রামধনু

রামধনু

কলমে – দেবলীনা দে

ছবি – নিকোলাস

 

 

 

লিভিংরুমে বসে নীলাক্ষী একটি বেসরকারী খবরের চ্যানেল দেখছে, বুকের ভিতরটা কেমন যেন করছে তার। আজ দিদিয়া থাকলে ঠিক কি বলত সেটা তো তার আর জানা হলো না, তার আগেই সব শেষ।

কলিংবেলের আওয়াজ শুনে সম্বিৎ ফিরল তার, খেয়াল করল নিজের অজান্তে কখন যেন চোখের কোল ভিজে গেছে। নিজেকে সামলে দরজা খুলতেই দেখল অনির্বান অফিস থেকে ফিরেছে।
-“নীলা, আবার তুমি মন খারাপ করছ! যত ভাববে তত কষ্ট পাবে।”
নীলা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “অনি, সেই তো সুপ্রিমকোর্ট রায় দিল, কিন্তু বড্ড দেরি করে ফেলল, আর একটু আগে হলে আমার দিদিয়াকে চলে যেতে হত না।”

ধীরে ধীরে সব মনে পড়লো নীলার। এণাক্ষী আর নীলাক্ষী দুই বোন, দুজনে দুই মেরুর মানুষ, তবে দুই বোনে খুব মিল। স্কুলে একসঙ্গে যাওয়া, তারপর আঁকার ক্লাস, নাচের ক্লাস, সবকিছুতে দিদিয়া তার ছায়াসঙ্গী। আগলে রাখত তাকে সবসময়। তারপর এণাক্ষী কলেজে ভর্তি হল, ততদিনে নীলাক্ষী অনেকটা বড় হয়ে গেছে। কলেজে পড়াকালীন দিদিয়ার সঙ্গে সুমনাদির আলাপ, অনার্সের ক্লাস থেকে পাসের সাবজেক্ট দুজনের এক। ধীরে ধীরে বুঝতে পারতাম দিদিয়ার সুমনাদি ছাড়া আর কোন বন্ধু নেই। দুজনের জগৎ এক, আমাদের পৃথিবী যেন তাদের বড় অচেনা। পড়াশোনায় দিদিয়া যতটা ভালো সুমনাদি ততটা নয়, তবে খেলাধুলায় ভীষণ ভাল। সেইসময় কলেজের স্পোর্টসে বেশ নামডাক হয়েছিল।

ভিজে গলায় নীলা বলতে শুরু করল, “মা খুব একটা সুমনাদিকে পছন্দ করতো না, দিদিয়াকে যখন দেখত সুমনাদির সঙ্গে কথা বলতে, কিংবা কলেজ থেকে একসঙ্গে ফিরতে, রাগ করত আর বলত, “এই সুমনা ছাড়া তোর কি বন্ধু হলো না কেউ কলেজে! কেন রে, স্কুলের বান্ধবীরা? তারাও তো কলেজে ভর্তি হয়েছে।” দিদিয়া চুপ করে থাকত, কোনো উত্তর দিত না। দেখতে দেখতে কলেজ পেরিয়ে দিদিয়া। ইউনিভার্সিটিতে রেগুলারে সুযোগ পেল, কিন্তু সুমনাদির মার্কস কম থাকায় ডিসট্যান্স কোর্সে এম.এ.তে ভর্তি হল। তবে ওদের দুজনের বন্ধুত্বে একটুও দূরত্ব তৈরী হয় নি, রোজ স্কুটি করে দিদিয়াকে ইউনিভার্সিটি পৌঁছে আসত সুমনাদি। মা পছন্দ করত না বলে বাড়ির থেকে বেরিয়ে একটু দূরে মোড়ের কাছে গিয়ে তারপর দুজনে একসঙ্গে যেত। এম.এ. রেজাল্ট খুব ভালো হল দিদিয়ার, আর সে বছর এস.এস. সি. দিয়ে একটি স্কুলে চাকরিও হয়ে গেল। সুমনাদি তেমন ভালো রেজাল্ট হয় নি, এখন কি করবে সেটা নিয়ে যতটা না সুমনাদি চিন্তিত তার দ্বিগুন চিন্তা দিদিয়ার। মা ভীষণ খুশি, ছোটবেলা বাবাকে হারানোয় আমাদের দু’বোনকে মা খুব কষ্ট করে বড় করেছে।
এবার মা দিদিয়ার বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় শুরু করল। কিন্তু দিদিয়া কিছুতেই রাজি নয়, কারণ জানতে চাইলে তার কোন উত্তর দেয় না। বেশ কয়দিন পর হঠাৎ একদিন দুজনে গল্প করছে ঘরে আমি সেই ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কানে এল, “চল না সু, আমরা অন্য কোথাও পালিয়ে দুজনে একসঙ্গে থাকি, এখন তো আমি চাকরি করি কোনো অসুবিধে হবে না। বোন বড় হয়ে গেছে, ও ঠিক পারবে মাকে সামলে রাখতে। আর আমি যদি কয়েকটা টিউশনি করি তাহলে তো মাসে মাসে বাড়িতে কিছুটা টাকা পাঠিয়ে দিলে কোন অসুবিধে হবে না। আমি যে মা’র বিয়ের কথার কোনো উত্তর দিতে পারি না।” কথাটা কানে শুনে আমার কেমন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না, ততদিনে আমি জেনে গেছি যে ছেলে-মেয়ের বাইরেও সমকামীদের একটি সম্পর্ক হয়, ভালোবাসা হয়, দুজনে স্বপ্ন দেখে একসঙ্গে। সেই বিকেলে আকাশের দিকে তাকাতে দেখি রামধনু, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি আর দিদিয়াকে সুমনাদি বলছে, “দেখ এনা, আকাশে রামধনু! দেখবি সব মেঘ কেটে যাবে, আমাদের জীবনেও রামধনু দেখা দেবে একদিন। আমাকে একটু সময় দে, আমি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে হলেও চাকরি ঠিক জুটিয়ে ফেলব।”
দুদিন বাদে এক রাতে মা আবার দিদিয়ার বিয়ে নিয়ে কথা তুলল, সেইসঙ্গে সুমনাদি সম্পর্কে যা নয় তাই বলতে শুরু করল, “… এই মেয়ে দেখবি একদিন তোকে শেষ করে দেবে!” খাবার টেবিলে বসে আমি শুধু দেখলাম দিদিয়ার চোখ থেকে থালায় টপটপ করে জল পড়ছে। খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার, জান তো অনি। আমি শুধু মা কে বললাম, “এভাবে জোর করে কাউকে বিয়ে দেওয়া যায় না মা, দিদিয়াকে নিজের মতো একটু বাঁচতে দাও, নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিও না।” মা এর চোখ-মুখ লাল, টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। একটু পরে দিদিয়া হাত ধুয়ে আমার মাথার উপর হাত রেখে বলল, “সবসময় তোর দিদিয়া কি ঠিক কাজ করে, বল? মাকে তুই একটু বুঝিস।” এই বলে নিজের ঘরে চলে গেল, তারপর আর পরের দিন সকালে দরজা খোলে নি, আর কথা হয় নি। তারপর তো তোমার সব জানা।”
অনির্বান নীলার মাথায় হাত রেখে বলল, “তুমি যত ভাববে, তত কষ্ট পাবে। মাকে দেখেছো তো কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন নি বলে কষ্ট পেতেন, তারপর আর বেশিদিন বাঁচলেন না।” “জানো অনি, দিদিয়া চলে যাওয়ার পর সুমনদি যে কোথায় চলে গেল। শুধু একটা বকুল ফুলের মালা হাতে করে এসেছিল শেষবারের মত দিদিয়াকে দেখতে। এই ফুল যে দিদিয়ার পছন্দের ফুল! আমি সেই সময় সুমনাদিকে লেখা দিদিয়ার শেষ চিঠিটা হাতে আগেই পেয়ে সরিয়ে রেখেছিলাম, সেটা সবার আড়ালে খামটা হাতে দিয়ে দিলাম। কিছু না বলে চলে গেল। আমার কাছে দিদিয়ার লেখা চিঠিটা আজও আছে, কাগজের ভাঁজে একটুও অস্পষ্ট হয় নি।
আজ যখন সুপ্রিমকোর্ট রায় দিল, রাস্তায় জনজোয়ার, একে অপরকে আলিঙ্গন করছে, এল.জি.বি.টি.কিউ.দের দীর্ঘদিনের আশা পূরণের দিন আজ, তাদের আকাশ জুড়ে রামধনু রঙের ছটা, শুধু নিজের চোখে দেখে গেল না আমার দিদিয়া। জানি না সুমনাদি আজ কোথায়, একবার তাকেও যে বলতে ইচ্ছে করছে আজ যে তোমার জয়।”

 

Author: admin_plipi