উল্টোডাঙা

 

 

 

 

“উল্টোডাঙা…উল্টোডাঙা…উল্টোডাঙা…” বেশ জোরে চিৎকার করছে টাটা সুমোর ড্রাইভারটা। আর দু’জন হলেই ছাড়বে গাড়ীটা। দেখতে দেখতে হয়েও গেল। উঠে পড়ল রূপসা আর বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অভি।  আধ ঘণ্টার মধ্যেই চলে এল উল্টোডাঙা।

সকলে ভাড়া মেটাচ্ছে। রূপসা টাকা দিয়ে এদিক ওদিক চেয়ে আছে। অভি টাকা দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে এগোতে যাবে সেই সময় হঠাৎ “এক্সকিউজ মি” ডাকটা এল পিছন থেকে। পিছন ঘুরেই অভি দেখল ঐ গাড়ী থেকেই নামা চুড়িদার পরা মেয়েটা দাঁড়িয়ে। অভির দিকে তার জিজ্ঞাসা “৮৫/ডি,উল্টোডাঙাটা কোনদিকে হবে?” “ঐ তো, ঐ যে দেখা যাচ্ছে সিঁড়িটা, ঠিক তার বাঁদিকে।” জবাব অভির । রূপসাও মৃদু হাসিতে “ওহ! থ্যাঙ্ক ইউ” বলে এগিয়ে গেল।

 

আবার দু’দিন পর ঐ একই বাসস্ট্যান্ডে দেখা ওদের। দেখা মাত্রই অভি বলল, “আপনিই সেদিন জিজ্ঞাসা করলেন না অ্যাড্রেস টা!”  আচমকা একটা পুরুষ কণ্ঠে ওর বুকের ঢিপঢিপানিটা বেড়ে গেলেও পিছন ঘুরে শান্ত ভাবেই উত্তর দিল, “ওহ! আপনি! হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই ছিলাম।” বলেই মৃদু হাসি ওর। একটু থেমে বলল, “আসলে সেদিন ইন্টারভিউ ছিল। চাকরীটা হয়ে গেছে।” অভি কিছু বলার আগেই ২০১ টা এসে গেল। উঠে পড়ল দু’জনেই। নেমে অভি একটু হেসে, “শুভেচ্ছা রইল” বলে এগিয়ে গেল। রূপসার ঠোঁটেও মুচকি হাসি।

 

এরকম ভাবে মাঝেই মাঝেই ওদের একসাথে যাওয়া হয়। কখনো বাস আবার কখনো বা গাড়ী। তবে কথাবার্তা কখনোই বেশী হয়নি। তবে নামটুকু আর অফিসের নাম দু’টোই দু’জনের জানা হয়ে গেছিল।

 

রূপসার কোলকাতাতে নিজের বলতে এই মাসী-মেসো। ওনাদের কাছেই থাকে ও। আর এদিকে অভির জীবনে ওর চেন্নাইতে চাকরী করা দিদিটা ছাড়া আর কেউই নেই। ছোটবেলাতেই মা-বাবাকে হারিয়েছে অভি।

 

একদিন অফিস যাওয়ার সময় বাস থেকে নামার সময় হঠাৎ করে বাসটা ছেড়ে দেওয়ায় রাস্তার ওপরেই মুখ থুবড়ে পড়ে রূপসা। লোকজন দৌড়ে এলে ও অভির কথা বলে। অভি এসে পৌঁছে দেয় ওকে অফিসে। অভি নিজেই ওর ফোন নাম্বারটা দিয়ে বলে, “এই নাও, এটা রাখ। বেরোনোর সময় একটা কল করে দিও আমায়। একসাথেই যাব।” আস্তে আস্তে অন্য সাধারণ বন্ধুত্ব গুলোর চেয়ে যেন একটু অন্য রকম ভাবেই ওদের বন্ধুত্বটা পরিণত হল গভীর বন্ধুত্বে।

 

মাসে একদিন হলেও এদিক ওদিক যাওয়া লেগে আছে ওদের সম্পর্কে। ক্রমশ তিনটে বছরেই যেন একে ওপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে ওরা। সম্পর্কটা যেন পরিনতির দিকেই এগোতে চায়। রাতে ওদের ফোনে বেশ অনেক গল্প হয়। সেদিন রাতে ফোনে অভি  হঠাৎ বলে উঠল, “কাল তুমি তোমার মতো অফিসে যাবে। আমি আমার মতো ঠিক চলে যাব। শুধু ফোন করলে একবার অফিসের নীচে এস। কিছু বলার আছে তোমাকে।” কিছু বুঝে ওঠার আগেই “গুড নাইট” বলে ফোন রেখে দেয় অভি। কিছুই বুঝে উঠতে পারল না রূপসা।

 

পরের দিন রূপসা চলে গেল। অভি রওনা হল একটা লাল গোলাপ নিয়ে। দু’জনের জীবনটাই রঙিন করতে চায় অভি। সেদিন রূপসা অফিসে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুনতে পেল যে ওদের অফিসের সামনেই একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। রাস্তায় জ্যামও খুব সেই জন্য। শুনেই বুকের বাঁ দিকটা ছ্যাঁত করে উঠল ওর। ‘অভি ঠিক আছে তো!’ ফোনবুক থেকে নাম্বারটা বার করতে করতেই নীচে দৌড় লাগাল মেয়েটা। জটলা সরিয়ে সামনে যেতেই ভেসে উঠল তিন বছর আগের ঐ ‘এক্সকিউজ মি’ এর উত্তর দেওয়া মুখটা। রাস্তায় তখন পড়ে অভির আনা গোলাপ। সেটা গোলাপ নাকি অভির আনা ভালোবাসা সেটা হয়তো কারুর জানা নেই। রূপসার ফোনবুকে যেন জ্বলজ্বল করছে অভির শেষ হাসিটা।

 

 

 

কলমে – অভ্রজিৎ দেবরায়

ছবি – কুণাল

Sugested Reading

Author: admin_plipi

5
Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Sangita Deb
Guest
Sangita Deb

মন খারাপ হয়ে গেল

গীতাঞ্জলি দাস (গুহ)
Guest
গীতাঞ্জলি দাস (গুহ)

লেখাটি এত বেদনাদায়ক। শেষ করেও মনে হচ্ছিল বোধয় নীচে আরেকটু আনন্দ দায়ক কিছু থাকবে। না না, এমন পরিণতি ভালো গায়ে কাঁটা দেয়।

Rakibul
Guest
Rakibul

ভালো লাগলো। যদিও বেদনাদায়ক

Debalina De
Guest
Debalina De

মন খারাপ হয়ে গেল । তবে লেখাটা খুব ভালো।

Rakesh Banik
Guest
Rakesh Banik

Darun sundor