বর্ষা – লেখা: শুভাশীষ দে
মাটি থেকে অনেক উঁচুতে পেঁজা তুলোর মত সাদা ধবধবে মেঘের বিছানায় আমার প্রিয় হালকা নীল রংয়ের চাদরটা আপাদমস্তক জড়িয়ে কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না। হঠাৎ কার ডাকে ঘুম ভেঙে দেখি শরৎ-আমার ছোট ভাই।
-‘কি রে দিদি, যাবি না? আর কতক্ষন ঘুমোবি? সময় তো হল নীচে নামবি না? চেয়ে দ্যাখ কত জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ তোর দিকে চেয়ে আছে।
চমকে উঠে অনেক নিচে মাটির দিকে তাকিয়ে আমার চোখ চড়কগাছ। যতদূর চোখ যায় এক ফোঁটা সবুজের চিহ্ন বিহীন ধূসর মাটির রুক্ষ প্রান্তর। প্রচন্ড দাবদাহে ফুটিফাটা। চারদিক যেন ঝলসে যাচ্ছে। নদী,পুকুর সহ খাল, বিল,জলাশয় সব যেন শুকনো খটখটে। আর মানুষসহ হাজার হাজার প্রাণী করুণ চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে এক ফোঁটা জলের আশায়।
বুঝলাম, আমার পরম শ্রদ্ধেয় পতিদেবের কান্ড।
ওহো, আমার পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। আমি বর্ষা। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন আপনাদের প্রিয় বর্ষা ঋতু। ঋতুরাজ গ্রীষ্মের সহধর্মিনী। সারা পৃথিবী জুড়ে আমার স্বামীর যেখানেই পদার্পণ ঘটে, সেখানেই আমি তাঁর অনুসরণ করি। গোটা বিশ্বজগৎ দগ্ধ করাই তাঁর কাজ। দুনিয়ার যত আবর্জনা দগ্ধ করে আমার পদার্পণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন তিনি। তারপর আমি তাতে করি আমার স্নেহের বারি সিঞ্চন। শস্য শ্যামল হয়ে ওঠে ধরিত্রীর প্রান্তর। শীতল হয় প্রাণীর দেহ,মন,আত্মা।
হঠাৎ চমকে উঠলাম। মানুষ সহ বহু প্রাণীর তৃষিত আত্মার করুণ দীর্ঘশ্বাস একটা গরম আগুনের হল্কার মত যেন আমার গায়ে এসে লাগল। নিচে দেখি জলের অভাবে অসংখ্য গবাদি পশুর মৃত্যুকাতর গোঙানি। করুনায় অশ্রুসজল হয়ে উঠল আমার চোখ। ঝরে পড়তে যাব আমার জলকণাময় দেহ নিয়ে, এমন সময় পেলাম বাধা।
-‘দাঁড়া! তোর এখনও সময় হয় নি।‘
চেয়ে দেখি বৈশাখী। আমার অগ্রজা। কালো মেঘের মত খোলা চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি বার আমার স্বামীর দহন কার্যের পর ওর আবির্ভাব হয় সাক্ষাৎ কালের মত প্রকৃতির বুকে তান্ডব চালানোর জন্য । তাই তো সবাই একে বলে কালবৈশাখী। প্রচণ্ড আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে গেলাম। বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা আর্ত আবেদন :
-‘ওরে যাস নে! ওরা এমনিতেই অনেক কষ্টে আছে। ওদের দুঃখ আর বাড়াস না।‘
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো শোঁ শোঁ শব্দে প্রলয়ঙ্করী বাতাসের রূপ নিয়ে চারদিকে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে ততক্ষণে বৈশাখী আছড়ে পড়েছে ধরিত্রীর বুকে। তারপর কত যে গৃহস্থের মাটির বাড়ি ধুলিস্যাত হলো, কত বড় বড় গাছ সমূলে উপড়ে পড়ল, পাখির বাসা ভেঙে কত যে পাখির শাবক তাদের মা বাবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে করুন স্বরে চিৎকার করতে লাগলো তার ইয়ত্তা নেই।
আর থাকতে পারলাম না। চোখের বাঁধ ভাঙ্গা আকুল কান্নায় আপ্লুত হয়ে পড়লাম আমি। আর আমার চোখের জল লক্ষ্ কোটি জলকণা হয়ে ঝরে পড়তে লাগলো মাটির উপর। ভরে উঠতে লাগল খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর। আর সেই জলকণার রূপ ধরে আমি নেমে এলাম মাটিতে। ঝরে পড়তে লাগলাম গৃহস্থের খড়ের আর টালির চালে, পাকা বাড়ির ছাদে, বাড়ির উঠোনে।
ওই যে দূরে দেখা যাচ্ছে মাঠের এক প্রান্তে ছোট্ট একতলা পাকা বাড়িটা – ওখানে থাকে একটি ছোট্ট বাচ্ছা মেয়ে। খুব বৃষ্টি ভালোবাসে। আমি যখন এই রকম অঝোরে ঝরে পড়ি মাটির ওপর তখন ছুটে বেরিয়ে আসতে চায় নিজের ছোট্ট ঘরটা থেকে। এসে দাঁড়াতে চায় খোলা মাঠে বা চাষের জমির আল পথে। দু হাত দুদিকে মেলে দিয়ে ভিজতে চায় নিজের ইচ্ছে মতন। কিন্তু পারে না। মেয়েটা বেশ কয়েক বছর ধরেই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। ডাক্তারের নির্দেশে বাড়ির বাইরে যাওয়া বারণ। তাই ঘরের মধ্যে শুয়েই খোলা জানলা দিয়ে করুণ চোখে তাকিয়ে দেখে মাঠ-ঘাট, বন বাদাড়ের উপর আমার ঝরে পড়া। কান খাড়া করে শোনে ওদের রান্নাঘরের টিনের চালে জলকণা রূপে আমার ঝরে পড়ার শব্দ । বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ নেয়। আজ ওর ছোট্ট খাটের পাশের জানলার দুটো পাল্লাই খোলা। এই সুযোগ। খোলা জানালা দিয়ে জলকণারূপে ঢুকে পড়ে ওকে ভিজিয়ে দিলাম আপাদমস্তক। হ্যাঁ, ওর ইচ্ছে পূরণ করার এই শেষ সুযোগ। পরের বছর আমি যখন এখানে আসব, তখন ও আর এই ঘরে নেই । ডাক্তার স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। কঠিন লিউকোমিয়া রোগে আক্রান্ত মেয়েটির জীবনের মেয়াদ আর বড়জোর দুই কি তিন মাস। ও হ্যাঁ, ওর নামও বর্ষা।
