টিটোদি ও রহস্যে ঘেরা কার্শিয়ং টুরিস্ট লজ [পঞ্চম ও শেষ পর্ব ]

টিটোদি ও রহস্যে ঘেরা কার্শিয়ং টুরিস্ট লজ [পঞ্চম ও শেষ পর্ব ]

কলমে – সৌরভ সেন

 

[গোয়েন্দার বেড়ানো বোধহয় এরকমই হয়। দার্জিলিং এ স্নো ফল দেখতে গিয়ে টিটোদি আর নিলু জড়িয়ে পড়ল রহস্যের জালে। পর পর দুটো খুন, আর কয়েকটা রহস্যময় সাংকেতিক ভাষায় লেখা চিঠি। সংকেত ভেঙে বেরোল শিলিগুড়ির আশেপাশের কয়েকটা জায়গার নাম।… তারপর…? ]

 

 

নিলু দরজা খুলে দেখল এক জন লোক দেখা করতে এসেছেন টিটোদির সাথে। পরনে কালো হাফ শার্ট আর নীল রঙের জিনস্ প্যান্ট। কালো, লম্বা মত চেহারা, হাল্কা চর্বি আছে শরীরে। ভদ্রলোকের বাঁ হাতে একটা ট্যাটু আঁকা। কোথায় যেন ঠিক একই রকম আঁকা ট্যাটু দেখেছে নিলু! কিন্তু না, কিছুতেই মনে করতে পারল না।
টিটোদিকে দেখে ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “নমস্কার। আমার নাম অখিল সাহা। দাদা বলল আপনি আমার সাথে দেখা করতে চান।”
-“হ্যাঁ। আমি যেতাম আপনার কাছে, ভালই হল আপনি চলে এসেছেন ভয় পেয়ে।”
-“কি সব উলটো পাল্টা বলছেন আপনি? আমি ভয় কেন পাব?” বেশ রেগেই কথাটা বলে উঠলেন ভদ্রলোক।
-“খুনের দিন আপনি কোথায় ছিলেন অখিলবাবু?”
-“বাড়িতেই ছিলাম। আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”
-“কেন, কিছু ভুল করছি কি? ওনাদের কিছু হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি লাভবান যে আপনিই হবেন।”
-“তাই বলে আমি খুন করতে যাব কেন ?”
-“ঠিক আছে, সেটা সময়ই বলবে অখিলবাবু। আপনি এবার যেতে পারেন। কাল বিকেল পাঁচটায় কার্শিয়ং টুরিস্ট লজে চলে আসুন। ওখানেই সব ফয়সালা হয়ে যাবে।”
অখিল বাবু চলে যাওয়ার পর টিটোদি নিলুকে জিজ্ঞাসা করল, “ভদ্রলোক কে চিনতে পারলি?”
-“আমি ওনাকে দেখেই এটা ভাবছিলাম! কোথায় যেন দেখেছি! কিন্তু কোথায় সেটা বুঝতে পারছি না।”
-“তোর মাথায় শুধু গোবর আছে বুঝলি, শুধু গোবর। একটু পেট পুরে ব্রাহ্মী শাক খা, বার্গার পিজা বাদ দিয়ে, বুঝলি? তাহলে যদি কিছু হয় তোর।”
-“কোথায় যে দেখেছি!”
-“তোর স্মরণশক্তির পরীক্ষা করছিলাম। ডাহা ফেল তুই।”
নিলু কিছুতেই মনে করতে পারল না অখিলবাবুকে ঠিক কোথায় দেখেছে সে! ভাবতে ভাবতে ঘুম চলে এল নিলুর।
পরদিন সকালে মালবাজার থেকে টিটোদি যখন ফিরল তখন বেলা ১১টা। মুখে একটা হালকা হাসি। নিলু বুঝল সব দরকারি তথ্য জোগাড় করে এনেছে টিটোদি ।
-“আর এক ঘণ্টা পরে বের হব আমরা, তুই রেডি হয়ে নিস সেই মতো।” টিটোদি বেশ গম্ভীর ভাবে বলে উঠল।
-“ঠিক আছে। কেসের কি সমাধান হল টিটোদি?”
-“প্রায় হওয়ার পথে। কয়েকটা খটকা আছে, আশা করি আজ তা মিটে যাবে। তা, তোর কি অবজারভেসন বল দেখি? আর শ্রীকান্ত সান্যাল ফোন করেছিল ও আজ টয়-ট্রেনে চড়ে কার্শিয়ং আসছে টুরিস্ট লজে রুম বুক করা আছে ওর। ”
-“বা! তাহলে তো ফিনিশিংটা বেশ জমজমাট। এত বড় লেখকের উপস্থিতিতে তুমি এন্ড করবে এরকম কিন্তু আগে কখনো হয় নি। দেখো, এটা নিয়ে উনি উপন্যাস না লিখে ফেলে!”
-“এটা বেশ বলেছিস। লিখলেই বা মন্দ কি?”
-“এবার হেঁয়ালি না করে বলতো মিস্টার সাহার ভাই কি খুনি?”
-“কেন এরকম মনে হল তোর?”
-“খুবই সিম্পল। সবাই মরলে উনি সব সম্পত্তির মালিক হবেন তাই।”
-“তাহলে ড্রাইভারকে মেরে ওনার কি লাভ? আর তিনজনের গ্লাসেই বিষ, কিন্তু একজন মরল কেন?”
-“তাহলে মিস্টার সাহার ভাই কি খুনি নয় বলছ?”
-“এর উত্তর পাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে শুধু যে প্রপার্টি আর টাকা পয়সার জন্য খুন দুটো হয় নি সেটা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। ”

বিকেল তিনটেয় বের হল টিটোদি আর নিলু। মিস্টার তামাংকে আগে থেকেই বলে দিয়েছিল টিটোদি। সবাই টুরিস্ট লজে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। ওরা আজকে অন্য রাস্তা দিয়ে কার্শিয়ং গেল। আসলে নিলুর অনেকদিনের শখ মকাইবাড়ি টি এস্টেট দেখবে সে। শখটা ঠিক অনেক দিনের বলাটাও ভুল হবে যদিও। মাস ছয়েক আগে সে খবরের কাগজে পড়েছে মকাইবাড়ির চা এক লক্ষ বারো হাজার টাকা কিলোতে অকশন হয়েছে। প্রথমে সে অবশ্য ভেবেছিল ছাপার ভুল। তারপর টিটোদি কে বলতেই টিটোদি অনেক ইতিহাস শুনিয়ে দিয়েছিল তাকে। মকাইবাড়ির চেয়ারম্যান রানা ব্যানার্জি সেটা তার এখন মুখস্থ হয়ে গেছে, কারণ টিটোদি অনেকবারই তাকে এই প্রশ্নটা করেছে। টিটোদিই তাকে শিখিয়েছে যে প্রধানত তিন রকম দার্জিলিং টি হয়। ব্ল্যাক টি, যার ফ্লেভার থাকে খুব সুন্দর আর লাল রঙের হয়। গ্রিন টি, যার ফ্লেভার থাকে না, সাধারনত আর হালকা সবুজ বা হলুদ রঙের হয়। আর হোয়াইট টি, যার ফ্লেভার আর রঙ কোনটাই থাকে না সাধারণত। মানে দেখে মনে হবে যেন এক কাপ শুধু জল। তখন নিলু প্রশ্ন করেছিল যে তাহলে লোকে হোয়াইট টি কেন খায়। টিটোদি বলেছিল যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে ওতে। পুরোটা ফিল করতে হলে খেয়েই বুঝতে হবে। এখন অবশ্য নিলু সবই বোঝে। এই লাস্ট তিন বছরে অন্তত বিশ রকম চা তার টেস্ট করা হয়ে গেছে। সবটাই অবশ্য টিটোদির কৃপায়।
মকাই বাড়ি টি এস্টেট দেখে ওরা এগিয়ে চলল কার্শিয়ং স্টেশনের দিকে। পথে একটা বাঁকের মুখে নিলু দেখল লাল রঙের একটা খুব সুন্দর বাড়ি। বাড়ির সামনে দুটো কার পার্ক করা। বাড়িটা দেখে মালিকের ওপর খুব হিংসে হল তার। এত সুন্দর জায়গায় এত সুন্দর একটা বাড়িতে থাকার সুখ কতটা সৌভাগ্য হলে পাওয়া যায়!
ওরা যখন কার্শিয়ং পৌঁছল তখন বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। কার্শিয়ং স্টেশনে গাড়ী থেকে নেমে ওরা একটু স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসল। শ্রীকান্ত সান্যাল আসবেন, তাঁকে নিয়েই একেবারে যাবে টিটোদি। তাই একটু অপেক্ষা করতে হবে। পাঁচ মিনিট আগে ভদ্রলোক ফোন করেছিলেন টিটোদিকে। তখন টুং স্টেশন ক্রস করে গেছে ওনার ট্রেন। আশা করা যায় আর দশ মিনিটের মধ্যে কার্শিয়ং স্টেশনে গাড়ী চলে আসবে।
স্টেশনে বসে একটা বাচ্চা মেয়েকে ‘দা হিন্দু’ পড়তে দেখে বেশ অবাক সুরে নিলু বলল, “টিটোদি দেখো, ছোট বাচ্চাটা ‘দা হিন্দু’ পড়ছে।”
একটু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হালকা হেসে টিটোদি বলল, “জানিস, কার্শিয়ং এ সাক্ষরতার হার প্রায় পঁচাশি পার সেন্ট, যেটা সারা ভারতের সাক্ষরতার হারের থেকে প্রায় পঁচিশ পার সেন্ট বেশি। এখানে অধিক সংখ্যক স্কুল থাকার জন্য কার্শিয়ংকে ‘দা স্কুল টাউন’ও বলা হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ এবং আশেপাশের অন্য রাজ্য এমনকি বাংলাদেশ থেকেও অনেকে এখানে থেকে পড়াশোনা করতে আসে।”
ওরা এক কাপ কফি শেষ করার আগেই ট্রেনের আওয়াজ শোনা গেল। ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কামরা থেকে এক গাল হাসি নিয়ে শ্রীকান্ত সান্যালকে নামতে দেখে এটা ভালই বোঝা গেল যে ভদ্রলোক ভালোই এনজয় করেছেন ওনার জীবনের প্রথম টয় ট্রেন এর ট্রিপটা।
-“কিরে বল কেমন লাগল তোর ফার্স্ট টয় ট্রেন রাইড?” টিটোদি জানতে চাইল।
-“দারুণ! তুই ঠিকই বলেছিলি। সত্যিই হিংসে হওয়ার মতন ব্যাপার। তবে আফসোস একটাই, স্টিম ইঞ্জিন কোথাও দেখতে পেলাম না।”
-“সেটা দেখতে হলে তোকে আরও কটা ষ্টেশন নিচে নামতে হ’ত। ফেরার সময় স্টিম ইঞ্জিন দেওয়া টয় ট্রেনেই ফিরিস, তাহলে দেখতে পাবি।”
-“ঠিক আছে তাই করতে হবে তাহলে।”
গাড়িতে উঠতে উঠতে শ্রীকান্ত সান্যাল টিটোদিকে জিজ্ঞাস করলেন, “কোথায় যেন পড়েছিলাম কার্শিয়ং আগে আলাদা ডিসট্রিক্ট ছিল?”
-“ঠিকই পড়েছিলি, কিন্তু হাফ মনে রেখেছিস। আলাদা ডিসট্রিক্ট নয়, আলাদা রাজ্য ছিল। সতেরশো আশির দশক অবধি কার্শিয়ং সিকিম রাজার অধীনেই ছিল। তারপর নেপালীরা এর দখল নেয়। তারপর আবার ১৮১৭র সময় নেপালীরা হেরে যায় গোর্খা যুদ্ধে। ঠিক তারপর কার্শিয়ং আবার তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তারও অনেক পরে ব্রিটিশ সরকার একটা বার্ষিক ফি’র বিনিময়ে কার্শিয়ংকে দার্জিলিং এর অন্তর্ভুক্ত করে। তুই যদি কার্শিয়ং নিয়ে কোন উপন্যাস লিখতে চাস তাহলে আরও জেনে রাখা ভালো কার্শিয়ং নামের উৎপত্তি একটি লেপচা শব্দ “কার্সন রিপ” থেকে। যেটা আসলে এই অঞ্চলের একপ্রকার অর্কিডের নাম। এই কারণে কার্শিয়ংকে ‘দ্যা ল্যান্ড অফ হোয়াইট অর্কিড’ও বলা হয়।”
-“উপন্যাস লেখার আইডিয়াটা দারুণ দিয়েছিস। তুই তো আজকেই কেসটা সলভ্ করবি বলেছিস। এটা নিয়েই তো লেখা যায়। তাহলে আমার প্রথম বাস্তব ঘটনার ওপর উপন্যাস লেখার সাধটাও পূরণ হবে। অবশ্য তোর যদি কোন আপত্তি না থাকে।”
-“আপত্তি কেন থাকবে? এতো দারুণ ব্যাপার!” হালকা হেসে টিটোদি নিলুর হাতটা চেপে দিল। টিটোদি হাতটা সরিয়ে নিতেই নিলুর মন বলে উঠল, আমি তোমার হাতের আর‌ও ছোঁয়া চাই। কিন্তু মনের আওয়াজ আর মুখ অবধি পৌঁছল না, মনের ভেতরেই অনেকবার আলোড়িত হয়ে ম্লান হয়ে গেল।
টুরিস্ট লজে যাওয়ার আগে টিটোদি একবার কার্শিয়ং এর নেতাজির বাড়িটা শ্রীকান্ত সান্যালকে দেখিয়ে নিয়ে গেল। হয়তো ওনার উপন্যাস লিখতে কাজে লাগতে পারে।
শ্রীকান্ত সান্যালকে নিয়ে সবাই মিলে সোজা চলে যাওয়া হল ওনার জন্য বুক করে রাখা রুমে। নিলু দেখল রুমটা খুবই সুন্দর, দামি কাঠ দিয়ে তৈরি। রুমের সামনে সুন্দর বৈঠক খানা, তাতে সুন্দর সোফা আর কাঁচের টেবিল রাখা রয়েছে।
ওসি সাহেবে আর বাকি সবাই অপেক্ষা করছিলেন টুরিস্ট লজের রেস্তোরাঁতে। দুটো টেবিলে আগে থেকেই রিজার্ভ বোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ওসি সাহেবের নির্দেশ মত। একটু ফ্রেশ হয়ে ওরা তিনজন চলে এল টুরিস্ট লজের রেস্তোরাঁতে।
-“ম্যাডাম, কিছু সমাধান হল?” ওসি সাহেব টিটোদিকে দেখেই জানতে চাইলেন।
-“সব সমাধান হয়ে গেছে।” টিটোদি বলে উঠল।
-“খুনগুলো কে করেছে বলুন। আমরা তাকে গ্রেফতার করি।” ওসি সাহেব বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন ।
-“সব জানতে পারবেন আস্তে আস্তে। খুব খিদে পেয়েছে চলুন কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। সবাই চলুন সেই টেবিলটাতেই বসা যাক যেখান থেকে গোটা ঘটনাটার শুরু। আর মিস্টার তামাং আমি আরেকবার সেদিনের সি.সি. টি.ভি. ফুটেজটা দেখতে চাই।”
-“নিশ্চয়ই।” ওসি সাহেব টুরিস্ট লজের ম্যানেজারকে ডেকে বলে দিলেন ফুটেজটা দিতে।
টিটোদি প্রথমে শ্রীকান্ত সান্যালকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর মোমোর অর্ডার দিতে দিতে বলল, “বুঝলি শ্রীকান্ত, কার্শিয়ং টুরিস্ট লজের মোমো না খেলে তোর কার্শিয়ং আসাটাই বৃথা হবে।”
খেতে বসে ল্যাপটপ এ সেদিনের সি.সি.টি.ভি. ফুটেজ চালিয়ে দিলেন মিস্টার তামাং। কি আশ্চর্য ঘটনার ঠিক আধ ঘণ্টা আগে দেখা গেল অখিলবাবু ওই সময় এখানেই ছিলেন। নকল দাড়িগোঁফ লাগালেও চিনতে কোন অসুবিধে হল না যে ওটা অখিলবাবুই।
-“কি অখিলবাবু? আপনি তাহলে মিথ্যে বলেছেন? আমার আগের দিনই সন্দেহ হচ্ছিল যে আপনাকে কোথায় দেখেছি! তারপর হঠাৎ আপনার বাঁ হাতের ট্যাটুটার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আরেকবার ফুটেজটা চেক করে দেখলাম।” টিটোদি বলে উঠল। এতক্ষণে নিলুর মনে পড়ল অখিলবাবুকে সে সেদিনের সি.সি.টি.ভি. ফুটেজেই তো দেখেছে!
-“না মানে, বিশ্বাস করুন আমি খুন করি নি।” অখিলবাবু বলে উঠলেন।
-“আপনি দাদাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন? আপনার বউদি কিন্তু তাই জানিয়েছেন।”
-“হ্যাঁ। কিন্তু সে তো রাগের মাথায়। বিশ্বাস করুন আমি খুন করি নি।”
-“কিন্তু, আপনার খুন করার মোটিভ যে সবচেয়ে জোরালো।”
-“আমাকে বাঁচান ম্যাডাম। আমি নির্দোষ। আমার সাথে মতের অমিল ছিল দাদার। দাদা আর ওই মিস্টার দাস আমাকে না জানিয়ে ফুলবাড়িতে ফ্ল্যাট বানানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ওখানে খুব ঝামেলা আর জমি মাফিয়ার রাজত্ব। আমি তাই ওদের পিছু নিয়েছিলাম, ওদের অ্যাকটিভিটি লক্ষ্য করার জন্য। আমার কাছে খবর ছিল যে ওরা শিলিগুড়ির বাইরে গিয়ে ডিল ফাইনাল করতে চেয়েছিল।”
– “ঠিক আছে বসুন, দেখছি। কি মিস্টার তামাং হুইস্কি খাবেন তো?”
-“না মানে ম্যাডাম…” ভদ্রলোক খুনি ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে রয়েছেন আসলে।
-“হ্যাঁ। অসুবিধা কি? হুইস্কি না খেলে খুনি ধরা পড়বে না”
-“কেন ম্যাডাম আমাদের হুইস্কি খাওয়ার সাথে খুনের কি সম্পর্ক?”
-“আছে আছে, সম্পর্ক আছে। হুইস্কি খাওয়া নিয়েই তো খুনের সূত্রপাত!”
-“চিয়ার্স” তিনটে ভ্যাট সিক্সটি নাইন দিয়ে গিয়েছিল ওয়েটার। মিস্টার সাহা এক চুমুকেই সব সাবাড় করে দিলেন।
-“আরে মিস্টার সাহা! আপনি কি এভাবেই খান নাকি!” মিস্টার তামাং বলে উঠলেন।
-“হ্যাঁ, মিস্টার তামাং। উনি এভাবে খান বলেই তো খুনি খুন করার জন্য দারুণ ব্যবস্থা নিয়েছে!”
-“কিছুই বুঝতে পারছিনা ম্যাডাম! খোলসা করে বলুন একটু।”
-“বুঝবেন, সবই বুঝবেন।”
-“মিসেস সাহা মিস্টার দাস কি শুধুই আপনার বরের বন্ধু, নাকি আপনারও বন্ধু ছিলেন?”
-“না, মানে আমার সাথেও ভালো রিলেশন ছিল ।”
-“আপনি বিয়ের আগেও মিস্টার দাসকে চিনতেন এই তো?”
-“কই না তো!” আমতা আমতা করে জবাব দিলেন মিসেস সাহা।
-“মিথ্যে কথা বলে কোনও লাভ নেই, আমি সব খোঁজ নিয়েছি। ভোটার লিস্টে আপনার নাম খুঁজে দেখি আপনি আসলে মালবাজারের বাসিন্দা। তারপর আমি মালবাজারে যাই আপনার ভোটার কার্ডের অ্যাড্রেসে। ওখানে খোঁজ নিয়েই সব জানতে পারি। প্রথমে আপনার ফোনের কল রেকর্ড দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। আপনার সাথে মিস্টার দাসের কোনও কথা হয় না এটা মানতেই পারছিলাম না। তারপর দেখি সেই কোড ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা চিঠিগুলো। চিঠিগুলোর মানে উদ্ধার করে বুঝতে পারি আপনারা প্রায়ই দেখা করতেন কিন্তু ফোনে কোনও কথা বলতেন না। তবে আপনার বেশ বুদ্ধি এটা স্বীকার করতেই হয়। আপনি কোনও প্রমাণই রাখেন নি আর খুব ভালো প্ল্যানও করেছেন। কিন্তু সবই বাজে কাজে সময় নষ্ট করেছেন।”
-“এতে কিছুই প্রমাণ হয় না!” বেশ রেগে গিয়ে বলে উঠলেন মিসেস সাহা।
-“আপনি এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন মিসেস সাহা? আমার বলা এখনো শেষ হয়নি কিন্তু। ড্রাইভারের রুমের জানালার কাঁচ ভাঙ্গার বেশির ভাগটাই ঘরের বাইরে পড়েছিল। ঘরে তেমন কাঁচ ছিলই না। এ থেকে বোঝাই যায় ওই জানালার কাঁচ ভেতর থেকে ভাঙ্গা হয়েছে। আপনি দরজা দিয়ে ঢুকে খুনটা করেন। তারপর দরজাটা লাগিয়ে দেন বাইরে থেকেই। শেষে জানলার কাঁচ ভেঙ্গে মিস্টার সাহাকে ডাকেন। যেহেতু জানালাটা একদম পেছন দিকের রাস্তায়, তাই ওই দিক দিয়ে কেউ এসে আপনাদেরকে খুন করতে চাইছে এটাই প্রমাণ করতে চাইলেন আপনি। দরজা দিয়ে খুনি ঢুকলে আপনাদের ওপরই সন্দেহটা আসবে বেশি তাই আপনি দারুণ ফন্দি আঁটলেন। এতে আপনার ওপর সন্দেহও হল না। আর তাড়াহুড়োতে আপনার হাতটা কেটে যায় তার দাগ এখনো আছে আপনার বাঁ হাতে।”
এবারে চুপ করে রইলেন মিসেস সাহা। কিছুই যে বলার নেই তার আর। তিনি ধরা পড়ে গেছেন এবারে।
-“আমি শুরু করছি কোথাও ভুল হলে আপনি শুধরে দেবেন।” টিটো দি রহস্যের ইতি টানা শুরু করল।
-“মিস্টার দাস অনেক বড়লোক বাড়ির ছেলে। মালবাজার স্কুলে আপনি আর মিস্টার দাস একসাথে পড়াশোনা করতেন। সেখান থেকে আপনাদের বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। মিস্টার দাস কাজকর্ম কিছুই করতেন না। বাবার টাকা ওড়াতেন। মদ, জুয়ায় নেশা ছিল তার প্রবল। আপনি চেষ্টা করেও কিছুই চেঞ্জ করতে পারেন নি। আপনার বাবা আপনাকে জোর করে শিলিগুড়িতে নিয়ে এসে কলেজে ভর্তি করে দেন। তারপরও আপনাদের দেখা-সাক্ষাৎ হ’ত, আর এরই মাঝে আপনার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যান। আপনাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন। তখন মিস্টার দাস বুঝতে পারেন যে আপনি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারেন। তখন আপনার কিছু গোপন মুহূর্তের ছবি ক্যামেরায় বন্দী করে রাখেন। পরে সেটা নিয়ে আপনাকে ব্ল্যাক মেলও করেন। আপনি বিশেষ পাত্তা না দিলে তিনি কায়দা করে আপনার বরের ব্যবসায় ঢুকে পড়েন। আপনাদের বাড়িতে আসা যাওয়াও শুরু করে দেন। আপনার সাথে জোর করে সম্পর্ক রাখতে চান। আপনি কিছুতেই এর থেকে বের হতে পারছিলেন না। তাকে খুন করারও হুমকি দেন। মিস্টার দাস আপনাদের ড্রাইভারকে সব ছবির লোকেশন বলে দেন আর আপনাকেও সেটা জানিয়ে দেন। আমার ধারনা ড্রাইভারকে নিয়েই আপনি মিস্টার দাস এর সাথে দেখা করতে যেতেন সব সময়। ড্রাইভার সবটাই জানত। ড্রাইভারের ডায়েরিটা আমি পুরোটা পড়ে দেখেছি, তাতে আপনার নামের উল্লেখ যদিও কোথাও নেই, কিন্তু তাতে বিভিন্ন তারিখে তার প্রাপ্য টাকার হিসেব ছিল এবং সেই তারিখগুলো আপনার কোড ওয়ার্ডে লেখা চিঠিতে দেখা করতে যাওয়ার তারিখের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। এ থেকে অনুমান করাই যায় যে টাকাগুলো তাকে আপনি বা আপনারাই দিয়ে থাকতেন। এই ঝঞ্ঝাট থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে আপনি দুজনকেই খুন করার প্ল্যানটা একেবারে ফাইনাল করে ফেলেন। কার্শিয়ং ঘুরতে আসার কথাটা প্রথম আপনিই বলেছিলেন সবাইকে। সেটা আমি জানতে পারি মিস্টার সাহার কাছ থেকে। প্রথম দিন মিস্টার সাহার মদ খাওয়া দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম! উনি খুব স্পিডে খাচ্ছিলেন। এটা ওনার অভ্যাস, আপনি সেটা জানতেন। তাই আপনি বুদ্ধি করে কিছু বরফের ভেতর পয়জন মিশিয়ে দিলেন আর সেটা থারমো ফ্লাস্কে নিয়ে আসলেন। পরে কায়দা করে সেটা আইস বাকেটে ঢেলে দিলেন। মিস্টার সাহার গ্লাসের বরফ বেশি একটা জল হল না, কারণ উনি প্রথমেই সবটা খেয়ে ফেললেন। আর মিস্টার দাস খাচ্ছিলেন আস্তে আস্তে, তাই বরফ গলে পয়জন মিশে যায় ড্রিংকে আর তাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। আপনি কায়দা করে আপনার গ্লাসেও পয়জন দেওয়া বরফ ফেলে রাখলেন। আপনি পুলিশের সন্দেহ তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেলেন। আর আপনি বেছে বেছে এমন জায়গায় গিয়ে বসলেন যাতে ক্যামেরায় আপনার অ্যাক্টিভিটি দেখা না যায়।”
মিসেস সাহা চুপ করে রইলেন। আর মিস্টার সাহা ভাবতেও পারছেন না যে এত বড় একটা ব্যাপার তিনি কিছুই জানতেন না। নারী–পুরুষের সম্পর্কের বিশ্লেষণ, সে তো চিরকালের চিরনতুন।
মিসেস সাহাকে লকআপে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে মিস্টার তামাং জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি বরফের ব্যাপারটা কি করে বুঝলেন?”
-“কাঁচ ভাঙ্গার ব্যাপারটাতে বুঝতে পারি মিসেস সাহা মিথ্যে কথা বলছেন। কিন্তু কেন সেটা বুঝতে পারি না। তখন ভাবি যদি মিসেস সাহা খুন করে থাকেন তাহলে হয়তো পরে কায়দা করে গ্লাসে বিষ মিশিয়েছেন। কিন্তু টিভি ফুটেজে সেরকম কিছুই চোখে পড়ে না। একটু ভালো করে লক্ষ করে দেখি মিসেস সাহার জুস যখন প্রায় শেষ তখন তিনি বরফ ঢালছেন গ্লাসে আর মিস্টার সাহা ফটাফট মদ খেয়ে যাচ্ছেন, তার গ্লাসে শুধু বরফ পড়ে আছে। আর তখনি চোখ যায় টেবিলে রাখা থারমো ফ্লাস্কটার দিকে। তখনি ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু কে খুনি ঠিক বুঝতে পারি না। মিসেস সাহা আর মিস্টার সাহা দুজনের ওপরই সন্দেহ হয়। মিস্টার সাহার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মিস্টার দাসের সাথে তাঁর সেরকম কোনও ঝামেলা ছিল না। মিসেস সাহা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এই ফ্ল্যাটে ওনারা নতুন এসেছেন। এর আগে কোথায় ছিলেন কেউ বিশেষ কিছু জানে না। এর পর ভোটার লিস্ট থেকে সব জানতে পারি। দেখি তার বাড়ি মিস্টার দাসের পাড়াতেই। তখন সন্দেহ হয়। আর মিস্টার সাহা যে ওভাবেই মদ খান সব সমই সেটা যে প্রি প্লানড নয় সেটাও আজই শিওর হয়ে নিলাম কিছুক্ষণ আগেই। অর্থাৎ এই প্ল্যানে মিস্টার সাহা কোনোভাবেই সামিল ছিলেন না। তার গ্লাসেও যে পয়জন আছে সেটা তো তিনি জানতেনই না।”
-“ভদ্রমহিলার তো বেশ শার্প ব্রেইন দেখছি, ম্যাডাম!”
-“হ্যাঁ। উনি খুব ডিটেকটিভ গল্প পড়তেন যে! মনে নেই টেবিলে রাখা শার্লক হোমস সমগ্র বইটা?”
-“হ্যাঁ। তাই তো।” মিস্টার তামাং খুব খুশি হয়ে উত্তরটা দিলেন।

এরপর কার্শিয়ং টুরিস্ট লজে বসেই সব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনে নেন শ্রীকান্ত সান্যাল। তারপর আরও দুটো দিন বুকিং এক্সটেন্ড করে টুরিস্ট লজেই থেকে যান তিনি। পুরো উপন্যাস লেখাটা সেখানে বসেই শেষ করে ফেলেন। এই প্রথম একটা সত্যি ঘটনাকে উপন্যাস আকারে লিখতে পেরে তিনি বেজায় খুশি। টিটোদি আর নিলুও খুশি, এই প্রথম তাদের কোন কেস বই হয়ে বের হওয়ার অপেক্ষায়। মিস্টার সাহা ওনার স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসেন, শহরের সব চেয়ে বড় ক্রিমিনাল ল ইয়ার লাগিয়েছেন তিনি তাঁকে বাঁচাতে। আর নিলু এখনও চুপি চুপি ভালবেসে যায় টিটোদিকে। আর এখনও একই ভাবে চলে আসে মাঝে মাঝে টিটোদির কাছে আড্ডা মারতে। টিটোদি আর নিলুর সম্পর্কের কি পরিণতি হয় সেটা তো সময়ই বলবে।

 

সমাপ্ত।

 

১) প্রথম পর্ব  https://pandulipi.net/titodi-rahasyo-01/
২) দ্বিতীয় পর্ব https://pandulipi.net/titodi-rahasyo-02
৩) তৃতীয় পর্ব   https://pandulipi.net/titodi-rahasyo-03/
৪) চতুর্থ পর্ব   https://pandulipi.net/titodi-rahasyo-04/
৫) পঞ্চম ও শেষ পর্ব  https://pandulipi.net/titodi-rahasyo-05/

 

 

Author: admin_plipi

2 thoughts on “টিটোদি ও রহস্যে ঘেরা কার্শিয়ং টুরিস্ট লজ [পঞ্চম ও শেষ পর্ব ]

Leave a Reply

Your email address will not be published.