ছে করেই নিজের উপস্থিতির সব চিহ্ন মুছে ফেলেছে।

ড. সেনের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। — “এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।”

সেই রাতে বাইরে প্রচণ্ড তুষারঝড় চলছিল। কিন্তু নীলার্য্যের ঘুম এল না। সে গবেষণাগারের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তুষারপাত দেখছিল। হঠাৎ দূরে বরফের প্রান্তরে একটি ক্ষীণ নীল আলো জ্বলে উঠল। কয়েক সেকেন্ড স্থির থেকে সেটা অন্ধকার তুষারঝড়ে মিলিয়ে গেল।

নীলার্য্য বিড় বিড় করে বলল, — “ওটা কী ছিল?”

ঠিক তখনই—বিপ… বিপ… বিপ…

পুরো স্টেশনের লাল সতর্ক বাতি জ্বলে উঠল, বেজে উঠল নিরাপত্তা অ্যালার্ম!

ক্যাপ্টেন মীরা দ্রুত দৌড়ে এলেন। — “কেউ বাইরের ল্যাবরেটরিতে ঢোকার চেষ্টা করছে!”

সবাই নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকক্ষে ছু টে গেল। সিসিটিভির পর্দায় দেখা গেল—ঘন তুষারঝড়ের মধ্যেও কালো পোশাক পরা এক অবয়ব গবেষণাগারের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দরজার ডিজিটাল লক পরীক্ষা করছে। তার মুখ সম্পূর্ণ ঢাকা। হঠাৎ সে মাথা তুলে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকাল। তারপর হাতের ছোট্ট একটা যন্ত্র সক্রিয় করতেই মনিটরের ছবি কেঁপে উঠল—স্ক্রিনজুড়ে শুধু ডিজিটাল নয়েজ। সংযোগ বিচ্ছিন্ন!

ক্যাপ্টেন মীরা নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে বাইরে ছু টলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে শুধু মাথা নাড়লেন। লোকটা যেন বরফের ঝড়ে র মধ্যেই মিলিয়ে গেছে।

পরদিন ভোরে ঝড় থামলে সবাই ল্যাবরেটরির বাইরে বেরোল। দরজার সামনে বরফে পড়ে ছিল একটি ছোট কালো ধাতব টোকেন।

নীলার্য্য সেটা তুলে নিল। এক পাশে খোদাই করা—1912। অন্য পাশে একটি বৃত্তের ভেতরে তিনটি পরস্পর সংযুক্ত ত্রিভু জ।

রূষা বিস্ময়ে বলল, — “এটা কি সেই পুরোনো হারিয়ে যাওয়া কোনো অভিযানের প্রতীক?”

ড. সেন টোকেনটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ নিশ্চু প দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, — “Order of Aurora…”

নীলার্য্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “আপনি এই নাম জানেন?”

ড. সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। — “বহু বছর আগে আন্তর্জাতিক মেরু গবেষণাজগতে একটি গোপন সংগঠনের নাম শোনা যেত। কেউ তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু বলা হতো, তারা পৃথিবীর অতিদুর্লভ বৈজ্ঞানিক উপাদান, অজানা খনিজ আর হারিয়ে যাওয়া অভিযানের তথ্য অবৈধভাবে নিজেদের দখলে রাখে।”

রূষা সাবধানে বলল, — “তাহলে… ওরা কি আমাদের আগেই এখানে এসে পৌঁছাল?”

ড. সেন উত্তর দিলেন না, কিন্তু তাঁর নীরবতাই সত্যটা জানিয়ে দিল।

নীলার্য্য জিজ্ঞেস করল, — “ওদের পেছনে কে আছে?”

ড. সেন কিছু সময় নীরব থেকে বললেন, — “ড. ভিক্টর রেইন। একসময় অসাধারণ মেধাবী ভূ -পদার্থবিদ ছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন—জ্ঞান মানবকল্যাণের জন্য নয়, পরম ক্ষমতা অর্জনের জন্য।”

ক্যাপ্টেন মীরা যোগ করলেন, — “নৈতিকতা ভঙ্গের অপরাধে আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিষদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তারপর থেকেই তিনি অলক্ষ্যে এমন অপরাধ চক্র পরিচালনা করছেন।”

ড. সেন টোকেনটার দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন, — “যদি ভিক্টর রেইন সত্যিই এখানে এসে থাকে, তবে সে কেবল গবেষণার জন্য আসেনি… সে এসেছে ‘Aurora Vault’-এর খোঁজে।”

ঘরের ভেতর নেমে এল এক জমাট নীরবতা। বাইরে তখন অরোরা অস্ট্রালিসের সুমেরুপ্রভা নেচে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এবার আর সেই আলো মন কাড় ছিল না; মনে হচ্ছিল, বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা শক্তি তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে।

অধ্যায়-৪ — হারানো মানচিত্র

রাতের ঘটনাটার পর গবেষণা শিবিরের পরিবেশ যেন বদলে গেল। আগে যেখানে বিজ্ঞানীরা নির্ভার মনে গবেষণার কথা বলছিলেন, এখন সেখানে প্রত্যেকেই একটু বেশি সতর্ক । নিরাপত্তা বেড়ে ছে। বাইরে যাওয়ার আগে প্রত্যেকের অবস্থান নথিভু ক্ত করা হচ্ছে। রেডিও যোগাযোগও আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ম মেনে চলছিল।

নীলার্য্য টেবিলের ওপর রাখা কালো ধাতব টোকেনটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ১৯১২। সংখ্যাটা যেন বারবার তার মাথায় ফিরে আসছে।

রূষা পাশে এসে দাঁড়াল। — “এখনও ওটার কথাই ভাবছিস?”

নীলার্য্য মাথা নাড়ল। — “১৯১২ সালে তো রবার্ট ফ্যালকন স্কটের অভিযানের ঘটনাও ঘটেছিল। একই বছর এই টোকেন… ব্যাপারটা কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না।”

ড. অনিরুদ্ধ সেন কথাটা শুনে মৃদু হাসলেন। — “খুব ভালো পর্যবেক্ষণ। ইতিহাস পড়ার আসল উদ্দেশ্যই হলো ঘটনার মধ্যে অদৃশ্যের সুতো দিয়ে সম্পর্ক খুঁজে বের করা।”

তিনি টোকেনটা হাতে নিয়ে বললেন, — “অনেক সময় সত্যিটা কোনো একটিমাত্র ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। ঘটনার মাঝখানের ফাঁকা জায়গাগুলোই আসল গল্পের উত্তর দেয়।”

নীলার্য্যের মনে পড়ে গেল তার বাবার কথা: “ইতিহাস কখনও শুধু সাল-তারিখ নয়; প” আজ যেন সেই কথার অর্থ তার কাছে মানুষের সিদ্ধান্ত আর তার পরিণতির গল্প। আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

সকালের ব্রিফিংয়ে ক্যাপ্টেন মীরা একটি বড় ডিজিটাল মানচিত্র খুললেন। মাউন্ট এরেবাস, রস দ্বীপ, হিমবাহ, পুরোনো অভিযানের রুট—সবকিছু তাতে চিহ্নিত।

ড. সেন এবার আরেকটি জিনিস বের করলেন—একটি পুরোনো, বহু ভাঁজ করা কাগজ। সাবধানে খুলতেই দেখা গেল বিবর্ণ হাতে আঁকা একটি মানচিত্র। কাগজের প্রান্তগুলো ছিঁড়ে গেছে, কিছু লেখা সময়ের চাদরে মুছে গেছে। তবু লাল কালি দিয়ে আঁকা একটি

সরু রেখা এখনও স্পষ্ট। সেটি গিয়ে শেষ হয়েছে মাউন্ট এরেবাসের দক্ষিণ-পশ্চিম ঢালে। সেখানে ইংরেজিতে স্পষ্ট লেখা—

Aurora Vault — Entrance

রূষা বিস্ময়ে বলল, — “এটাই কি সেই মানচিত্র?”

ড. সেন মাথা নাড়লেন। — “গত দশ বছর ধরে বিভিন্ন আর্কাইভ ঘেঁটে আমি এর ছিন্নভিন্ন অংশগুলো সংগ্রহ করেছি। অবশেষে গত মাসে এগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগাতে পেরেছি।”

তিনি একটু থেমে যোগ করলেন, — “তবে এই মানচিত্রের সত্যতা এখনও প্রমাণিত নয়। তাই আমরা এটাকে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, একটি সম্ভাব্য সূত্র হিসেবেই দেখছি।”

ক্যাপ্টেন মীরা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, — “এই কারণেই ড. সেনের সঙ্গে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। বিজ্ঞান কখনও অহংকার শেখায় না।”

ঠিক তখন গবেষণা কেন্দ্রের যোগাযোগকক্ষ থেকে একজন প্রযুক্তিবিদ দ্রুত ভেতরে ঢুকলেন। — “স্যার… রাতের সিসিটিভি ফুটেজের একটা অংশ আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি।”

সবাই মনিটরের সামনে এসে দাঁড়াল। ছবিটা অস্পষ্ট, তুষারঝড়ে বারবার কেঁপে উঠছে। তবুও কয়েক সেকেন্ডের জন্য মুখোশধারী লোকটির হাত পরিষ্কার দেখা গেল। তার ডান কব্জিতে বাঁধা কালো ব্যান্ডে একই প্রতীক—পরস্পর জড়ানো তিনটি ত্রিভু জ।

ড. সেন ধীরে বললেন, — “তাহলে সন্দেহ আর রইল না।”

— “অর্ডার অফ অরোরা?” ক্যাপ্টেন মীরা প্রশ্ন করলেন।

ড. সেন গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন। — “হ্যাঁ। আর ওরা যদি সত্যিই এখানে থাকে, তবে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ওদের নজরদারিতে রয়েছে।”

ঘরের ভেতর এক কঠিন নিস্তব্ধতা নেমে এল। দূরে জানালার বাইরে মাউন্ট এরেবাসের চূড়া থেকে ধোঁয়ার সরু রেখা ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। নীলার্য্যের মনে হলো —এখন আর তারা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অভিযানের সদস্য নয় , তারা এমন এক অদৃশ্য

দৌড়ে র অংশ হয়ে গেছে যেখানে প্রতিপক্ষ অদৃশ্য, কিন্তু তার উপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তে অনুভবে স্পষ্ট।

পরদিন ভোর। আকাশ সম্পূর্ণ পরিষ্কার। দিগন্তজুড়ে বরফের ওপর সূর্যের আলো এমনভাবে ঝিলমিল করছে যে পোলারাইজড গগলস ছাড়া তাকিয়ে থাকাই অসম্ভব। আজই প্রথমবার দলটি পুরোনো মানচিত্রে চিহ্নিত পথ অনুসরণ করবে।

রওনা হওয়ার আগে ক্যাপ্টেন মীরা সবাইকে আবার মনে করিয়ে দিলেন— — “মনে রেখো, এই অভিযান কোনো গুপ্তধনের খোঁজ নয়। আমাদের প্রথম লক্ষ্য নিরাপত্তা, দ্বিতীয় লক্ষ্য বিজ্ঞান, আর তৃ তীয় লক্ষ্য অনুসন্ধান।”

নীলার্য্য মাথা নাড়ল। তার বাবা সবসময় বলতেন: “ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়; সেই জায়গাকে সম্মান করতে শেখা।” আজ কথাটার গুরুত্ব সে যেন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারল।

দুটি স্নোমোবাইল ধীরে ধীরে গবেষণা শিবির ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। সামনে ক্যাপ্টেন মীরা, পিছনে ড. অনিরুদ্ধ সেন, নীলার্য্য ও রূষা। দূরে মাউন্ট এরেবাসের কালো ঢাল বরফের সমুদ্রের মধ্যে এক বিশাল প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে।

ড. সেন বললেন, — “এই আগ্নেয়গিরির ভূ-তাপীয় প্রক্রিয়ার কারণেই রস দ্বীপের ভূতত্ত্ব পৃথিবীর অন্য অনেক জায়গার চেয়ে আলাদা।”

রূষা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, — “তাহলে এখানেই কি সেই বিশেষ বিরল খনিজ পাওয়া যায়?”

— “সম্ভব,” ড. সেন বললেন। “তবে আমরা আগে তথ্য সংগ্রহ করব, তারপর সিদ্ধান্তে পৌঁছাব।”

প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর মানচিত্রে চিহ্নিত প্রথম স্থানাঙ্কে পৌঁছাল তারা। চারদিকে নিস্তব্ধতা, কোনো মানুষের চিহ্ন নেই।

হঠাৎ রূষা দূরবীন নামিয়ে বলল— — “মীরা ম্যাম… আমাদের বাঁদিকে কেউ আছে!”

সবাই তাকাল। দূরের বরফের ঢিবির পাশে কালো একটা অবয়ব। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বরফের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ক্যাপ্টেন মীরা সঙ্গে সঙ্গে দূরবীন তুললেন। কিন্তু কেউ নেই—শুধু বাতাসে উড় তে থাকা বরফের গুঁড়ো।

নীলার্য্য নিচু গলায় বলল, — “মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ছায়ার মতো অনুসরণ করছে।”

ড. সেন শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, — “হতে পারে। আবার আলো আর বরফের দূরত্বের বিভ্রমও হতে পারে। আমরা বস্তু নিষ্ঠ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”

কিন্তু তাঁর কণ্ঠেও ছিল স্পষ্ট সতর্ক তার আভাস।

আরও কিছু টা এগিয়ে যাওয়ার পর নীলার্য্যের নজরে পড়ল বরফের নিচে অস্বাভাবিক একটি জ্যামিতিক রেখা। প্রাকৃ তিক বরফে এমন সোজা, মসৃণ রেখা তৈরি হওয়া অসম্ভব।

সে স্নোমোবাইল থামিয়ে বলল— — “একটু দাঁড়ান!”

সবাই নেমে এল। রূষা ও নীলার্য্য বরফ পরিষ্কার করতে লাগল। কয়েক মিনিট পর বেরিয়ে এল একটি ধাতব পৃষ্ঠ।

ড. সেন বিস্ময়ে বললেন— — “এটা তো সম্পূর্ণ কৃ ত্রিম একটি কাঠামো!”

বরফ আরও সরাতেই দেখা গেল একটি ছোট স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া ও ভূ -কম্পন কেন্দ্র। ইস্পাতের তৈরি, বেশিরভাগটাই বরফের নিচে চাপা। তবে সৌরপ্যানেলের একটা অংশ এখনও বাইরে বেরিয়ে আছে। অদ্ভুতভাবে, যন্ত্রটির পাওয়ার নির্দেশক আলো তখনও জ্বলছিল।

ক্যাপ্টেন মীরা অবাক হয়ে বললেন— — “এটা এখানে কে বসাল?”

গায়ে কোনো দেশের পতাকা নেই, কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নামও নেই। শুধু একটি কালো প্রতীক—একটি বৃত্তের মধ্যে পরস্পর সংযুক্ত তিনটি ত্রিভু জ।

নীলার্য্য ধীরে ফিসফিস করে বলল— — “অর্ডার অফ অরোরা…”

রূষা কনসোলের বরফ পরিষ্কার করতেই ছোট্ট স্ক্রিনটি জ্বলে উঠল। বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও সক্রিয়! তার ইঞ্জিনিয়ার বাবা ছোটবেলা থেকেই তাকে শিখিয়েছিলেন—অজানা যন্ত্রে কখনও তাড়াহুড়ো করে বোতাম চাপবে না; আগে কার্যপদ্ধতি বুঝবে, তারপর হাত দেবে। সে শুধু মনিটরটি পর্যবেক্ষণ করল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠছে: পৃষ্ঠ তাপমাত্রা, চৌম্বকীয় প্রবাহ, অণু-ভূকম্পন কার্যকলাপ

ড. সেন বিস্মিত। — “এগুলো কেবল আবহাওয়া নয়, মাউন্ট এরেবাসের ভূ -কম্পন আর চৌম্বক ক্ষেত্রও গোপনে ট্র্যাক করছে!”

তিনি দ্রুত নিজের ট্যাবলেটে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করতে শুরু করলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে—বিপ… বিপ… বিপ…

যন্ত্রটি হঠাৎ তীব্র সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করল। স্ক্রিনে একটি বার্তা ভেসে উঠল : অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে

তারপরেই—এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড… এবং সমস্ত সঞ্চিত উপাত্ত একে একে সিস্টেম থেকে মুছে যেতে শুরু করল!

নীলার্য্য চমকে উঠে বলল— — “কেউ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূর থেকে সিস্টেমটা ফরম্যাট করছে!”

ড. সেনের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। — “না… শুধু ফরম্যাট নয়। আমরা যে এখানে পৌঁছেছি, সেটা ওরা জেনে গেছে।”

ঠিক তখনই দূরে বরফের ওপর সূর্যের আলোয় আবার এক মুহূর্তের জন্য সেই কালো অবয়বটিকে দেখা গেল। এবার সে পালাল না। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে নিজের ডান হাত তুলে যেন তাদের উদ্দেশে এক ঠাণ্ডা অভিবাদন জানাল… এবং পরের মুহূর্তেই তুষারের পর্দার আড়ালে উধাও হয়ে গেল।

স্বয়ংক্রিয় কেন্দ্রটির স্ক্রিন নিভে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু বাতাসের গর্জন শোনা যাচ্ছিল।

ড. অনিরুদ্ধ সেন ধীরে বললেন, — “চলো। আমরা এখানে যত বেশি সময় থাকব, ঝুঁকি তত বাড় বে।”

ঠিক তখনই—ঠাস!

একটি গুলির শব্দে বরফের ওপর তুষার ছিটকে উঠল!

ক্যাপ্টেন মীরা মুহূর্তের মধ্যে চিৎকার করে উঠলেন, — “কভার নাও!”

সবাই তড়ি ঘড়ি বরফের উঁচু রিজের আড়ালে আশ্রয় নিল। দূরের একটি বরফ -টিলার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তিনজন কালো পোশাক পরা মুখোশধারী, যাদের হাতে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক অস্ত্র। তবে তারা অন্ধের মতো গুলি চালাচ্ছিল না। প্রথম গুলিগুলো ছিল ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

ড. সেন নিচু গলায় বললেন, — “ওরা আমাদের প্রাণ নিতে আসেনি।”

— “এখনও নয়,” ক্যাপ্টেন মীরা জবাব দিলেন।

একজন মুখোশধারী ইংরেজিতে চিৎকার করল— — “Drop the map! Step away from your bags!”

নীলার্য্য অবাক হয়ে বলল, — “ওরা জানে মানচিত্রটা আমাদের কাছে আছে!”

ড. সেনের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। — “তার মানে আমাদের প্রথম থেকেই ট্র্যাকিং করা হচ্ছে।”

ক্যাপ্টেন মীরা দূরত্ব হিসাব করলেন—প্রায় একশো মিটার, সঙ্গে প্রতিকূ ল বাতাস। সরাসরি সংঘর্ষ বোকামি হবে। — “কেউ অনর্থক গুলি চালাবে না,” তিনি নির্দেশ দিলেন। “আমরা বিজ্ঞানী। আত্মরক্ষা ছাড়া প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না।”

ঠিক তখন নীলার্য্যের চোখ পড়ল ওপরের পাহাড়ি ঢালে। সেখানে জমে আছে ঝু লন্ত, নরম বরফের মোটা স্তর। তার মনে পড়ে গেল প্রশিক্ষণের সময় ক্যাপ্টেন মীরার সেই কথাটা: “প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা, তবে তাকে ব্যবহার করতে হলে তার মন বোঝা চাই।”

নীলার্য্য তার ব্যাকপ্যাক থেকে ইমার্জেন্সি সিগন্যাল ফ্লে য়ার বের করল।

রূষা চোখ বড় করে তাকাল। — “তুই কী করতে যাচ্ছিস, নীল?”

— “একটা নিয়ন্ত্রিত রাস্তা বানাতে চাইছি…”

কথাটা শেষ করেই সে ঢালের অনেকটা ওপরে ফ্লে য়ারটা ছু ড়ে মারল! ফ্লে য়ারের তীব্র আলো ও তাপে নরম বরফের আস্তরণে ঝাঁকু নি লাগল।

এক মুহূর্ত… দুই মুহূর্ত…

গররররর… পুরো পাহাড়ে র ঢাল কেঁপে উঠল!

ড. সেন চেঁচিয়ে উঠলেন— — “নিয়ন্ত্রিত তুষারধস!”

ক্যাপ্টেন মীরা সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন— — “সবাই ডানে পজিশন নাও!”

মুহূর্তের মধ্যে বরফের একটি মাঝারি ঢেউ ঢাল বেয়ে নেমে এল। এটি মারাত্মক প্রাণঘাতী না হলেও মুখোশধারীদের সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে দিল। তারা নিজেদের বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে চারদিকে ছু টে পালাল।

সুযোগ বুঝে ক্যাপ্টেন মীরা বললেন— — “এখনই সুযোগ, স্নোমোবাইলে চলো!”

পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারা বিপজ্জনক এলাকা ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গেল। সবাই হাঁপাচ্ছে, তবে কেউ আহত হয়নি।

ক্যাপ্টেন মীরা নীলার্য্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, — “বিশাল ঝুঁকি নিয়েছিলে।”

নীলার্য্য মাথা নিচু করল। — “জানি।”

ক্যাপ্টেন মীরা হালকা হেসে বললেন, — “কিন্তু আগে ঢালের অবস্থা দেখে, বাতাসের গতি মেপে, নিরাপদ কোণ বেছে সিদ্ধান্ত নিয়েছ। আতঙ্কে নয়—বুদ্ধি দিয়ে কাজ করেছ। সেটাই আসল দক্ষতা।”

ড. সেন যোগ করলেন, — “বিজ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় নয়, সঠিক সময়ে উপস্থিত বুদ্ধির মধ্যেও থাকে।”

ঠিক তখনই নীলার্য্য নিজের ব্যাকপ্যাকের চেন খুলতে গিয়ে থমকে গেল। তার মুখের রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। — “না…”

রূষা দ্রুত এগিয়ে এল। — “কী হয়েছে, নীল?”

— “মানচিত্রটা…”

সে ব্যাগের সব জিনিস একে একে বের করল—ফার্স্ট এইড কিট, নোটবই, কম্পাস, জিপিএস, স্যাম্পল ব্যাগ। কিন্তু মানচিত্র নেই! ব্যাগটির পাশের পকেট পেন্সিল কাটারের মতো কিছু দিয়ে সুন্দর করে কাটা!

সবাই স্তব্ধ।

ক্যাপ্টেন মীরা চোখ ছোট করে বললেন, — “ধস নামার ঠিক আগের বিশৃঙ্খলায় একজন মুখোশধারী খুব কাছ পর্যন্ত চলে এসেছিল…”

ড. সেন ধীরে বললেন, — “সেই ভিড় ভাট্টাতেই ওটা স্রেফ পকেট কেটে বের করে নিয়েছে।”

ঠিক তখনই রূষা দূরের দিগন্তে আঙুল তুলল— — “ওদিকে দেখুন!”

দিগন্তের বরফ চিরে একটি কালো স্নোমোবাইল প্রচণ্ড গতিতে সরে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে সেটি সাদা বরফের বাষ্পে মিলিয়ে গেল।

নীলার্য্যের কণ্ঠে চরম হতাশা ফুটে উঠল। — “সব শেষ হয়ে গেল…”

ড. সেন তার কাঁধে শান্তভাবে হাত রাখলেন। — “না, নীলার্য্য। মানচিত্র কেবল পথ দেখায়, কিন্তু পথের অর্থ আর গন্তব্যের রহস্য ব্যাখ্যা করে না।”

রূষা যোগ করল, — “আর যারা শুধু অন্ধের মতো মানচিত্র অনুসরণ করে, তারা দরজার সামনে গিয়ে চাবি ছাড়া দাঁড়াবে।”

ড. সেন মৃদু হেসে বললেন, — “মানচিত্রের প্রতিটি গাণিতিক হিসেব, প্রতিটি সংকেত আমরা আগেই বিশ্লেষণ করেছি। ওরা কাগজ পেয়েছে, কিন্তু সেই কাগজের ভাষা পড়ার চাবি এখনও আমাদের মাথাতেই আছে।”

নীলার্য্যের চোখে হারানো বিশ্বাস ফিরে এল। সে মাউন্ট এরেবাসের দিকে তাকিয়ে বলল, — “তাহলে আমাদের ওদের আগেই সেই সংকেত উদ্ধার করতে হবে!”

ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাপ্টেন মীরার স্যাটেলাইট রেডিও প্রচণ্ড শব্দে বেজে উঠল। — “ক্যাপ্টেন… জরুরি বার্তা!”

রেডিওর ওপার থেকে ভেসে এল অ্যান্টার্কটিকা কন্ট্রোল রুমের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ—

“Ross Sector Control calling… কয়েক মিনিট আগে একটি অজ্ঞাত পরিচয়বিহীন হেলিকপ্টার এরেবাসের উত্তর-পশ্চিমে রাডারে ধরা পড়ে ছে। কোনো সিগন্যাল দেওয়ার আগেই সেটি রাডার ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ে র আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে!”

ড. সেন ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। মনে মনে উচ্চারণ করলেন— — “তাহলে খেলাটা এখন থেকে আরও কঠিন মোড়ে ঘুরল…”

দূরে মাউন্ট এরেবাসের কালো চূড়া নিশ্চু প দাঁড়িয়ে রইল। শুভ্র বরফের বুকে পাতা অদৃশ্য জালে যেন নতুন একটি চাল পড়ে গেছে!

অধ্যায়-৫ — ডায়েরির ইঙ্গিত

তুষারধস থেমে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে আবার নেমে এল অ্যান্টার্কটিকার সেই পরিচিত নিস্তব্ধতা। চারদিকে শুধু সাদা বরফ, ভাঙা তুষারের স্তূ প আর হিমেল বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে মৃত্যুর বিকট গর্জন ছিল, এখন সেখানে প্রকৃতি যেন কিছু ই ঘটেনি এমন শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

নীলার্য্য হাঁটু গেড়ে বসে বরফে চাপা পড়া নিজের ব্যাগটা আবার খুঁজে দেখল। একবার… দু’বার… তিনবার। তারপর ধীরে ধীরে ব্যাগের জিপ বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে রইল সে।

রূষা কাছে এসে নরম গলায় বলল, — “এখনও খুঁজছিস?”

নীলার্য্য মৃদু হাসল। সেই হাসিতে হতাশা ছিল, কিন্তু রাগ ছিল না। — “জানি নেই। তবু… যদি কোথাও থেকে যায়।”

ড. অনিরুদ্ধ সেন চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, — “তুষারধসের সময় মানচিত্রটা নিশ্চয়ই ব্যাগ থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে। আর সেই সুযোগেই ওরা পকেট কেটে নিয়ে পালিয়েছে।”

ক্যাপ্টেন মীরা দূরে মিলিয়ে যাওয়া স্নোমোবাইলের ট্র্যাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, — প করেই এসেছিল। তুষারধস তাদের জন্য কেবল সুবর্ণ সুযোগ “ওরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে দিল।”

কিছু ক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু দূরে কোথাও বরফের পাহাড় ভেঙে পড়ার ক্ষীণ শব্দ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।

কিছু ক্ষণ পর রূষা নিজের ব্যাগ খুলে একটি স্বচ্ছ জলরোধী ফাইল বের করল। ভেতরে ১৯১২ সালের সেই প্রাচীন অভিযাত্রীর ডায়েরির অনুলিপি। সে ফাইলটি নীলার্য্যের হাতে দিয়ে বলল, — “আমরা সব হারাইনি, নীল।”

নীলার্য্য অবাক হয়ে তাকাল। — “ডায়েরিটা…?”

— “মানচিত্রটা তারা নিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু ডায়েরিটা এখনও আমাদের কাছেই রয়েছে।”

ড. সেন মৃদু হেসে বললেন, — “অনেক সময় একটি মানচিত্রের চেয়ে একজন তীক্ষ্ণদর্শীর প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।”

নীলার্য্য ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল। সেখানে ইংরেজিতে স্পষ্ট খোদাইয়ের মতো লেখা —

“Where fire touches ice, and the southern sky remembers light… the first gate shall reveal itself.”

সে মনে মনে বাংলায় অনুবাদ করে উচ্চস্বরে পড়ল, — “যেখানে আগুন বরফকে স্পর্শ করে, আর দক্ষিণের আকাশ আলোকে মনে রাখে… সেখানেই প্রথম দরজা নিজেকে প্রকাশ করবে।”

রূষা ফিসফিস করে বলল, — “আগুন আর বরফ…”

দুজন একই সঙ্গে বলে উঠল, — “মাউন্ট এরেবাস!”

ড. সেন সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন। — “দেখছ? ওরা মানচিত্র পেয়েছে, কিন্তু এই গূঢ় কথার আসল অর্থ এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি।”

সন্ধ্যার আগেই দলটি নিরাপদ ঘাঁটিতে ফিরে এল। গরম স্যুপের কাপ হাতে নিয়েও নীলার্য্যের মন শান্ত হচ্ছিল না। সে তাঁবুর বাইরে এসে বরফের ওপর নিঃশব্দে বসে পড়ল। দূরে অস্তগামী সূর্যের শেষ আলো বরফের গায়ে এক মোহময় কমলা আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কিছু ক্ষণ পর রূষাও এসে তার পাশে বসল। দুজনেই চু প।

তারপর রূষা হালকা হেসে বলল, — “এত চু পচাপ কেন রে?”

নীলার্য্য ধীরে বলল, — “মাকে খুব মনে পড় ছে।”

— “হঠাৎ?”

— “এই সময়ে বারাসাতের বাড়ি তে থাকলে মা নিশ্চয়ই গরম চা আর স্ন্যাকস বানিয়ে ডাকত। বাবা বই নিয়ে বসতেন, তারপর কোনো পুরোনো মানচিত্র খুলে আবার নতুন কোথাও যাওয়ার গল্প শুরু করতেন।”

একটু থেমে সে মুচকি হেসে বলল, — “মা বলত, ‘দুনিয়ার সব রহস্য একদিনে সমাধান করতে যেও না। রাতের খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।’”

রূষা হেসে ফেলল। — “জাকিয়া মাসিমা একদম ঠিকই বলতেন।”

তারপর নিজের মোটা গ্লাভসের দিকে তাকিয়ে স্বতঃস্ফূ র্তভাবে বলল, — “আমারও বাড়ি র কথা ভীষণ মনে পড় ছে রে। বাবা নিশ্চয়ই এখনো অফিস থেকে ফিরে কোনো নতুন ভাঙা সার্কি ট নিয়ে পার্ট স জুড় তে বসেছেন। আর মা হয়তো ভাবছে আমি এই ঠান্ডায় ঠিকমতো খেলাম কি না।”

দুজনেই কিছু ক্ষণ নীরব হয়ে রইল।

তারপর নীলার্য্য বলল, — “জানিস, বাবা একটা কথা সবসময় বলেন—‘বড় আবিষ্কার করার আগে ভালো মানুষ হতে শেখ।’”

রূষা মৃদু হেসে উত্তর দিল, — “আমার বাবাও বলেন, ‘যে প্রযুক্তি মানুষকে বাঁচায় না, সেটা স্রেফ ধাতু আর তারের জঞ্জাল। আর যে জ্ঞান মানুষের কাজে লাগে না , তা অসম্পূর্ণ।’”

ড. সেন দূর থেকে তাদের কথাগুলো শুনছিলেন। তিনি ধীর পায়ে কাছে এসে শান্ত গলায় বললেন, — “ঠিক এ কারণেই তোমাদের এই অভিযানে সঙ্গী করতে আমি একমুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করিনি।”

দুজনেই অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল।

ড. সেন বললেন, — “শুধু প্রখর মেধা দিয়ে একজন গবেষক হওয়া যায়, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া যায় না। আসল গবেষণায় নৈতিক মূল্যবোধও দরকার। তোমাদের পরিবার তোমাদের সেই মূল ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছে।”

ক্যাপ্টেন মীরা গরম কফির মগ হাতে এগিয়ে এসে হেসে যোগ করলেন, — “অ্যান্টার্কটিকায় একটা কথা খুব প্রচলিত আছে—‘No one survives here alone.’ এখানে কেউ একা বাঁচে না। দলগত একতা, পারস্পরিক বিশ্বাস আর একে অপরের প্রতি দায়িত্ব—এই তিনটিই মেরুপ্রদেশের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।”

নীলার্য্য মনে মনে তার বাবার কণ্ঠস্বর যেন আবার শুনতে পেল: “ভ্রমণ মানুষকে শুধু পৃথিবী দেখায় না, মানুষ চিনতেও শেখায়।”

সে ধীরে মাথা তুলল। চোখের কোণে আবার সেই পরিচিত দৃঢ়তা ফিরে এসেছে। — “মানচিত্র হাতছাড়া হয়েছে বলে আমাদের অভিযান থেমে থাকবে না।”

রূষা হাত বাড়ি য়ে দিল। — “তাহলে নতুন উদ্যমে আবার শুরু করি?”

নীলার্য্য শক্ত করে তার হাত ধরল। — “হ্যাঁ, আবার শুরু করি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে গবেষণা শিবিরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কনসোল থেকে একটানা তীক্ষ্ণ সতর্ক সংকেত ভেসে এল!

বিপ… বিপ… বিপ…

ডায়াল ট্র্যাকিংয়ে থাকা তরুণ বিজ্ঞানী দৌড়ে বেরিয়ে এসে বললেন, — “ড. সেন! দক্ষিণ আকাশে অস্বাভাবিক মাত্রার সৌর কার্যকলাপ (solar activity) রেকর্ড হচ্ছে। আজ রাতে বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত শক্তিশালী অরোরার প্রভাব দেখা যাবে!”

ড. সেনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, — “যদি ১৯১২ সালের ডায়েরি সত্যি হয়ে থাকে… তবে আজ রাতেই প্রকৃতি তার গোপন সূত্র আমাদের সামনে উন্মোচিত করবে।”

অধ্যায়-৬ — বরফের উপর নকশা

দূরে, মাউন্ট এরেবাসের চূড়া থেকে হালকা ধোঁয়ার রেখা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছিল। আর বরফের অসীম নিস্তব্ধতার বুকে অদৃশ্য কেউ যেন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সতর্ক চোখে পর্যবেক্ষণ করছিল।

রাত পুরোপুরি নেমে এসেছে। অ্যান্টার্কটিকার আকাশ আজ অস্বাভাবিক স্বচ্ছ, মেঘের একটি আস্তরণও নেই। দক্ষিণ দিগন্ত থেকে ধীরে ধীরে উজ্জ্বল সবুজ আলোর একটি সূক্ষ্ম

রেখা ভেসে উঠল। তারপর আরও একটি… দেখতে দেখতে কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো আকাশটাই জীবন্ত এক ক্যানভাসে পরিণত হলো। সবুজ, নীল আর বেগুনি আলোর বিশাল পর্দা যেন মহাজাগতিক তরঙ্গের মতো এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভেসে বেড়াতে লাগল।

রূষা শ্বাস রুদ্ধ করে ফিসফিস করে বলল, — “অরোরা অস্ট্রালিস…”

ড. অনিরুদ্ধ সেন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, — “সূর্য থেকে ধেয়ে আসা ক্ষতিকারক আধানযুক্ত কণাগুলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে, তখন এই মহাজাগতিক আলোর জন্ম হয়। বিজ্ঞান এর ভৌত ব্যাখ্যা জানে, কিন্তু এর মহিমান্বিত সৌন্দর্যকে পুরোপুরি ভাষায় প্রকাশ করা আজও অসম্ভব।”

নীলার্য্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার বাবার কথা মনে পড়ে গেল: “প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোকে ক্যামেরায় নয়, মন দিয়ে দেখতে শেখ।” সে ক্যামেরা তুলল না, নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

রূষা মুচকি হেসে বলল, — “আবার সেই বাবার নিয়ম?”

নীলার্য্য মাথা নাড়ল। — “হ্যাঁ। কিছু দৃশ্য স্মৃতির ফ্রে মে বাঁধিয়ে রাখাই সবচেয়ে সুন্দর।”

ড. সেন সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, — “এই রুচি আর অনুভূ তির গভীরতাই একজন প্রকৃত অভিযাত্রীর পরিচয়।”

ঠিক তখনই—রূষা হঠাৎ বরফের দিকে আঙুল তুলে উচ্চস্বরে বলে উঠল— — “নীল! নিচে বরফের দিকে দেখ!”

সবাই পোলারাইজড টর্চের আলো বরফের ওপর ফেলল। এক অভূ তপূর্ব দৃশ্য ! অরোরার আলো বরফের একটি বিশেষ কোণে আপতিত হতেই সেখানে স্পষ্ট জ্যামিতিক নকশা ফুটে উঠছে—ত্রিভু জ, বৃত্ত, সূক্ষ্ম সরলরেখা! তারপর আলোর কোণ বদলাতেই আবার তা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

নীলার্য্য হাঁটু গেড়ে বসে বরফ স্পর্শ করল। — “এটা আলোর ছায়ার কোনো প্রাকৃ তিক খেলা নয়।”

ড. সেন একটি ছোট পোলারাইজড লাইট বের করে বরফের বিশেষ স্থানে আলো ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে নকশাগুলো নিখুঁতভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি উত্তেজিত গলায় বললেন, — “বরফের স্তরের নিচে নিশ্চয়ই অতিউচ্চ মানের প্রতিফলক কোনো ধাতব মাধ্যম রয়েছে, যা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো বিচ্ছুরিত করছে!”

ক্যাপ্টেন মীরা চারদিকে দৃষ্টি রেখে সতর্ক করলেন, — “কথা নয়, কাজ শুরু করো। সময় খুব কম।”

আইস-কোর ড্রিল আর ক্রিস্টাল কাটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবাই মিলে সাবধানে বরফ সরাতে লাগল। ড. সেন নির্দেশ দিলেন, — “কোনো ভারী কম্পন সৃষ্টি করা যাবে না, এতে নিচের সূক্ষ্ম উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

প্রায় কু ড়ি মিনিটের সতর্ক চেষ্টার পর—ঠং! একটি স্পষ্ট ধাতব শব্দ অনুধাবিত হলো।

নীলার্য্য হাত দিয়ে বরফের আস্তরণ সরাতেই বেরিয়ে এল একটি কালচে -রূপালি সংকর ধাতুর ফলক। আয়তাকার, প্রায় দুই ফু ট লম্বা। কিনারাজুড়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম নীল রঙের খোদাই। মাঝখানে খোদাই করা—

A.V. – 1912

তার নিচে ইংরেজিতে একটি বাক্য স্পষ্ট—

“The Earth remembers what humans forget.”

রূষা খুব নিচু গলায় পড়ল, — “পৃথিবী সেই সবকিছু মনে রাখে, যা মানুষ ভুলে যায়…”

কিছু ক্ষণ চারপাশ নিস্তব্ধ। ড. সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, — “এটা কেবল একটি ফলক নয়, এটি একটি জীবন দর্শন।”

নীলার্য্য আঙুল দিয়ে ফলকের নীল লেখাগুলো ছুঁয়ে বলল, — “কী অর্থ এর, স্যার?”

ড. সেন উত্তর দিলেন, — “মানুষ ইতিহাস কাগজে বা ডিজিটাল ডিভাইসে লেখে, যা একসময় মুছে যায়। কিন্তু প্রকৃতি ইতিহাসকে ধরে রাখে তার নিজস্ব উপাদানে—বরফের

স্তরে, আগ্নেয় পাথরে, বৃক্ষের বলয়ে, কিংবা সমুদ্রের অতলে। প্রকৃতির স্মৃতি মানুষের স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী।”

রূষা নিজের নোটবই খুলে লিখে নিল: “Nature is the oldest archive.”

ড. সেন পোর্টে বল ডিজিটাল স্ক্যানারের নিচে ফলকটি রাখলেন। স্ক্রিনে পর পর অদ্ভুত কিছু গাণিতিক চিহ্ন ও প্রাচীন প্রতীক ফুটে উঠতে লাগল।

নীলার্য্য অবাক হয়ে বলল, — “এগুলো কি কোনো প্রাচীন ভাষা?”

— “ভাষা… এবং একই সঙ্গে ভৌগোলিক মানচিত্র,” ড. সেন উত্তর দিলেন। “এগুলো নক্ষত্রের অবস্থান, পৃথিবীর চৌম্বকীয় মানদণ্ড এবং গাণিতিক সূত্রের এক অসাধারণ সমন্বয়।”

রূষা বলল, — “তার মানে প্রকৃতির ঘটনাগুলোকেই তালা খোলার চাবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে?”

— “ঠিক তাই!” ড. সেনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “যাঁরা এটি নির্মাণ করেছিলেন, তাঁরা জানতেন—লোভী মানুষ হয়তো মানচিত্র চু রি করতে পারবে, কিন্তু প্রকৃতির এই মহাজাগতিক ভাষাকে স্রেফ বস্তু দিয়ে জয় করতে পারবে না।”

হঠাৎ ক্যাপ্টেন মীরা হাত তুলে সবাইকে থামার সংকেত দিলেন। তিনি নিচু হয়ে বরফে কান পাতলেন। — “সব লাইট অফ করো! এখনই!”

এক মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ অন্ধকারে ডু বে গেল।

দূরে… বরফের বুক চিরে এক মৃদু ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে আসছে। প্রথমে একটি, তারপর দুটি, তারপর তিনটি!

নীলার্য্য নাইট-ভিশন দূরবীন চোখে লাগাল। বরফের দিগন্তে তিনটি আলোর বিন্দু দ্রুত এগিয়ে আসছে।

ক্যাপ্টেন মীরা নিচু গলায় বললেন, — “স্নোমোবাইল।”

ড. সেন শান্তভাবে যোগ করলেন, — “ওরা এসে গেছে।”

কয়েক মিনিট পর একটি উঁচু বরফ-টিলার আড়ালে গাড়ি গুলো থামল। সেখান থেকে নেমে এল কয়েকজন সশস্ত্র অবয়ব। তাদের মুখ ঢাকা, কিন্তু মাঝখানের অবয়বটি সম্পূর্ণ আলাদা। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নিজের মুখ থেকে থার্মাল মাস্কটি সরিয়ে ফেলল।

বয়স চল্লিশের কোঠায়, চু ল সামান্য ধূসরাভ, তীক্ষ্ণ চোখ এবং মুখে এক স্থির, আত্মবিশ্বাসী দ্যুতি।

ড. সেন খুব আস্তে উচ্চারণ করলেন— — “ড. ভিক্টর রেইন…”

নীলার্য্য প্রথমবার মানুষটিকে দেখল। অদ্ভুত ব্যাপার—তার অবয়বে কোনো হিংস্রতা বা উন্মাদনা নেই; বরং এমন এক ঠাণ্ডা আত্মবিশ্বাস ফুটে রয়েছে, যা সাধারণ শত্রুর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর।

ভিক্টর দূর থেকেই ধাতব ফলকটির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। তারপর বলল, — “অভিনন্দন, ডক্টর সেন। আপনি আর আপনার এই খুদে গবেষকরা আমাদের হয়ে প্রথম চাবিটি খুঁজে বের করে দিলেন।”

ক্যাপ্টেন মীরা সঙ্গে সঙ্গে নিজের সার্ভিস রিভলভার উঁচিয়ে ধরলেন। কিন্তু ভিক্টর বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে শুধু আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে অরোরার তীব্র সবুজ আলো তার মুখে ছায়া ফেলছে।

সে ধীরে বলল, — “দেখুন… প্রকৃতি নিজেই আজ সেই পরম সত্যের দরজা খোলার আয়োজন করছে।”

তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। আর নীলার্য্য মুহূর্তেই অনুধাবন করল—আজকের রাতটি কেবল কোনো আবিষ্কারের সমাপ্তি নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব ও আদর্শের আসল লড়াইয়ের সূচনা!

অ্যান্টার্কটিকার রাত আরও গভীর হয়েছে। আকাশে অরোরা অস্ট্রালিসের সবুজ, নীল ও বেগুনী আলোর খেলা যেন এক অদৃশ্য সঙ্কেতে বরফের প্রান্তরে অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে।

দুই দলের মধ্যে দূরত্ব মাত্র পঞ্চাশ মিটারের। একদিকে ভারতীয় বৈজ্ঞানিক দল, অন্যদিকে ‘Order of Aurora’। আর ঠিক মাঝখানে বরফের বুক চিরে জেগে ওঠা সেই রহস্যময় ধাতব ফলক।

ভিক্টর রেইন ধীর পায়ে কয়েক পা এগিয়ে এল। তার চোখ সরাসরি নীলার্য্যের ওপর স্থির হলো। — “তুমিই নিশ্চয়ই নীলার্য্য?”

নীলার্য্য সামান্য চকিত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, — “আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?”

ভিক্টর মৃদু হাসল। — “যে কিশোর মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এমন গাণিতিক সংকেত উদ্ধার করতে পারে, যা বড় বড় গবেষণা সংস্থা এক শতাব্দীতেও পারেনি… তার নাম না জানাটা মূর্খতা।”

ক্যাপ্টেন মীরা কঠোর কণ্ঠে বললেন, — “আর এক কদম এগোলে আমি গুলি চালাতে বাধ্য হব, ড. রেইন।”

ভিক্টর থেমে গেল। মুখে সেই একই শীতল প্রশান্তি। — “আমি এখানে রক্তপাত করতে আসিনি, মীরা। আমি আলোচনা করতে এসেছি।”

ড. সেন কড়া গলায় বললেন, — “তোমার মতো নীতিহীন মানুষের ওপর ভরসা করার মতো কোনো কারণ আমাদের জানা নেই, ভিক্টর।”

ভিক্টর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। — “অনিরুদ্ধ… এত বছর পরেও তুমি সেই একই রকম আদর্শবাদী থেকে গেলে।”

নীলার্য্য কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “আপনারা কি আগে থেকেই পরস্পরকে চেনেন?”

ড. সেন বললেন, — “একসময় আমরা আন্তর্জাতিক ভূ -পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও গবেষণাগারে একসঙ্গে কাজ করতাম।”

ভিক্টর বলল, — “আমরা দুজনেই সত্যের সন্ধান করতাম, কিন্তু আমাদের দর্শনের জায়গাটা আলাদা হয়ে গেল।”

— “কারণটা কী?” নীলার্য্যের প্রশ্ন।

ড. সেন উত্তর দেওয়ার আগেই ভিক্টর বলল, — “কারণ অনিরুদ্ধ বিশ্বাস করত—জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। আর আমি বিশ্বাস করি—সীমাহীন ক্ষমতা ও জ্ঞান সাধারণ মানুষের হাতে দেওয়া মানে বিনাশ ডেকে আনা। জ্ঞানকে পরিচালনা করার জন্য নির্দিষ্ট যোগ্য মস্তিষ্কের প্রয়োজন।”

রূষা তর্ক করে উঠল, — “কেন? বিজ্ঞান তো সবার কল্যাণের জন্য!”

ভিক্টরের চোখে এক অদ্ভুত দ্যুতি জ্বলে উঠল। — “আগুন মানুষকে যেমন শীতের হাত থেকে বাঁচায়, তেমনই পুরো শহর জ্বালিয়ে ছারখারও করে দিতে পারে। পরমাণু শক্তি আলোও দেয়, আবার লাখ লাখ মানুষ মারার অস্ত্রও তৈরি করে। জ্ঞান নিজে ভালো বা খারাপ নয়—সেটি কার নিয়ন্ত্রণে আছে সেটাই আসল কথা।”

ড. সেন দৃঢ় স্বরে বললেন, — “তাই বলে তুমি একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক হতে পারো না!”

ভিক্টর ঠাণ্ডা গলায় বলল, — “আমি মালিক হতে চাই না, অনিরুদ্ধ। আমি নিশ্চিত করতে চাই যেন এই পরম জ্ঞান ভুল হাতে গিয়ে পৃথিবীটাকে ধ্বংস না করে।”

নীলার্য্য এতক্ষণ নীরবে সব শুনছিল। এবার সে শান্তভাবে বলল, — “আমার বাবা বলেন, সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী ও দায়িত্বশীল বানায়, অহংকারী নয়।”

ভিক্টর তার দিকে তাকাল। — “তোমার বাবা কী করেন?”

— “তিনি একজন শিক্ষক। তিনি বলেন—জ্ঞান যত শেয়ার করা যায়, তত তার শক্তি বাড়ে । তাকে বন্দি করে রাখলে তা বিষে পরিণত হয়।”

ভিক্টর কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল, — “ভারী সুন্দর নীতিবাক্য! কিন্তু বাস্তব পৃথিবীটা তোমার পাঠ্যবইয়ের মতো এত সরল নয়, নীলার্য্য।”

রূষা যোগ করল, — “আমার বাবা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বলেন—নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি আলো দেয় না, শর্ট সার্কি ট ঘটিয়ে সব পুড়ি য়ে দেয়। আর আপনি সেই অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার পেছনেই ছু টছেন।”

ঠিক সেই মুহূর্তে—বিপ… বিপ… বিপ!

ড. সেনের স্ক্যানার ডিভাইসটি দ্রুত শব্দ করে উঠল! ধাতব ফলকটির ওপর খোদাই করা সূক্ষ্ম নীল রেখাগুলো একটির পর একটি স্বতঃস্ফূ র্তভাবে জ্বলে উঠছে! আকাশে অরোরার গতিপথ ও মেরু চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে গেল।

— “অরোরার কোণ বদলাচ্ছে!” রূষা চেঁচিয়ে উঠল।

নীলার্য্য দেখল ফলকটি থেকে একটি নীল আলোকরেখা লেজারের মতো নির্দিষ্ট একটি বরফের স্তরের দিকে নির্দেশ করছে। সে তার পকেট কম্পাস বের করল—কাঁটাটি উন্মত্তের মতো ঘুরছে।

ড. সেন স্ক্রিনে চোখ রেখে বললেন, — “মহাজাগতিক আলোর অবস্থান, পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরু আর মাউন্ট এরেবাসের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক মিলে গেছে! ফলকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাঠাচ্ছে!”

নীলার্য্য সাবধানে ফলকটি তুলে ধরল। নীল আলোটি বরফের ওপর একটি বৃত্তাকার এলাকা চিহ্নিত করল।

ভিক্টরের এক সঙ্গী অস্ত্র উঁচিয়ে বলল, — “স্যারের নির্দেশের অপেক্ষা করছি, এখনই ওদের উড়ি য়ে দিই!”

ভিক্টর হাত তুলে তাকে থামাল। — “চু প করো। ওদের কাজটা শেষ করতে দাও।”

নীলার্য্য চিহ্নিত বরফের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। সে বরফে কান রাখল। তার বাবার শেখানো কথা মনে পড়ল: “প্রকৃতিকে বুঝতে হলে আগে নিঃশব্দে তাকে শুনতে শেখো।”

সে বরফে আলতো চাপ দিতেই একটি ফাঁপা শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। — “নিচে ফাঁকা কক্ষ আছে!” ড. সেন নিশ্চিত করলেন।

ক্যাপ্টেন মীরার নির্দেশে টিম সতর্ক তার সঙ্গে বরফ কাটতে শুরু করল। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে এল কু চকু চে কালো এক আগ্নেয় শিলার বৃত্তাকার কাঠামো। তার ঠিক মাঝখানে বিশাল এক অদ্ভুত ধাতুর তৈরি গোলাকার দরজা!

দরজার গায়ে সেই পরিচিত চিহ্ন—তিনটি পরস্পর সংযুক্ত ত্রিভু জ। আর তার নিচে খোদাই করা ল্যাটিন বাক্য:

Knowledge Demands Responsibility

রূষা ফিসফিস করে বলল, — “জ্ঞান কেবল অধিকার চায় না, তার চেয়ে বড় দায়িত্ব চায়…”

নীলার্য্য ফলকটি দরজার কেন্দ্রের খাঁজে নিয়ে যেতেই, অদৃশ্য কোনো শক্তিশালী চৌম্বক বল সেটাকে হাত থেকে টেনে নিয়ে নিখুঁতভাবে বসিয়ে দিল!

গুমমমম…

মাটির অসীম গভীর থেকে এক ভারী যান্ত্রিক কম্পন ভেসে এল। দরজাজুড়ে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল। তারপর গম্ভীর এক কৃ ত্রিম মেকানিক্যাল কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো—

প্রাথমিক চাবি গৃহীত. AWAITING FINAL ALIGNMENT.

চারপাশের বরফ কাঁপতে শুরু করল।

ড. সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, — “আমরা প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করতে পেরেছি…”

ভিক্টর রেইনের মুখে এক জয়ীর অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরস্বরে বলল, — “না, অনিরুদ্ধ… দরজা মাত্র খুলল। আসল সত্যের মুখোমুখি হওয়া এখনও বাকি!”

ঠিক সেই মুহূর্তে মাউন্ট এরেবাসের গভীর পাতাল থেকে এক প্রচণ্ড ভূ -কম্পনের গর্জন ভেসে এল, আর সেই প্রাচীন ধাতব দরজাটি ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে সরতে শুরু করল…

অধ্যায়-৭ — অরোরা ভল্টের প্রথম দরজা

রাতের অ্যান্টার্কটিকা। চারদিকে বরফের নিস্তব্ধ রাজ্য। আকাশজুড়ে নেচে বেড়াচ্ছে সবুজ, নীল আর বেগুনি অরোরা অস্ট্রালিস। মনে হচ্ছে, মহাকাশ যেন বরফঢাকা পৃথিবীর বুকের ওপর কোনো অদৃশ্য ভাষায় বার্তা লিখে চলেছে।

কিন্তু সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের মাঝেও বিপদ ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। দূরে স্নোমোবাইলের শব্দ। অর্ডার অব অরোরার দল তাদের অনুসরণ করেই এখানে পৌঁছে গেছে।

ক্যাপ্টেন মীরা মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলেন। — “সব আলো নিভিয়ে দাও। সবাই বরফের আড়ালে চলে যাও।”

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো দল অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গেল। নীলার্য্য শক্ত করে ধরে আছে সেই ধাতব ফলকটা। এখন আর কারও সন্দেহ নেই—এটা কোনো সাধারণ প্রত্নবস্তু নয়। এটাই অরোরা ভল্টের প্রথম দরজার চাবি।

রূষা নিচু গলায় বলল, — “নীল… ওরা যদি এটা কেড়ে নেয়?”

নীলার্য্য শান্তভাবে উত্তর দিল, — “চাবি শুধু ধাতুর তৈরি হয় না, রূষা। আসল চাবি হলো তার অর্থ বোঝা। রহস্যের ভাষা না জানলে এই ফলক তাদের কোনো কাজে লাগবে না।”

রূষা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। — “সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।”

প্রবেশদ্বারের রহস্য

ভোরের প্রথম আলো ফু টতেই দলটা নিরাপদ দূরত্বে ফিরে এল। ড. সেন ফলকটা একটা পোর্টে বল স্পেকট্রাল স্ক্যানারের নিচে রাখলেন। কয়েক সেকেন্ড পর মনিটরে জটিল রেখা, বিন্দু আর নক্ষত্রমণ্ডলের মতো কিছু প্রতীক ভেসে উঠল।

ড. সেন বিস্ময়ে বললেন, — “অবিশ্বাস্য…”

নীলার্য্য এগিয়ে এল। — “কী হয়েছে, স্যার?”

ড. সেন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বললেন, — “এগুলো অলংকার নয়। এগুলো এক ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নির্দেশচিত্র। অরোরা ভল্টের অবস্থান শুধু কোনো মানচিত্রে নির্দিষ্ট করা নেই। এটা নির্ভর করছে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র, অরোরার অবস্থান আর নির্দিষ্ট নাক্ষত্রিক বিন্যাসের ওপর।”

রূষা বলল, — “অর্থাৎ প্রকৃতির ঘটনাগুলোই তালার কম্বিনেশন।”

ড. সেন সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন। — “ঠিক তাই। ১৯১২ সালের অভিযাত্রীরা বুঝেছিলেন—প্রকৃতির ভাষা না বুঝলে এই ভল্ট কেউ খুলতে পারবে না।”

বরফের নিচে পথ

ফলকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দলটা মাউন্ট এরেবাসের উত্তর-পশ্চিম ঢালে পৌঁছাল। গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডারের পর্দায় বরফের নিচে একটা বিশাল ফাঁপা অংশ ধরা পড়ল। বরফ কেটে নামতেই দেখা গেল একটা প্রাচীন লাভা টানেল। হাজার হাজার বছর আগে আগ্নেয়গিরির লাভা প্রবাহে তৈরি এই সুড়ঙ্গ আজও অক্ষত।

কিন্তু আরও আশ্চর্যের বিষয়—ভেতরে মানুষের উপস্থিতির স্পষ্ট চিহ্ন। জং ধরা লোহার খুঁটি। পুরোনো বৈদ্যুতিক বাতির ফ্রে ম। পাথরের দেয়ালে খোদাই করা প্রতীক—A.V., নিচে লেখা Aurora Vault।

নীলার্য্যের বুকের ভেতর উত্তেজনা বাড় তে লাগল। তারা সঠিক পথেই এসেছে।

প্রথম দরজা

হেডল্যাম্পের আলোয় তারা ধীরে ধীরে সুড়ঙ্গের গভীরে এগিয়ে চলল। বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস তিরিশ ডিগ্রি। কিন্তু সুড়ঙ্গের ভেতর আশ্চর্যজনকভাবে তুলনামূলক উষ্ণ—কারণ নিচে এখনও সক্রিয় ভূ-তাপীয় শক্তি কাজ করছে।

হঠাৎ রূষা থেমে গেল। — “নীল… এখানে আলো ফেলো।”

পাথরের ফাঁকে ছোট ছোট সবুজ শৈবাল আর অণুজীবের স্তর দেখা যাচ্ছে।

ড. সেন বিস্ময়ে বললেন, — “অসাধারণ! এমন পরিবেশেও জীবন নিজের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।”

রূষা নমুনা সংগ্রহ করতে করতে বলল, — “জীবন সবসময় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজে নেয়।”

আরও কিছু টা এগোতেই সবাই থমকে দাঁড়াল। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল দরজা—কালো আগ্নেয়শিলা আর অজানা ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি, প্রায় তিরিশ ফু ট উঁচু । তার ওপর খোদাই করা—Knowledge Demands Sacrifice। নিচে বাংলায়—“জ্ঞান মূল্য চায়।”

দরজায় কোনো তালা নেই, কোনো হাতল নেই। শুধু মাঝখানে একটা নিখুঁত বৃত্তাকার খাঁজ—যেন সেই ধাতব ফলকের জন্যই তৈরি।

নীলার্য্য ধীরে ধীরে ফলকটা এগিয়ে নিয়ে গেল। ঠিক তখনই টানেলের পেছন থেকে পাথরে বুটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো।

ক্যাপ্টেন মীরা ফিসফিস করে বললেন, — “ওরা এসে গেছে।”

দূরে টর্চের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। অর্ডার অব অরোরা। সম্ভবত ভিক্টরও তাদের সঙ্গেই আছে।

নীলার্য্য গভীর শ্বাস নিল। সে ফলকটা খাঁজের সামনে ধরতেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। মনে হলো দরজার ভেতর থেকে অদৃশ্য কোনো চৌম্বকীয় শক্তি ফলকটাকে টেনে নিচ্ছে। ফলকটা ধীরে ধীরে তার হাত ছেড়ে উঠে গেল, তারপর নিখুঁতভাবে গিয়ে বসে গেল বৃত্তাকার খাঁজে।

এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর পুরো দরজাজুড়ে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল। জটিল জ্যামিতিক নকশাগুলো একে একে জ্বলে উঠতে লাগল। গভীর যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো—

“প্রাথমিক চাবি গৃহীত.”

কয়েক সেকেন্ড পর আবার শোনা গেল—

“সারিবদ্ধতার অপেক্ষায়.”

তারপর সব আলো নিভে গেল। দরজা খুলল না।

ড. সেন ধীরে বললেন, — “প্রথম চাবি গ্রহণ করেছে। কিন্তু সক্রিয় হওয়ার জন্য আরেকটা ধাপ বাকি।”

রূষা দরজার গায়ের জ্বলন্ত নকশাগুলো গভীর মনোযোগে দেখছিল। হঠাৎ সে বলল, — “এগুলো অলংকার নয়। এগুলো এক ধরনের ভাষা। সম্ভবত নক্ষত্রের অবস্থান, চৌম্বক ক্ষেত্র আর জ্যামিতিক অনুপাতের সমন্বয়ে তৈরি সংকেত।”

ড. সেন মুগ্ধ হয়ে তাকালেন। — “হয়তো এই কারণেই ভল্ট এখনও বন্ধ।”

ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের গভীর থেকে আবার পায়ের শব্দ ভেসে এল। এবার অনেক কাছ থেকে।

ক্যাপ্টেন মীরা অস্ত্র হাতে প্রস্তু ত হলেন। — “ওরা আর দূরে নেই।”

নীলার্য্য দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, অরোরা ভল্ট যেন জীবন্ত। সে তাদের দেখছে, পরীক্ষা করছে, আর অপেক্ষা করছে—সঠিক উত্তরের জন্য, সঠিক মানুষের জন্য।

বরফের হাজার বছরের নীরবতার মধ্যে বিশাল দরজাটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে এক অজানা স্পন্দন। আর নীলার্য্য বুঝতে পারল—এটাই শেষ নয়। এটাই প্রকৃত অভিযানের শুরু।

অধ্যায়-৮ — বরফের নিচে হারানো সভ্যতার বিজ্ঞান

[ রবার্ট এডওয়ার্ডসের শেষ বার্তা ]

অরোরা ভল্টের প্রথম দরজা নীরবে খুলে যেতেই সবার মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। সামনের দিকে নেমে গেছে একটা সরু পাথুরে সিঁড়ি । নিচ থেকে ভেসে আসছে উষ্ণ বাতাস। বাইরে তাপমাত্রা যেখানে মাইনাস তিরিশ ডিগ্রিরও নিচে, সেখানে এই উষ্ণতা যেন সম্পূর্ণ অসম্ভব।

ক্যাপ্টেন মীরা হেডল্যাম্প জ্বালিয়ে বললেন, — “সবাই সতর্ক থাকবে। কোনো কিছু স্পর্শ করবে না।”

ড. সেন গভীরভাবে চারদিকে তাকালেন। — “আমরা সম্ভবত এমন এক জায়গায় প্রবেশ করতে চলেছি, যেখানে মানুষের পা শেষবার পড়ে ছিল এক শতাব্দীরও বেশি আগে।”

নীলার্য্য নিচের অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলল। গভীর থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত গুঞ্জন—না, সেটা কোনো মানুষের কণ্ঠ নয়, না কোনো যন্ত্রের আওয়াজ। এ যেন পৃথিবীর নিজের নিঃশ্বাস। হু-উ-উ-উ…

রূষা হাত বাড়ি য়ে বাতাস অনুভব করল। — “নীল… এটা অসম্ভব! বাইরে যখন মাইনাস তিরিশ ডিগ্রি, তখন বরফের নিচে এত উষ্ণ বাতাস মানে এখানে এখনও ভূ-তাপ সক্রিয়।”

ড. সেন মাথা নাড়লেন। — “ঠিক বলেছ। মাউন্ট এরেবাস এখনও সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। তার ভূ-তাপ এই গুহাকে জীবিত রেখেছে।”

অন্ধকার সুড়ঙ্গের যাত্রা

দলটা ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। সবার সামনে ক্যাপ্টেন মীরা, তারপর নীলার্য্য ও রূষা, সবশেষে ড. সেন আর গবেষক দলের সদস্যরা।

সুড়ঙ্গটা ছিল বহু হাজার বছর আগে লাভা প্রবাহে তৈরি একটা প্রাকৃ তিক টানেল। দেয়ালের কালো ব্যাসল্ট পাথরের ওপর কোথাও কোথাও স্বচ্ছ বরফ জমে আছে। বরফের ভেতরে আটকে রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র বায়ুর বুদবুদ।

রূষা একটা নমুনা সংগ্রহ করল।

ড. সেন বললেন, — “এই বরফ পৃথিবীর জলবায়ুর ইতিহাস সংরক্ষণ করে। হাজার হাজার বছর আগের বায়ুমণ্ডলের তথ্যও এখান থেকে জানা যায়।”

নীলার্য্য মুগ্ধ হয়ে বলল, — “অর্থাৎ বরফ শুধু বরফ নয়…”

— “এ পৃথিবীর স্মৃতিভাণ্ডার।” ড. সেনের উত্তর।

জীবনের অসম্ভব আশ্রয়

প্রায় এক ঘণ্টা নিচে নামার পর দলটা একটা বিশাল ভূ গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে পৌঁছাল। দৃশ্যটা দেখে সবাই থমকে দাঁড়াল। উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছে বরফের স্ফটিক। মাটির ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসছে গরম বাষ্প। ছোট ছোট উষ্ণ জলাশয়ের ধারে জন্মেছে সবুজ শৈবাল , ছত্রাক আর অণুজীবের উপনিবেশ।

রূষার চোখ বিস্ময়ে ভরে উঠল। — “এখানে জীবন আছে!”

ড. সেন মৃদু হাসলেন। — “যেখানে আমরা জীবনকে অসম্ভব ভাবি, প্রকৃতি সেখানেই নতুন পথ খুঁজে নেয়।”

নীলার্য্য চারদিকে তাকিয়ে বলল, — “তাহলে অরোরা ভল্ট কোনো গুপ্তধনের ভাণ্ডার নয়…”

রূষা উত্তর দিল, — “এটা পৃথিবীর গোপন গবেষণাগার।”

হারিয়ে যাওয়া অভিযাত্রী

গুহার এক কোণে টর্চের আলো পড় তেই নীলার্য্য থেমে গেল। বরফের নিচে আধা-ঢাকা একটা পুরোনো ব্যাকপ্যাক। তার ওপর এখনও স্পষ্ট লেখা—R. EDWARDS 1912।

ড. সেন বিস্ময়ে ফিসফিস করে বললেন, — “রবার্ট এডওয়ার্ডস…”

নীলার্য্য জিজ্ঞেস করল, — “উনি কে?”

ড. সেন ধীরে বললেন, — “একজন ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ। ১৯১২ সালে মাউন্ট এরেবাস অঞ্চলে নিখোঁজ হওয়া একটা বেসরকারি অভিযানের সদস্য। ইতিহাসে তাঁর দলের কোনো নির্ভরযোগ্য সন্ধান আর পাওয়া যায়নি।”

ব্যাগ খুলে দেখা গেল একটা পুরোনো ক্যামেরা, একটা চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি, কিছু শিলার নমুনা, আর একটা কাঁচের শিশিতে সংরক্ষিত অদ্ভুত খনিজ।

ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা—

“আমরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছি, যা মানুষের হাতে পড়লে পৃথিবীর ক্ষতি হবে।”

তার নিচে—

“প্রকৃতির রহস্য দখল করার জন্য নয়, রক্ষা করার জন্য।”

কথাগুলো পড়ে কেউ কিছু বলতে পারল না।

ভিক্টর রেইনের আবির্ভাব

ঠিক তখনই—ধাম!

গুহার অন্য প্রান্তে প্রচণ্ড শব্দ হলো। সবার আলো একসঙ্গে ঘুরে গেল। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল একজন মানুষ। কালো তাপরোধী পোশাক। মুখে মাস্ক। হাতে একটা ধাতব যন্ত্র।

নীলার্য্য বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ড. সেনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। — “ভিক্টর রেইন!”

নীলার্য্য অবাক হয়ে বলল, — “আপনি ওকে চেনেন?”

ড. সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। — “খুব ভালো করেই।”

তিনি ধীরে বললেন, — “ভিক্টর একসময় আন্তর্জাতিক ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণা প্রকল্পের অন্যতম মেধাবী বিজ্ঞানী ছিল। আমরা বহু বছর একসঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু পরে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পৃথিবীর সব গোপন জ্ঞান মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। গবেষণার নীতি ভঙ্গ করার অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তারপর থেকেই সে অদৃশ্য হয়ে যায়।”

ভিক্টর ধীরে মাস্ক খুলল। তার ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি। — “তুমি এখনও আগের মতোই আদর্শবাদী, অনিরুদ্ধ।”

— “আর তুমি এখনও ক্ষমতার লোভে অন্ধ।” ড. সেন উত্তর দিলেন।

ভিক্টর শান্ত গলায় বলল, — “জ্ঞান যার হাতে থাকবে, ভবিষ্যৎও তারই হবে।”

দ্বিতীয় স্তরের জাগরণ

ভিক্টর হাতে ধরা যন্ত্রটা সক্রিয় করল। নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল পুরো গুহায়। মুহূর্তের মধ্যেই মাটি কেঁপে উঠল। গুহার দেয়ালে ফাটল ধরল। বরফের বিশাল স্তম্ভ কাঁপতে শুরু করল।

রূষা চিৎকার করে উঠল— — “নীল! ওদিকে দেখো!”

গুহার গভীরে বিশাল একটা দরজা ধীরে ধীরে খুলছে। তার ওপরে লেখা— AURORA VAULT LEVEL TWO

ড. সেনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। — “আমরা ভেবেছিলাম অরোরা ভল্ট শুধু একটা গোপন আশ্রয়…”

তিনি থামলেন। — “কিন্তু এটা আসলে একটা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক কমপ্লেক্স।”

দরজা পুরোপুরি খুলে গেল। ভেতর থেকে নীল আলো বেরিয়ে এল। দেখা গেল অজানা ধাতুর তৈরি বিশাল এক যন্ত্র, যেন বহু শতাব্দী ধরে নিদ্রিত ছিল। আর এখন, ভিক্টরের অসাবধানী হস্তক্ষেপে সেটা আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে।

ঠিক তখনই চারদিকে প্রতিধ্বনিত হলো একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ—

সিস্টেম সক্রিয়। মানব প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়।

নীলার্য্য, রূষা, ড. সেন আর ক্যাপ্টেন মীরা একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের সবারই একই উপলব্ধি হলো—এতক্ষণ তারা কেবল দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। এবার তারা প্রবেশ করতে চলেছে এমন এক রহস্যের ভেতরে, যা হয়তো মানবসভ্যতার ইতিহাসকেই নতুন করে লিখে দিতে পারে।

অধ্যায়-৯ — অরোরা ভল্টের হৃদস্পন্দন

নীল আলো ধীরে ধীরে গুহার অন্ধকার ভেদ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড় ছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না—কারণ সামনে যা দেখা যাচ্ছে, তা কোনো গুপ্তধনের ঘর নয়, কোনো পরিত্যক্ত খনিও নয়। এটা ছিল এমন এক আবিষ্কার, যার অস্তিত্ব পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে নেই।

একটা বিশাল ভূ গর্ভস্থ কক্ষ। দেয়ালজুড়ে অদ্ভুত ধাতব প্যানেল। মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা শতবর্ষ পুরোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। আর মাঝখানে একটা বিশাল স্বচ্ছ গোলক, যার ভেতরে ধীরে ধীরে ঘুরছে নীলাভ আলোর এক অদ্ভুত প্রবাহ।

রূষা বিস্ময়ে ফিসফিস করে বলল, — “নীল… ওটা কি কোনো শক্তির উৎস?”

নীলার্য্য উত্তর দিতে পারল না। তার চোখ তখন আটকে আছে সেই গোলকের ওপর। মনে হচ্ছে, সেটা শুধু কোনো যন্ত্র নয়—যেন কোনো অজানা শক্তির হৃদস্পন্দন।

অচেনা বার্তা

হঠাৎ পুরো কক্ষের ভেতর একটা গভীর শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো।

“সতর্ক তা। প্রাকৃ তিক ভারসাম্যের পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে।”

সবাই চমকে উঠল। কণ্ঠটা মানুষের মতো, কিন্তু সম্পূর্ণ যান্ত্রিকও নয়।

ড. অনিরুদ্ধ সেন চারদিকে তাকালেন। — “কে কথা বলছে?”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর আবার সেই কণ্ঠ শোনা গেল—

“একশো বারো বছর পর… পুনরায় মানব উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।”

নীলার্য্যের চোখ বড় হয়ে গেল। — “একশো বারো বছর?”

সে রূষার দিকে তাকাল। — “তাহলে ১৯১২ সালের অভিযাত্রীরা কি এখানে এসেছিলেন?”

ঠিক তখনই কক্ষের এক পাশের দেয়াল আলোকিত হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে সেখানে ফুটে উঠল একটা ছবি—একজন মানুষ, বরফে ঢাকা মুখ, হাতে পুরোনো ক্যামেরা।

ড. সেন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলেন। — “এটা… রবার্ট এডওয়ার্ডস।”

অসমাপ্ত রেকর্ড

দেয়ালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটা পুরোনো ভিডিও রেকর্ড চালু হলো। কাঁপা কাঁপা শব্দে একজন মানুষের কণ্ঠ ভেসে এল—

— “যদি কেউ এই বার্তাটা দেখতে পাও, তাহলে বুঝবে… আমরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছি, যা মানুষের লোভের হাতে পড়লে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।”

স্ক্রিনে রবার্ট এডওয়ার্ডসের মুখ দেখা যাচ্ছিল—ক্লান্ত, কিন্তু চোখে গভীর সতর্ক তা।

— “আমরা ভেবেছিলাম, অরোরা ভল্ট কোনো সম্পদের ভাণ্ডার। কিন্তু আমরা ভুল ছিলাম।”

তিনি কিছু ক্ষণ থামলেন।

— “এটা কোনো ধনভাণ্ডার নয়। এটা পৃথিবীর প্রাকৃ তিক ভারসাম্য পর্যবেক্ষণ ও রক্ষার একটা প্রাচীন কেন্দ্র।”

হঠাৎ ভিডিওর পেছনে প্রচণ্ড শব্দ হলো। রবার্ট আতঙ্কিত হয়ে পেছনে তাকালেন। — “না… সিস্টেম সক্রিয় হয়ে যাচ্ছে!”

তিনি দ্রুত ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, — “যে-ই এখানে আসবে, মনে রেখো… এই শক্তি ব্যবহার করার জন্য নয়। রক্ষা করার জন্য।”

তারপর ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে রইল।

পৃথিবীর সতর্ক সংকেত

হঠাৎ পুরো কক্ষ কেঁপে উঠল। স্বচ্ছ গোলকের ভেতরের নীল আলো দ্রুত ঘুরতে শুরু করল। দেয়ালের স্ক্রিনে একটা সতর্ক বার্তা ভেসে উঠল—

ভূ-তাপীয় ভারসাম্য : অস্থির

ড. সেন আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। ঘুরে তাকালেন ভিক্টরের দিকে। — “ভিক্টর! তুমি যে যন্ত্রটা চালু করেছ, সেটা শুধু এই কক্ষের নয়। এটা মাউন্ট এরেবাসের নিচের ভূ-তাপীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।”

ভিক্টরের মুখের আত্মবিশ্বাস প্রথমবারের মতো কমে গেল। — “মানে?”

ড. সেন কঠিন গলায় বললেন, — “মানে, তুমি এমন একটা প্রক্রিয়া শুরু করেছ, যার ফল আমরা জানি না।”

ভিক্টর চারদিকে তাকাল। — “তাহলে এটা বন্ধ করো!”

ড. সেন ধীরে মাথা নাড়লেন। — “যে জিনিসকে না বুঝে চালু করা হয়েছে, তাকে শুধু ইচ্ছা করলেই বন্ধ করা যায় না।”

অন্ধকারে রহস্যময় উপস্থিতি

হঠাৎ সব আলো নিভে গেল। পুরো কক্ষ ডু বে গেল অন্ধকারে। শুধু জরুরি লাল আলো জ্বলছে।

সেই ক্ষীণ আলোয় নীলার্য্যের চোখে পড়ল—গুহার এক কোণে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। বরফের পোশাক পরা, হাতে পুরোনো একটা নোটবুক। কিন্তু সে তাদের দলের কেউ নয়।

নীলার্য্য ধীরে বলল, — “কে ওখানে?”

মূর্তিটা ধীরে ধীরে তাদের দিকে ফিরল। তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না, কারণ মুখে ছিল পুরোনো অক্সিজেন মাস্ক। কিন্তু তার পোশাকের ওপর স্পষ্ট লেখা—R. EDWARDS

রূষার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। — “রবার্ট এডওয়ার্ডস…”

ড. সেন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। — “এটা কীভাবে সম্ভব?”

কারণ ইতিহাস বলছে—রবার্ট এডওয়ার্ডস ১৯১২ সালের অভিযানের পর নিখোঁজ হয়েছিলেন।

শেষ বার্তা

মূর্তিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার হাতে থাকা নোটটা নীলার্য্যের দিকে বাড়ি য়ে দিল। নীলার্য্য কাঁপা হাতে সেটা নিল।

নোটে লেখা মাত্র একটা বাক্য—

“তোমরা যেটাকে আবিষ্কার ভাবছ… সেটা আসলে একটা সতর্ক বার্তা।”

নিচে আরেকটা লাইন—

“এরেবাস জেগে উঠছে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে মাউন্ট এরেবাসের গর্জন শোনা গেল। কিন্তু এবার সেই শব্দ শুধু আগ্নেয়গিরির ছিল না। মনে হলো, পৃথিবীর গভীরে ঘুমিয়ে থাকা কোনো বিশাল শক্তি ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।

অরোরা ভল্টের রহস্যের প্রথম দরজা খুলেছে মাত্র। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্য এখনও অন্ধকারে ঢাকা।

অধ্যায়-১০ — ছায়ার মানুষ

গুহার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা এক পা, দু’পা করে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এল। নীলার্য্যের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন আরও দ্রুত হয়ে উঠল। রূষা তার হাত শক্ত করে ধরল।

ড. সেন কাঁপা গলায় বললেন, — “না… এটা সম্ভব নয়।”

মানুষটার পোশাকে এখনও স্পষ্ট লেখা—R. EDWARDS। একশো চৌদ্দ বছর আগের সেই হারিয়ে যাওয়া অভিযাত্রীর নাম। কিন্তু একজন মানুষ কি একশোরও বেশি বছর বেঁচে থাকতে পারে? অসম্ভব। তাহলে সে কে?

মুখোশের আড়ালে রহস্য

লোকটা তাদের সামনে এসে থামল। ধীরে ধীরে তার হাত উঠল, সে অক্সিজেন মাস্কটা খুলে ফেলল। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু মাস্কের নিচে কোনো মানুষের মুখ নেই। ছিল এক অদ্ভুত স্বচ্ছ আবরণ—বরফের মতো সাদা, কিন্তু জীবন্ত নয়। যেন কোনো খনিজ ও অজানা পদার্থের তৈরি একটা মুখের প্রতিরূপ।

হঠাৎ সেই অবয়বটা কেঁপে উঠল। তারপর—ধপ! মাটিতে ভেঙে পড়ল।

রূষা চমকে পিছিয়ে গেল। ড. সেন দ্রুত এগিয়ে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত পরীক্ষা করার পর তিনি ধীরে বললেন, — “এটা মানুষ নয়।”

নীলার্য্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “তাহলে এটা কী?”

ড. সেন সাবধানে খনিজ আবরণটা সরালেন। ভেতরে বেরিয়ে এল একটা পুরোনো বিশেষ অভিযাত্রী পোশাক, আর তার মধ্যে একটা মানব কঙ্কাল।

কিছু ক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।

ড. সেন নিচু গলায় বললেন, — “রবার্ট এডওয়ার্ডস এখানেই মারা গিয়েছিলেন। সম্ভবত ১৯১২ সালের সেই অভিযানের সময়। এই গুহার বিশেষ পরিবেশ—ঠান্ডা, শুষ্কতা আর খনিজের প্রভাবে তাঁর দেহ অস্বাভাবিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।”

নীলার্য্য ধীরে বলল, — “কিন্তু তাহলে আমরা যাকে হাঁটতে দেখলাম?”

ড. সেন চারদিকে তাকালেন, তাঁর চোখে তখন বিস্ময়। — “সম্ভবত… অরোরা ভল্টের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।”

ছায়ার প্রযুক্তি

হঠাৎ দেয়ালের একটা অংশ আলোকিত হয়ে উঠল। সেখানে ভেসে উঠল কিছু শব্দ—

স্মৃতি পুনর্গঠন সক্রিয়

ড. সেনের চোখ বড় হয়ে গেল। — “এটা… অবিশ্বাস্য!”

তিনি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, — “এই সিস্টেম রবার্ট এডওয়ার্ডসের শেষ মুহূর্তের তথ্য সংরক্ষণ করে রেখেছিল।”

রূষা বলল, — “মানে আমরা যে মানুষটাকে দেখলাম…”

ড. সেন মাথা নাড়লেন। — “সে মানুষ ছিল না। সে ছিল একটা স্মৃতি। একটা সতর্ক বার্তা।”

ঠিক তখনই দেয়ালে রবার্টে র রেকর্ড করা ছবি ফুটে উঠল। তাঁর কণ্ঠ আবার শোনা গেল —

— “যদি তুমি এই বার্তা দেখতে পাও, বুঝবে অরোরা ভল্ট আবার সক্রিয় হয়েছে। মনে রেখো… এখানে লুকিয়ে থাকা জ্ঞান মানুষের সম্পত্তি নয়। এটা পৃথিবীর।”

তারপর হঠাৎ রেকর্ড থেমে গেল।

অদৃশ্য উপস্থিতি

ঠিক সেই মুহূর্তে নীলার্য্যের চোখ গিয়ে পড়ল গুহার মেঝের দিকে। বরফের ওপর নতুন দাগ—পায়ের ছাপ। কিন্তু মানুষের নয়। খুব বড় , গভীর।

রূষা টর্চের আলো সেই দাগ অনুসরণ করল। দেয়ালের কাছে গিয়ে দেখা গেল বরফে গভীর আঁচড়ে র চিহ্ন, যেন শক্ত কোনো নখ বা অঙ্গ দিয়ে বরফ কাটা হয়েছে।

রূষা নিচু হয়ে কিছু একটা তুলে নিল—কয়েকটা কালো লোম। ড. সেন সেটা পরীক্ষা করলেন। — “এটা কোনো পরিচিত প্রাণীর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।”

নীলার্য্য অবাক হয়ে বলল, — “কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার এত গভীরে বড় কোনো প্রাণী থাকার কথা নয়!”

রূষা শান্ত গলায় বলল, — “প্রকৃতি অনেক গোপন জায়গা তৈরি করেছে, নীল। আমরা যা জানি না, তার মানেই এই নয় যে তার অস্তিত্ব নেই।”

ড. সেন মাথা নাড়লেন। — “ঠিক বলেছ। বিজ্ঞান সবসময় নতুন প্রশ্নের সামনে এগিয়ে যায়।”

বরফের নিচের চোখ

হঠাৎ গুহার গভীর অন্ধকারে দুটো নীল আলো জ্বলে উঠল। সবাই থেমে গেল। তারপর আরও দুটো, তারপর আরও।

অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটা প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। তারা আক্রমণ করছে না, শুধু দেখছে— যেন তারা বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিল।

রূষা খুব আস্তে বলল, — “ওরা আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে।”

নীলার্য্য টর্চের আলো সামান্য এগিয়ে দিল, কিন্তু প্রাণীগুলো আলো থেকে দূরে সরে গেল। তাদের শরীর পুরোপুরি দেখা গেল না, শুধু বোঝা গেল—তারা এই অন্ধকার, উষ্ণ গুহার পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত।

ঠিক তখনই গুহার গভীর থেকে এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। না মানুষের, না কোনো পরিচিত প্রাণীর—একটা গভীর গর্জন। আর সেই গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে অরোরা ভল্টের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

চারদিকে শুধু অন্ধকার। তারপর শোনা গেল—

টু প… টু প… টু প…

কারও ধীর পায়ের শব্দ। কিন্তু শব্দটা সামনে থেকে আসছে না। এবার সেটা থামল— তাদের ঠিক পেছনে।

নীলার্য্য ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। আর অন্ধকারের মধ্যে কেউ ফিসফিস করে বলল—

— “তোমরা অনেক দেরি করে ফেলেছ…”

অধ্যায়-১১ — সাদা মৃত্যুর ফাঁদ

গুহার ভেতর তখন নিস্তব্ধতা। শুধু শোনা যাচ্ছে—

টু প… টু প… টু প…

কেউ হাঁটছে। কিন্তু আলো নেই।

নীলার্য্য ধীরে ধীরে টর্চ ঘুরিয়ে পেছনে ফেলল। আলো পড় তেই—কেউ নেই।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টরের একজন লোক হঠাৎ চিৎকার করে উঠল— — “ওটা… ওটা আমার পায়ে ধরেছে!”

সবাই ছু টে গেল। লোকটা মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। তার পায়ে জড়ি য়ে রয়েছে কালো রঙের মোটা একটা দড়ি র মতো বস্তু ।

ড. অনিরুদ্ধ সেন টর্চের আলো ফেলতেই বুঝলেন—ওটা দড়ি নয়। বরফের নিচে আটকে থাকা বহু বছরের পুরোনো স্টিল কেবল। ভূ মিকম্পের ধাক্কায় বরফ ভেঙে সেটা বেরিয়ে এসেছে। লোকটা আতঙ্কে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল।

ড. সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, — “অ্যান্টার্কটিকায় আতঙ্কই সবচেয়ে বড় শত্রু।”

অদৃশ্য অনুসরণকারী

সবাই আবার এগোতে শুরু করল। হঠাৎ রূষা থেমে গেল। — “নীল…”

নীলার্য্য তাকাল। — “কী হয়েছে?”

রূষা বরফের দিকে আঙুল দেখাল। — “আমাদের পেছনে কেউ হাঁটছে।”

নীলার্য্য বরফের মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দলের সবার পায়ের ছাপ। আর— আরও একটা। অচেনা। বুটের ছাপ। সবাই দাঁড়িয়ে আছে, তবুও নতুন ছাপ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। একটা… দুটো… তিনটা… যেন অদৃশ্য কেউ বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

ভিক্টরের মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। — “এটা কীভাবে সম্ভব?”

ড. সেন হাঁটু গেড়ে বরফ পরীক্ষা করলেন। কিছু ক্ষণ পর বললেন, — “এটা অদৃশ্য কারও ছাপ না।”

সবাই অবাক হয়ে তাকাল। — “তাহলে?”

ড. সেন বরফের ছাদের দিকে দেখালেন। — “ওপরের বরফের স্তর ধীরে ধীরে গলছে। সেই জল নিচের পাতলা বরফকে দুর্বল করছে। আমাদের চলাফেরার কম্পনে বরফের স্তর বসে যাচ্ছে। তাই মনে হচ্ছে নতুন পায়ের ছাপ তৈরি হচ্ছে।”

রূষা মৃদু হেসে বলল, — “ভূ তের চেয়েও বিজ্ঞান অনেক বেশি আশ্চর্য।”

বিশ্বাসঘাতক

ঠিক তখনই—ঠাস!

একটা গুলির শব্দ। গুলিটা ড. সেনের পাশের পাথরে লেগে স্ফু লিঙ্গ ছড়িয়ে দিল। সবাই ঘুরে তাকাল। ভিক্টরের দলের বিজ্ঞানী ড. ক্যালেকাস বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।

ভিক্টর চিৎকার করে উঠল, — “ক্যালেকাস! তুমি কী করছ?”

ক্যালেকাস ঠান্ডা গলায় বলল, — “যেটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল।”

সে নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছোট ডেটা-ড্রাইভ বের করল। — “অরোরা ভল্টের সব তথ্য এখন আমার কাছে।”

ভিক্টর হতবাক। — “তুমি আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করলে?”

ক্যালেকাস হেসে বলল, — “লোভের দুনিয়ায় কেউ কারও বন্ধু নয়।”

সে দ্রুত অন্য একটা সুড়ঙ্গের দিকে এগিয়ে গেল। কেউ তাকে আটকানোর আগেই সে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

সাদা মৃত্যুর শুরু

ঠিক তখনই একটা গভীর গর্জন। গুহার দেয়াল কেঁপে উঠল।

ড. সেন চিৎকার করে উঠলেন— — “সবাই নিচু হও!”

ধড়াম!

বিশাল বরফের স্তর ভেঙে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে গুহার ভেতরে প্রবল হিমেল বাতাস ঢু কে পড়ল। ওপরের হিমবাহে বিশাল ফাটল তৈরি হয়েছে। বরফের ধস সুড়ঙ্গের দিকে নেমে আসছে।

ক্যাপ্টেন মীরা রেডিওতে চিৎকার করলেন— — “সাদা ধস! সবাই নিরাপদ জায়গায় যাও!”

কিন্তু রেডিওতে শুধু কর্ক শ শব্দ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু বরফের গর্জন।

রূষার আবিষ্কার

সবাই যখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য এগোচ্ছে, তখন রূষা হঠাৎ থেমে গেল। তার চোখ পড়ে ছে গুহার দেয়ালের ওপর। — “নীল… দেখো!”

দেয়ালের ওপর ছোট ছোট নীল স্ফটিক জ্বলছে। প্রথমে পাঁচটা, তারপর সাতটা, তারপর বারোটা। কিন্তু এগুলো এলোমেলো নয়—একটা নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানো।

নীলার্য্য কাছে গিয়ে দেখল। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। — “এগুলো সংখ্যা না… এগুলো নক্ষত্রের অবস্থান!”

রূষা দ্রুত তার নোটবুক খুলল। — “এটা কোনো সাধারণ নকশা না।”

ড. সেন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, — “এটা একটা মানচিত্র।”

নীলার্য্য ধীরে জিজ্ঞেস করল, — “কীসের মানচিত্র?”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর রূষা ফিসফিস করে বলল— — “দ্বিতীয় ভল্টের…”

দ্বিতীয় ভল্টের সংকেত

ঠিক তখনই সব নীল স্ফটিক একসঙ্গে জ্বলে উঠল। পুরো গুহা নীল আলোয় ভরে গেল। হঠাৎ মেঝে কেঁপে উঠল। বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল কোনো যন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে গুহার মেঝে দুই ভাগ হয়ে যেতে শুরু করল।

আর গভীর অন্ধকার থেকে ভেসে এল এক যান্ত্রিক কণ্ঠ—

“প্রথম ভল্টের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে।” “দ্বিতীয় ভল্টের সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হচ্ছে।” “অনধিকার প্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে।”

সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর একটা ভারী দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। কিন্তু দরজাটা তাদের সামনে নয়—তাদের ঠিক নিচে।

নীলার্য্য নিচের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—এতক্ষণ তারা যে জায়গাটাকে অরোরা ভল্ট ভেবেছিল, সেটা আসলে ছিল শুধু প্রথম প্রবেশপথ। আসল রহস্য, আসল বিপদ আর পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস এখনও বরফের আরও গভীরে অপেক্ষা করছে।

অধ্যায়-১২ — এরেবাস জেগে ওঠে

বিপ… বিপ… বিপ…

ড. অনিরুদ্ধ সেনের স্যাটেলাইট রিসিভার হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একের পর এক লাল সংকেত জ্বলছে।

ANTARCTIC VOLCANIC OBSERVATORY — ALERT LEVEL: RED

ড. সেনের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। — “না… এটা হতে পারে না।”

ক্যাপ্টেন মীরা রিসিভারটা হাতে নিয়ে পড়লেন। — “মাউন্ট এরেবাসে অস্বাভাবিক ভূ কম্পন। ম্যাগমা চেম্বারে চাপ দ্রুত বাড় ছে। রস দ্বীপের সব গবেষণা দলকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।”

রূষা আস্তে বলল, — “এর মানে… আগ্নেয়গিরি জেগে উঠছে?”

ড. সেন মাথা নাড়লেন। — “হ্যাঁ। কিন্তু শুধু অগ্ন্যুৎপাত নয়… এর চেয়েও ভয়ংকর কিছু ঘটতে পারে।”

বরফের দানব

প্রথম কম্পনটা এতটাই হালকা ছিল যে কেউ গুরুত্ব দিল না। তারপর—ধুমমম ! পুরো গুহা যেন বিশাল কোনো হাতুড়ি র আঘাতে কেঁপে উঠল। দেয়ালের বরফে হাজার ফাটল ছড়িয়ে পড়ল। ওপর থেকে বরফের চাঙড় ভেঙে পড় তে লাগল।

গুহার গভীর থেকে ভেসে এল গর্জন। এ যেন কোনো প্রাণীর আওয়াজ নয়। এটা পাহাড়ে র শব্দ। জেগে ওঠা পৃথিবীর শব্দ।

নীলার্য্য অনুভব করল—তার পায়ের নিচের মাটি ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছে।

ভিক্টরের পতন

— “সব নমুনা নিয়ে বেরিয়ে পড়ো!” ভিক্টর তার লোকদের আদেশ দিল।

ঠিক তখনই—বিড়ি রর…!

তার পায়ের নিচের মাটি ভেঙে গেল। ভিক্টর নিচে পড়ে যাচ্ছিল। এক মুহূর্ত। দুই মুহূর্ত। তারপর—একটা হাত তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

নীলার্য্য।

ভিক্টর বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। — “তুমি… আমাকে বাঁচালে?”

নীলার্য্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল, — “আমি অভিযাত্রী। খুনি নই।”

রূষা আর ক্যাপ্টেন মীরা মিলে ভিক্টরকে ওপরে টেনে তুলল। ভিক্টর কিছু বলতে পারল না। প্রথমবার তার চোখে লজ্জা দেখা গেল।

অরোরা ভল্টের শেষ বার্তা

ঠিক তখনই গুহার ভেতরের সব স্ক্রিন একসঙ্গে জ্বলে উঠল। সেই একই কণ্ঠ। কিন্তু এবার আরও স্পষ্ট।

“প্রাকৃ তিক ভারসাম্য ভেঙে গেছে।” “স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে।” “সাত মিনিটের মধ্যে প্রথম ভল্ট স্থায়ীভাবে সিল হয়ে যাবে।”

সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।

রূষা ফিসফিস করে বলল, — “মানে… আমরা যদি সাত মিনিটের মধ্যে বেরোতে না পারি…”

ড. সেন বাকিটা বললেন। — “তাহলে আমরা বরফের নিচেই চিরদিনের জন্য আটকে যাব।”

কাউন্টডাউন

নীলার্য্য ঘড়ি র দিকে তাকাল। ৭:০০। কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। সবাই দৌড়াতে লাগল।

৬:১২—বরফের ছাদ থেকে বিশাল বরফখণ্ড পড়ে পথ বন্ধ করে দিল। ক্যাপ্টেন মীরা বিস্ফোরক ব্যবহার না করে বরফ কাটার যন্ত্র দিয়ে পথ পরিষ্কার করতে লাগলেন—কারণ বিস্ফোরণ ঘটালে পুরো গুহাই ধসে পড় বে।

৫:০১—হঠাৎ রূষা থেমে গেল। — “নীল… ওইদিকে দেখো।”

দেয়ালের ফাটলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা ছোট ধাতব বাক্স। তার গায়ে খোদাই—“To the Next Explorers.” পরবর্তী অভিযাত্রীদের জন্য।

নীলার্য্য দ্বিধায় পড়ে গেল। বাক্সটা নেবে, নাকি প্রাণ বাঁচিয়ে দৌড়াবে?

ড. সেন চিৎকার করলেন, — “সময় নেই!”

রূষা শান্ত গলায় বলল, — “নীল, কখনও কখনও ইতিহাসকে বাঁচাতেও ঝুঁকি নিতে হয়।”

নীলার্য্য সিদ্ধান্ত নিল। সে বাক্সটা তুলে নিল।

 শেষ ত্রিশ সেকেন্ড

০০:৩০। প্রবেশপথ সামনে।

কিন্তু ঠিক তখনই—ড. ক্যালেকাস! সে আবার ফিরে এসেছে। তার হাতে পিস্তল, আর অন্য হাতে সেই ডেটা-ড্রাইভ। — “কেউ বেরোবে না! এই আবিষ্কার শুধু আমার হবে!”

ভিক্টর ধীরে ধীরে তার সামনে এগিয়ে গেল। — “ক্যালেকাস… শেষ কোরো না।”

ক্যালেকাস গুলি চালাতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে—ধাম! গুহার ছাদ থেকে বিশাল বরফখণ্ড নেমে এল। ক্যালেকাসকে নয়—তার সামনে থাকা পথটাকে ধ্বংস করল। ডেটা-ড্রাইভটা ছিটকে পড়ে সরাসরি গলিত উষ্ণ জলের স্রোতে হারিয়ে গেল। সমস্ত তথ্য চিরতরে মুছে গেল।

অধ্যায়ের শেষে

সবাই প্রাণপণে দৌড়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল। তাদের পেছনে প্রচণ্ড গর্জনে বন্ধ হয়ে গেল অরোরা ভল্টের প্রথম দরজা। বরফ, পাথর আর আগ্নেয়শিলার নিচে চাপা পড়ল শতাব্দীর রহস্য। সবাই হাঁপাতে হাঁপাতে বরফের ওপর বসে পড়ল।

তখনই রূষা লক্ষ করল—নীলার্য্যের হাতে ধরা ধাতব বাক্সটা এখনও গরম। অ্যান্টার্কটিকার মাইনাস তিরিশ ডিগ্রিতেও বাক্সটা যেন ভেতর থেকে উষ্ণতা ছড়াচ্ছে।

নীলার্য্য ধীরে ধীরে ঢাকনাটা খুলল। ভেতরে কোনো সোনা নেই, কোনো মানচিত্রও নেই। শুধু একটা কালো পাথর, আর তার ওপর অদ্ভুত নীল রেখাগুলো হঠাৎ জ্বলে উঠল।

তারপর পাথরটা নিজে থেকেই একটা শব্দ করল। — “বিপ…”

সবাই স্তব্ধ। পাথরটা আবার জ্বলে উঠল। এবার তার ভেতর থেকে ভেসে এল একটা কণ্ঠ —

“যদি তোমরা এটা শুনতে পাও… তবে প্রথম ভল্ট হারিয়ে গেছে।” “এখন খোঁজো… দ্বিতীয় ভল্ট।”

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, দিগন্তের ওপারে মাউন্ট এরেবাসের চূড়া থেকে একটা অস্বাভাবিক সোনালি আলোর স্তম্ভ আকাশের দিকে উঠে গেল—যেন পাহাড় টা নিজেই কাউকে সংকেত পাঠাচ্ছে।

অধ্যায়-১৩ — সোনালি সংকেত

মাউন্ট এরেবাসের চূড়া থেকে উঠে আসা সোনালি আলোর স্তম্ভটা মাত্র সাত সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল। তারপর সবকিছু আবার অন্ধকার। কেউ কোনো কথা বলল না। অ্যান্টার্কটিকার হিমেল বাতাস যেন হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছে।

নীলার্য্য এখনও শক্ত করে ধরে আছে কালো পাথরটা। অদ্ভুত ব্যাপার—পাথরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে, যেন সে তার শেষ বিন্দুটু কু ব্যবহার করেছে।

অসম্ভব সংকেত

গবেষণা শিবিরে ফিরে ড. অনিরুদ্ধ সেন পাথরটাকে বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। শেষে তিনি চশমা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। — “আমি কিছু ই বুঝতে পারছি না।”

রূষা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “কেন?”

ড. সেন ধীরে বললেন, — “এটা কোনো পরিচিত আগ্নেয়শিলা নয়। আবার কোনো উল্কাপিণ্ডও নয়।”

নীলার্য্য পাথরটার দিকে তাকিয়ে বলল, — “তাহলে এটা কী?”

ড. সেন কিছু ক্ষণ চু প করে থেকে বললেন, — “সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই পাথর নিজে থেকেই অত্যন্ত দুর্বল রেডিও সংকেত পাঠাচ্ছে।”

ঘরের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একটা পাথর রেডিও সংকেত পাঠাচ্ছে?

অদৃশ্য শ্রোতা

ঠিক তখনই গবেষণা কেন্দ্রের যোগাযোগ কর্মকর্তা দৌড়ে ঘরে ঢুকলেন। — “স্যার!”

ড. সেন তাকালেন। — “কী হয়েছে?”

— “আমাদের স্যাটেলাইটে অদ্ভুত কিছু ধরা পড়ে ছে।”

সবাই দ্রুত কন্ট্রোল রুমে চলে গেল। বিশাল মনিটরে দেখা গেল অ্যান্টার্কটিকার মানচিত্র। সেখানে একটা ছোট আলোর বিন্দু জ্বলছে—ঠিক মাউন্ট এরেবাসে। কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা আলোর বিন্দু জ্বলে উঠল, প্রায় আটশো কিলোমিটার দূরে।

ড. সেনের মুখ কঠিন হয়ে গেল। — “অসম্ভব…”

রূষা জিজ্ঞেস করল, — “কী অসম্ভব?”

ড. সেন ধীরে বললেন, — “দুটো জায়গা একে অপরকে উত্তর দিচ্ছে।”

নীলার্য্যের চোখ বড় হয়ে গেল। — “মানে… দ্বিতীয় ভল্ট?”

ড. সেন কোনো উত্তর দিলেন না। কারণ তিনিও বুঝতে পারছিলেন—অরোরা ভল্টের রহস্য এখনও অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে।

ভিক্টরের স্বীকারোক্তি

সেই রাতে ভিক্টর একা বসে ছিল। তার চোখে আগের মতো অহংকার নেই। নীলার্য্য ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল। — “তুমি কেন এত মরিয়া ছিলে?”

ভিক্টর অনেকক্ষণ চু প করে রইল। তারপর ধীরে বলল, — “আমি কোনো চোর নই। আমি একজন ভূতত্ত্ববিদ ছিলাম। আমার গবেষণা চু রি করে অন্যরা সাফল্য পেয়েছে। যে স্বীকৃ তি আমার পাওয়ার কথা ছিল, তা অন্যরা নিয়ে নিয়েছে।”

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। — “তারপর আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

রূষা শান্ত গলায় বলল, — “তাই তুমি ভেবেছিলে পৃথিবীর রহস্য নিজের করে নেবে?”

ভিক্টর মাথা নিচু করল। — “লোভ কখন যে প্রতিশোধে বদলে যায়… আমি বুঝতেই পারিনি।”

এটাই ছিল ভিক্টরের প্রথম সত্য স্বীকারোক্তি।

শেষ নির্দেশ

রাত দুটো। হঠাৎ কালো পাথরটা আবার জ্বলে উঠল। এবার শুধু নীলার্য্য আর রূষা নয়— গবেষণা কেন্দ্রের সবাই সেই শব্দ শুনতে পেল। একটা গভীর যান্ত্রিক কণ্ঠ।

“প্রথম পরীক্ষা সম্পন্ন।” “দ্বিতীয় সংকেত সক্রিয় হয়েছে।” “সতর্ক বার্তা—তোমরা একা নও।”

হঠাৎ ঘরের সব আলো নিভে গেল। রেডিও বন্ধ, কম্পিউটার বন্ধ। পুরো গবেষণা কেন্দ্র অন্ধকারে ডু বে গেল। মাত্র তিন সেকেন্ড। তারপর সবকিছু আবার চালু হয়ে গেল।

কিন্তু তখনই দেখা গেল—কন্ট্রোল রুমের দরজার নিচে একটা খাম পড়ে আছে। কেউ দেখেনি কে সেটা রেখে গেল। কেউ প্রবেশও করেনি।

নীলার্য্য ধীরে ধীরে খামটা তুলে নিল। ভেতরে ছিল একটা মাত্র ছবি—স্যাটেলাইট থেকে তোলা, আজকের। ছবিতে দেখা যাচ্ছে নীলার্য্য, রূষা, ড. সেন এবং পুরো দল গবেষণা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ছবিটা তারা তোলেনি।

আরও ভয়ংকর বিষয়—ছবির ডান কোণে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একজন অচেনা মানুষ। সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নেই। সে তাকিয়ে আছে শুধু নীলার্য্যের দিকে।

ছবির পেছনে কালো কালি দিয়ে লেখা মাত্র একটা বাক্য—

“দ্বিতীয় ভল্ট আমরা আগেই খুঁজে পেয়েছি।”

নীলার্য্যের হাত থেকে ছবিটা ধীরে ধীরে মেঝেতে পড়ে গেল। কারণ সে বুঝতে পারল— এতদিন তারা ভেবেছিল তারা শিকারি। আসলে প্রথম দিন থেকেই কেউ তাদের শিকার বানিয়ে রেখেছিল।

অধ্যায়-১৪ — অর্ডার অব অরোরা

রাত ৩টা ১৭ মিনিট। বাইরে অ্যান্টার্কটিকার হিমেল ঝড় তাণ্ডব চালাচ্ছে। গবেষণা কেন্দ্রের ভেতরে কেউ ঘুমাতে পারেনি। টেবিলের ওপর রাখা সেই রহস্যময় ছবিটা যেন নীরবে সবাইকে একই প্রশ্ন করে চলেছে—“দ্বিতীয় ভল্ট আমরা আগেই খুঁজে পেয়েছি।”

নীলার্য্য ছবিটা আবার হাতে তুলে নিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল ছবির এক কোণে। — “রূষা…” — “কী হয়েছে?” — “এটা দেখো।”

সে ছবির নিচের ডানদিকে আঙুল রাখল। প্রথম দেখায় মনে হচ্ছিল বরফের ওপর শুধু একটা ছায়া পড়ে ছে। কিন্তু ছবিটা বড় করে দেখতেই বোঝা গেল—বরফের ওপর তিনটা ছোট কালো পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটা প্রতীক। একটা কালো বৃত্ত, তার ভেতরে তিনটা ত্রিভু জ।

রূষার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। — “ওরা শুধু আমাদের ওপর নজর রাখেনি… ওরা আমাদের গবেষণা কেন্দ্র পর্যন্ত এসে গিয়েছিল।”

সত্য, যা কেউ জানত না

ড. অনিরুদ্ধ সেন অনেকক্ষণ চু প করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, — “আমার তোমাদের কাছে একটা কথা স্বীকার করার আছে।”

ঘরের সবাই তাঁর দিকে তাকাল। — “আমি প্রথম দিন থেকেই ওই প্রতীকটাকে চিনেছিলাম।”

নীলার্য্য বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, — “তাহলে আগে বলেননি কেন?”

ড. সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। — “কারণ আমি ভেবেছিলাম ওরা শুধুই একটা গল্প… একটা কিংবদন্তি।”

তিনি টেবিলের ওপর একটা পুরোনো নথি রাখলেন। তারিখ—১৯৫৮। এটা কোনো সাধারণ গবেষণা রিপোর্ট নয়। এটা ছিল নরওয়ের একটা মেরু অভিযানের গোপন নথি। রিপোর্টে লেখা—

“Order of Aurora নামে একটা অজ্ঞাত আন্তর্জাতিক সংগঠন পৃথিবীর বিভিন্ন মেরু অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার গোপন রাখছে। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনও অজানা।”

রূষা ধীরে ধীরে লেখাগুলো পড়ে শোনাল। ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

হানা

ঠিক তখনই—প্যাং!

গবেষণা কেন্দ্রের সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল। জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও চালু হলো না। সম্পূর্ণ অন্ধকার।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর বাইরে ভেসে এল স্নোমোবাইলের শব্দ। একটা নয় , দুটো নয় —ছয়টা।

ক্যাপ্টেন মীরা জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন। তাঁর মুখ কঠিন হয়ে গেল। — “ওরা এসেছে।”

কালো পোশাক পরা ছয়জন মানুষ নিঃশব্দে গবেষণা কেন্দ্র ঘিরে ফেলেছে। তাদের মুখ ঢাকা, হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—তাদের পোশাকে কোনো দেশের পতাকা নেই। শুধু সেই প্রতীক। কালো বৃত্তের মধ্যে তিনটা ত্রিভু জ।

আক্রমণ

ধাম!

প্রধান দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল। সাদা বরফের ধুলোয় চারদিক ঢেকে গেল। একজন লম্বা মানুষ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তার কণ্ঠ শান্ত—অস্বাভাবিক শান্ত।

— “ড. অনিরুদ্ধ সেন। আমরা অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত চাই না। আমাদের শুধু কালো পাথরটা দিন।”

ড. সেন সামনে এগিয়ে এলেন। — “আপনারা কারা?”

লোকটা মৃদু হাসল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের গ্লাভস খুলল। হাতে খোদাই করা সেই প্রতীক। — “আমাদের অনেক নাম আছে। কিন্তু পৃথিবী আমাদের চেনে…”

সে থামল। — “অর্ডার অব অরোরা নামে।”

রূষার পরিকল্পনা

নীলার্য্য নিঃশব্দে কালো পাথরটা নিজের জ্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে ফেলল। কিন্তু রূষা বুঝতে পারছিল—এদের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করে জেতা সম্ভব নয়। তাকে অন্য পথ খুঁজতে হবে।

সে ধীরে ধীরে ল্যাবরেটরির পেছনের দিকে সরে গেল। সেখানে ছিল গবেষণা কেন্দ্রের জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রূষা কয়েকটা সুইচ সক্রিয় করল। পরের মুহূর্তে পুরো ঘর সাদা কু য়াশায় ভরে গেল—ফায়ার-সাপ্রেশন সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসা কার্বন ডাই- অক্সাইডের কারণে কয়েক সেকেন্ডের জন্য কারও কিছু দেখা যাচ্ছিল না।

— “এখন!” রূষার চিৎকার।

সবাই দ্রুত পেছনের জরুরি দরজা দিয়ে বেরিয়ে বরফের ঝড়ে র মধ্যে ছু টে গেল।

বরফের প্রান্তরে

তুষারঝড় এতটাই প্রবল যে দশ মিটারের বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। জিপিএস কাজ করছে না। কম্পাস অস্বাভাবিকভাবে ঘুরছে—মনে হচ্ছে এই অঞ্চলের চৌম্বক ক্ষেত্র স্বাভাবিক নয়।

হঠাৎ নীলার্য্যের জ্যাকেটের ভেতরে থাকা কালো পাথরটা গরম হয়ে উঠল। তারপর একটা ক্ষীণ নীল আলো বেরিয়ে এসে বরফের ওপর একটা সরু রেখা আঁকল।

রূষা বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল, — “এটা… আমাদের পথ দেখাচ্ছে!”

ড. সেন মাথা নাড়লেন। — “না।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল। — “এটা শুধু পথ দেখাচ্ছে না। এটা আমাদের এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে…”

তিনি থামলেন। — “…যেটা অর্ডার অব অরোরা কোনোদিন খুঁজে পায়নি।”

শেষ দৃশ্য

তুষারঝড়ের মধ্যে দূরে একটা কালো পাহাড়ে র মতো ছায়া দেখা গেল। কিন্তু মানচিত্র অনুযায়ী সেখানে কোনো পাহাড় থাকার কথা নয়।

নীলার্য্য দূরবীন তুলে তাকাল। তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। এটা পাহাড় নয়। বরফে ঢাকা একটা বিশাল দরজা। উচ্চতা অন্তত পঞ্চাশ ফু ট। দরজার ওপর খোদাই করা—

AURORA VAULT – II

নীলার্য্য, রূষা এবং ড. সেন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু তারা জানত না—প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বরফের আড়ালে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ দূরবীন দিয়ে সবকিছু দেখছে।

সে ধীরে ধীরে ওয়াকিটকিতে বলল— — “টার্গেট দ্বিতীয় ভল্টে পৌঁছে গেছে।”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল— — “তাদের ভেতরে ঢু কতে দাও। দরজা খুলুক…”

এক মুহূর্ত থেমে আবার কণ্ঠ ভেসে এল— — “তারপর ভল্টটা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিও।”

বরফের ঝড় আরও তীব্র হয়ে উঠল। আর নীলার্য্য বুঝতেই পারল না—এবার সে শুধু কোনো রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে একটা বহু বছরের পুরোনো পরিকল্পিত ফাঁদের সামনে।

অধ্যায়-১৫ — শেষ দরজা, নতুন রহস্য

বরফঝড় থেমে গেছে। অ্যান্টার্কটিকার আকাশে আবার অরোরা জ্বলে উঠেছে—সবুজ, নীল আর বেগুনি আলোর ঢেউ। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই নীরবে সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক অসম্ভব আবিষ্কারের।

নীলার্য্য, রূষা, ড. অনিরুদ্ধ সেন, ক্যাপ্টেন মীরা এবং ভিক্টর দাঁড়িয়ে আছে অরোরা ভল্ট– II-এর বিশাল দরজার সামনে। নীলার্য্যের হাতে সেই কালো পাথরটা। পাথরের ভেতরের নীল রেখাগুলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

দরজার ওপর খোদাই করা শব্দগুলো আবার আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠল—

“Knowledge demands sacrifice.” “জ্ঞান মূল্য চায়।”

নীলার্য্য দরজার জটিল নকশাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। অসংখ্য জ্যামিতিক রেখা, অদ্ভুত চিহ্ন আর অজানা প্রতীক। সে হিসেব করতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর তার ভ্রু কুঁচকে গেল। — “কিছু একটা মিলছে না…”

রূষা এগিয়ে এল। তার হাতে অ্যান্টার্কটিকার প্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে লেখা পর্যবেক্ষণ ডায়েরি। সে দরজার খোদাইগুলো গভীরভাবে দেখতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ বড় হয়ে গেল। — “নীল, থামো!”

নীলার্য্য তাকাল। — “কী হয়েছে?”

রূষা দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, — “তুমি ভাবছ এটা কোনো গাণিতিক পাসকোড। কিন্তু এটা আসলে তা নয়।”

সে ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করতে লাগল— — “দেখো, এই রেখাগুলো… এগুলো মেরু অঞ্চলের পাখিদের উড্ডয়নপথ। আর এই বাঁকগুলো পেঙ্গুইনদের মৌসুমি চলাচলের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।”

ড. সেন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।

রূষা বলল, — “অরোরা ভল্টের নির্মাতারা জটিল কোডের ওপর নয়, প্রকৃতির নিয়মের ওপর বিশ্বাস করেছিল।”

নীলার্য্যের মুখে হাসি ফুটে উঠল। — “অসাধারণ, রূষা।”

রূষা বলল, — “প্রকৃতির ভাষা বুঝতে পারলেই দরজা খুলবে।”

নীলার্য্য কালো পাথরটা তুলে ধরল। তারপর রূষার নির্দেশিত পথে পাথরটা ঘোরাতে শুরু করল। প্রথমে কিছু ই ঘটল না। তারপর গভীর মাটির নিচ থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত গর্জন।

ধ্রররর…

পঞ্চাশ ফু ট উঁচু বরফঢাকা দরজাটা শতাব্দীর নীরবতা ভেঙে ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।

ছায়ার সত্য

দরজার ওপারে কোনো সোনার পাহাড় নেই। কোনো অমূল্য রত্ন নেই। বরং রয়েছে অসংখ্য কাচের নল, বরফে সংরক্ষিত অজানা নমুনা, প্রাচীন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। আর একটা মাত্র টেবিল। টেবিলের ওপর রাখা একটা খাম। তার ওপর লেখা—

“যারা প্রথম ভল্ট অতিক্রম করেছে, তাদের জন্য।”

নীলার্য্য খামটার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই পেছনে ভেসে এল ভারী বুটের শব্দ। সবাই ঘুরে তাকাল। অন্ধকার সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাক পরা একদল মানুষ। অর্ডার অব অরোরা। তাদের হাতে অস্ত্র। কিন্তু তাদের নেতার চোখে ছিল না শুধু হিংসা। ছিল ক্লান্তি। ছিল বহু বছরের বোঝা।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। — “তোমরা ভাবছ আমরা শুধু ক্ষমতা বা সম্পদের জন্য এখানে এসেছি?”

তার কণ্ঠ শান্ত। — “না, নীলার্য্য। ১৯১৩ সালে অর্ডার অব অরোরা তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর গোপন রক্ষক হিসেবে।”

সে ভল্টের দিকে তাকাল। — “আমরা এমন সব আবিষ্কারের সাক্ষী হয়েছি, যা ভুল হাতে পড়লে মানবসভ্যতার জন্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞান যখন লোভী মানুষ বা ক্ষমতালোভী শাসকদের হাতে যায়, তখন তা আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে ওঠে।”

ড. সেন বললেন, — “কিন্তু তাই বলে জ্ঞানকে লুকিয়ে রাখা?”

নেতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। — “আমরা ভেবেছিলাম এটাই একমাত্র পথ।”

নীলার্য্য এক পা এগিয়ে গেল। তার কণ্ঠ দৃঢ়। — “জ্ঞানকে বন্দি করে রাখা আর জ্ঞানকে ধ্বংস করা—দুটোই ভুল। মানুষকে অন্ধকারে রেখে পৃথিবীকে রক্ষা করা যায় না। সঠিক শিক্ষা, দায়িত্ব আর নৈতিকতার মাধ্যমে মানুষকে সেই জ্ঞানের যোগ্য করে তুলতে হয়।”

অর্ডারের নেতা কিছু ক্ষণ চু প করে রইল। কারণ সে জানত—ছেলেটার কথার মধ্যে সত্য আছে।

ভিক্টরের সিদ্ধান্ত

ঠিক তখন ভিক্টর রেইন সামনে এগিয়ে এল। তার হাতে অর্ডার অব অরোরার একটা গোপন ব্যাজ। সে কিছু ক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ব্যাজটা বরফের ওপর ছুঁড়ে ফেলল।

— “আমি সারাজীবন কিছু পাওয়ার জন্য ছু টেছি। প্রথমে সম্পদের পেছনে, তারপর ক্ষমতার পেছনে।”

সে অর্ডারের নেতার দিকে তাকাল। — “কিন্তু আজ বুঝলাম—পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কোনো প্রযুক্তি নয়, কোনো গুপ্ত বিদ্যা নয়। সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো বিশ্বাস। যেটা আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

রবার্ট এডওয়ার্ডসের সত্য

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক অ্যান্টার্ক টিক চু ক্তির আওতায় নিরাপত্তা দল ও তদন্তকারী বিশেষজ্ঞরা সেখানে পৌঁছাল। অর্ডার অব অরোরার সদস্যদের আইনি হেফাজতে নেওয়া হলো।

উদ্ধারকারী বিমানে ওঠার আগে ড. অনিরুদ্ধ সেন ভল্ট থেকে পাওয়া পুরোনো নথিগুলো পরীক্ষা করছিলেন। হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন। তাঁর হাত কাঁপছে। — “অবিশ্বাস্য…”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল। ড. সেন ধীরে বললেন, — “রবার্ট এডওয়ার্ডস মারা যাননি। তিনি প্রথম ভল্ট থেকে জীবিত বেরিয়ে এসেছিলেন।”

নীলার্য্য বিস্মিত। — “তাহলে আমরা যে কঙ্কাল দেখেছিলাম?”

ড. সেন বললেন, — “সেটা ছিল তাঁর এক সহযাত্রীর। দুর্ঘটনার পর সে রবার্টে র জ্যাকেট পরে বরফের ফাটলে আটকা পড়ে ছিল। রবার্ট নিজের পরিচয় গোপন করে চলে গিয়েছিলেন—কারণ তিনি বুঝেছিলেন, এই জ্ঞান রক্ষা করার জন্য একজন অভিভাবক দরকার।”

ড. সেন চিঠির শেষ অংশ পড়লেন—

“যদি ভবিষ্যতের কোনো অভিযাত্রী এই চিঠি পড়ে , মনে রেখো—ভল্টের রক্ষক হওয়া মানে তার মালিক হওয়া নয়। পৃথিবীকে কখনও নিজের সম্পত্তি ভেবো না।” — Robert Edwards, Ross Island, 1912

নীলার্য্য আর রূষা অ্যান্টার্কটিকার অসীম সাদা প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে রইল। একজন অচেনা মানুষের আত্মত্যাগ তাদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য রয়ে গেল।

শেষ নয়…

কয়েক সপ্তাহ পর। ভারতে তাদের বাড়ি । টেলিভিশনের সংবাদে প্রতিদিন বলা হচ্ছে —“আন্তর্জাতিক তদন্ত দল অ্যান্টার্কটিকায় অনুসন্ধান চালিয়েছে, কিন্তু তথাকথিত অরোরা ভল্টের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

মানুষ তাদের গল্পকে কল্পকাহিনি বলে ভুলে গেল। নীলার্য্য আর রূষা শুধু মৃদু হাসল।

টেবিলের ওপর রাখা ছিল মাউন্ট এরেবাস থেকে পাওয়া সেই সোনালি ধূলিকণার ছোট বয়াম। নীলার্য্য বয়ামটা খুলল। তারপর ধীরে ধীরে সোনালি কণাগুলো বাতাসে ছড়িয়ে দিল।

— “সোনার আলো সাময়িক, রূষা।” সে বলল, “কিন্তু প্রকৃতির জ্ঞান, মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর সেই জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার—চিরন্তন।”

ঠিক তখনই রূষা ডাকবাক্স থেকে একটা ছোট খাম নিয়ে এল। খামের ওপর কোনো নাম নেই, কোনো ঠিকানাও নেই। ভেতরে ছিল একটা পুরোনো সাদা-কালো ছবি। ছবিতে দাঁড়িয়ে আছেন রবার্ট এডওয়ার্ডস। কিন্তু তাঁর পাশে দাঁড়ানো তরুণ ভারতীয় অভিযাত্রীর মুখ দেখে নীলার্য্য স্তব্ধ হয়ে গেল। মুখটা অদ্ভুতভাবে তার নিজের মতো।

ড. সেন ছবিটা দেখে ধীরে বললেন, — “অবিশ্বাস্য মিল। কিন্তু মিল মানেই রক্তের সম্পর্ক নয়।”

রূষা ছবির পেছনের লেখাটা পড়ল। সেখানে লেখা—

“কিছু গল্প রক্তে নয়, সাহসে বেঁচে থাকে।” — R. Edwards

নীলার্য্য ধীরে বলল, — “তাহলে এটা কি কোনো উত্তরাধিকার?”

ড. সেন মৃদু হেসে বললেন, — “হয়তো। কারণ কিছু রহস্যের উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য নয়… বরং পথ চলার জন্য।”

ঠিক তখন রূষা খামের ভেতর থেকে আরেকটা জিনিস বের করল। বর্তমানে চীনা নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের একটা হোটেলের খুব পুরোনো মানি রিসিট-এর অংশ। গন্তব্য—দারচেন, অর্থাৎ কৈলাশ-মানস সরোবর। আর নিচে লেখা একটা ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক।

ড. সেন কম্পিউটারে স্থানাঙ্কটা বসালেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—কৈলাস পর্বতমালার কাছে একটা অচিহ্নিত হিমবাহ।

নীলার্য্য চেঁচিয়ে উঠলো, “তার মানে তিব্বতের ইয়ার্লুং সাংপো, অর্থাৎ আমাদের ব্রহ্মপুত্র নদের মূল উৎপত্তিস্থল!”

ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলের ওপর রাখা কালো পাথরটা জ্বলে উঠল। নীল আলো। ঘরের সব আলো এক সেকেন্ডের জন্য নিভে গেল। তারপর ভেসে এল একটা গভীর যান্ত্রিক কণ্ঠ—

“Vault Three is waiting.”

তারপর আবার অন্ধকার।

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, কৈলাসের বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা একটা বিশাল ধাতব দরজায় ক্ষীণ নীল আলো জ্বলে উঠল। বহু শতাব্দীর নীরবতার পর একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো—

“Acknowledged.”

তারপর আলো নিভে গেল। যেন কেউ অপেক্ষা করতে শুরু করেছে।

নীলার্য্য জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে তখন প্রথম তারা উঠেছে। সে জানত না সামনে কী অপেক্ষা করছে। কিন্তু সে বুঝেছিল—অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে প্রথম রহস্যের সমাপ্তি হয়েছে। আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আরেকটা দরজা খুলতে শুরু করেছে।

(অরোরা ভল্ট — প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

শীঘ্রই আসছে…

দ্বিতীয় পর্ব: “কৈলাস ভল্ট: বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা সভ্যতা”

Author: admin_plipi