অচেনা আকাশ

অচেনা আকাশ
লেখা – প্রদীপ ভট্টাচার্য

সকাল থেকে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। এরকম বৃষ্টির দিনে তিন্নির স্কুলে যেতে একদম ভাল লাগে না। কিন্ত মা কিছুতেই বুঝতে চায় না। তিন্নি জানলার ধারে গিয়ে বাইরে তাকায়। মাস ছয়েক হল তিন্নিরা এই নতুন ফ্ল্যাটে এসেছে। জায়গাটা এখনো খোলামেলা। চারপাশে নতুন নতুন ফ্ল্যাট তৈরী হচ্ছে। তিন্নিদের কমপ্লেক্সে মোট আশিটা ফ্ল্যাট। প্রায় সব ফ্ল্যাটে লোক এসে গেছে। তিন্নিরা বাবুপাড়ায় যে বাড়িতে ভাড়া থাকত সেখানে তিন্নির কয়েকজন বন্ধু ছিল। কিন্তু এখানে এখনো কারো সাথেই তেমন করে পরিচয় হয়নি। বাইরে বৃষ্টি কমার কোন লক্ষন নেই। তিন্নিকে স্কুলে যেতেই হবে। তিন্নির খুব ইচ্ছে করে স্কুলে না গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে। ওদের স্কুল এখন শহর থেকে অনেকটা দূরে গ্রামের ভিতর অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরী হয়েছে। তিন্নি কতদিন স্কুলের বাসের জানলা দিয়ে দেখেছে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজে খেলছে। তিন্নির খুব ইচ্ছে করে ওরকম বৃষ্টিতে ভিজে খেলতে। কিন্তু মা দু-ফোঁটা বৃষ্টির জল গায়ে পড়লেই চিৎকার শুরু দেবে, “তিন্নি একদম ভিজে গেছ। নির্ঘাত জ্বর হবে। আর জ্বর হলে স্কুলে যেতে পারবে না, পড়া মেকআপ করতে পারবে না। লিলি তোমার থেকে এগিয়ে যাবে।”
মার ঐ এক সমস্যা। সব বিষয়েই মা পড়াশোনা, স্কুল, ফার্ষ্ট… এসব কথা টেনে আনবে।
-“তিন্নি, রেইনকোটটা পরে নাও। বাসের টাইম হয়ে গেছে। একদিনও চিৎকার না করলে নিজের থেকে রেডি হতে পারে না!” মা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করছে।
-“মা দেখো না, কীরকম বৃষ্টি হচ্ছে। আজ স্কুল যেতে ইচ্ছে করছে না।” তিন্নি মার কাছে গিয়ে মিনমিন করে বলে।
-“কী বললে?” মা চিৎকার করে ওঠে।
-“স্কুল যাবেনা! সে কি কথা!”
-“কেন? সরলাদি তো বৃষ্টি হলে স্কুলে যায় না।”
-“কী বললে, সরলাদি?” মা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলল, “তিন্নি, তোমাকে কতবার বলেছি সরলাদির সাথে মিশবে না। ওদের স্কুল! তার আবার যাওয়া না যাওয়া! ওর স্কুলের সাথে তোমার স্কুলের তুলনা করছ! তোমার স্কুলে ভর্তি হতে গেলে দেড় লক্ষ টাকা ডোনেশন দিতে হয়। মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা টিউশন ফি, বাসের ভাড়া দিতে হয়। তুমি সরলাদির স্কুলের সাথে তোমার স্কুলের তুলনা করছ?”
-“কেন করবো না! সরলাদির নাইন থেকে টেনে ফাস্ট হয়ে উঠেছে। তোমাকে তো প্রগ্রেস-রিপোর্ট দেখাতে এনেছিল। তুমি তো দেখলেই না। ” তিন্নি বিড়বিড় করে বলে।
-“থাক! তোমাকে আর সরলাদির হয়ে ওকালতি করতে হবে না।” মা চিৎকার করে ওঠে, “যাও রেইন কোটটা পরে নাও।”
তিন্নি জানত মাকে রাজি করাতে পারবে না। আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দিকে যায়। এই ফ্ল্যাটে তিন্নির একটা আলাদা ঘর আছে। মা সরলাদির কথা বললেই রেগে যায়। সরলা তিন্নিদের বাড়িতে কাজ করে। সকাল বিকাল দুবেলা এসে কাজ করে। দুপুরে স্কুলে যায়। সরলাকে তিন্নির খুব ভাল লাগে। তিন্নির থেকে বছর চারেক বড়। মা সরলার সাথে বেশি কথা বলা পছন্দ করে না।

মা প্রতি রবিবার দু-ঘন্টার জন্য স্ট্রিট ডগ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিতে যায়। যদিও তিন্নি কখনো মাকে রাস্তার কুকুরকে একটা বিস্কুটের টুকরোও দিতে দেখেনি। কিন্তু মা এই সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান। বছরে অনেক টাকা ডোনেশন দেয়। এসব নাকি স্টেটাস রাখতে করতে হয়। সে যাই হোক, প্রতি রবিবার মা দু-ঘন্টার জন্য যায়। ঐ দু-ঘন্টা তিন্নি সম্পুর্ন স্বাধীন। সরলা ও হাতের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে তিন্নির সাথে গল্প করতে বসে। বাবা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। মা ফ্লাস্কে চা বানিয়ে রেখে দেয়। বাবার আর কিছু চাই না। ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ে। তাই তিন্নির সরলাদির সাথে খেলতে, গল্প করতে অসুবিধা হয় না। সরলাদির মুখেই শুনেছে খুব বৃষ্টি হলে সরলাদিদের বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে পুঁটি মাছ, ছোট ছোট কই, সিঙ্গুর যায়। সরলাদিরা বৃষ্টিতে ভিজে সেই মাছ ধরে। তিন্নি এসব মাছের নাম শুনলেও কখনো চোখে দেখেনি। তিন্নির খুব ইচ্ছে সরলাদির সঙ্গে গিয়ে মাছ ধরে। কিন্ত সে তো কোনদিনই হবে না। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো সরলাদির মুখে গল্প শোনে।

সরলাদির কছে তিন্নি পুতুল খেলার গল্প শুনেছে। সামনের রোববার সরলাদি তিন্নির জন্য পুতুল নিয়ে আসবে।
-“কী হল, রেডি হয়েছ? দাও, ব্যাগটা দাও। চল।” মা ছাতা নিয়ে দরজার দিকে এগোয়। তিন্নি “বাবা আসছি।” বলে বের হয়। সরলাদি দরজা বন্ধ করে দেয়। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। এত বৃষ্টির মধ্যেও তিন্নিকে স্কুলে যেতে হচ্ছে। ওর বাসের বন্ধুরাও কেউ যেতে চায় না। কিন্তু বন্যায় ডুবে না গেলে তিন্নিদের স্কুল কোনদিনই ছুটি দেবে না।

সরলাদির পুতুলের সাথে আজ মায়াদির পুতুলের বিয়ে। তিন্নি কখনো মায়াদিকে দেখেনি। সরলাদির মুখে মায়াদির এত কথা শুনেছে যে না দেখলেও তিন্নির মায়াদিকে খুব চেনা মনে হয়। পুতুলের বিয়েতে সরলাদি পাঁচজনকে নেমন্তন্ন করেছে। সবাইকে খিচুড়ি আর ডালের বড়া খাওয়াবে বলেছে। খিচুড়ি তিন্নি দু-একবার খেয়েছে, কিন্তু ডালের বড়া কখনো খায়নি। সরলাদি বলার পর তিন্নি রাতে মাকে বলেছিল, “মা একদিন ডালের বড়া করবে?”
-“কী বললে?” বিষ্মিত হয়ে বলেছিল।
তিন্নি মিনমিন করে আবার বলেছিল, “ডালের বড়া।”
মা চিৎকার করে বলে ওঠে, “ডালের বড়া!”
-“এমন করে উঠলে যেন ডালের বড়া কথাটা কোনদিন শোনো নি, কোনদিন খাওনি!” টাইয়ের গিঁট খুলতে খুলতে ভিতর থেকে শান্তনু বাবু বলেছিলেন।
-“কেন খাব না?”
-“তাহলে কর না একদিন। কতদিন যে গরম ভাত, মুসুর ডাল আর মুসুর ডালের বড়া খাই না।” শ্যামলী প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “থাক! ওসব এখানে খেতে হবেনা। যখন হাসিমারার বাড়িতে যাবে তখন খেও।”
-“কেন? এখানে খেতে অসুবিধা কোথায়?”
মা রেগে বাবাকে বলেছিল, “তোমার কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই! মেয়েটা স্কুলে গিয়ে বলবে, ডাল আর ডালের বড়া দিয়ে খেয়েছি। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে হাসবে। থাকবে তোমার প্রেস্টিজ?”
-“আমার প্রেস্টিজ থাকবে কিনা জানিনা, তবে সোসাইটিতে তোমার মুখ দেখানো সমস্যা হবে।” বাবার কথা শুনে মা চিৎকার করে ওঠে, “থাক, মানির সামনে আর সিন ক্রিয়েট করতে হবে না।”
ভালের বড়া নিয়ে আর কথা না বলে তিন্নি নিজের ঘরে ফিরে গিয়েছিল।

রোববার মা বেরিয়ে যেতেই সরলাদি ওর ছোট্ট ব্যাগ থেকে দুটো পুতুল বের করে। তিন্নি অবাক হয়ে পুতুলদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তিন্নি আগে কখনো এরকম কাপড় দিয়ে তৈরী পুতুল দেখেনি। মুখটা কি সুন্দর। টানা টানা কি সুন্দর চোখ একেঁছে সরলাদি। কালো সূতো দিয়ে একমাথা চুল বানিয়েছে।
-“তোদের কোন খালি জুতোর বাক্স আছে? পুতুলের একটা ঘর লাগবে তো।”
সরলাদির কথায় তিন্নির মনে পড়ে যায় ও সিঁড়ির ঘরে একটা জুতোর বাক্স রেখে এসেছিল। বাক্সটা বেশ ভালো। তিন্নি ছুটে সিঁড়ির ঘরে গিয়ে বাক্সটা নিয়ে আসে। সরলাদি দেখে খুব খুশি হয়ে বলে, “বাঃ! বাক্সটা বেশ সুন্দর। দাঁড়া, আমি বিছানাটা করে ওদের শুইয়ে দেই। বলেই নিজের ব্যাগ থেকে কয়েকটা ছোট ছোট কাপড়ের টুকরো বের করে জুতোর বাক্সটার মধ্যে পেতে পরিপাটি করে বিছানা বানিয়ে ছোট ছোট দুটো বালিশ পেতে পুতুল দুটোকে শুইয়ে দেয়।
-“আমি তোকে ছাপা শাড়ি বানিয়ে এনে দেব। ওদের রোজ শাড়ি পাল্টে দিবি।” বলে সরলাদি তিন্নিকে শাড়ি পরানো শিখিয়ে দেয়।
-“এখন বল তো ওদের রাখবি কোথায়?”
-“সিঁড়ির ঘরে রেখে দেব।”
-“সেই ভাল। নাহলে বৌদি দেখলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দেবে।”

তিন্নি মাকে বলেছিল, “মা, তুমি পুতুল খেলেছে?”
মা তিন্নির স্কুল ড্রেস প্রেস করতে করতে বলেছিল, “হ্যাঁ, খেলেছি।” পরক্ষণেই তিন্নির দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, “তুমি হঠাৎ পুতুল খেলার কথা জিজ্ঞেস করছ কেন? নিশ্চয়ই সরলা তোমাকে পুতুল খেলার গল্প করেছে। তোমাকে একশো বার বলেছি ওর সাথে বেশী মিশবে না। আনকালচার্ড। তাছাড়া তোমার তো কম্পিউটারে অনেক গেম আছে। তুমি সে সব খেলবে। তা না, পুতুল খেলা!” তিন্নি মার কাছ থেকে এরকমই কিছু আশা করেছিল। এই তো ক’মাস আগে ঠাম্মি ডাক্তার দেখাতে এসে বইমেলা থেকে একটা ‘ঠাকুমার ঝুলি’ কিনে দিয়েছিল। ঠাম্মি চলে যাবার পর তিন্নি রোববার দুপুরে বইটা নিয়ে বসেছিল পড়বে বলে। মা ভীষণ রেগে গিয়েছিল। আসলে মা বাংলা গল্পের বই পড়া পছন্দ করে না । তিন্নি অবশ্য লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল। মা যে ঠিক কি চায় তিন্নি বুঝে উঠতে পারেনা। বাবা ঢেকি শাকের কথা বললে মা রেগে যায়। হাসিমারার দাদা ঠাম্মির ওখানে গেলে তিন্নির খুব আনন্দ হয়। ঠাম্মি কতরকম রান্না করে। বাবার পছন্দের সব জিনিস রান্না করে খাওয়ায়। মা অবশ্য ওখানে কিছু বলতে পারে না । ঠাম্মি কি সুন্দর করে মুড়ি মেখে দেয়। মা তো চাউ-ম্যাগি-চিজ-বাটার এসব দিয়ে তৈরী করা খাবার টিফিন দেয়। বাবা একবার দুধ চিনি আম দিয়ে মেখে খাবে বলেছিল। সাথে সাথে মা বলে উঠল, “ছিঃ ছিঃ! তুমি একেবারে গেঁয়ো ভূত। নিজের স্টেটাসটাও ভুলে যাও।” বাবা আর কোন কথা বলেনি। আসলে বাবা কোনরকম অশান্তি পছন্দ করে না।

হাসিমারার গেলে তিন্নি ঠাম্মির কাছে শোয়। ঠাম্মি কি সুন্দর গল্প বলে। ব্যঙ্গমা ব্যঙ্গমী, রাজপুত্র কোতোয়ালপুত্র, সোনার কাঠি-রুপোর কাঠি… আরো কত গল্প। তিন্নির তো হাসিমারা থেকে আসতেই ইচ্ছা করে না। বনগাঁর দাদু-দিদাও তো কত গল্প বলে। দাদুর একটা কথা তিন্নির মনে গেঁথে বসে আছে। দাদু একবার বলেছিল, “দিদিভাই, ইংরাজি স্কুলে পড়তাছো ভাল, তয় মাতৃভাষা ভুইলা যাইয়ো না। মাতৃভাষা যত ভালো বুঝবা ইংরাজি তত ভালো বুঝবা, কইতে পারবা।… তোমার বাবারে তো আমার এইজন্যই এতো পছন্দ। ডুয়ার্সের নামি ইংরাজি স্কুলে পড়াশুনা করছে, নামি প্রতিষ্ঠান থাইকা ম্যানেজমেন্ট পাশ করছে। কত বড় চাকরী করে। কিন্তু দেখো, পা অখনো মাটিতে আছে। বুকে এখনো দ্যাশের মানুষের লাইগা অগাধ ভালবাসা। আমি তো দেখছি, আমার স্কুলের কোন শিক্ষকের সাথে পরিচয় করায় দিলে শান্তনু পায়ে হাত দিয়া প্রণাম করে। এইডা অহনকার দিনে খুব একটা দেখা যায় না।” দাদুর কথা শুনে তিন্নির খুব গর্ব হয়েছিল।

রোববার সরলাদি পুতুলের চারটে শাড়ী নিয়ে এসেছে। শাড়ী ছিঁড়ে গাছের পাতা থেঁতলে রস বের করে ছাপা শাড়ী বানিয়েছে। কী সুন্দর হয়েছে।
-“আচ্ছা সরলাদি, আমার ছেলের বার্থ-ডে হবেনা?” তিন্নি উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চায়।
-“হ্যাঁ, হবে তো। কিন্তু তোমাদের ফ্ল্যাটে জন্মদিন হবে কি করে? বৌদি জানতে পারলে আমাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে।”
-“সরলাদি বাবাকে বলব?” তিন্নি বলে।
-“দাদাবাবুকে বলবে! আমার কিন্ত ভীষন ভয় করছে। দাদাবাবু যদি বৌদিকে বলেন।” সরলা ভয় ভয় স্বরে বলে।
-“কি হবে? বার্থডে হবে না। দূর! এত ভেবোনা তো।” বলেই তিন্নি ছুটে বাবার কাছে যায়। শান্তনু বাবু ল্যাপটপে কাজ করছিলেন।
চোখ তুলে তিন্নিকে দেখে বললেন, “কিছু বলবে মানি?” তিন্নি আমতা আমতা করে বলে, “বাবা আমি আমার পুতুলের বার্থ-ডে করব।”
-“পুতুলের বার্থডে মানে তোমার ঐ বারবি ডলের?”
তিন্নি বলে, “না বাবা, সরলাদি আমাকে পুতুল বানিয়ে দিয়েছে, সেই পুতুলের বার্থ ডে।”
-“সরলাদি তোমাকে পুতুল বানিয়ে দিয়েছে? কোথায় দেখি?”
তিন্নি ছুটে গিয়ে পুতুল এনে বাবাকে দেখায়।
বাবা পুতুল দেখে হেসে হাতে নিয়ে বলেন, “বাঃ! বেশ কিউট। কিন্ত মানি, মা জানলে…”
-“তুমি না বললে মা জানবে না। আমি তো আগামী রোববার মা যখন থাকবে না তখন বার্থ-ডে করব।”
-“বাঃ! খুব ভাল। তোমার মার সেদিন স্ট্রিট ডগ শো আছে। সারাদিন বাড়িতে থাকবে না। কিন্তু মানি তুমি বার্থ-ডে করবে, তাহলে তো বেলুন, বার্থ-ডে কেক, এসব লাগবে। সেগুলো তুমি পাবে কোথায়?”
তিন্নি আমতা আমতা করে বলে, “দিদা, ঠাম্মি যে টাকাগুলো দিয়েছিল সব মায়ের কাছে।”
-“ঠিক আছে, ওসব তোমাকে ভাবতে হবে না। বেলুন, চকোলেট, বার্থ-ডে কেক আমি নিয়ে আসব। কিন্তু তুমি তোমার বন্ধুদের বলবে না?”
-“আমাদের কমপ্লেক্স কারো সাথে ভাল করে এখনো পরিচয় হয়নি। তাছাড়া কমপ্লেক্সের কাউকে বললে মা জেনে যাবে।”
-“তা অবশ্য ঠিক।” শান্তনু মেয়েকে সমর্থন করে। -“কিন্তু মানি, একা একা বার্থ-ডে!”
-“না, একা একা হবে না। সরলাদি, সরলাদির ভাই আসবে, মায়াদি আসবে পুতুল নিয়ে। আমি রান্নার মাসিকে বলব থাকতে। রান্নার মাসি মাকে কিচ্ছু বলবে না।”

সেদিন সরলা চলে যাবার পর তিন্নি জুতোর বাক্সটা ভাল করে ঢেকে ওর খাটের তলায় দেওয়াল ঘেঁসে রেখে দেয়। ছাদের ঘরে সিমেন্ট রাখা হয়েছে কাজ হবে বলে। তাই ক’দিন ওর খাটের তলায় পুতুলটাকে রাখতে হবে। তিন্নি স্কুল থেকে আসার পর মা তিন্নিকে খেতে দেয়। তিন্নির খাওয়া হয়ে গেলে মা প্রায় প্রতিদিন শিখা আন্টির বাড়িতে যায়। ওদের ঘরে চারজন মিলে তাস খেলে। চারটের আগে আসে না ।
এই সময়টা তিন্নি পুতুলের পরিচর্যা করে। তিন্নি এখন ভাল করে কাপড় পরাতে পারে। সরলাদি দুটাকা দিয়ে একটা ছোট্ট চিরুনি এনে দিয়েছে। তিন্নি খুব পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে দেয় । বার্থ-ডের আগে পুতুলের একটা ভাল নাম দিতে হবে। তিন্নি অনেক ভেবে একটা নাম ঠিক করেছে ‘সৃজা’। নামটা সরলাদির পছন্দ হয়েছে। পরের রোববার ‘সৃজা’-র জন্মদিন। বাবাকে পাশে পেয়ে তিন্নির খুশী আর ধরে না।

শনি-রবি স্কুল বন্ধ। শুক্রবার একটা ক্লাস বেশী হয়। তিন্নির বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে চারটা হয়ে যায় । কাল বাদে পরশু ‘সৃজা’-র বার্থ ডে। কি মজাই না হবে। মা সেদিন সারাদিন থাকবে না, তাই আনন্দটা একটু বেশী । বার্থ ডেতে ‘সৃজা’-কে কিভাবে সাজাবে এসব ভাবতে ভাবতে ফ্ল্যাটের সামনে এসে কলিং বেলটা টিপতে গিয়েও থেমে গেল। ভিতর থেকে মার চিৎকার ভেসে আসছে,
“অসভ্য গেঁয়ো মেয়েদের এর থেকে ভাল রুচি হতে পারে না। তোমাকে এতগুলো টাকা মাইনে দিই বাড়ির কাজ করার জন্য। আমার মেয়ের সর্বনাশ করার জন্য নয়। মানির স্ট্যান্ডার্ড আর তোমার স্ট্যান্ডার্ড এক না একথা ভুলে যাও কেন? ওর খেলার জন্য কম্পিউটার আছে, বারবি ডল আছে, কত টাকা দিয়ে কত সফ্ট টয় কিনে দেওয়া হয়েছে। আর তুমি কিনা নোংরা কাপড় দিয়ে তৈরী পুতুল নিয়ে এসেছ মানির খেলার জন্য? কার না কার কাপড়। কী অসুখ-বিসুখ আছে কে জানে! মোষ্ট আনহাইজিনিক। তোমাকে আর এখানে কাজ করতে হবে না। টাকা নিয়ে চলে যাও। আর যেন কক্ষনো মানির কাছাকাছি না দেখি।”
তিন্নি কলিং বেলটা টেপে। মা এসে দরজা খুলে দেয়। তিন্নি নিজের ঘরে ঢোকে। তিন্নির টেবিলের ধারে সরলাদি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মেঝেতে ‘সৃজা’-র মাথাটা ছিঁড়ে আলাদা হয়ে পড়ে আছে। তিন্নি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখদুটো জলে টস টস করছে। ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে কাঁদতে, কিন্তু কাঁদতে পারছে না।”
-“দাঁড়াও, আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি। টাকা নিয়ে চলে যাও।” বলে মা নিজের ঘরে যায়।
সরলাদি নীচু হয়ে ছেঁড়া পুতুলটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তিন্নির দিকে একবার তাকায়। চোখ দুটো জলে ভর্তি। তারপর টাকা নিয়ে বেরিয়ে যায়।

তিন্নি এবার ক্লাস নাইনে। সেদিনের পর আর কখনো পুতুল খেলে নি। মা ওর ভাললাগাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। তিন্নি এখন সবই বোঝে। মা চায় তিন্নি সানিয়া মির্জার মতো লন টেনিস খেলুক। মা এবং আরো কয়েকজনের উৎসাহে ক্যাম্পাসের ভিতরে টেনিস কোর্ট কাটা হয়েছে। ইচ্ছে না থাকলেও তিন্নিকে সেখানে খেলতে যেতে হয়। মাঝে মাঝে একজন কোচ রাখা হয়।

আজ রোববার, তিন্নি সকালের কাগজটা নিয়ে ব্যালকনির চেয়ারে বসে। কাগজ খুলে হেডলাইনগুলোর উপর চোখ বোলাতে গিয়ে সংবাদটা চোখে পড়ে। এক নজর চোখে বুলিয়ে তিন্নি চিৎকার করে ওঠে, “বাবা! শিগ্‌গির এসো।” তিন্নির চিৎকারে তিন্নির বাবা- মা হন্ত দন্ত হয়ে চায়ের কাপ হাতে ছুটে আসে।
-“কী হল? এরকম করে চিৎকার করলি কেন?” তিন্নির মা জানতে চায়।
-“তোমাকে তো ডাকি নি।”
-“বেশ তো বল, কি হয়েছে?” তিন্নির বাবার গলায় উৎকন্ঠা।
-“সংবাদটা পড়ছি শোন। দারুন খবর।” তিন্নি উচ্ছ্বসিত।
-“পড় শুনি।” তিন্নির বাবা তাড়া দেয়।
-“শোন।” তিন্নি উচ্চস্বরে পড়তে শুরু করে, “বাসাবাড়িতে কাজ করে মাধ্যমিকে তৃতীয়। মেয়েদের মধ্যে প্রথম সরলা রায়। ৯৬% নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছে। ছাত্রীর সাফল্যে বিদ্যালয়ে সকলে খুব খুশি।… দেখ বাবা, সরলাদির কি সুন্দর ছবি ছাপিয়েছে।”
আজ আর তিন্নির ভয় করছে না। মার সামনেই বলে, “বাবা, যাবে একবার?”
-“অবশ্যই যাব। আমি বিকেলে ফেরার সময় বেশ ভাল একটা ফুলের বুকে আর একটা খুব ভাল গিফট আর মিষ্টি নিয়ে আসব।”
তিন্নি লক্ষ্য করে মা মাথা নীচু করে ভিতরে চলে যায় ।

Author: admin_plipi

1 thought on “অচেনা আকাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published.