অপরাহ্নের চিঠি

“ম্যাডাম, আপনার ফোন…” সুবলবাবুর কথাটা শুনে টেবিলে স্তুপিকৃত ফাইলগুলো থেকে মুখ তোলে তন্মিষা। “কে?” – “একজন সাংবাদিক, ম্যাডাম”। সে রিসিভারটা তুলে নিল। ওপারে এক সুন্দর পুরুষ কণ্ঠ,” ম্যাডাম, আমি ‘দ্য ট্রুথ’ কাগজের সাংবাদিক। আজ যদি একবার সময় দিতেন… “। তার দ্রুত উত্তর,” আপনি কাল আসুন, আজ হবে না।” ফোনটা কেটে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল তন্মিষা। কাজে মন বসাতে চাইল, কিন্তু পারল না। অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, ফোনটা আসার পর থেকে। কেন তা সে জানে না। সত্যিই কি জানে না? একটা সন্দেহ…

তন্মিষা – তন্মিষা ব্যানার্জী, বিনপুর-১ ব্লকে সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক হিসাবে কয়েকমাস হল যোগ দিয়েছে। ফর্সা দীর্ঘ মেদহীন চেহারা, বয়স পঁচিশের কোঠায়। তার মুখমন্ডলের গাম্ভীর্যপূর্ণ কোমলতা লক্ষ্য করলে, তাকে এই দায়িত্বপূর্ণ পদের উপযুক্ত ধারক বলেই মনে হয়। নিজের বাবাকে আদর্শ করে অনেক ছোটোবয়স থেকে তার সিভিল সার্ভিসে যোগদান করার স্বপ্নজাল বোনা শুরু। তারপর চলেছে দীর্ঘ প্রস্তুতি , সবশেষে আসে সাফল্য।

ব্লকটিতে আধিকারিকের কার্যালয় ও আবাসন একই চত্বরের ভিতরে। শুষ্ক গ্রাম্য পরিবেশে লোকবসতি কম। কিছু বছর আগে পর্যন্তও মাওবাদীদের ভয়ে বাইরের মানুষজন এ অঞ্চলে পা বাড়াতে সাহস করত না। স্থানীয় মানুষ তো বটেই, ক্ষমতাধর কর্তাব্যাক্তিরাও ভয়ে ও সংশয়ে দিন যাপন করতেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। ফলে প্রচুর টুরিস্ট সমাগম হয় প্রকৃতির অমৃতকুন্ডের রসাস্বাদনে। দূরে অদূরে ছড়িয়ে আছে বেলপাহাড়ি, গাররাসিনি পাহাড়, ঘাঘরা ফলস, চিড়িয়াখানা,রাজবাড়ি, কনকদুর্গা মন্দির ইত্যাদি আরো কত জানা অজানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার। সর্বোপরি অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রামের নয়নাভিরাম প্রশান্তিদায়ক শ্যামলতাকে উপেক্ষা করা কি সহজ কথা?

সেদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে আবাসনে ফিরে তন্মিষা বাইরে গিয়ে বসল। কাজের মেয়ে মিতু পাশের ছোটো টেবিলে রেখে গেল কফির ধুমায়িত কাপ। তারকাখচিত কৃষ্ণবর্ণ আকাশের এক অদ্ভূত মোহাবরণে বেষ্টিত হয়ে কফির মৌতাতে তন্মিষা হারিয়ে গেল। ফোনটা কি তবে ‘সে’ ই করেছিল? হঠাৎ মনে পড়ে যায় তাকে। দীর্ঘ দেহ, প্রশস্ত ললাট, দৃঢ় চিবুক এবং উজ্জ্বল দুই চোখে ব্যাক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। তবে সবচেয়ে সুন্দর তার গলার স্বর। আজ কতদিন পরে ওই স্বর শুনল। সে কি ভুল শুনল? মনে হয় না। কত বছর আগের কথা?- কলেজের প্রথম বর্ষ…। “মন মোর মেঘের সঙ্গী…” আচমকা ফোনের শব্দে সংবিত ফেরে তার। স্ক্রিনে ফুটে ওঠে – ‘দেবু কলিং ‘। তিনবার-চারবার – ফোনটা নিশ্চুপ হয়ে যায়। দেবু -দেবাদৃত মুখার্জী, তন্মিষার হবু স্বামী। কলকাতার নামি হাসপাতালের বড় ডাক্তার। হঠাৎ ই দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। আবার হারিয়ে যায় অতীতে।’তার’ সাথে তন্মিষার দেখা হয়েছিল এক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে বাবা পরিচয় করিয়ে দিলেন এক যুবকের সাথে। ‘সে’- সৌগত সেন, পেশায় সাংবাদিক নেশায় লেখক। তন্মিষার চোখে চোখ রেখে হেসেছিল সৌগত। সেই হাসির গভীরতা আর তার মুগ্ধ চাহনির অব্যক্ত ভাষা অনুধাবন করে শিহরিত হয়েছিল তন্মিষা। তাদের সামনাসামনি দেখা হয়েছে হাতে গোনা কয়েকবার। তবে কখনও সরাসরি না বললেও অন্তঃসলিলা নদীর মতই প্রতিবার বয়ে যেত ভালোলাগার চোরাস্রোত। তন্মিষা যখন তৃতীয় বর্ষে, শুনেছিল সৌগতর বদলি হয়েছে উত্তরবঙ্গে। সেসময় দেখাও হয়নি তাদের। কদিন খুব মন খারাপ হয়েছিল তার। কিন্তু কালের নিয়মে স্মৃতিরাও আস্তে আস্তে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়।

“মন মোর মেঘের সঙ্গী…” – আবার ভাবনায় ছেদ পড়ে তার। ফোনটা ধরে। ওপারে দেবুর উদ্বিগ্ন স্বর, “ফোন ধরছিলে না কেন তনু? একলা আছো ওখানে। তারপর ভাবলাম হয়তো মিটিং এ…”।”না, আসলে মাথাটা একটু ধরেছিল। তাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম”, ঢোক গিলে মিথ্যে কথাগুলো বলল তন্মিষা।”সে কি? আমার কথায় তো তুমি পাত্তা দাও না। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। কয়েকটা ওষুধের নাম বলছি, এখনই আনিয়ে নাও। আর শোনো, জল খেয়ে বিশ্রাম নাও।” দেবুর অভিমানে হেসে বলল,” অত ব্যস্ত হয়ো না ডাক্তারবাবু, আমি ঠিক আছি। ” আরো কয়েকটা কথা বলে ফোনটা ছাড়ে। দেবু এরকমই, তন্মিষাকে চোখে হারায়। কর্মসূত্রে দুজনের পরিচয়। একদিন যখন এই সুদর্শন, মৃদুভাষী এবং দিলদরিয়া স্বভাবের যুবকটি ভীরু চোখে প্রেম নিবেদন করেছিল, তন্মিষা অসম্মত হতে পারেনি। দুজনের পরিবারের দিক থেকেও কোনো আপত্তি ছিল না। সামনের বছর ফেব্রুয়ারীতে তাদের চার হাত এক হবে। তাহলে এই সুখের জীবনে হঠাৎ আবার সৌগতর প্রসঙ্গ আসছে কেন? কেন মনে পড়ছে তার কথা? বদলি হয়ে যাবার পর থেকে তো তার আর কোনো খবরই পায়নি সে। নিজেকে খুব অস্থির লাগে তন্মিষার। “ম্যাডাম, ঠান্ডা লেগে যাবে।” মিতুর ডাকে বাস্তবে ফেরে সে। গায়ের শালটা ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে ভিতরে ফিরে যায়। দূরে তখন ল্যাম্পপোস্টের কৃত্রিম মৃদু আলো, তার চারপাশের অকৃত্রিম ঘনায়মান অন্ধকার দূরীকরণের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় নিমগ্ন।

“ম্যাডাম, আসতে পারি?” চমকে মুখ তোলে তন্মিষা। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে, ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে, “আসুন”। তার টেবিলের সামনে এসে বসে সৌগত সেন। হ্যাঁ ‘সে’ ই। কিন্তু এ কাকে দেখছে তন্মিষা? এই ক-বছরে একি অবস্থা হয়েছে? গায়ের ফর্সা রং হয়েছে তামাটে, শরীর ভেঙে গেছে, মাথার চুল অস্বাভাবিক হারে কমেছে, কিন্তু ক্লান্ত দুটো চোখ বসে গেলেও উজ্জ্বলতা একটুও কমেনি বই বেড়েছে। ওই চোখ দুখানিই যেন তার অতীত পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করছে।”তন্মিষা ” – গভীর পরিচিত ডাকে নিশ্চিন্ত হল সে। “তোমার কাছে আজ কেবল ভারমুক্ত হতে এসেছি। ভালোবাসাও একপ্রকার ভার বৈকি। এতদিন যা সযত্নে বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরেছি। ভাবিনি আবার কখনো তোমার সামনে দাঁড়াতে পারব। কিন্তু কি আশ্চর্য দেখো, তোমার প্রথম পোস্টিং হল এখানে।” নীরব হল সৌগত। কারণ শ্যামল ঘরে প্রবেশ করেছে। হাতে ধূমায়িত দুটি চায়ের কাপ। “নাহ, আজ আর কিছু বলার নেই তোমায়। সেই সময় অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। আমার কালক্ষেপন ও ব্যর্থতার কৈফিয়ত, পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনা এখন কেবল অজুহাতের মতো শোনাবে। সর্বোপরি অতীত-বর্তমানের দ্বন্দ্বে বর্তমানেরই জয়ী হওয়া উচিত বলে আমার মত। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সময় বড় বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে আমার কাছে। লাস্ট স্টেজ।” আজ তন্মিষা যেন কেবল বেদনাহত নীরব শ্রোতা। অপ্রত্যাশিত বাস্তবিক সত্যের অভিঘাতে তার হৃদয় রক্তাক্ত। হঠাৎ নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হয় তার। এই ক-বছরে কেন একবারও সৌগতর ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার কথা মনে হয়নি তার? অথচ সে হয়তো তার ব্যাপারে সবই জানে। কিন্তু সৌগত তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার দিকে একটা সুদৃশ্য মুখবন্ধ ছোটো মোড়ক এগিয়ে দেয়। তারপর হাসিমুখে বলে, ” কলকাতায় বদলি হয়েছি। আজ বিকালের ট্রেনটা ধরবো। ভালো থেকো। আসছি। ” হাসতে পারে না তন্মিষা, সৌগতর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মোড়কটা খোলে সে – ভিতরে পাথর বসানো একখানি রুপোর ব্রোচ। আরে, এটা তো তারই ! কলেজের প্রথম বর্ষে সরস্বতী পূজায় শখ করে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হারিয়ে ফেলে সেবারে খুব বকা খেয়েছিল মায়ের কাছে। এতক্ষণে বুঝতে পারে তন্মিষা। কলেজে পুজো দেখতে সৌগতও এসেছিল। আর ফল কাটার সময় তার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিল। তখনই হয়তো ব্রোচটা খুলে পড়ে যায় আর সে সেটা কুড়িয়ে নিয়েছিল। এতদিন এত যত্নে রেখে দিয়েছিল? একি তবে মায়ার বাঁধন? অশ্রুসিক্ত চোখে সে দেখে মোড়কের বিপরীত পাশে মুক্তাক্ষরে লেখা আছে একটিমাত্র লাইন – “তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে…” এমনভাবেও কেউ ভালোবাসতে পারে? আজ সৌগত বুঝি নির্মল অতীতের জয়গান গেয়ে গেল। তন্মিষা চোখ বন্ধ করে। একজন চলে যাচ্ছে, কিন্তু তাকে থামানোর সাধ্য বা অধিকার কোনোটাই তার নেই। চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তার।

জীবনরুপী স্রোত প্রবহমান….

Author: admin_plipi